জিহাদি – ১২

(বারো)

নিউ জার্সিতে মিঠাস বলে একটা গুজরাতি রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছে কালকেতু আর সুদীশ। সন্ধে ছ’টা-সাড়ে ছ’টা বাজে। নিরামিষ এই রেস্টুরেন্টটা যে খুব চালু, ভিড় দেখলেই বোঝা যায়। খাদ্যরসিকরা বেশিরভাগই গুজরাতি অথবা দক্ষিণ ভারতীয়। খাবারের তালিকাতেও তাদেরই পছন্দের ছাপ। হয় ব্যাসন দিয়ে তৈরি নোনতা, নয়তো নারকেল তেল দিয়ে ভাজা বড়া-ধোসা। কালকেতুর কোনওটাই পছন্দের নয়। কাউন্টারের ঠিক উপরে খাবারের ছবি দেখতে দেখতে ও একবার ভাবল, পুরি-ভাজি খাবে। কিন্তু পুরির সাইজ দেখে ও পিছিয়ে গেল। রোজিনা ডিনারে মেক্সিকান কুইজিন খাওয়াবেন। ভর সন্ধেয় দুটো বড় বড় পুরি খেলে পেটে আর জায়গা থাকবে না। রাতে আর খেতে ইচ্ছে করবে না। তাই ও দহিবড়ার অর্ডার দিল। সুদীশ অবশ্য পাওভাজি খেতে চাইল। অর্ডার দিয়ে সুদীশ বলল, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যে ছবিটা তুই আমার কাছে পাঠিয়েছিলি, সেটা কিন্তু তোদের রমাদার তোলা না।’

শুনে চমকে উঠল কালকেতু। কী বলছে সুদীশ!!

সকালে সুদীশ ফোন করে বলেছিল, লিওঁ থেকে নিউ জার্সিতে এসেছে। মেট্রো পার্ক স্টেশনের কাছাকাছি এক হোটেলে উঠেছে। অবাক হয়ে কালকেতু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘হঠাৎ তুই এখানে?’

সুদীশ বলেছিল, ওর এক মাসতুতোভাই এই নিউ জার্সিতে থাকে। পনেরো বছর এখানে কাটানোর পর ভাই সদ্য গ্রিনকার্ড পেয়েছে। সেই আনন্দে পার্টি। শুনে একটু খটকা লেগেছিল কালকেতুর। সামান্য একটা পার্টির জন্য সুদীশ ফ্রান্সের লিওঁ থেকে নিউ জার্সিতে আসবে, বিশ্বাস করতে ওর মন চায়নি। কিন্তু সুদীশ যখন বলল, কাল সকালবেলাতেই ও ওয়াশিংটন চলে যাবে, ওখানে আমেরিকার ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) একটা ওয়ার্কশপে অংশ নেওয়ার জন্য, তখন কালকেতু আর কোনও প্রশ্ন করেনি।

ইন্টারপোল অফিসারদের না কি কিছু বাধা-নিষেধ আছে। ওঁরা যার-তার বাড়িতে যেতে পারেন না। প্রোটোকলে বাঁধে। পলাশভাইয়ের বাড়িতে তাই সুদীশ যেতে চায়নি। কাছাকাছি মিঠাস বলে এই রেস্টুরেন্টে ওকে ডেকে নিয়েছে কালকেতু। কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলছে। কলকাতা থেকে বেরনোর আগেই শিউলিদিদিকে খুঁজে বের করার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সব কথা সুদীশকে ও জানিয়েছিল। টুলটুলের দেওয়া ছবি আর রমাদার লেখার ফোটো কপিও পাঠিয়ে দিয়েছিল। সুদীশ বোধহয় কিছুর সন্ধান পেয়েছে। আর সেটা বলার জন্যই ও এত উদগ্রিব।

ছবিটা তোদের রমাদার তোলা না। শুনে বিস্ময় কাটিয়ে কালকেতু বলল, ‘তুই কী করে সিওর হলি?’

সুদীশ বলল, ‘দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। যে ধরনের ক্যামেরায়, এই ছবি তোলা সম্ভব, সত্তরের দশকের গোড়ায় আমাদের কাগজের ফোটোগ্রাফারদের কাছে তা ছিলই না। আমাদের ইন্টারপোলের একটা ফোরেনসিক ডিভিশন আছে জার্মানির কোলন শহরে। সেখানে এক্সপার্টরা বলে দিতে পারেন, ছবিটা কোন ধরনের ক্যামেরা থেকে তোলা হয়েছে। কতদিনের পুরনো। কত হাইট থেকে তোলা… এইসব খুঁটিনাটি। তোর পাঠানো রমাদার ছবিটা আমি পাঠিয়েছিলাম কোলনে। নতুন কোনও তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা জানার জন্য। একটা রেসপন্স পেয়েছি। তাই তোকে জানাতে এলাম।’

‘রমাদার ছবিটা কোন ক্যামেরা থেকে তোলা হয়েছিল?’

‘এই ছবিটা তোলা হয়েছিল ক্যাননের এফ-ওয়ান সিরিজের ক্যামেরা থেকে। হাই স্পিড মোটর ড্রাইভ ক্যামেরা, সবে বেরিয়েছে। সেকেন্ডে সাতটা করে ফ্রেম দিত। তখনও ওই মডেলের ক্যামেরা ভারতে আসেনি। তাই ধরে নিতে হবে, রমাদা মোটেও ওই ছবিটা তোলেননি।’

‘তা হলে রমাদার কাছে ওই ছবিটা এল কী করে?’

কাউন্টারে পাওভাজি আর দহিবড়া রেডি। সেটা দেখে সুদীশ বলল, ‘দাঁড়া, বলছি। এখানকার রেস্টুরেন্টে তো আপনা হাত, জগন্নাথ। কাউন্টার থেকে ট্রে নিজেদেরই নিয়ে যেতে হবে। চল, আগে সেটাই করি।’

 দু’জনে খাবারের ট্রে নিয়ে এসে কোণের দিকে একটা টেবলে খেতে বসল। পাওভাজি মুখে দিয়ে সুদীশ বলল, ‘তুই খুব অবাক হচ্ছিস, তাই না? তা হলে পুরো ব্যাপারটা গুছিয়ে বলি। লিওঁতে আমাদের ইন্টারপোলের হেড কোয়াটার্সে একটা বিশাল লাইব্রেরি আছে, যেখানে ওয়ার্ল্ডের সব নামী কাগজের পুরনো ফাইল পাওয়া যায়। আমেরিকান সেকশনের যিনি লাইব্রেরিয়ান, তাঁর নাম জন বেটো। কলকাতা থেকে তাঁকে মেল করে আমি লিখেছিলাম, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাওয়া পর্যন্ত এক বছর সময়ের পেপার কাটিংস আমার দরকার। জানতে চেয়েছিলাম, ছয় বছরের একটা মেয়ে সেই যুদ্ধের সময় মারাত্মক আহত হয়েছিল। তার ছবি নিউ ইয়র্ক টাইমস ছেপে ছিল। মেয়েটির সম্পর্কে যদি কোনও কাগজে কিছু লেখা হয়ে থাকে, তা হলে সেটা আমার কাজে লাগবে। প্রায় একমাস বেটোর কাছ থেকে কোনও উত্তর নেই। দু’তিন দিন আগে আমার কাছে একটা পার্সেল এল। তাতে দেখি, বেটো এমন কিছু তথ্য পাঠিয়েছেন, যা আমার সন্দেহটা তো গাঢ় করেইছে, ভবিষ্যতে তোরও ভীষণ কাজে লাগবে।’

দহিবড়া মুখে দিয়ে কালকেতু বলল, ‘কিন্তু ছবিটা রমাদার তোলা না, এটা বিশ্বাস করতে মন চাইছে না ভাই। যতদূর জানি, ওই ছবিটার জন্য রমাদা বেস্ট ওয়ার পিকচারের অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। রমাদা মিথ্যে কথা বলে প্রাইজ নেবেন? আমার মনে হয় না।’

সুদীশ বলল, ‘তোকে কে বলেছে, ওই ছবিটার জন্য রমাদা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন?’

‘রমাদার ছেলে টুলটুল।’

‘ও ঠিক জানে না। গুগল সার্চ করে আমি দেখেছি। রমাদা বেস্ট ওয়ার পিকচার তোলার অ্যাওয়ার্ড পান ওয়ার্ল্ড ফোটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে। অন্য একটা ছবির জন্য। সেটাও আমি খুঁজে পেয়েছি। সাবজেক্টটা অসাধারণ। বুড়ি গঙ্গার চরে পাক সেনারা মেরে ফেলে রেখে গেছে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে। ডেডবডিগুলো পড়ে আছে। বিষণ্ণ বিকেল, নদীর ওপারে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ডেডবডির একটু দূরেই অপেক্ষা করছে একদল শকুন। দিনের আলো নিভে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তার পর মৃতদেহ ঠুকরে ঠুকরে খাবে। ওয়ার্ল্ড ফোটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে ক্লিক করিস। তা হলে দেখতে পাবি, সেরা একশোটা যুদ্ধের ছবির মধ্যে রমাদার এই ছবিটা আছে।’

‘ছবিটা কোন সালে তোলা?’

‘ওই একাত্তরেই। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। ছবি আর রেলিভ্যান্ট কিছু পেপার কাটিং একটা পেন ড্রাইভে ভর্তি করে নিয়ে এসেছি। পড়লেই সব বুঝতে পারবি ভাই। দেখবি, ওই মেয়েটার ছবি প্রথম ছাপা হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসে ষোলোই ডিসেম্বর ১৯৭১। অর্থাৎ কলকাতায় তোদের কাগজে ছবিটা ছাপা হওয়ার এক সপ্তাহ আগে। ছবিটা অ্যাকচুয়ালি তোলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিচার্ড গাটম্যান বলে একজন ফোটোগ্রাফার। আমার মনে হয়, ঢাকায় কোথাও রিচার্ডের সঙ্গে দেখা হয়েছিল রমাদার। তখন ওঁর কাছ থেকে কিছু ছবি উনি চেয়ে নিয়ে তোদের কাগজে পাঠিয়ে ছিলেন।’

ফোটোগ্রাফাররা নিজেদের মধ্যে ছবি আদান প্রদান করেন, সেটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু রমাদার মতো একজন শ্রদ্ধেয় ফোটোগ্রাফার অন্যের ছবি নিজের বলে চালিয়ে দেবেন, এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছিল কালকেতুর। ছবি আগে ছাপা হওয়া মানে গ্যারান্টি দেয় না, রিচার্ড গাটম্যানেরই তোলা। এমনও হতে পারে, ঢাকা থেকে ছবিটা কলকাতায় পাঠাতে দেরি করেছিলেন রমাদা। অথবা ওঁর ছবিটা পেয়েও নিউজ এডিটর দু’চারদিন ফেলে রেখে দিয়েছিলেন, ছাপাননি। তখন কাগজের নিউজ এডিটর কে ছিলেন, মনে করার চেষ্টা করল কালকেতু। অমিত চৌধুরী… ওই রকম একটা ছবি তিনি ফেলে রাখতেই পারেন না। বিশেষ করে, সদ্য যুদ্ধ লেগেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ভারত জেনারেল মানেকশ’র নেতৃত্বে তখন সবে সেনাবাহিনি পাঠিয়েছে ঢাকায়!

যুক্তিটা দিতেই সুদীশ বলল, ‘টুলটুল ছবির সঙ্গে রমাদার যে চিঠিটা তোকে দিয়েছিল, সেটা কি তুই ভাল করে পডেছিস কালকেতু? ইন বিটুইন লাইনস পড়লে বুঝতে পারতি, রমাদা কোত্থাও ক্লেইম করেননি, ছবিটা উনি তুলেছিলেন। দাঁড়া, চিঠিটা আমার মোবাইলেই আছে। খাওয়া শেষ হলে, পড়ে তোকে শোনাচ্ছি। তা হলে বুঝতে পারবি।’

খেতে খেতে কালকেতুও মনে করার চেষ্টা চালাল। রমাদার লেখা চিঠিটা ও এক-দু’বার পড়েছে। কিন্তু কখনও ওর মনে ছবিটা নিয়ে প্রশ্ন জাগেনি। রিটায়ার করার পর রিপোর্টার বরুণদা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন। তাতে রমাদার দক্ষতা নিয়ে উনি প্রচুর প্রশংসা করেছেন। লিখেছেন, ‘তখন রমার বয়স কম, ব্যাটাচ্ছেলে সবসময় আমেরিকান আর ব্রিটিশ রিপোর্টারদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। মাঝে মধ্যে ওঁদের আলোচনা শুনে এসে আমাদের টিপসও দিত। পাকিস্তান যে খুব তাড়াতাড়ি স্যারেন্ডার করবে, সেই খবরটা ও-ই প্রথম আমাকে এনে দিয়েছিল। তখন ওকে অবিশ্বাস করে খবরটা করিনি। করলে আমরা একটা অল ইন্ডিয়া এক্সক্লুসিভ করে ফেলতে পারতাম। পরে এ নিয়ে রমা খুব আক্ষেপ করত।’

খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে এসে সুদীশ পকেট থেকে মোবাইল বের করল। সুইচ টিপে চিঠিটা বের করে ও বলল, ‘দাঁড়া, তোর অসুবিধে হবে। আমিই তোকে পড়ে শোনাচ্ছি। শোন, যা বলেছি, ঠিক কি না?’

সুদীশ লেখাটা পড়তে শুরু করল। ‘রমাদা লিখেছেন, এই ছবিটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার। পাক সেনারা তখন নির্বিচারে হত্যা করছিল, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী আর গ্রামের মোড়লদের। বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বউ-ঝিদের ধর্ষণ করছিল। তখন তাদের সাহায্য করছিল রাজাকাররা। পাক সরকারের সুবিধাভোগী সেই সব বাঙালি-অবাঙালি, যারা সংখ্যায় খুব অল্প। রাজাকাররা চাইছিল না, মুক্তিযুদ্ধ সফল হোক। যুদ্ধের সময় এই রাজাকাররা সাংবাদিকদেরও ভয় দেখাচ্ছিল। এমন কোনও ছবি বা লেখা পাঠানো যাবে না, যাতে পাকিস্তানের বদনাম হয়। ব্রিটিশ বা আমেরিকান সাংবাদিকরা অবশ্য রাজাকারদের পাত্তা দিতেন না। সেটা বুঝে আমি ফরেন রিপোর্টারদের একটা দলের সঙ্গে ভিড়ে গেছিলাম। ওদের সাহায্য নিয়ে কলকাতার অফিসে ছবি পাঠাতাম।’

‘পূর্ব পাকিস্তানে আমি ঢুকেছিলাম, যশোহর দিয়ে। একাত্তরের ডিসেম্বরে ইন্ডিয়ান আর্মি যুদ্ধ ঘোষণা করার পরই বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে আমিও রওনা হয়েছিলাম ঢাকার দিকে। সেদিনই ঢাকায় প্রথম বোমা পড়েছিল। রাজাকারদের এড়ানোর জন্য আমরা গাড়িতে করে নদীর ধার দিয়ে এগোচ্ছিলাম। তখন শুনলাম, কাছেই একটা গ্রামের কালীমন্দিরের আশপাশে চারটে বোমা পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির টাটকা ছবি তোলার জন্য আমরাও দৌড়লাম সেদিকে। গিয়ে আহতদের মুখে শুনলাম, পাক সেনারা বোমা ফেলবে এই আশঙ্কায় গ্রামের মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল কালীমন্দিরে। এই আশায় যে, জাগ্রত কালী মা ওদের বাঁচাবেন। তেমনটা আদৌও হয়নি। মন্দির অক্ষত ছিল, কিন্তু আশ্রিতরা অনেকেই মারা গেছিলেন।’

‘আমরা যখন ধ্বংসের ছবি তুলতে ব্যস্ত, সেইসময় নদীর ধারে মন্দিরের পিছনদিকে মেয়েটাকে প্রথম দেখতে পায় রিচার্ড গাটম্যান বলে একজন আমেরিকান ফোটোগ্রাফার। মেয়েটার পায়ের পাতা থেকে পিঠ, হাতের পিছনের দিকের অংশ এবং পোশাক আগুনে ঝলসে গেছিল। আতঙ্কে উলঙ্গ অবস্থায় ও রাস্তা দিয়ে দৌড়োচ্ছিল। ‘জ্বইলা গেল, জ্বইল্যা গেল’ বলতে বলতে মেয়েটা একটা সময় রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে। রিচার্ড ওর ওই অবস্থা দেখে, ক্যামেরা কাঁধ থেকে নামিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায়। তার পর ওকে কোলে তুলে নিয়ে ঝাঁপ দেয় নদীর জলে। ও জলে ঝাঁপ না দিলে মেয়েটা হয়তো সেদিনই মরে যেত। রিচার্ডকে দেখে সেদিনই শিখেছিলাম, পেশার থেকেও মানবিক কর্তব্যকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’

‘মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে রিচার্ড রওনা দিয়েছিল ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালের দিকে। আমরা অনেকেই ছবি তোলার লোভে ওই গ্রামেই থেকে গেছিলাম। রাতে পূর্বানী হোটেলে যখন ওঁর সঙ্গে দেখা হল, তখন জানলাম, মেয়েটাকে ও রেড ক্রশের হাতে তুলে দিয়েছে। হয়তো বেঁচে যাবে। কিন্তু কবে সুস্থ হবে, ডাক্তাররা গ্যারান্টি দিতে পারেননি। হোটেলের ঘরেই ছবি ডেভেলপ করে রিচার্ড প্রিন্ট শুকোতে দিয়েছিল। সেগুলো দেখিয়ে আমাকে বলেছিল, তোমার যেটা পছন্দ, বেছে নিয়ে, সেটা তোমার অফিসে পাঠিয়ে দিতে পারো।’

‘সারা দিনে আমি চারটে রোল ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে ঢাকায় স্টুডিয়োগুলো তখন সব বন্ধ। ডেভেলপ করার সুযোগ নেই। পরদিন ইস্টার্ন কম্যান্ডের এক কর্ণেলের হাত দিয়ে রোলগুলো আমি কলকাতায় পাঠাই। সেই ছবি আমাদের অফিসে পৌঁছেছিল আরও দিন তিনেক পর। রিচার্ডের সঙ্গে আমার আর কখনও দেখা হয়নি। কেননা, পরে হোটেলে গিয়ে ওঁর খোঁজ করতে শুনি, চেক আউট করে গেছে। অনেক পরে পাকিস্তানি এক ফোটোগ্রাফারের কাছে শুনেছিলাম, রিচার্ড না কি প্রতিজ্ঞা করেছিল, জীবনে আর কখনও যুদ্ধের ছবি তুলবে না।’

মোবাইল থেকে রমাদার চিঠিটা সুদীশ পড়ে শোনাচ্ছে। কালকেতুর মনে পড়ল, প্রথম যেদিন ও চিঠিটাতে চোখ বোলায়, সেদিন টুলটুল বলেছিল, ‘এই ছবিটা ভাঙিয়ে বাবা জীবনে অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু উনি তা করেননি। স্টুডিয়োতে আগুন লাগার পর ছবিটা আমি যখন উদ্ধার করি, তখনও বাবা বেঁচে। স্মৃতিশক্তি খানিকটা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। এই ছবিটা দেখিয়ে কোনও প্রশ্ন করলে কেন জানি না বাবা এড়িয়ে যেতেন। কেমন যেন সংকোচ বোধ করতেন উত্তর দিতে।’ টুলটুলের কথাগুলো কালকেতু তখন বুঝতে পারেনি। এখন ওর মনে হচ্ছে, হয়তো সুদীশই ঠিক। ছবিটা নিজের তোলা নয় বলে, জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে হয়তো রমাদা কিছু বলতে গ্লাণিবোধ করতেন। সত্যিই, চিঠিতে রমাদা কোথাও স্পষ্ট করে লিখে যাননি, ছবিটা উনিই তুলেছিলেন।

চিঠি পড়া শেষ করে সুদীশ বলল, ‘কেন আমার সন্দেহ হয়েছিল জানিস। রিচার্ড গাটম্যান ওই ছবিটার জন্য পুলিৎজার পুরষ্কার পেয়েছিলেন। অরিজিনাল আর এক্সক্লুসিভ ছবি না হলে উনি অত বড় অ্যাওয়ার্ড পেতেন না। তুই আমায় ভুল বুঝিস না ভাই। রমাদাকে খাটো করছি না। উল্টে তোকে একটা দিশা দিতে চাইছি। বলতে চাইছি, যে মেয়েটাকে তুই খুঁজছিস, তার সম্পর্কে সবথেকে ভাল বলতে পারবেন রিচার্ড গাটম্যান। উনি আগে থাকতেন নিউ ইয়র্কে। রিটায়ার করার পর এখন আমেরিকার কোথায় আছেন, কেউ জানে না। এটা তোকেই খুঁজে বের করতে হবে।’

‘তোদের মিসিং পারসন্স ডিভিশনও বলতে পারল না?’

‘না। আসলে কী জানিস, নিরুদিষ্ট মানুষ সম্পর্কে কেউ যদি ব্যাক্তিগতভাবে কিছু জানতে চায়, ইন্টারপোল তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। ওদের কাছে অনুরোধটা যেতে হবে কোনও দেশের পুলিশ ফোর্সের কাছ থেকে। নামেই গালভারী অর্গাইজেশন। ইন্টারপোল আসলে ইন্টারন্যাশনাল পুলিশের একটা লাইব্রেরি। সারা বিশ্বের ক্রাইম রেকর্ড ওখানে পাবি। এমন একটা জায়গা যা, শুধু তথ্য আদান-প্রদান করে। আমি জানি, তোর ব্যাপারটা নিয়ে যদি ফের বেটোর কাছে কোনও রিকোয়েস্ট করি, তা হলে উনি রেসপন্ড করবেন না।’

‘তোর ভাল লাগছে ইন্টারপোলে কাজ করতে?’

‘একদম না। নামেই বিরাট, কিন্তু শুনে তুই অবাক হবি, কাউকে অ্যারেস্ট করার ক্ষমতা পর্যন্ত আমাদের নেই। আমরা একটা পিস্তল পর্যন্ত ক্যারি করতে পারি না। আমাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অপরাধী আর উগ্রপন্থীদের সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করা এবং সেটা লিওঁর হেড কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেওয়া।’

আরও কী বলতে যাচ্ছিল সুদীশ। এমন সময় ওর মোবাইলটা বেজে উঠল। চেয়ার ছেড়ে ওঠার সময় ও বলল, ‘হেড কোয়ার্টার্স থেকে ফোন! দাঁড়া, কী রিকোয়েস্ট করবে কে জানে?’

রেস্টুরেন্টের ভিতর প্রচুর লোক খেতে খেতে কথা বলছে। ফোনে কিছু শুনতে পাবে না, ভেবে সুদীশ মিঠাস থেকে বেরল। সিগারেট ধরানোর জন্য কালকেতুও বাইরে বেরিয়ে এল। সামনে বিরাট পার্কিং স্পেস। তাতে অসংখ্য গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমেরিকায় গাড়ি ছাড়া জীবনযাপন অসম্ভব। আশপাশে আরও কয়েকটা ফুড জয়েন্ট। ডোমিনো’স, আইহোপ, পাণ্ডা এক্সপ্রেস, পাপা জোন্স, স্পোর্টস পাব, স্টার বাকস। রোজিনা আর পলাশভাইয়ের কল্যাণে, এই ক’দিনে ওই সব নামী রেস্টুরেন্ট আর কফি শপে কালকেতুর পা দেওয়া হয়ে গেছে। মিঠাসের ঠিক পাশেই একটা মোগলাই খানার দোকান। কাচের দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে করতে হঠাৎ কালকেতুর চোখে পড়ল, পলাশভাইয়ের আশ্রিত দু’জন… ইমন আর চিরাগ দোকানটা থেকে বেরিয়ে আসছে। ইচ্ছে করেই ও মুখ ঘুরিয়ে নিল, যাতে ওই দু’জনের চোখে না পড়ে।

বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। জ্যাকেট না পরে বেরনোটা ওর ঠিক হয়নি। কালকেতু ফের মিঠাসের ভিতরে ঢুকে যাবে কী না ভাবছে, এমন সময় সুদীশ এসে বলল, ‘দিন দুই তিনেক বোধহয় আমাকে নিউ জার্সিতে থেকে যেতে হবে রে।’

কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’

সুদীশ বলল, ‘এইমাত্তর হেড কোয়াটার্স থেকে খবর পেলাম, নিউ জার্সিতে দু’জন জিহাদি কোনও বাড়িতে লুকিয়ে রয়েছে। তাদের খুঁজে বের করতে হবে। দু’জনই খতরনাক টাইপের। একজনের নাম রফিকুল আলম অন্যজন ফিরহাদ আলি। আমাকে একবার লোকাল এফবিআই অফিসে যেতে হবে। ওরা কিছু ইনপুট দেবে।’

কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কেন? এখানে ইন্টারপোলের আর কোনও অফিসার নেই?’

সুদীশ বলল, ‘আছেন। কিন্তু আমাকে রেখে দেওয়ার কারণ, যে দুই টেররিস্ট এখানে লুকিয়ে আছে, এফবিআই খবর পেয়েছে, তারা দু’জনই বাংলা ভাষায় কথা বলে।’ কথাগুলো বলতে বলতেই সুদীশ পকেট থেকে পেনড্রাইভটা বের করে কালকেতুর হাতে ধরিয়ে দিল। তার পর বলল, ‘এই পেন ড্রাইভে অনেক তথ্য আছে। সেগুলো ভাল করে দেখে নিয়ে, তুই কাল একবার নিউ ইয়র্ক টাইমস অফিসে যা। গিয়ে দ্যাখ, রিচার্ড গাটম্যান সম্পর্কে কোনও খবর পাস কি না। তোর সঙ্গে আমার দু’একদিনের মধ্যে ফের কথা হবে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *