(বাইশ)
ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিয়ে, অনেকটা ঝুঁকে গালে গাল ঠেকাল অ্যান্ডি। সারা শরীরে ঠিক আগের মতো উত্তাপ টের পেলেন লিলি। প্রায় ছ’ফুটের মতো হাইট অ্যান্ডির। গড়পড়তা সুইডদের মতোই। পাশাপাশি হাঁটলে একটু বেমানানই লাগে। কিন্তু প্রেমের বন্ধনটা কার সঙ্গে কীভাবে হয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না। নিশ্চয়ই উচ্চতা বুঝে কখনো হয় না। হাগ করার পর অ্যান্ডি জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কেমন আছ, ডার্লিং। অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হল।’
কেমন আছেন, লিলি নিজে বুঝতে পারছেন। চেক আপের জন্য হাসপাতালে এসেছেন। খবরটা পেয়ে অ্যান্ডি লাস ভেগাস থেকে অ্যাদ্দূর হাজির। এর থেকে ভাল থাকা আর কী হতে পারে? ‘আপাতত ঠিক আছি।’ ছোট্ট উত্তর দিয়ে লিলি ভাল করে তাকালেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকের দিকে। অ্যান্ডির চুলে সামান্য পাক ধরেছে। মুখ ভরাট, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। তাতে বেশ রাশভারী লাগছে ওকে। পরনে আরমানির থ্রি পিস স্যুট। তখনকার মতোই হ্যান্ডসাম অ্যান্ডি। পারফিউম নিয়ে পছন্দ এখনও বদলায়নি। ওর শরীর থেকে এখনও বন্ড নাম্বার নাইন-এর সুগন্ধ ভেসে আসছে। লিলি পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন দেখছ আমাকে?’
‘অ্যাজ বিউটিফুল অ্যাজ এভার।’ অ্যান্ডির গলায় কৌতুকের ঝিলিক, ‘ফুলগুলোকেও তোমার কাছে ম্লান দেখাচ্ছে। আমি তো চুজ-ই করতে পারছিলাম না, কোন ফুল তোমার জন্য নিয়ে আসব।’
লিলি বললেন, ‘ফ্লার্ট করার স্বভাবটা তোমার গেল না অ্যান্ডি।’
‘নিজেকে বদলাতে দিইনি ডার্লিং। চলো, বাইরে কোথাও নিরিবিলিতে বসে তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলি।’
‘সম্ভব না। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে ডার্মাটোলজিস্ট ডা. কিংসফোর্ডের সঙ্গে। এখন বাইরে কোথাও যাওয়া যাবে না। নিরিবিলিতে যদি কথা বলতে চাও, তা হলে চলো, ফোয়ারার ধারে গিয়ে বসি।’
হাসপাতালে ঢোকার মুখেই বিরাট একটা লন আছে। তারই মাঝে সুন্দর একটা ফোয়ারা। রাতে কেবিন থেকে বসে লিলি দেখতে পান, মিউজিকের সঙ্গে রঙিন আলোয় ফোয়ারার জল খেলা করে। জায়গাটা চমৎকার সাজানো গোছানো। যারা সুস্থ হয়ে গেছেন, তারা ভিজিটরদের সঙ্গে ওখানে বসে কথা বলতে পারেন। সেদিকে এগোনোর সময় অ্যান্ডি জিজ্ঞেস করল, ‘ডক্টর কী বলছেন, ডার্লিং?’
লিলি বললেন, ‘লেজার ট্রিটমেন্ট করতে হবে। আমার কথা থাক। এলসা আন্টি কেমন আছেন অ্যান্ডি?’
অ্যান্ডি বললেন, ‘উনি এখন লাস ভেগাসে। আলেক্সের ছুটি শুরু হয়ে গিয়েছে। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখাবেন বলে মাদার এলসা ওকে আমার কাছে নিয়ে গেছেন।’
ইন্ডিয়ার মাদার টেরিজা নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর সুইডেনের কোনও কাগজে এলসা আন্টিকে নিয়ে একটা আর্টিকেল বেরিয়েছিল। তাতে ওরা মাদার এলসা কথাটা ব্যবহার করেছিল। তার পর থেকে অ্যান্ডি ওঁর মাসিকে মাদার এলসা নামে ডাকতে শুরু করেছে। আর্ত মানুষের সেবা আর শিশু কল্যাণে এলসা গিনেসবেরির যা অবদান, তা অবশ্য মাদার টেরিজার থেকে কোনও অংশে কম নয়। দীর্ঘ তিরিশ বছর রেড ক্রসের হয়ে কাজ করেছেন। অন্তত ছাব্বিশটা যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন। গত দশ বছর ধরে বিশ্বের বিপন্ন শিশুদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। মা ডাকটা ওঁরই তো প্রাপ্য। গতবছর গ্রিটিংস কার্ডে একবার মাদার লিলি কথাটা লিখেছিল অ্যান্ডি। তাতে খুব চটে গেছিলেন লিলি। লিখে পাঠিয়ে ছিলেন, এমন ঠাট্টা করলে ভবিষ্যতে কোনও কার্ড গ্রহণ করবেন না।
আলেক্স হল এলসা আন্টির মেয়ের ছেলে। হাই স্কুলে পড়ে। এই নাতিটিকে খুব ভালবাসেন আন্টি। ফোনে যখনই কথা হয়, তখন ওর কথা খুব বলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরের দিনই এলসা আন্টি ফোন করেছিলেন কুশল জানার জন্য। তখন কিন্তু আলেক্সকে নিয়ে লাস ভেগাসে যাওয়ার কথা কিছু বলেননি। হয়তো তাঁর সঙ্গে অ্যান্ডির সম্পর্কটা শীতল হয়ে রয়েছে বলে, উল্লেখ করতে চাননি। অথচ প্রথম যেদিন ওঁদের প্রেমের সম্পর্কটা আন্টি জানতে পারেন, সেদিন খুব খুশি হয়েছিলেন। এলসা আন্টির সেই মুখটা চোখের সামনে একবার ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আন্টিরা কি তোমার হোটেলেই আছেন?’
অ্যান্ডি বলল, ‘হ্যাঁ ডার্লিং, আমার সুইটেই। ওঁরা আজ গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে গেছেন। সেই ফাঁকে প্লেন চালিয়ে আমি চলে এলাম নিউ ইয়র্কে।’
পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগে এই থ্যাঙ্কস গিভিংয়ের ছুটিতেই আন্দ্রিয়াসের সঙ্গে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ওয়েস্ট রিম-এ বেড়াতে গেছিলেন লিলি। সেদিনটাও আজকের মতো রোদ ঝলমলে ছিল। অ্যারিজোনা স্টেট-এ পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে প্রায় পৌনে তিনশো মাইল জুড়ে ক্যানিয়নের বিস্তৃতি। এক মাইল নিচ দিয়ে বয়ে গেছে কোলোরাডো নদী। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের তিনটে দিক। সাউথ রিম সারা বছরই খোলা থাকে। নর্থ রিম শীতকালে বন্ধ, ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত। তাই অনেকে এখন ওয়েস্ট রিম-এ যাওয়া পছন্দ করেন। কেননা, ওখানে বাড়তি আকর্ষণ… রেলিং ঘেরা স্কাইওয়াক আছে। ঘোড়ার খুরের আকৃতির, একশো গজ লম্বা, মেঝেটা কাচের। সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে পায়ের তলায় নদীটা দেখা যায়। ফোয়ারার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সেইদিনটা মনে করার চেষ্টা করলেন লিলি। স্কাইওয়াকে হাঁটার ভয়মিশ্রিত অনুভূতির কথাও।
ওয়েস্ট রিম-এ নিয়ে গিয়ে সেদিন অ্যান্ডি বলেছিল, ‘বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখো ডার্লিং, পাহাড়টা এমন, যেন মনে হচ্ছে একটা ঈগল ডানা ছড়িয়ে বসে আছে। এটাকে বলে ঈগল’স পয়েন্ট।’
সেদিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন লিলি। এমনটাও হয়? সত্যিই মনে হচ্ছে, একটা ঈগল পাখি যেন পাহাড় জুড়ে বসে রয়েছে। পাখিটাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে প্রচুর ছবি তুলেছিল অ্যান্ডি। নিচের দিকে উঁকি মারতে ভয় পাচ্ছিলেন লিলি। নিচ দিয়ে কোলোরাডো নদীর সবজে জল বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণ ধারায়। নদীটাকে যাতে ভালভাবে দেখা যায়, তার জন্য হেলিকপ্টার সার্ভিসও আছে। পাহাড়ের খাঁজে কপ্টারের পাখা ঘুরছে। নিচের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরতে শুরু করায় লিলি একটা পাথরের উপর বসে পড়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্ডি এসে জড়িয়ে ধরে। তাঁকে কোলে তুলে অনেকটা পথ হেঁটে গিয়ে বসেছিল হুয়ালাপাইদের রেস্টুরেন্টে। হুয়ালাপাইরা হল আমেরিকার প্রাচীন জনজাতি। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে গিয়ে সেদিনই লিলি প্রথম জানতে পারেন, তাঁর ভার্টিগো আছে।
হাসপাতালে ফোয়ারার ধারে এসে বসলেন দু’জন। মোবাইল সেটে রিং টোন হচ্ছে দেখে অ্যান্ডি সুইচ অন করে খুশি খুশি গলায় বলে উঠল, ‘হাই অ্যালেক্স। তোমরা এখন কোথায়?’
স্পিকার অন থাকায় একটা বাচ্চা ছেলের উত্তেজিত গলা শুনতে পেলেন লিলি। ছেলেটা বলল, ‘আমরা এখনও ক্যানিয়নে। এইমাত্তর স্কাইওয়াক থেকে নেমে এলাম। ইউ আর রাইট আঙ্কল, কাচের ফাঁক দিয়ে নিচের দিকে তাকাতে খুব ভয় ভয় করছিল। মনে হচ্ছিল, যদি ভেঙে নিচে পড়ে যাই, তা হলে আর চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঘোড়ার খুড়ের মতো অত বড় একটা স্ট্রাকচার শূন্যে বানাল কী করে আঙ্কল?’
এ দিক থেকে অ্যান্ডি হাসতে হাসতে বলল, ‘এতে সারপ্রাইজড হওয়ার কী আছে ডিয়ার। মনে রেখো, আমরা আমেরিকান। আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি। রাইট? বলো, তোমার গ্র্যান্ডমা কোথায়?’
‘দেখো না, উনি রেস্টুরেন্টে বসে নেটিভদের সঙ্গে কথা বলে যাছেন। গ্র্যান্ডমায়ের সঙ্গে কোথাও আসা মুশকিল। কোনও না কোনও একজন চেনা লোক এসে হাজির হয়। ওঁকে খাতির করতে শুরু করে।’
অভিযোগের সুর শুনে অ্যান্ডি প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বললেন, ‘তোমার গ্র্যান্ডমা একজন সেলেব্রিটি ডিয়ার। চিরদিন মানুষের সেবা করে এসেছেন। লোকে ওকে সেই কারণেই চেনেন ও ভালবাসেন।’
ছেলেটার অনুযোগ শুনে লিলি মনে মনে বললেন, তোমার গ্র্যান্ডমা কত বড় মনের মানুষ, একটু বয়স হোক, তখন বুঝতে পারবে আলেক্স। এই তো বছর দশেক আগে ক্যানিয়নের একটা অংশের জঙ্গলে আগুন লেগেছিল। ওই অঞ্চলে যাঁরা থাকেন, সেই হুয়ালাপাই জনজাতির বহু মানুষ তাতে আহত হয়েছিলেন। রেড ক্রশের হয়ে এলসা আন্টি দুর্গতদের সেবা করতে যান। শুধু তাই নয়, পীড়িত বাচ্চাদের সুস্থ করে তোলার জন্য চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে একটা বড় অনুদানও তিনি জোগাড় করে দিয়েছিলেন। ওঁরা কি সেদিনগুলোর কথা ভুলে যেতে পারেন? দেখা হলে ওঁরা তো মাথায় করে রাখবেনই। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ওয়েস্ট রিম অঞ্চলটা হুয়ালাপাই জনজাতির জন্য সংরক্ষিত। আলেক্স যাদের নেটিভ বলছে, আমেরিকান সরকারও তাঁদের ঘাঁটায় না।
আলেক্স ও প্রান্ত থেকে আরও কী বলতে চাইছিল, অ্যান্ডি ওকে থামিয়ে দিল। ‘ঠিক আছে ডিয়ার। আমি এখন একজনের সঙ্গে কথা বলছি। রাতে তোমার সঙ্গে ফের দেখা হবে।’
ফোনের সুইচ অফ করে দিয়ে তার পর অ্যান্ডি বলল, ‘স্কাইওয়াকে উঠে, আলেক্সের মতো তুমিও কিন্তু প্রথমবার মারাত্মক ভয় পেয়েছিলে লিলি। নিচের দিকে তাকাতেই চাইছিলে না।’
‘আমি এখুনি সেই কথাই ভাবছিলাম। তোমারও মনে আছে সে কথা?’
‘এভরি বিট অফ ইট। অতীতের কোনও কথাই আমি ভুলিনি। যাক গে, কয়েকটা দরকারেই তোমার কাছে ছুটে এলাম। হলিডডে একটা ছবি বানানোর কাজ চলছে। ওরা একটা বায়োপিক বানাতে চান। ডিরেক্টর ভদ্রলোক বছর দেড়েক আগে গোথেনবার্গ গেছিলেন স্ক্রিপ্ট রাইটারকে সঙ্গে নিয়ে। তখন ওদের প্ল্যান ছিল, মাদার এলসার জীবনী নিয়ে ছবি করার।’
শুনে লিলি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফেললেন, ‘ইজ ইট? এর থেকে ভাল খবর আর হয় না।’
‘ওয়েট, ওয়েট।’ অ্যান্ডি বললেন, ‘খবরটা ভাল। কিন্তু মাদার এলসা তখন রাজি হননি। সোজাসাপ্টা না করে দিয়ে বলেছিলেন, উনি এমন কিছু করে ফেলেননি, যার জন্য ওকে নিয়ে ছবি হতে পারে। পাল্টা উনি কি সাজেশন দিয়েছিলেন, জানো? ফিল্মটা তোমার জীবনী নিয়ে করতে।’
‘আমাকে নিয়ে! এমন হাসির কথা তুমি দ্বিতীয়বার মুখে উচ্চারণ কোরো না অ্যান্ডি। তুমি যদি চাও, তা হলে আমি এলসা আন্টিকে রাজি করাতে পারি। ওর জীবনের গল্প আমার থেকে বেশি আর কেউ জানেন না।’
‘অদ্ভুত! উনি তো একই কথা বলছেন, তোমার সম্পর্কে। স্ক্রিপ্ট রাইটারকে উনি বলছিলেন, লিলি ইজ আ রিয়াল উইনার। যেখান থেকে ফিরে এসে আজ, ও যে জায়গায় পৌঁছেছে, তা বিশ্বের মানুষের জানা উচিত। ওর জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত মানুষের সিমপ্যাথি পাবে। অনেক মানুষকে ইন্সপায়ার করবে।’
‘এলসা আন্টির কথা তোমরা মেনে নিও না অ্যান্ডি।’
‘আরে শোনো, শোনো। তোমার জীবনের গল্প শুনে ডিরেক্টর ভদ্রলোক এত ইম্প্রেসড যে, উনি মাদার এলসার কথাই মেনে নিয়েছেন। ওঁরা তোমার সম্পর্কে আরও রিসার্চ করেছেন। সেইসূত্রে আমার কাছেও এসেছিলেন। স্ক্রিপ্ট রেডি, প্রিপ্রোডাকশনের কাজও শুরু হয়ে গেছে তিনমাস আগে। তোমার চেহারার সঙ্গে এশিয়ানদের মিল আছে। তাই প্রোতাগনিস্ট-এর রোলটা করছেন একজন ইন্ডিয়ান অ্যাক্টর প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। রিসেন্টলি উনি খুব নাম করেছেন হলিউডে।’
‘বাঃ, আমার বায়োপিক হচ্ছে, অথচ আমাকে না জানিয়ে? কী করে হয়?’
‘প্রোডিউসার-ডিরেক্টর তোমার কাছে আসতে চান। ওঁরা দু’জনই আমাকে বলেছেন, ফিল্ম থেকে যা রোজগার হবে, তার টোয়েন্টি পার্সেন্ট ওঁরা ডোনেশন দেবেন তোমার চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনে। আমি জানি, সেটা গিয়ে দাঁড়াবে, মিলিয়ন ডলারে। আর তা সত্ত্বেও, তুমি যদি রাজি না হও, তা হলে ছবিটা তোমার বায়োপিক হিসেবে ওরা প্রচার করবেন না। কিন্তু ছবিটা শেষ পর্যন্ত করবেন।’
ডোনেশনের কথা শুনে লিলি অবাক হয়ে তাকালেন। ওয়ান মিলিয়ন ডলার কম অর্থ নয়। চাইন্ড কেয়ারের দায় দিনের পর দিন বেড়েই যাচ্ছে। লিলি বললেন, ‘দাঁড়াও, আমি একটু ভেবে দেখি।’
অ্যান্ডি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের ফাউন্ডেশনের চ্যারিটি শো-টা কবে?’
‘অস্কার অনুষ্ঠান হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পরে। ওই সময়টায় হলিউডের স্টারদের ফাঁকা পাওয়া যায়।’
‘শো কাদের ডেডিকেট করা হচ্ছে এ বার লিলি?’
‘ইয়েমেনের শিশুদের জন্য। অপুষ্টি, রোগ, দারিদ্র… নানা কারণে প্রতি বারো মিনিটে একজন করে শিশু মারা যাচ্ছে ওখানে। সবথেকে বড় কারণ, সিভিল ওয়ার। ক্ষমতা দখলের জন্য দেশের ভিতরই দু’দলের লড়াই। রিসেন্টলি চাইল্ডকেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে আমরা পাঁচজনের একটা দল ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলাম। তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান সেনেটর মাইকেল ক্লেয়ারও ছিলেন। ফিরে এসে ওঁরা যা চিত্র দিলেন, তা ভয়াবহ। মাটির নিচে জলের স্তর বারোশো মিটারের মতো নেমে গেছে। সারা দেশে চাষ করার মতো জল নেই। একটা জাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। সারা বিশ্বের মানুষের এখুনি উচিত ইয়েমেনের পাশে দাঁড়ানো। আমরা বাচ্চাদের জন্য অর্থ সাহায্য চাইব সাধারণ মানুষের কাছে। পঞ্চাশ থেকে হাজার ডলার। যে যেমন পারেন, সাহায্য করুন।’
‘শো-টা কি এবার লাস ভেগাসে নিয়ে যাওয়া যায়? আমাদের ভেনিসিয়ান হোটেল তোমাদের জন্য খোলা থাকবে। আমি চাই, তোমাদের শো আরও জাঁকজমক করে হোক।’
প্রস্তাবটা শুনে লিলি চুপ করে গেলেন। অ্যান্ডি যখন অনুরোধটা করছে, তখন নিশ্চয়ই এলসা আন্টির সমর্থন আছে। কিন্তু ভেনু অন্য জায়গায় নিয়ে গেলে বেশি খরচ হবে কি না, তা নিয়ে মিটিংয়ে আলোচনা করতে হবে। ডোনেশন থেকে ফাউন্ডেশন যত অর্থ পায়, তার নববুই শতাংশ খরচ হয় অনাথ, আর্ত আর অসহায় বাচ্চাদের জন্য। বাকি মাত্র দশ শতাংশ সংস্থা চালানোর জন্য লাগে। এই কারণেই চ্যারিটি নেভিগেটর ওঁদের ফাউন্ডেশনকে এক নম্বরে রেখেছে। লিলি বললেন, ‘এই প্রস্তাবটাও আমরা ভেবে দেখব। এখন ওঠো। আমাকে কেবিনে ফিরে যেতে হবে।’
দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে মেন গেটের দিকে ফিরছেন। অ্যান্ডি বললেন, ‘তোমাকে আরও একটা কথা বলার ছিল। কিন্তু বলব কি না, ঠিক করতে পারছি না।’
গলার স্বরে হঠাৎ পরিবর্তন শুনে, দাঁড়িয়ে পড়ে লিলি বললেন, ‘কী হয়েছে অ্যান্ডি? এত ইতস্তত করছ কেন?’
‘কয়েকদিন আগে কয়েকজন ডিপ্লোম্যাট সেনেটর আমাদের হোটেলে একটা অনুষ্ঠানে গেছিলেন। ওঁদের মুখে শুনলাম, বাংলাদেশে তোমাকে নিয়ে না কি মারাত্মক হই চই হচ্ছে। আচ্ছা, নায়গারায় রিসেন্টলি তোমাকে লক্ষ্য করে টেররিস্টরা কি গুলি চালিয়েছিল? সেই গুলি না কি তোমার বাংলাদেশি রিপ্রেজেন্টিটিভ রোকেয়া সুলতানার গায়ে লাগে? কথাটা কি সত্যি?’
অ্যান্ডির কাছে গোপন করতে চাইলেন না লিলি। বললেন, ‘হ্যাঁ।’
‘তুমি কি জানতে তোমার উপর অ্যাটাক হবে? না হলে ঘটনাটা ঘটার আগে তুমি ও রোকেয়া কেন পোশাক বদলাবদলি করেছিলে? বাংলাদেশি সাংবাদিকরা এই প্রশ্নটা তুলেছেন।’
লিলি বললেন, ‘আমরা পোশাক বদলে নিয়েছিলাম সিকিউরিটি গার্ড স্ট্যানলি গর্ডনের কথায়। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। কিন্তু আমি তো সে ব্যাপারে কথা বলে নিয়েছি রোকেয়ার সঙ্গে।’
অ্যান্ডি বললেন, ‘দু’দিন আগে রোকেয়া মারা গেছেন। হাইকমিশন মারফৎ খবরটা পেয়ে ডিপ্লোম্যাট সেনেটররা তৈরি হচ্ছেন। তোমার উপর টেররিস্ট অ্যাটাকের খবর কেন চেপে দেওয়া হল, তোমার জন্য কেন একজন বাংলাদেশিকে প্রাণ দিতে হল, এর পিছনে চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের কোনও আর্থিক কারচুপির কারণ আছে কি না… সেনেটে এইসব প্রশ্ন ওঁরা তুলবেন। ওঁরা জানেন, তুমি প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসের খুব প্রিয়। আসল টার্গেট তাই উনি।’
রোকেয়া মারা গেছে! শোনার পর থেকে পা থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে লিলির। ইসস, রোকেয়াকে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশি কোনও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে চান। তাঁকেই পরিষ্কার করে সব বলে দেবেন, আ্যটাকের খবর মিডিয়া জানুক, সেটা তিনি কেন চাননি? রোকেয়া বলেছিল, যোগাযোগ করিয়ে দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকা থেকে কোনও সাংবাদিক ফোন করেননি। করলে তিনি বলে দিতে পারতেন, রোকেয়া নন, টেররিস্টদের টার্গেট ছিলেন তিনিই। হামলার ঘটনাটা আমেরিকান মিডিয়া জানতে পারলে, চ্যানেলগুলোতে বিশ্রী আলোচনা শুরু হয়ে যেত। তাতে তাঁর ফাউন্ডেশনের খুব ক্ষতি হত। কথাগুলো ভাবতেই লিলি পিঠে সুচ ফোটার যন্ত্রণা অনুভব করলেন। কোনও রকমে তিনি বললেন, ‘অ্যান্ডি, আমার শরীরটা কেমন যেন করছে। প্লিজ, আমাকে কেবিনে নিয়ে চলো।’
বলার সঙ্গেসঙ্গে লিলি টের পেলেন, অ্যান্ডি তাঁকে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়েছেন। পঁচিশ বছর আগে ঠিক যেমন ক্যানিয়নের ধার থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে গেছিলেন হুয়ালাপাইদের রেস্টুরেন্টে।
