(চৌদ্দো)
লিভিং রুমে রোজিনার সঙ্গে আড্ডা মারছেন পলাশভাই। হাতে ড্রিঙ্কসের গ্লাস। সেন্টার টেবলে ক্যাপ্টেন মর্গানের বোতল। রামের এই ব্র্যান্ড খুব প্রিয় পলাশভাইয়ের। ওর মতো পয়সাওয়ালা মানুষরা সাধারণত স্কচ পছন্দ করেন। কিন্তু উনি মানুষটাই অদ্ভুত। কালকেতুকে ঘরে ঢুকতে দেখে পলাশভাই খানিকটা কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বললেন, ‘আইজ ড্রিঙ্ক করতে ইচ্ছা হইল, বোঝলেন কাইলকেতুভাই। যা ঠান্ডা পড়সে, লোভ সামলাইতে পাইরলাম না।’
সক্কালবেলায় কালকেতু মোবাইলে দেখেছে পারদ শূন্য ডিগ্রির আশপাশে। রাতের দিকে অবশ্যই মাইনাসে পৌঁছে যাবে। আবহাওয়াবিদরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, কাল হালকা বরফ পড়তে পারে। ঠিকঠাক পোশাক চাপালে ঠান্ডাকে অবশ্য ভয় করার কিছু নেই। ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচবার জন্য মদ্যপানেরও দরকার নেই। পলাশভাই বোধহয় রোজিনার সঙ্গে কোথাও বেরিয়ে ছিলেন। দু’জনের পোশাকই তা বলে দিচ্ছে। রোজিনা দেখতে এত সুন্দরী, যা পরেন তাই মানিয়ে যায়। এই মুহূর্তে ওঁর পরনে ফারের সাদা লং কোট, সাদা ব্যারেটস ক্যাপ। বলাই বাহুল্য, খুব দামি। আর পলাশভাই থ্রি পিস স্যুটে।
কালকেতু সোফায় বসতেই পলাশভাই বললেন, ‘আপনেও দুই প্যাগ মর্গানপ্যাটে দ্যান। ঠান্ডা কোথায় পলাইব, ট্যার পাইবেন না। ম্যাডাম, আপনে সার্ভ করেন তো। এক যাত্রায় পৃথক ফল অইব ক্যান?’
শোনামাত্রই দেরি করলেন না রোজিনা। ড্রিঙ্কস ঢেলে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনিও বেরিয়ে ছিলেন না কি কালকেতুভাই? ফিরে এসে পলাশ আপনার খোঁজ করেছিলেন। আপনি ছিলেন না।’
গত কয়েকদিন ধরেই কালকেতু লক্ষ করছে, রোজিনা যখন ওর সঙ্গে কথা বলেন, তখন কলকাতার ভাষায়। কিন্তু পলাশভাইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা চালান বাঙাল ভাষায়। এই মহিলাটিকে ও যত দেখছে, ততই ওর শ্রদ্ধা বাড়ছে। রোজিনা পলাশভাইকে পলাশ বলে ডাকেন। কিন্তু পলাশভাই রোজিনাকে বলেন ম্যাডাম। পলাশভাইয়ের সঙ্গে রোজিনার সম্পর্কটা ঠিক কী, এখনও ও বুঝে উঠতে পারেনি। একেক সময় কালকেতুর মনে হয়, মালিক আর কর্মচারীর সম্পর্ক। আবার অন্যসময় ঘনিষ্ঠতা দেখে মনে হয়, ওরা বন্ধুর মতো। বা তার থেকেও বেশি। স্বামী-স্ত্রীর মতো লিভ টুগেদার করছেন। ওঁদের বোঝাপড়ার রসায়নটা যে খুব মজবুত, সেটা অবশ্য কালকেতু বোঝে।
রোজিনার হাতেও এখন রঙিন গ্লাস। চিয়ার্স জানিয়ে কালকেতু বলল, ‘হ্যাঁ, সন্ধেবেলায় আমিও বেরিয়ে ছিলাম। আমার এক বন্ধু এসেছে ফ্রান্স থেকে। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য মিঠাস রেস্টুরেন্টে গেছিলাম।’
শুনে পলাশভাই অসন্তুষ্ট হওয়ার ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়তে শুরু করলেন, ‘না, না কাইলকেতুভাই, হেইড্যা আফনে ঠিক করেন নাই। আমার এত্তবড় বাসা থাকতে আফনে বন্ধুর সাথে বাইরে দ্যাখা কইরবেন ক্যান? বাসায় ডাইক্যা লইতে পাইরতেন। হেইড্যা করা আফনের উচিত হয় নাই।’
কালকেতু বলল, ‘আমার এই বন্ধু সুদীশ নাগ ইন্টারপোল অফিসার। ওরা অফিসকে না জানিয়ে কারও বাড়িতে যেতে পারেন না। ওর নিজের মাসতুতো ভাই থাকে নিউ জার্সিতে। সেখানেও ওঠেনি।’
পলাশভাই অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বললেন, ‘ক’ন কী? ইন্টারপোল! হেইড্যা তো বিশাল অর্গানাইজেশন। হোল ওয়ার্ল্ডের পুলিশ এককাট্টা হয় সেহানে। ভেরি হাই প্রোফাইল জব। আমার সাথে আলাপ করাইয়া দ্যান না ভাই। পরে কোনও কামে লাইগতে পারে।’
কালকেতু হেসে বলল, ‘কোনও অসুবিধে নেই। সুদীশ এখন কয়েকদিন নিউ জার্সিতে থাকবে। কোনও একটা হোটেলে ওকে ডেকে নিলেই হরবে। অ্যাকচুয়ালি ও এসেছে, আপনার শিউলিদিদির ব্যাপারে আমাকে হেল্প করতে।’
‘হ্যার কুনও সন্ধান পাইলেন?’
অ্যাদ্দিন পর এই প্রথম পলাশভাই প্রশ্নটা করলেন। কালকেতু উত্তর দিতে যাচ্ছিল। মাঝখান থেকে রোজিনা বলে উঠলেন, ‘আমরাও কম চেষ্টা করিনি কালকেতুভাই। শিউলিদিদি কোথায় আছেন আমরা জানতে পারিনি ঠিকই। কিন্তু উনি যে বেঁচে আছেন সে সম্পর্কে আমরা সিওর।’
শুনে কালকেতুর কৌতূহল হল। ও জিজ্ঞেস করল, ‘কীভাবে সিওর হলেন?’
‘এখানে পাঁচ-ছ’জন ফর্চুন টেলার… মানে জ্যোতিষী একই কথা বলেছেন। বুকলিনে খুব নামকরা একজন ব্ল্যাক ম্যাজিসিয়ান আছেন। তিনি মেক্সিকান, নাম মারসেডো সালিনাস। যাকে যা বলেন, মিলে যায়। তাঁর কাছে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত ছুটে আসেন। পলাশকে তাঁর কাছে নিয়ে গেছিলাম। উনি জোর দিয়ে বলেছেন, শিউলিদিদি বেঁচে আছেন। কোথায় আছেন, সেটাও বলে দিতে পারেন। তবে, যা ফি চাইলেন, তার অঙ্কটা শুনে আপনার পলাশভাই পিছিয়ে গেলেন।’
কালকেতু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন, পিছিয়ে গেলেন কেন?’
পলাশভাই বললেন, ‘হ্যাগো কথার কোনও গ্যারান্টি নাই। এহানে মেক্সিকান পাড়ায় গেলেই ট্যার পাইবেন, দুই হাইত অন্তর ফর্চুন টেলারের চেম্বার। হক্কলের গায়ে কারুকার্য করা পোশাক। টেবলে রঙিন আলো দিয়া সাজানো-গোজানো একডা খাঁচা। তাইর মধ্যে একডা পাখি বইস্যা থাকে। খাঁচার সামনে প্রচুর ট্যারোঁ কার্ড। তাতে অনেক কিছু আঁকা আর ল্যাখা। ঠোঁটে কইর্যা পাখি যে কার্ড আগাইয়া দিব, তাতে যে সিম্বল বা ল্যাখা থাইকব, হেহডাই আফনের ভবিষ্যদ্বাণী।’
কালকেতু হেসে বলল, ‘এ রকম জ্যোতিষী তো কলকাতার রাস্তায় আকচার দেখা যায়। খাঁচায় টিয়াপাখি নিয়ে বসে থাকে।’
‘ঢাকায়ও কম নাই।’ পলাশভাই বললেন, ‘তফাৎ হইল গিয়া, মেক্সিকানরা অনেক স্মার্ট। আপনের ট্যাহা পয়সা আসে জানলে, ব্ল্যাক ম্যাজিক দিয়া আফনেরে প্রথমে মেসমোরাইজড কইর্যা দিব। একেকজনের এক এক রকম স্টাইল অফ ফাংশনিং। যত্তসব ভণ্ড….চিট।’
বাধা দিয়ে রোজিনা বললেন, ‘হেইড্যা কইয়েন না পলাশ। হ্যারা আফনেরে কিন্তু একবার উদ্ধার করসিল।’
উত্তর না দিয়ে পলাশভাই মিটিমিটি হাসছেন। কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছিল পলাশভাই? কোনও বিপদে পড়েছিলেন?’
‘আমার একডা ইম্পরট্যান্ট বিজনেস ফাইল হারাইয়্যা গেছিল। পাওয়া না গেলে এক মিলিয়ন লস হইয়া যাইত। নানা প্যাকনা কইর্যা সালিনাস কইয়া দিসিলেন, ফাইলডা আফনের বাড়ির উত্তর দিকে কোথাও আসে। হ, একডা ড্রয়ারে ফাইলডা পাইসিলাম। কী কইর্যা কইসিল, জানি না। তবে এইটুকু কইতে পারি, হ্যাগো দ্যাখলে, আফনেগো মতো ইন্টেলিজেন্ট মানুষরা বুজরুকি ধইর্যা ফ্যালবেন।’
শুনে রোজিনা গম্ভীর হয়ে গেছেন। মুখটা দেখে মায়া হল কালকেতুর। ম্যাডামকে খুশি করার জন্য ও বলল, ‘সবাই কিন্তু বুজরুক নয়। অনেকের আশ্চর্য ক্ষমতা থাকে।’
‘আমার কিন্তু চোখে পড়ে নাই। মেক্সিকান ব্ল্যাক ম্যাজিসিয়ানরা সবকিছুর সাথে কার্স মানে… শাপ জুইড়্যা দেয়। য্যামন, শিউলিদিদি সম্পর্কে কইসিল, ফ্যামিলির কারও শাপ ছিল। হেই কারণে উনি নিখোঁজ। আগে শাপ কাটাইতে অইব। তার লইগ্যা বিশাল খরচ। বিশ্বাস করা যায়, কয়েন? আপা নিরুদ্দেশ হইল যুদ্ধের সময়। ফ্যামিলির কারও শাপে তা হইতে পারে না হি? চিডিংয়ের একডা সীমা আসে।’
কথাগুলো বলে পলাশভাই হাসতে লাগলেন। ওকে হাসতে দেখে রোজিনা আরও চটে গেলেন। এক চুমুকে গ্লাস খালি করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উনি বললেন, ‘আমি কিচেনে আছি। ডিনার রেডি কইর্যা আফনেগো ডাকুম।’
রোজিনা ম্যাডাম নিজের হাতে মেক্সিকান ফুড তৈরি করে আজ খাওয়াবেন, বলেছিলেন। পর্দা সরিয়ে উনি অদৃশ্য হয়ে যেতেই পলাশভাই বললেন, ‘আমার উপর চেইত্যা গেসে। আসলে ম্যাডাম মেক্সিকানগো নিন্দা সহ্য কইরতে পারেন না। রক্তের সম্পর্ক তো…।’
কালকেতুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘তার মানে?’
‘আফনেরে কই নাই? হ্যার বাবা মেক্সিকান। মা বাংলাদেশি। হ্যার সাথে আমার পরিচয়… ইট’স আ লং লং স্টোরি। শুইন্যা তাজ্জুব হইয়া যাবেন। যাউক সে কথা। আফনে ক’ন, শিউলিদিদির ব্যাপারে কতডা আগাইলেন?’
ক্যাপ্টেন মর্গানে চুমুক দিতে দিতে কালকেতু মোটামুটি গুছিয়ে বলল, সুদীশের কাছ থেকে কী জানতে পেরেছে। শেষে বলল, ‘সবার আগে আমাকে একবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের অফিসে যেতে হবে। ওখান থেকে ওয়ার্ল্ড ফোটোগ্রাফারস অ্যাসোসিয়েশনের অফিস। দুটো অফিসই ম্যানহাটনে। আমার মনে হয়, ওই দুটো জায়গায় গেলে কিছু না কিছু ক্লু পাওয়া গেলেও যেতে পারে।’
সোফায় হেলান দিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন পলাশভাই। নিউ ইয়র্কের কথা শুনে সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, ‘আফনে যদি চান, তাইলে আমিও আফনেরে কম্পানি দিতে পারি। কাইল আমারে বিশেষ একডা কাজে নিউ ইয়র্ক যাইতে অইব। নতুন একডা বিজনেস ভেঞ্চারে নামতাসি, বোঝলেন। আপনেরে কইতে অসুবিধে নাই। অনেকদিন ধইর্যা রোজিনা ম্যাডাম চাপাচাপি করতাসিল। তাই রাজি হইয়া গেলাম।’
শুনে কালকেতু উৎসুক চোখে তাকাল। কিছুদিন আগে পলাশভাই নায়গারার চেয়েও বড় একটা ওয়াটার ফলস চট্টগ্রামে বানানোর প্ল্যান করছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদের জল টেনে নিয়ে গিয়ে। এমন একটা ট্যুরিস্ট স্পট বানাবেন, যা কি না দেখার জন্য সারা বিশ্বের লোক ছুটে যাবে। মাথা থেকে সেটা বোধহয় আপাতত সরে গেছে। নতুন প্ল্যানটা কী, জানার জন্য কালকেতু জিজ্ঞাসা করল, ‘বিজনেস ভেঞ্চারটা কি এখানকার জন্য, না বাংলাদেশের?’
‘এহানে। আপনে লক্ষ করসেন কি না, জানি না। নিকি অ্যাডামস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেইক্যা বারবার কইতাসেন, ইল্লিগ্যাল যে সব ইমিগ্রান্টের পোলাপান আমেরিকায় জন্মাইসে, হ্যারা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাইকতে পাইরব না। এইডা একডা মেজর পলিটিক্যাল ডিসিশন। আমি তারই ফায়দা তুলুম।’
এখানকার বড় বড় টিভি চ্যানেলগুলোতে এই প্রসঙ্গটা নিয়ে প্রায়ই ডিবেট হচ্ছে, লক্ষ করেছে কালকেতু। অ্যাডামস নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, জিতলে অনুপ্রবেশকারী মেক্সিকানদের খুঁজে খুঁজে বের করবেন। আমেরিকার মাটিতে বাচ্চার জন্ম দিয়ে, বাবা-মায়েদের আমেরিকার নাগরিকত্ব পাওয়ার কৌশলটা তিনি রুখবেন। সেইসঙ্গে ভবিষ্যতেও মেক্সিকানদের বেআইনি ভাবে আমেরিকায় ঢুকতে দেবেন না। তেমন হলে মেক্সিকান বর্ডারে ইস্পাতের দেওয়াল তুলে দেবেন। আমেরিকায় দুই একটা স্টেট-এ অ্যাডামস প্রশাসন বাচ্চাদের বাড়ি থেকে তুলেও নিয়ে গেছে। তাতে ডেমোক্র্যাটরা মারাত্মক ক্ষুব্ধ। রোজই টিভিতে তাঁরা তুলোধনা করছেন অ্যাডামসের। ওরা বলছেন, বাবা-মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে বাচ্চাদের আলাদা ক্যাম্পে রাখা শুধু নিষ্ঠুরতাই নয়, বর্বরতা। এই বিতর্কের আবহাওয়ায় পলাশভাই কী ফায়দা তুলবেন, সেটা কালকেতুর মাথায় ঢুকল না।
এমনিতেই আমেরিকায় মেক্সিকান অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা কম নয়। এরা জনজীবনে মিশে গেছেন। রাস্তা ঘাটে, শপিং মল, রেস্টুরেন্টগুলোতে এরাই কায়িক পরিশ্রমের কাজগুলো করেন। এঁদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভব। নানা জায়গায় ডেমোক্র্যাটদের মদতে বিক্ষোভ, মিটিং মিছিল হচ্ছেই। রোজ রোজ গ্রেফতারও হচ্ছেন প্রচুর মেক্সিকান। এই অশান্তির পরিবেশেও পলাশভাই ব্যবসায়িক মুনাফার কথা ভাবছেন? কীভাবে? প্রশ্নটা করতেই, পলাশভাই বললেন, ‘প্ল্যানডা আমার না। রোজিনা ম্যাডামের মাথা থেইক্যা বাইর হইসে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে মাস পাঁচেক আগে একডা আর্টিকেল পাবলিশড হইসিল, প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস যে বাচ্চাগুলানরে তুইল্যা আনতাসেন, হ্যাগো রাইখবেন কোথায়? সরকারি জেল বা ডিটেনশন সেন্টারগুলা তো সব ভর্তি হইয়া গ্যাসে? তহনই রোজিনা ম্যাডাম আমারে কইল, চাইল্ড ডিটেকশন সেন্টার কিংবা প্রাইভেট জেল খোলার বিজনেস কইরলে ক্যামন হয়?’
কালকেতু চমকে উঠে বলল, ‘প্রাইভেট জেল মানে?’
‘হ, এত অবাক হওনের কী আসে?’ পলাশভাই গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘এহানে কিছু কোম্পানি হইসে, যারা প্রাইভেট জেল চালায়। সেই কোম্পানিগুলা প্রফিট মেকিংও। এই দ্যাশে জেল মানে তো আমাগো দ্যাশের মতো নরক না। এরা কয় কারেকশনাল সেন্টার। আফনে যে নর্মাল পরিবেশে বাসায় থাকতেন, হেই সুবিধাগুলান জেলেও পাইবেন। ডিটেনশন সেন্টারগুলানও একই রকম। গত তিন-চাইর বসরে ধড়পাকড় এমন বাইড়্যা গেসে, যে সরকারি জেলে আর জায়গা নাই। তাই প্রশাসন অহন প্রাইভেট জেলগুলানরে প্রোমোট করত্যাসে।’
‘কিন্তু এই বিজনেস ভেঞ্চারটা খুব রিস্কি না? দাগী অপরাধীদের বন্দি করে রাখা চাট্টিখানি কথা নাকি? প্রাইভেট জেল থেকে কেউ পালিয়ে গেলে, সেই দায়িত্ব কার?’
‘অবভিয়াসলি কোম্পানির মালিকের। ঠিক এই কারণেই আমি অ্যাদ্দিন হেজিটেট করতাসিলাম। কিন্তু ইমিগ্রান্ট চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার চালানো অনেক সহজ। আফটার অল, হ্যারা তো ক্রিমিনাল না। হ্যাগো হ্যান্ডেল করা অনেক কম ঝুঁকির। অনেকটা ক্রেশ চালানোর মতো। বা মিডল স্কুলের হোস্টেল। বাচ্চারা খাইব-দাইব, ল্যাখাপড়া কইরব, খেলব… এই তো। তবে হ্যাগো হেলথ কেয়ার-এর ব্যবস্থাটা ভালমতো কইরতে অইব। কেউ য্যান কইতে না পারে, আমার সেন্টারে বাচ্চারা খারাপ আসে।’
‘সেন্টার কোথায় করবেন ভাবছেন?’
‘আমার তো খুব ইচ্ছা, শহর থেইক্যা অনেক দূরে, কোনও রুরাল এরিয়ায়। আপাতত, দুইশোডা বেড নিয়া শুরু করুম। রোজিনা ম্যাডাম একডা প্রোজেক্ট বানাইয়া দিসেন। হেইডা নিয়া কথা কওয়ার জন্য আমরা আইজ জাস্টিস ডিপার্টমেন্টে গেসিলাম। মোটামুটি গ্রিন সিগন্যাল পাইসি। এই ভেঞ্চারের মালিকানার মেজরিটি শেয়ার থাইকব রোজিনা ম্যাডামের। হ্যায় নিজে মেক্সিকান বইল্যা, একস্ট্রা কেয়ার নিব। মেসেজটা আমরা জাস্টিস ডিপার্টমেন্টে দিতে পারসি।’
শুনতে শুনতে কালকেতু বলেই ফেলল, ‘রোজিনা ম্যাডামের বিজনেস ব্রেন বাঁধিয়ে রাখার মতো।’
‘আমি তো কই, জিনিয়াস।’ পলাশভাই বললেন, ‘জানেন, প্লেনোতে ম্যাডাম অলরেডি একডা বাড়ি খুইজ্যা বাইর করসেন, যেহানে সব ইনফ্রাস্ট্রাকচার আসে। আসলে ছিল পার্কোম্যাট। চালাইতে পারতাসিল না। বিককিরি কইর্যা দিতে চায়। সেল তৈরি কইর্যা, তিন মাসের মইধ্যে সেন্টার চালু করা সম্ভব। স্বীকার কইরতে দ্বিধা নাই কাইলকেতুভাই, ম্যাডাম যদি আমার সাথে না থাকেন, আমি এক্কেরে কানা।’
অকস্মাৎ পর্দা সরিয়ে রোজিনা লিভিং রুমে ঢুকে বললেন, ‘বসে বসে আমার অত নিন্দে শুনতে হবে না কালকেতুভাই। চলেন, মেক্সিকান ফুড রেডি।’
কালকেতু বলল, ‘এর মধ্যেই রেডি হয়ে গেল?’
‘খুব বেশি আইটেম করিনি। বুরিতো, নাচোস, টাকো, গুইমেলো…। যদি আপনার ভাল লাগে, তা হলে পরে আরও ভ্যারাইটি করে খাওয়াব।’
পলাশভাই সোফা ছেড়ে ওঠার মুডে নেই। দেখে তাঁর হাত ধরে টানলেন রোজিনা, ‘আফনের কিন্তু পাঁচ-ছয় প্যাগ হইয়া গেসে পলাশ। ওঠেন, ওঠেন। আমি আর অ্যালাউ করুম না। কাইল হকালে নিউ ইয়র্কে যাইতে অইব, মনে আসে আফনের?’
উঠে দাঁড়ানোর বদলে রোজিনাকেই নিজের কাছে টেনে বসালেন পলাশভাই। জড়ানো গলায় বললেন, ‘এতক্ষণ তো হেই গল্পই করতাসিলাম।’
‘মিস গডউইনের কথা কি কাইলকেতুভাইরে কইসেন?’
‘মাই গুডনেস! আমি কী বলদ দ্যাখেন। আসল কথাডাই কই নাই। কাইলকেতুভাই, নায়গারায় আফনে যে ভদ্রমহিলারে প্রাণে বাঁচাইয়া ছিলেন, আমাগো সাথে একবার আফনেরে হ্যার কাছে যাইতে অইব। চাইল্ড ডিটেকশন সেন্টারের ব্যাপারে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের অফিসারগো সাথে ডিল করতে গেসিলাম। অফিসার আমাগো জিজ্ঞাস করসিল, কুনও ইম্পরট্যান্ট লোকরে আফনেরা চেনেন কি না? তহন বুদ্ধি কইর্যা রোজিনা ম্যাডাম লিলি গডউইনের নামটা করেন। শুইন্যা অফিসার কইলেন, তাইলে তো আফনেগো চিন্তার কোনও কারণ নাই। হ্যায় চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন চালায়। হ্যার কাইছ থেইক্যা একটা রেকমেন্ডেশন লইয়্যা আসেন। আফনেরা পার্মিশন পাইয়্যা যাবেন। অহন আফনে যদি মিসেস গডউইনরে রিকোয়েস্ট করেন, তা ইলে হয়তো আমাগো বিজনেস ডিলটা হইয়া যাইব। যাইবেন তো, প্লিজ?’
কালকেতু যাবে বলে ঘাড় নাড়ল। খবরটা পলাশভাই এতক্ষণ দেননি। আশ্চর্য মানুষ তো!
