(ছত্রিশ)
পলাশকে হর্স ব্রিডিং সেন্টারে নিয়ে এসেছেন রোজিনা। দূরে লাল পাহাড়ের গায়ে সূর্য তখন ডুবছে। সারা আকাশ জুড়ে হলুদ আভা। জায়গাটা র্যাঞ্চের মূল গেস্ট হাউস থেকে প্রায় দশ মাইল দূরে। দিগন্তব্যাপী সবুজ, গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা অদ্ভুত শান্ত প্রকৃতি। এমন কী, পাখির কলতানও নেই। কাঠের গুড়ো বিছানো রাস্তা। দু’পাশে পাঁচ ফুট উঁচু কাঠের সুন্দর বেড়া। টানা চলে গেছে ব্রিডিং সেন্টারের দিকে। একটা ঘোড়ায় চেপেছেন রোজিনা। অন্যটার উপরএকজন কাউবয়ের সঙ্গে বসে আপ্লুত পলাশ। পাশাপাশি কথা বলতে বলতে যাচ্ছেন দু’জন। পলাশ যা দেখছেন, তাতেই মুগ্ধ। কাউবয়দের আগে কখনও তিনি দেখেননি। ওদের পরনে সাদা টি শার্ট, নীল জিনসের টাইট প্যান্ট। হাঁটু অবধি চামড়ার জুতো। মাথায় কাউবয় টুপি। কিশোরসুলভ কৌতূহলে উনি নানা প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। আর হাসিমুখে রোজিনা ওঁকে আন্দাজ দিচ্ছেন, ঘোড়াদের ঠিকুজি নিয়ে।
‘ম্যাডাম ক’ন কী? একটা ঘোড়ার দাম সেভেন্টি মিলিয়ন ডলার?’ শুনে চোয়াল ঝুলে পড়েছে পলাশের। ‘আমাগো ট্যাহায় কত দাঁড়াইল তাইলে? সাতশো কোটি ট্যাহা! অ্যা, এ তো দেহি, প্লেনের থেইক্যাও দাম বেশি। হ্যার কুলজি কুষ্ঠি কী?
‘হ্যায় ঘোড়াডার নাম ফুসাইচি পেগাসাস। থরোব্রেড জাইতের। আইরিশ মালিকের নাম কুলমোর স্টাড। দাম শুইন্যা চমকাইতাসেন ক্যান। এ গুলা রেসের ঘোড়া। রেসে ফুসাইচির ফ্যান্টাস্টিক রেকর্ড। হ্যারে যদি আফনে দ্যাখতে চান, তাইলে আফনেরে কেনটাকি যাইতে অইব। ফুসাইচি অহন রেস থেইক্যা রিটায়ার করসে। কিন্তু ঘোড়ার ব্রিডিংয়ে… মানে জন্ম দেওয়ার কাজে অহনও হ্যার খুব নাম।’
পলাশ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওয়ার্ল্ডের বেস্ট ঘোড়া কুনডা ম্যাডাম?’
‘আমারে যদি ক’ন তাইলে কমু অ্যারাবিয়ান ঘোড়া। কিন্তু আমেরিকানরা মাইনতে চায় না। হ্যারা মনে করে, হ্যাগো কোয়ার্টার হর্সই বেস্ট। শর্ট ডিসট্যান্স রানে এই ব্রিডের ঘোড়া খুব ফাস্ট। কিন্তু রেসের ঘোড়া হিসাবে দাম বেশি থরোব্রেডের।’
‘মোটরগাড়ির যুগে অহন ঘোড়ার ইম্পরট্যান্স আসে না হি? কী কামে লাগে?’
‘এই যে কইলাম, রেসে নামে। কোটি কোটি ডলার আয় করে। ঘোড়া স্পোর্টসের মাঠে লাগে। ইকোয়েস্ট্রিয়ান, ড্রেসেজ, পোলো খেলায় দরকার। ক্যাটল পাহারা দিতে লাগে। এই যে আমরা ঘুরতে বাইর হইসি যে ঘোড়ায়, হেই দুইডা কোয়ার্টার হর্স। দাম সত্তর-আশি লাখ ট্যাহা অইব। কাউন্টি সাইডে কোনও বাসায় একটা আস্তাবল থাকা মানে, লোকডার পয়সাকড়ি আছে।’
‘একটা ঘোড়া ক’দ্দিন বাঁচে ম্যাডাম?’
‘পঁচিশ-তিরিশ বৎসর। যে ঘোড়াডায় আমি যাইতাসি, হ্যার আর আমার বয়স এক। একই দিনে আমাগো জন্ম হইসিল বইল্যা ড্যাডি আমারে গিফট দিসিল। হ্যার নামও রোজি। আমি না থাকলে কেউ রোজির উপর চাপে না। রোজি আমারে এত চেনে, শিস দিয়া ডাকলেই চইল্যা আসে।’
হর্স ব্রিডিং সেন্টারের দিকে আসার সময় কিছু ঘোড়া কাঠের বেড়ার ওদিকে চরে বেড়াচ্ছিল। দিনের আলো নিভের আসার সঙ্গে সঙ্গে একে একে আস্তাবলে ঢুকে যাচ্ছে। রোজিনা ছোটবেলা থেকে র্যাঞ্চের রোমাঞ্চ অনুভব করেছেন। প্রতিটা জায়গা তাঁর চেনা। পলাশকে তিনি ঝরণার ধারে নিয়ে যেতে চান। ঝরণাটা মাইল পাঁচেক দূরে। একটু পরেই চাঁদ উঠবে। জ্যোৎস্নায় আলাদা রূপ খুলবে র্যাঞ্চের। সেই রোমান্টিক পরিবেশে প্রিয়তমকে গোপন কথাটা বলতে চান রোজিনা। কিন্তু আস্তাবলটা দেখতে চাইছেন পলাশভাই। সেদিকে যাওয়ার সময় উনি নানা অদ্ভুত প্রশ্ন করছেন। যেমন, শীতে ঘোড়ার ঠান্ডা লাগে কী না, বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হয় কী না? একটা ঘোড়া বছরে ক’টা ঘোড়ার জন্ম দিতে পারে? রোজিনার সব জানা। অবলীলায় উত্তর দিচ্ছেন। শেষে একটা প্রশ্নে রোজিনা হোঁচট খেলেন।
‘ম্যাডাম ঘোড়া দাঁড়াইয়া ঘুমায় ক্যান?’
রোজিনা বললেন, ‘আমার জানা নাই। হোস্টলাররা মানে… যারা ঘোড়ার সহিস, হ্যারা কইতে পাইরব। খাড়ান, ডি’কস্টা বইল্যা একজন হোস্টলার আসে, অনেক পুরানা লোক, হ্যারে কইয়া দিম। আফনেরে বুঝাইয়া দিব।’
আস্তাবলের বাড়িটা বিরাট। চল্লিশটার মতো ঘোড়া আছে। নিউ ইয়ার্সের আগে আর দু’একদিনের মধ্যেই ঘোড়াদের নিলাম হওয়ার কথা। আমেরিকার অন্য স্টেটগুলো থেকেও লোকে ঘোড়া কিনতে আসে। সারা দেশে প্রায় সত্তর হাজারের মতো র্যাঞ্চ আছে। কিন্তু রেসের মালিকরা রোজি র্যাঞ্চে এসে ভিড় জমান। কেননা, ভাল জাতের ঘোড়া এখানে পাওয়া যায়। ছোটবেলা থেকে রোজিনা দেখছেন, দূরের শহর বোস্টন, শিকাগো, নিউ জার্সি, ডিট্রয়েট এমন কী হিউস্টন থেকেও লোকেরা এখানে এসে, ঘোড়া কিনে প্লেনে করে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এসে কাউবয়কে রোজিনা বললেন, ‘তুমি গেস্ট হাউসে ফিরে যাও। আমরা পরে আসছি।’
লাল রংয়ের পাহাড়ের দিকে এগোচ্ছেন রোজিনা। তাঁর পিছনে কোমর ধরে বসে পলাশ। ঘোড়ায় উঠেই তাঁর উন্মুক্ত পিঠে একটা দীর্ঘ চুমু দিয়েছেন। সারা শরীর কেঁপে উঠেছিল সেই চুম্বনে। তখন থেকে রোজিনা ভাবছেন, সুখবরটা কীভাবে দেবেন। ক্রিসমাসের দু’দিন আগে থেকে কথাটা পলাশকে বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কোনও না কোনও কারণে ভেস্তে যাচ্ছে। প্রথমদিন পুলিশ লারেইনার নিখোঁজ হওয়ার খবরটা দিল। তার পরেরবার লিলি গডউইনের ডিনার থেকে ফিরে পলাশ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার নিয়ে। একেক সময় মনে হয়, মানুষটা ডলার ছাড়া কিছু বোঝেন না। আরেক সময় মনে হয়, ডলারের কোনও মূল্যই নেই ওঁর কাছে। মুখে কখনও বলেননি, আই লাভ ইউ। কিন্তু ওর চোখের ভাষায় রোজিনা বুঝতে পারেন, তাঁর জন্য পলাশভাই সর্বস্ব ত্যাগ করতে পারেন।
আজ লাঞ্চের পর খুব অল্প সময়ের জন্য মাম্মির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন রোজিনা। মাম্মি জানতে চাইছিলেন, বিয়ে করার কথা ওঁরা ভাবছেন কি না। কথাটা বললেন এইভাবে, ‘আমার শরীর ভালা যাইত্যাসে না মা। পিঠের যন্ত্রণায় ঘুমাইতে পারি না। এত বৎসর হইয়্যা গেল, অহনও সুস্থ হইলাম না। তরা যত তাড়াতাড়ি পারস বিয়া সাইর্যা ফ্যাল।’ তিনি একমাত্র মেয়ে। মাম্মির উদ্বেগ স্বাভাবিক। ড্যাডিও নিশ্চয় চান, জাঁকজমক করে ওঁদের বিয়েটা হোক। কিন্তু রোজিনা মনে করেন, এত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। তাঁর জন্মের তিন বছর পর মামি-ড্যাডির বিয়ে হয়েছিল লাস ভেগাসের এক হোটেলের গির্জায়। মাম্মি-ড্যাডি তাঁর বিয়ের সময়টা বেছে নেওয়ার ব্যাপারেও স্বাধীনতা দেবেন। রোজিনা মাম্মিকে আশ্বাস দিয়েছেন, বিয়ে যখনই করুন, র্যাঞ্চে ছাড়া অন্য কোনও জায়গায় তা, ভাবতেই পারেন না।
‘এখানে চাঁদটা কত বড়, দ্যাখেন দ্যাখেন ম্যাডাম। অ্যামেজিং। মনে হইতাসে, চূড়ায় উঠলে হাতে ধরা যাইব।’ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে পলাশ উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠলেন।
‘পাহাড়ে যাইবেন না হি? চূড়ায় একটা বাংলো আসে। হনিমুনে রাইত কাটানোর জইন্য কাপলরা ভাড়া নেয়। তবে, ওহানে নেকড়া আর কালা ভালুক আসে কিন্তু।’
‘না, তাইলে রিক্স নেওনের দরকার নাই।’ উত্তর শুনে রোজিনা অবাক। মানুষটা কী ধাতুর তৈরি? অন্য কোনও প্রেমিক হলে চট করে রাজি হয়ে যেত। সারা রাত ধরে শরীরের সুখ নিত। রোজিনা জানেন, কেননা, র্যাঞ্চে তাঁর প্রেমিকের অভাব ছিল না। অনেকেই কাছাকাছি আসার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু তিনি পাত্তা দেননি। পলাশ তাঁর মনের ইচ্ছেটাই বুঝতে পারলেন না।
রোজিনা ঠাট্টা করলেন, ‘ভয় পাইসেন না হি? আমার কাছে গান আসে। কোমরে হাত দিয়া দ্যাখতে পারেন। ওয়ালথার পি নাইন্টি নাইন। জার্মান মেড, সেমি অটোমেটিক পিস্তল। র্যাঞ্চে আইলে পিস্তলটা সবসময় আমার সঙ্গে থাকে।’
সঙ্গে সঙ্গে রোজিনা টের পেলেন, পলাশের হাত তাঁর কোমরে ঘোরাঘুরি করছে। লেদার জ্যাকেট আর প্যান্টের মাঝের অংশটুকু খোলা। পলাশের আঙুল তাঁর নাভিতে। অন্য কেউ হলে আঙুলগুলি আরও নিচে নেমে যেত। কিন্তু প্যান্টের খাঁজ থেকে পিস্তলটা বের করে নিয়ে পলাশ বললেন, ‘লাইসেন্সড না হি?’
‘র্যাঞ্চের ভিতর লাইসেন্সের দরকার হয় না। পিস্তলডা যেহানে সিল, সেহানে রাইখ্যা দ্যান পলাশ।’
ফের কয়েক সেকেন্ড তলপেটে পলাশের আঙুলের স্পর্শ পেলেন রোজিনা। তাঁর মুখ থেকে শিৎকারের শব্দ বেরিয়ে এল। চোখ বুঁজে অতীন্দ্রিয় সুখ অনুভব করলেন তিনি। আর থাকতে পারলেন না। ঘোড়া থেকে চট করে নেমে, দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আসেন, নাইম্যা আসেন। আমার ঝরণার কাসে আইয়া গেসি। ওই শোনেন, পানির শব্দ শোনা যাইতাসে। আমার অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল, আফনেরে নিয়া আসুম।’
পলাশ ঘোড়া থেকে নামতেই রোজিনা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। বুকে মাথা রেখে বললেন, ‘আমারে এট্টু আদর কইর্যা দ্যান পলাশ। শরীরডা ঝিমঝিম করত্যাসে। আর থাইকতে পাইরতাসি না।’
এ বার পলাশের মধ্যে উত্তেজনা টের পেলেন রোজিনা। দু’হাতে তাঁর মুখটা তুলে পলাশ ঠোঁট চুষে যাচ্ছেন। চোখ খুলে আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রোজিনা মনে মনে বললেন, তুমি সাক্ষী। তোমারে সামনে রাইখ্যাই আইজ পলাশরে কমু আফনের সন্তান প্যাটে ধরসি।’ শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। পলাশকে আলিঙ্গন করে না থাকলে হয়তো ভূমিশয্যা নিতেন। ঝরণা দেখার জন্য রাস্তার ধারে লোহার কারকার্য করা বেঞ্চ আছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে, পলাশকে পাল্টা চুমু দেওয়ার ফাঁকে রোজিনা যৌনকাতর গলায় বললেন, ‘চলেন, বেঞ্চের উপর গিয়া বসি।’
কয়েক পা দূরেই বেঞ্চ। পলাশ পাঁজকোলা করে তাঁকে তুলে নিলেন। তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে রোজিনা বললেন, ‘আফনেরে একডা কথা কওনের জন্য এহানে নিয়া আইলাম।’
পলাশ বললেন, ‘আমি জানি। কওনের দরকার নাই। আমি বাবা হইতাসি, তাই না?’
বিস্ময় ঠিকরে বেরোল রোজিনার মুখ থেকে, ‘কার মুখ থেইক্যা হুনলেন?’
‘আফনের গাইনির কাসে। কাইল আফনে যখন ইমনের সঙ্গে কথা কইতাসিলেন, তখন গাইনি ম্যাডাম আফনেরে ফোন করসিল। ফোনটা আমি তুলসিলাম।’
‘আফনে খুশি তো? মুখ-চোখ দেইখ্যা তো মনে হইতাসে না।’
কোল থেকে তাঁকে সযত্নে নামিয়ে, হাঁটু গেড়ে বসে পলাশ বললেন, ‘আমারে বিয়া কইরতে রাজি আসো রোজিনা? এতদিন কইতে সাহস পাই নাই।’
শুনে আনন্দে বুকের ভিতরটা কুলকুল করে উঠল। একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রোজিনা বললেন, ‘আমি রাজি।’
পকেট থেকে ছোট্ট একটা অর্নামেন্ট বক্স বের করে আনলেন পলাশ। তার পর তাঁর বাঁ হাতের অনামিকা টেনে নিয়ে আংটি পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমারে যেদিন প্রথম দেহি, হেইদিনই প্ল্যাটিনামের এই আংটিটা কিইন্যা রাখসিলাম। হেইদিনই ঠিক কইর্যা ফেলি, যদি কোনওদিন বিয়া করি, তোমারেই করুম।’ কথাটা বলতে বলতে হাতে চুমু খেলেন পলাশ।
ঠান্ডা বাতাস বইছে ধীর গতিতে। ঝরণা থেকে উড়ে আসা জলবিন্দুর স্পর্শ পাচ্ছেন দু’জন। পরস্পরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দু’জন নির্বাক হয়ে বেঞ্চের উপর বসে। যেন দু’জনেই ভাবছেন, এই বন্ধনটা যেন সারা জীবন অটুট থাকে। জীবনে এইরকম একটা মুহূর্ত একবারই আসে। মানুষটার কাঁধে মাথা রেখে রোজিনা সুখের সাগরে ভাসছেন। পলাশের সঙ্গে তাঁর আলাপ বছর চারেক আগে। এতদিন ধরে মানুষটা আংটি সামলে রেখেছেন উপযুক্ত একটা মুহূর্তে তাঁকে দেবেন বলে! মানুষটাকে এত রোম্যান্টিক বলে কখনও মনে হয়নি রোজিনার। কাঁধে মুখ রেখেই ফিসফিস করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হেইদিনডার কথা আফনের মনে আসে?’
পলাশ বললেন, ‘ক্যান থাইকব না। মনের মানুষ তো একবারই জীবনে আসে। তোমারে আমি প্রথম দেহি, নিউ ইয়র্কে ডলবি থিয়েটারের বাইরে উল্কি আঁকার দুকানে। হাতের কবজিতে বাংলায় তোমার নামটা লিখাইতাসিলা, রোজিনা। তোমারে দেইখ্যা আমার মনে হইসিল, প্যারাগন অফ বিউটি। ভগবান য্যান তোমারে তুলি দিয়া আঁইক্যা পৃথিবীতে পাঠাইসেন। তহন ভাবলাম, আমেরিকান একডা মাইয়া বাংলায় উল্কি আঁকাইতাসে, কেসটা কী? তুমি হয়তো আমারে লক্ষ করো নাই। দোকান থেইক্যা তুমি বাইর হইয়্য গেলা। আমি আমাগো আমোদপুরের মা কালীরে মনে মনে ডাইক্যা কইলাম, মাগো হ্যার সাথে আবার য্যান আমার দেখা হয়। মায় আমার কথা হুনছিলেন। কয়েকদিন বাদে তোমার সাথে দেখা হইল। ম্যানহাটনে ইম্পোর্ট এজেন্সির আপিসে। হেইদিন তোমার পরনে সিল ফ্লেয়ার্ড জিনস, সিল্ক র্যাপ ব্লাউজ আর কাঁধে ঝোলানো হলুদ ব্যাগ। কী অপূর্ব দেখাইতাসিল।’
‘মাই গুডনেস, তোমার এত ডিটেলে মনে আাসে?’
‘তাইর পর কী করসিলাম, হুনবা? আর্টিস্টরে কইলাম, আগের মাইয়াডা যে উল্কি আঁকাইয়া গেল, হেইডা আমারে কইর্যা দাও। হ্যায় আমারে জিগাইল, মাইয়াডা কে হয় তোমার, গার্লফ্রেন্ড? আমি কইলাম, এখনও কেউ হয় নাই। তবে শিগ্গির অইব। আমার কাঁধের মাঝে ম্যাডাম, তোমার নামটা কিন্তু ল্যাখা আসে।’
পলাশ আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ ওঁর ফোনটা বেজে উঠল। না দেখেই লাইনটা কেটে দিলেন উনি। ফের ফোন বেজে উঠল। ফের বিরক্ত হয়ে লাইন কেটে দিয়ে পলাশ বললেন, ‘সেল ফোনডা গেস্ট হাউসে রাইখ্যা আইলে ভালা অইত। ভেরি ডিসটার্বিং।’
রোজিনা বললেন, ‘তোমারে প্রথম নোটিশ করি, যেদিন তুমি আমারে নিউ ইয়র্কের লা বেরনারদিন রেস্টুরেন্টে নিয়া গেলা। তুমি হেইদিনই ইম্পোর্টের কাগজপত্র হাতে পাইস। আমারে কইসিলা, ম্যাডাম, আফনে আমার জইন্য লাকি। আফনের জইন্য আমি এত বড় একডা কন্ট্রাক্ট পাইয়া গেলাম। হুইন্যা আমি মনে মনে হাসসিলাম। ফ্লার্ট করার একডা সীমা আসে। কিন্তু তুমি যহন সেকেন্ড টাইম আমেরিকায় আইলা, তহন আমার মনে হইল, জীবনে তোমার মতো কাউরে আমি খুঁজতাসি। তোমারে লাইফ পার্টনার হিসেবে চুজ করলে আমার মাম্মি খুব খুশি অইব।’
‘রোজি, রেস্টুরেন্টে হেইদিনও তোমার পরনে কী সিল, অহনও ভুলি নাই। কমু না হি?’
‘থাউক থাউক। আর পরীক্ষা দিতে অইব না।’ রোজিনা বললেন, ‘মাম্মির খুব পসন্দ হইসে তোমারে। আমারে এগবার জিগাইল, কবে বিয়া করবি? ঠিক করছস না হি? আমি কইসি, বাচ্চা হওনের দুই বৎসর পর। তোমার কোনও আপত্তি নাই তো?’
ঘাড় নেড়ে পলাশ জানালেন, তাঁর কোনও আপত্তি নেই। তার পর বললেন, ‘আমি তো ভাবতেই পারতাসি না, বাবা হইতাসি। আমি পোলা চাই না। আমার মাইয়া য্যান তোমার মতো সুন্দরী হয়। কী নাম রাখব্যা, ভাবসো কিসু?’
‘তোমার মাইয়া, তুমি নাম ঠিক করব্যা।’ নিজের তলপেটে হাত বোলাতে বোলাতে রোজিনা বললেন, ‘কী অইব যিশুই জানেন। আমি গর্ভে নিসি। প্রার্থনা করি, য্যান সুস্থ বাচ্চার জন্ম দিতে পারি।’
পলাশের ফোনটা তৃতীয়বার বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে নৈঃশধ ভেঙে দুটো পেঁচা ডাকতে ডাকতে এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে গেল। লাইনটা ধরে পলাশ বললেন, ‘কও ইমন। কী খবর?’
বুকে মুখ গুজে শুয়ে রোজিনা। ইমনের গলা শুনতে পাচ্ছেন। ও বলল, ‘ছ্যার, ডিসটার্ব করার জন্য সরি ছ্যার। ভেরি ভেরি সরি।’
পলাশ বললেন, ‘আরে, হইসেডা কী কও? এত প্যানিকি হওনের কী আসে?’
‘ছ্যার, চিরাগ… চিরাগরে জিহাদিরা খুনের চেষ্টা করসিল। আইজ বিহানে হ্যার খোঁজে পুলিশ আফনের বাসায় আইসিল। হ্যাগো মুখেই হুনলাম, জিহাদিরা চিরাগরে এমন মারসে, সেন্সলেস হইয়া অহন হ্যায় হাসপাতালে। ছ্যার, আমি জানতাম না, হ্যায় জিহাদি।’
পলাশ ধমক দিয়ে বললেন, ‘আমারে মিথ্যা কথা কইও না ইমন। আমি জানি, তোমরা দুইজনেই জিহাদি। অহন কও, পুলিশ কি তোমারে অ্যারেস্ট করসে?’
ও প্রান্তে ইমন কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর ভাঙা গলায় বলল, ‘অহনও করে নাই ছ্যার।’
‘আহাম্মক কোথাকার। তোমাগো আমি এত উপকার করলাম, আর তোমরা আমারে এই প্রতিদান দিলা? অহন যাও, জেলের রুটি খাও গিয়া। আমারে ফোন করস ক্যান? আমি তোমর লইগ্যা কিছু কইরতে পারুম না।’
‘ছ্যার, আমারে বাঁচান। আমি বাঁইচলে, আফনেও বাঁচবেন। চিরাগ লুকাইয়া একজন জিহাদিরে বাসায় লইয়্যা আইসিল। হ্যায়, আফনের আউট হাউসের বেসমেন্টে বইস্যা, আফনের অ্যাকাউন্টস হ্যাক করসে। লিলি গডউইনের অ্যাকাউন্টস হ্যাক কইর্যাও হ্যায় হাফ মিলিয়ন ডলার সরাইয়া নিসিল। কিন্তু আমার চোখে পড়ায়, কিসু ক্ষতি করতে পারে নাই। আফনের কোম্পানিরও যা সর্বনাশ করসে, আমি মেরামত কইর্যা দিতে পারুম। হ্যার জন্য আমার সময় দরকার। তার আগে যাতে পুলিশ আমারে অ্যারেস্ট না করে।’
কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে পলাশ বললেন, ‘তুমি হ্যাকিংয়ের ব্যাপারে জানলা কী কইর্যা?’
ইমন বলল, ‘ছ্যার, আফনেরে আমি হত্য কথা কই নাই। আমি একজন ফার্স্ট ক্লাস সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। এথিক্যাল হ্যাকার। একডা সময় বাংলাদ্যাশ ডিফেন্স অ্যাকাডেমির হইয়্যাও কাম করসি। আমারে মাফ করেন ছ্যার। আহাম্মকের মতো জিহাদি হইসিলাম। অহন বুঝতে পারতাসি, কী ভুল করসি।’
কী ভেবে পলাশ বললেন, ‘তুমি আহাম্মক বইল্যা, আমি তো আর আহাম্মকের মতো কাম করতে পারুম না। তুমি ডালাসের প্লেনো বইল্যা একডা জায়গায় চইল্যা যাও। সেহানে রোজিনা ম্যাডাম চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার খুলতাসেন। অ্যাড্রেস পাঠাইয়া দিম। সেন্টারের চার্জে আছেন ডগলাস বইল্যা একজন। হ্যার কাসে গিয়া কইব্যা, সিকিউরিটি গার্ডের জন্য তোমারে রোজিনা ম্যাডাম পাঠাইসে। আর হ্যাঁ, প্লেনে যাওনের চেষ্টা কইরো না। আমার সিদান গাড়িডা লইয়্যা যাও। প্লেনোতে পৌঁছাইয়া আমারে খবর দিবা। মাঝে আমারে বা রোজিনা ম্যাডামরে ডিসটার্ব কইরো না। মনে থাকে য্যান।’
কাছাকাছি কোথাও থেকে গররর শব্দ ভেসে আসছে। অভ্যস্ত কান, রোজিনা বুঝতে পারলেন, কোনও বন্য জন্তু এসে হাজির রয়েছে। সন্ধের দিকে এই সময়টাই নেকড়ে আর কালো ভালুকের দল ঝর্ণার জল খেতে আসে। তখন বেড়ার লোহার দরজাটা বন্ধ করে রাখা হয়। ঝরণার দিকে তাকাতেই ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় তিনি দেখতে পেলেন, চার-পাঁচটা নেকড়ে জল খেতে খেতে ওঁদের লক্ষ করছে। লোহার দরজাটা হাট করে খোলা। ভিতরে ঢুকে সবাই মিলে আক্রমণ করলে ক্ষতবিক্ষত হতে হবে। একমাত্র উপায়, ঘোড়ায় উঠে পড়া। কিন্তু নড়াচড়া করলেই নেকড়ের দল ওঁদের তাড়া করবে। আরও ভয়ের ব্যাপার, রোজিকে কাছাকাছি কোথাও দেখতে পেলেন না রোজিনা। ঘোড়াটা বোধহয় আপনমনে কোথাও চরতে গেছে। শিস দিয়ে ডাকলে অবশ্য এখুনি ফিরে আসবে। কিন্তু আওয়াজ করাটাও ঝুঁকির হয়ে যাবে।
নেকড়ের দলটাকে পলাশ দেখতে পাননি। ফলে বিপদটাও টের পাননি। সেল ফোন পকেটে ঢুকিয়ে আপন মনে গালাগাল দিয়ে যাচ্ছেন ইমনকে। ওকে মানা করতে যাওয়ার সময়ই বিস্ফারিত চোখে রোজিনা দেখলেন, নেকড়ের দল ওঁদের দু’জনের দিকে এগিয়ে আসছে।
