1 of 4

৫০. সহবাসীর প্রতি স্নেহ—নহুষ-চ্যবনসংবাদ

৫০তম অধ্যায়

সহবাসীর প্রতি স্নেহ—নহুষ-চ্যবনসংবাদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! পরপীড়াদর্শনে কিরূপ ক্লেশ হয়, যাহাদের সহিত একত্র বাস করা যায়, তাহাদের প্রতি কিরূপ স্নেহ জন্মে এবং গোসমুদয়ের মাহাত্ম্যই বা কিরূপ, আপনি এই কয়েকটি বিষয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি এই স্থলে নহুষ-চ্যবনসংবাদ নামক এক প্রাচীন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। উহা, শ্রবণ করিলেই তোমার এই বিষয় সুস্পষ্ট হৃদয়ঙ্গম হইবে। পূৰ্ব্বে মহর্ষি চ্যবন অভিমান, ক্রোধ, হর্ষ ও শোক পরিত্যাগপূৰ্ব্বক দ্বাদশ বৎসর প্রয়াগতীর্থে গঙ্গাযমুনার জলমধ্যে বাস করিয়াছিলেন। ঐ মহাত্মা গঙ্গাযমুনার বায়ুবেগসদৃশ প্রবল জলবেগ অনায়াসে সহ্য করিতেন। গঙ্গা, যমুনা ও অন্যান্য স্রোতস্বতীরা ঐ মহর্ষিকে কদাচই নিপীড়িত করিতেন না, প্রত্যুত প্রদক্ষিণদ্বারা তাঁহার সম্মানবন্ধন করিতেন। মহর্ষি কাষ্ঠের ন্যায় স্থির হইয়া জলমধ্যে কখন শয়ন ও কখন বা উপবেশন করিয়া থাকিতেন। জলচর জীবজন্তুগণ তাঁহাকে নিরন্তর জলমধ্যে বাস করিতে দেখিয়া ক্রমশঃ তাঁহার প্রতি সমুচিত বিশ্বাস প্রদান [স্থাপন] করিতে আরম্ভ করিল। মৎস্যেরা তাঁহার সন্নিধানে আগমনপূর্ব্বক প্রফুল্লমনে বিশ্বস্তচিত্তে তাঁহার দেহ আঘ্রাণ করিতে লাগিল। মহাত্মা চ্যবন এইরূপে সলিলবাস অবলম্বনপূর্ব্বক বহুকাল অতিবাহিত করিলেন।

ধীবরগণকর্ত্তৃক জলবাসী চ্যনের আকর্ষণ

“অনন্তর একদা মহাবলপরাক্রান্ত মহাকায় মৎসজীবী নিষাদগণ মৎস্য সংগ্রহ করিবার মানসে প্রয়াগতীর্থে সমুপস্থিত হইয়া বহুবিধ উপায় উদ্ভাবনপূর্ব্বক যে স্থানে মহর্ষি চ্যবন বাস করিতেছিলেন, তথায় সুবিস্তীর্ণ নূতন সূত্রসঙ্কলিত [নূতন সূত্রে বোনা—সুদৃঢ়] জাল নিক্ষেপ করিল এবং অনতিবিলম্বেই এই জাল অতিভারাক্রান্ত বিবেচনা করিয়া প্রফুল্লচিত্তে জলে অবতীর্ণ হইয়া মৎস্য প্রভৃতি জলজন্তু জীবজন্তুগণের সহিত মহর্ষি চ্যবনকে গ্রহণপূৰ্ব্বক তীরে উত্থিত হইল। তীরে উত্থিত হইবামাত্র হরিদ্বর্ণ শ্মশ্রুরাজিবিরাজিত জটাজূটমণ্ডিত মহর্ষি চ্যবন তাহাদের নেত্রপথে নিপতিত হইলেন। ঐ মহাত্মার কলেবর শৈবালজালে জড়িত ও শঙ্খ শম্বুক [শামুক] প্রভৃতি জলজন্তুগণসমাকীর্ণ হইয়াছিল। মৎস্যজীবিগণ তাঁহাকে জলজন্তুগণের সহিত জালে বদ্ধ দেখিয়া শঙ্কিতচিত্তে কৃতাঞ্জলিপুটে বারংবার অভিবাদন করিতে লাগিল। ঐ সময় মৎস্যগণ জমধ্যে জালদ্বারা আকর্ষণ, নিপীড়ন এবং তৎকালসুলভ ভয় ও স্থলস্পর্শনিবন্ধন প্রাণত্যাগ করিল। মহর্ষি চ্যবন তাহাদের তাদৃশ দুর্দ্দশা দর্শন করিয়া দয়ার্দ্রচিত্তে বারংবার দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন।

‘তখন নিষাদগণ মহর্ষিকে মৎস্যবিনাশনিবন্ধন যারপরনাই দুঃখিত দেখিয়া বিনীতভাবে কহিল, ‘ভগবন্! আমরা অজ্ঞানতানিবন্ধন যে পাপাচরণ করিয়াছি, আমাদিগকে তদ্বিষয়ে ক্ষমা করুন এবং এক্ষণে আমরা আপনার কি প্রিয়কার্য্যের অনুষ্ঠান করিব, তাহাও বলুন।’ মৎস্যজীবিগণ এইরূপে বিনয় প্রকাশ করিলে, মহর্ষি চ্যবন তাহাদিগকে কহিলেন, ‘নিষাদগণ! এক্ষণে আমার এই অভিলাষ যে, আমি হয় এই মৎস্যগণের সহিত প্রাণ পরিত্যাগ করিব, না হয় ইহাদিগের সহিত বিক্রীত হইব। আমি ইহাদিগের সহিত বহুকাল জলে বাস করিয়াছি, এক্ষণে কদাচ ইহাদিগকে পরিত্যাগ করিতে পারিব না।’ মহর্ষি এই কথা কহিলে নিষাদগণ নিতান্ত ভীত হইয়া দীনবদনে মহারাজ নহুষের নিকট গমনপূর্ব্বক সেই বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত নিবেদন করিল।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *