(পঁয়ত্রিশ)
ফাউন্ডেশনের অফিসে পৌঁছে লিলি গডউইন দেখতে পেলেন, লাউঞ্জে বাম কিমের সঙ্গে জন মিকেল বসে কথা বলছেন। তাঁকে দেখে মিকেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। মিরাকলটা কীভাবে হল, আমরা বুঝতে পারছি না।’
অ্যাড্রায়াটিকা রেসিডেন্সি থেকে ম্যানহাটন… এতটা রাস্তা নিজে গাড়ি চালিয়ে এসেছেন। ড্রাইভ করার অভ্যাস অনেকদিন চলে গেছে। ড্রাইভারের সিটে সোজা হয়ে বসলেই এখন পিঠে যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। এখনও ব্যথাটা তিনি অনুভব করছেন। লাউঞ্জের সোফায় বসে পড়ে লিলি বললেন, ‘মিরাকল? কী হয়েছে?’
মিকেল বললেন, ‘আপনার এখান থেকে মি. বাম কিম আমাদের একটা কমপ্লেন করেছিলেন। আপনার চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্ট না কি হ্যাকড হয়েছে। আমাদের সাইবার ক্রাইম সেল থেকে লোকজন নিয়ে এসে এখন দেখছি, কাউন্টার হ্যাকিং হয়েছে।’
‘কী বলছেন মি. মিকেল, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
বাম কিম বললেন, ‘আমি বুঝিয়ে বলছি ম্যাডাম। আপনাকে আগেও বলেছি, কাল রাতে একজন হোয়াইট হ্যাট প্রোগ্রামার জিমি রাইটসকে আমি ডেকে নিয়ে এসেছিলাম। ও বলেছিল, টয় ডিভিশন থেকে কেউ হাফ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করে দিয়েছে মরিশাসের একটা ফাইনান্সিয়াল অর্গানাইজেশনকে। একটু আগে পুলিশের সাইবার ক্রাইম সেল-এর লোকরা অ্যাকাউন্ট ওপেন করে দেখেন, মরিশাস থেকে সেই অর্থ আবার ফিরে এসেছে। কী করে এটা হল, পুলিশের মাথায় ঢুকছে না।’
মিকেল বললেন, ‘একজন হ্যাকার আপনাদের অ্যাকাউন্টস থেকে ডলার চুরি করল। সেই অঙ্কের ডলার আবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আপনার অ্যাকাউন্টে ফিরে এল! এমন ঘটনা, আমার পুলিশ জীবনে কখনও দেখিনি বা শুনিনি ম্যাডাম। আমার লোকেরা এখন খুঁজে দেখছে, চোররা কোন সার্ভারের থ্রু দিয়ে এই অপকর্মটা করেছিল।’
শুনে প্রভু যিশুকে মনে মনে স্মরণ করলেন লিলি। ডলারগুলো চুরি হয়ে গেলে মারাত্মক বদনামের ভাগী হতেন তিনি। চট করে তাঁর মনে পড়ল, রোকেয়া সুলতানার মৃত্যুর পর যখন তাঁকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে, তখন টিভিতে একজন ডেমোক্রাট সেনেটর একদিন বলেছিলেন, লিলি গডউইন ফাউন্ডেশনের ফান্ড থেকে একটা অংশ মরিশাসে পাচার করতে চেয়েছিলেন। মরিশাসের কথাটা উঠল কোত্থেকে, তখন ভেবে লিলি কোনও সদুত্তর পাননি। সেই মরিশাসের নাম সত্যিই জড়িয়ে গেল। অন্তত কম্পিউটারে তো রয়ে গেল, হাফ মিলিয়ন ডলার মরিশাসে সরানো হয়েছিল? তা হলে কি ফাউন্ডেশনেরই কেউ এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত? কে হতে পারে?
লিলি বললেন, ‘অফিসার, আমি চাই সত্যিটা প্রকাশ পাক। আমি জানতে চাই, কারা এই কন্সপিরেসিতে জড়িত? আপনার সাইবার এক্সপার্টরা আর কী আন্দাজ করছেন?’
মিকেল বললেন, ‘ম্যাডাম, প্রাইমারিলি ওদের ধারণা কোনও টেররিস্ট অর্গানাইজেশন এর সঙ্গে যুক্ত। ওরাই কোনও লিঙ্ক ইউজ করেছে। কোন দেশের সার্ভার, সেটাই ওরা খোঁজা হচ্ছে। বালগেরিয়ান বা রাশিয়ান হলে ট্রেস করা যাবে না ম্যাডাম। সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে, টেররিস্টরা আপনাকে ফাঁসানোর চেষ্টা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে। উল্টোদিকে, ওই টেররিস্টদের মধ্যেই এমন কেউ আছে, যে আপনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। সে মরিশাসের ওই সংস্থার অ্যাকাউন্টস হ্যাক করে, ডলার ফেরত এনেছে।’
লিলি টেনশনবোধ করছেন। বললেন, ‘কারা হতে পারে?’
‘আইএস টেররিস্টরা। রিসেন্টলি আপনারই রেসিডেন্সিতে মামুন বলে যে সিরিয়ান ছেলেটা ধরা পড়েছে, সে একজন ক্র্যাকার। আমাদের কাস্টোডিতেই সে আছে। আমার এখন মনে হচ্ছে, কালপ্রিট সে-ই। মারধর করলেই সে বলে দেবে। আপনি অত উতলা হবেন না ম্যাডাম। দেখাই যাক না, আমার লোকেরা আর কী বের করতে পারে।’
কথাগুলো বলে মিকেল উঠে দাঁড়ালেন। মাথায় টুপিটা গলিয়ে বললেন, ‘দেখছি, আপনি সিকিউরিটি ছাড়াই রাস্তায় বেরিয়েছেন। কেন ম্যাডাম? স্ট্যানলি কোথায়?’
লিলি বললেন, ‘আজ ও কাজে আসেনি।’
‘হাউ ইরেসপন্সিবল। ম্যাডাম, আমি একজন অফিসার পাঠিয়ে দিচ্ছি। দয়া করে বাড়ি ফেরার সময় আপনি একা ফিরবেন না।’
বাম কিম খুশি হয়ে বললেন, ‘সো নাইস অফ ইউ স্যার। চলুন, আপনাকে এগিয়ে দিই।’
ওঁরা দু’জন চলে যাওয়ার পর, নিজের চেম্বারে পৌঁছে লিলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মিকেলের কথাটা তাঁর কানে বাজছে, ‘ওই টেররিস্টদের মধ্যেই এমন কেউ আছে যে, আপনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।’ কে সেই লোক? দু’হাতে মুখ ঢেকে লিলি ভাবছেন। হঠাৎ খসখস আওয়াজ শুনে মুখ তুলে দেখলেন, অফিস কর্মীদের কয়েকজন উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে রয়েছে, প্রাইভেট সেক্রেটারি মার্থা। খরচ কমানোর জন্য খুব কম কর্মী নিয়ে ফাউন্ডেশন চালান লিলি। সব মিলিয়ে তিরিশজন, বয়স সবারই তিরিশের নিচে। বেছে বেছে এঁদের তিনি নিয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, এমন কেউ নেই। জঙ্গিদের সঙ্গে কারোর সম্পর্ক থাকতেই পারে না। মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে, ফাউন্ডেশনের সর্বনাশ করতে যাচ্ছিল, এমন কাউকে তিনি খুঁজে পেলেন না।
মার্থারা সবাই খুব মুষড়ে পড়েছে। ফাউন্ডেশনের প্রধান হিসেবে, কর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনা উচিত। ড্যাডির কাছে উনি এই শিক্ষাই পেয়েছেন। জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে লিলি বললেন, ‘তোমাদের টেনশনে পড়ার কোনও কারণ নেই। ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন। যে যার কাজে লেগে যাও। মার্থা, আজ আমার কোন কাজ পেন্ডিং আছে, বলো।’
চোখের ইশারায় সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলল মার্থা। কৃষ্ণকায় ছোট্টখাটো চেহারার মেয়ে, সদা হাসিখুশি। শিকাগোর শাখা থেকে ওকে সদর দফতরে নিয়ে এসেছেন লিলি। বলল, ‘বেলা বারোটার সময় সিঙ্গার রেহেন্না ফেন্টির প্রোমোটার ডগলাস কার্টিস আসবেন। উনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’
লাস ভেগাসের চ্যারিটি শো-তে ফেন্টিকে পারফর্ম করতে বলা হবে। আর্থিক কথাবার্তা হয়ে গেছে অ্যান্ডির সঙ্গে। ভদ্রলোক ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চান কেন, লিলি বুঝতে পারলেন না। বললেন, ‘ডিল তো হয়ে গেছে, আমার সঙ্গে কথা বলতে চান কেন?’
মার্থা বলল, ‘উনি আপনার অটোগ্রাফ নিতে চান। তার সঙ্গে ফেন্টির জন্য শুভেচ্ছা বার্তা। ওঁরা এখন থেকেই অনুষ্ঠানটা প্রোমোট করবেন ম্যাডাম। শুনলে আপনি খুশি হবেন, আমাদের শো-এর জন্য ফেন্টি মাত্র এক ডলার নিচ্ছেন। বলেছেন, লিলি গডউইনের মতো মহান এক মহিলা শো-এর জন্য আমার কথা ভেবেছেন, সেটাই আমার কাছে অনেক। ইয়েমেনের বাচ্চাদের জন্য একটা গান বানাচ্ছেন ওঁরা। লাস ভেগাসে ফেন্টি প্রথম সেই গানটা গাইবেন। গানের পুরো রাইটস উনি ফাউন্ডেশনকে দিয়ে দেবেন।’
শুনে খুব খুশি হলেন লিলি। বললেন, ‘ঠিক আছে, বাচ্চাদের সঙ্গে আমার একটা ছবি বের করে রাখো। তার উপর অটোগ্রাফ দিয়ে দেব। আর হ্যাঁ, ফেন্টিকে আমার তরফে একটা চিঠি দাও। তাতে লিখো, আমরা ওর গান শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আর কী আছে, বলো।’
মার্থা বলল, ‘ম্যাডাম, রোহিঙ্গা বাচ্চাদের নিয়ে আপনার ব্রিফিং আজ ইউনিসেফের ইিউম্যান রাইটস কমিটিতে। বেলা তিনটের সময়। বাংলাদেশ থেকে রোকেয়া সুলতানা রোহিঙ্গা বাচ্চাদের যে ক্লিপিংসগুলো পাঠিয়েছিলেন, তা পেন ড্রাইভে তুলে রেখেছি। আপনি একবার দেখে নিতে পারেন। ব্রিফিংয়ের সময় আপনার বলতে সুবিধা হবে ম্যাডাম।’
রোকেয়া অনেকদিন আগে ক্লিপিংসগুলো পাঠিয়েছিল। ছবিগুলোতে তখন একবার চোখ বুলিয়েছিলেন লিলি। এমন ছবিও ছিল, বার্মিজ সেনারা পালাতে চাওয়া বাবা-মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে বাচ্চাগুলোকে সাফ নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলছে। রোকেয়া হাসপাতালে শুয়েও অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশের উদ্বাস্তু শিবিরে বাচ্চাগুলো অবস্থা আরও খারাপ। বিনা চিকিৎসায়, খেতে না পেয়ে সেখানেও বাচ্চারা মরছে। রোকেয়া আজ বেঁচে নেই। ওর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারবেন না লিলি। আজ ইউনিসেফের খুব গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। কমিটি মেম্বারদের বোঝাতেই হবে, বাচ্চাগুলোকে এভাবে মরতে দেওয়া যাবে না। মার্থাকে তিনি বললেন, ‘পেন ড্রাইভটা আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। আর মি. বাম কিমকে বোলো যেন আমার সঙ্গে একবার দেখা করেন।’
রোহিঙ্গা শিশুদের কথা ভাবতে ভাবতে লিলির একবার মনে হল, যে দেশে তিনি বসবাস করছেন, সেই আমেরিকাতেও তো বাচ্চারা সুরক্ষিত নেই। প্রতিদিন পাঁচটা করে অত্যাচারিত বাচ্চা মারা যাচ্ছে এই দেশে। বছরে প্রায় সাত লাখ শিশু নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। চিল্ডেনস অ্যাডভোকেসি সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় চৌত্রিশ লাখ শিশুকে তারা শারীরিক, মানসিক আর যৌননিগ্রহ থেকে বাঁচায়। এই অপরাধে জেল বন্দীদের মধ্যে একুশ শতাংশ বাবা। মায়ের সংখ্যা আরও বেশি, সাতাশ শতাংশ। কী ভয়ানক পরিস্থিতি! তবে প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসের আমলে চাইল্ড অ্যাবিউস কিছুটা কমেছে। স্কুলগুলোও এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। মারধর করা তো দূরের কথা, বাড়িতে বাচ্চাদের অবহেলা করলে, স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি তা জানতে পারে, তা হলে বাবা-মায়েরা শাস্তির মুখে পড়ছেন। প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস অন্তত বোঝাতে পেরেছেন, বাচ্চারা সুস্থ পরিবেশে মানুষ না হলে, জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
আমেরিকা এমন একটা দেশ, যেখানে সব ধরনের পরিসংখ্যান পাওয়া সম্ভব। সরকারি দফতর আর ইউনিভার্সিটিগুলোতে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, আমেরিকায় শিশু নিগ্রহের ক্ষেত্রে দায়ী সাতানববুই শতাংশ তাদের বাবা-মা অথবা অভিভাবক। যে সব বাচ্চার বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভাল নয়, নিত্য গৃহবিবাদ, তারাই অত্যাচার আর অবহেলার শিকার হয় বেশি। মদ্যপান বা মাদক সেবনের চল বেশি, এমন পরিবারের বাচ্চারা দুঃসহ পরিবেশে বেড়ে ওঠে। আশঙ্কার কথা এই যে, যাদের বাল্যকাল দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটেছে, তারা যখন বাবা বা মা হয়, তখন সন্তানদের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করে। আমেরিকায় তবুও এই তথ্যগুলো পাওয়া যায়। ইউরোপ ছাড়া বিশ্বের অন্য কোথাও এ নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। এই যেমন, ইয়েমেন থেকে লিলি পরিসংখ্যান আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও তাই। আজ মিটিংয়ে পরিসংখ্যানের থেকে তাঁকে অনেক বেশি আবেগ মেশাতে হবে বক্তব্যে। তা হলে হয়তো রোহিঙ্গাদের কল্যাণে কিছু করা সম্ভব।
মার্থা এসে পেন ড্রাইভটা দিয়ে গেল। ল্যাপটপে সেটা ঢুকিয়ে রোকেয়ার পাঠানো ছবিগুলো দেখতে শুরু করলেন লিলি। বাংলাদেশের পাটেঙ্গা সমুদ্রতটে কয়েকটি মৃত শিশু উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। তাদের বয়স এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। লোনা জলে ভেসে এসেছে। গায়ের চামড়া সাদা হয়ে গেছে। চিটাগং থেকে মাত্র চোদ্দো কিলোমিটার দূরে এই পাটেঙ্গা বিচ। সম্ভবত ইয়াঙ্গন থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে নৌকো করে পালিয়ে আসার সময় মায়ানমারে কোস্টাল গার্ড ওদের ধরে ফেলেছিল। বাচ্চাদের মেরে জলে ভাসিয়ে দেয়।
কিছু দিন আগে আমেরিকান কাগজগুলোতে এই ধরনের একটা ছবি দেখেছেন লিলি। সিরিয়ান বাচ্চার ছবি গ্রিসের উপকূলে। এই ঘটনা ঘটেছে এল সালভাদোরেও। সারা বিশ্বে এ সব হচ্ছেটা কী?
ল্যাপটপের পর্দায় একের পর এক ছবি ভেসে উঠছে। আর বুকের ভিতরটা খালি হয়ে যাচ্ছে লিলির। নিজে মা হতে পারেননি। কিন্তু চাইল্ড কেয়ার হোস্টেলগুলিতে থাকা শিশুদের কাছে তিনি মায়ের থেকেও বেশি। লিলি নিজেও জানেন, অপত্যস্নেহ কী। সত্যিই তিনি বুঝে উঠতে পারেন না, ধর্ম বড়, না মানবতা? মায়ানমারে এই মুসলিম শিশুগুলো কী দোষ করেছিল? বৌদ্ধরা তাদের প্রতি কেন এত নির্মম? বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ঠাঁই দিয়েছে বলে প্রশংসা কুড়োচ্ছে। কিন্তু কোথায়? ছবি দেখে মনে হচ্ছে, মূল ভূখণ্ড থেকে বহুদূরে রেখেছে, ওদের অচ্ছুত মনে করে।
এমন একটা দ্বীপ, সেখানে আগে কোনও জনবসতি ছিল না। অস্থায়ী আস্তানায় কোনও রকম রোহিঙ্গারা মাথা গুঁজে আছে। শক্তসমর্থ পুরুষদের সংখ্যা খুবই কম। পুষ্টিহীন, রুগ্ন বিভিন্ন বয়সি বাচ্চারা কিলবিল করছে। পানীয় জলের অভাব। চিকিৎসার তেমন ব্যবস্থা নেই, ওষুধ নেই। উদ্বাস্তু শিবিরে যা খাবার যাচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। ইয়েমেনের আডেন বন্দরে তাদের ফাউন্ডেশনের একটা জাহাজ খাদ্যদ্রব্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়েমেন সরকার দেশের ভিতর খাবার ও ওষুধ ঢুকতে দিচ্ছে না। লিলি ঠিক করে নিলেন, ব্রিফিংয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ করবেন এইভাবে যে, ওই জাহাজটি বাংলাদেশের ঠেঙার চরে পাঠানো হোক, যাতে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মধ্যে দ্রুত খাবার আর ওষুধ বিলি করা যায়।
ছবিগুলো দেখা শেষ হতে না হতেই চেম্বারে ঢুকে এলেন বাম কিম। সাইবার সেলের লোকজন কী বলে গেল, সেটা শোনার জন্য লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কারা এই সর্বনাশটা করতে যাচ্ছিল, কিছু শুনলেন?’
বাম কিম বললেন, ‘ম্যাডাম, আমি বোধহয় আন্দাজ করতে পারছি। আপনার খুব কাছের লোক। রক্ষকই শেষ পর্যন্ত ভক্ষক হয়ে দাঁড়াল।’
লিলি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘হেঁয়ালি করবেন না মি. কিম।’
‘ম্যাডাম, যাকে আমি ইঙ্গিত করছি, সে আপনার সিকিউরিটি গার্ড স্ট্যানলি গর্ডন। সাইবার সেলের লোকজন বলছেন, ফাউন্ডেশনের ক্লোজ কেউ হ্যাকারের হাতে কিছু তথ্য তুলে দিয়েছিল। তাঁকে খুব মেহনত করতে হয়নি। আমার ধারণা, সে স্ট্যানলি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। তবে, ও একা নয়। ওর পিছনে আরও বড় কোনও মাথা থাকতে পারে।’
‘আশ্চর্য, স্ট্যানলির উপর আপনার সন্দেহটা হল কেন?’
‘এখুনি একটা খবর পেলাম, ওর এজেন্সি চিফের কাছে। স্ট্যানলি কী কারণে মিচিগানে গেছে, শুনবেন? কনভার্ট হতে। আমেরিকার সবথেকে বড় মসজিদটা হল মিচিগানে। স্ট্যানলি ওখানে গিয়ে মুসলিম হল। ও না কি দু’একদিনের মধ্যেই সিরিয়ায় যাচ্ছে। জিহাদি ফোর্সে জয়েন করার জন্য। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলছে কি না বলুন। ম্যাডাম, আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই জঘন্য কাজটা স্ট্যানলি করতে গেল কেন? আমার মনে হয়, জিহাদি দলে যোগ দেওয়ার আগে, ওখানে নিজের ওজন বাড়ানোর জন্য।’
শুনে বিশ্বাস হচ্ছে না লিলির। সকাল থেকে সব দুঃসংবাদ শুনছেন। বাম কিম বললেন, স্ট্যানলি একা নয়। ওর পিছনে আরও বড় কোনও মাথা থাকতে পারে। এর পর কার নাম উঠে আসবে, ভেবে শঙ্কাবোধ করলেন লিলি। কার উপর ভরসা করে তিনি এগোবেন? এই মুহূর্তে অ্যান্ডি পাশে থাকলে তিনি মনের জোর পেতেন। সেটা ফিরে পাওয়ার জন্যই ফোনে লিলি ধরার চেষ্টা করলেন তাঁর প্রিয় মানুষটাকে।
