1 of 4

২২. দাতা ও দানপাত্রনির্ণয়

২২তম অধ্যায়

দাতা ও দানপাত্রনির্ণয়

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! দণ্ডাদি চিহ্নসম্পন্ন বা ঐ চিহ্নবিহীন ব্রাহ্মণ দানাদির উপযুক্ত পাত্র, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচর্য্যাদির চিহ্নসম্পন্ন হউন বা না হউন, স্বধৰ্ম্মাক্রান্ত হইলেই তাঁহাকে দান করা কর্ত্তব্য। চিহ্নিত ও অচিহ্নিত উভয়বিধ ব্রাহ্মণই দানের উপযুক্ত পাত্র।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যদি অপবিত্র ব্যক্তি পরমশ্রদ্ধা সহকারে ব্রাহ্মণকে হব্যকব্য ও অর্থাদি দান করে, তাহা হইলে তাহার কি পাপ জন্মে?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! দুর্দ্দান্ত ব্যক্তি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইলেই পবিত্র হইয়া থাকে, সুতরাং তদ্বিষয়ে তাহার পাপ জন্মিবার সম্ভাবনা নাই।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! দৈবকাৰ্য্য অনুষ্ঠানকালে ব্রাহ্মণের পরীক্ষা করিবার রীতি নাই; কিন্তু পিতৃকাৰ্য্যসাধনসময়ে কি নিমিত্ত উহাদিগের পরীক্ষা করা হইয়া থাকে?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! দৈবকাৰ্য্য দেবতার অনুগ্রহেই সুসিদ্ধ হয়, তদ্বিষয়ে ব্রাহ্মণের সহযোগিতার আবশ্যকতা নাই। যজমানেরা কেবল দেবগণের অনুগ্রহের উপর নির্ভর করিয়াই দৈবকাৰ্য্যসাধনে প্রবৃত্ত হয়; কিন্তু পিতৃকাৰ্য্য ব্রাহ্মণের অনুগ্রহ ব্যতিরেকে কদাচ সম্পন্ন হয় না। সুতরাং পিতৃকাৰ্য্যসাধনকালে ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ্য আছে কি না, অগ্রে তাহার সবিশেষ পরীক্ষা করা কৰ্ত্তব্য।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যাঁহারা অপরিচিত, স্বসম্পৰ্কীয়, বিবিধবিদ্যায় পারদর্শী, তপঃপরায়ণ ও যজ্ঞশীল, তাঁহাদিগকে কি নিমিত্ত পাত্র বলিয়া অঙ্গীকার করা যায়?”

বিপ্রগুণ—পৃথ্বী-কশ্যপ-অগ্নি-মার্কণ্ডেয়সংবাদ

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! অপরিচিত, স্বসম্পর্কীয় ও তপঃপরায়ণ ব্যক্তি সৎকুলসম্ভূত, যাগযজ্ঞাদির অনুষ্ঠানপরায়ণ, বিদ্বান, অনৃশংস, লজ্জাসম্পন্ন, সরল ও সত্যবাদী এবং বিদ্বান্ ও যজ্ঞশীল ব্যক্তি কুলীন, অনৃশংস, লজ্জাসম্পন্ন, সরল ও সত্যবাদী হইলেই দৈব ও পৈত্র কার্য্যের প্রকৃত পাত্র বলিয়া পরিগৃহীত হয়েন। এই বিষয়ে পৃথিবী, কশ্যপ, অগ্নি ও মার্কণ্ডেয় এই চারিজনের যেরূপ অভিপ্রায়, তাহা শ্রবণ কর।

“একদা পৃথিবী প্রভৃতি চারিজন সমবেত হইয়া এই কথাপ্রসঙ্গে ব্রাহ্মণের সদগুণের কথা উল্লেখ করিয়া কহিয়াছিলেন, ‘মৃৎপিণ্ড যেমন মহাসাগরে নিক্ষিপ্ত হইলে অবিলম্বেই নিমগ্ন হইয়া যায়, সেইরূপ যাজন, অধ্যাপন ও প্রতি গ্রহসম্পন্ন ব্রাহ্মণে সমুদয় দুষ্কাৰ্য্যই বিলুপ্ত হয়, সন্দেহ নাই।

“কশ্যপ কহিলেন, ‘যে ব্রাহ্মণ সুশীল না হয়েন, সার্ঙ্গবেদ, সাঙ্খ্য, পুরাণ ও কৌলীন্য কখনই তাঁহার উদ্ধারসাধনে প্রবৃত্ত হয় না।’

‘অগ্নি কহিলেন, ‘যে ব্রাহ্মণ অধ্যয়নশীল হইয়া আপনার পাণ্ডিতাভিমান প্রকাশ করিয়া থাকেন এবং যিনি ইচ্ছাপূৰ্ব্বক আপনার বিদ্যাবলে অন্যের যশঃ বিলুপ্ত করেন, তিনি নিশ্চয়ই উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম হইতে পরিভ্রষ্ট ও সত্যপ্রয়োগে অসমর্থ হয়েন এবং তাঁহার কখনই অক্ষয়লোকলাভ হয় না।

“মার্কণ্ডেয় কহিলেন, সহস্র অশ্বমেধ ও সত্যকে এক মানদণ্ডে পরিমাণ করিলে সহস্র অশ্বমেধ সত্যের অর্ধাংশ হইতে পারে কি না সন্দেহ। অতএব সতত সত্যপরায়ণ হওয়া অপেক্ষা ব্রাহ্মণের শ্রেয়স্কর আর কিছুই নাই। হে ধৰ্ম্মরাজ! পৃথিবী, কশ্যপ, অগ্নি ও মার্কণ্ডেয় ব্রাহ্মণের বিষয়ে এইরূপ স্ব স্ব অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া যথাস্থানে প্রস্থান করিলেন।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যদি শ্রাদ্ধে ব্ৰহ্মচর্য্যব্রতপরায়ণ ব্রাহ্মণ স্বয়ং প্রার্থনা করিয়া শ্ৰাদ্ধীয় দ্রব্য ভোজন করেন, তাহা হইলে সেই শ্রাদ্ধের অখণ্ড ফললাভ হয় কি না?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যে ব্রাহ্মণ দ্বাদশ বৎসর ব্রহ্মচর্য্য অনুষ্ঠানপূর্ব্বক বেদবেদাঙ্গে পারদর্শী হইয়াছেন, তিনি যদি শ্রাদ্ধকালে প্রার্থনা করিয়া পিত্ৰদ্দেশে [পিতৃলোকের উদ্দেশে] প্রদত্ত দ্রব্য ভক্ষণ করেন, তাহা হইলে তাঁহারই ব্ৰতলোপ হয়, শ্রাদ্ধের কোন অঙ্গহানি হয় না।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! মনীষিগণ ধৰ্ম্মকে নিতান্ত জটিল ও দুরবগাহ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন; অতএব আপনি স্থিরসিদ্ধান্ত করিয়া যথার্থ ধৰ্ম্ম কি, তাহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, অনৃশংসতা, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ ও ঋজুতা এই কয়েকটি ধর্ম্মের প্রকৃত লক্ষণ। যাঁহারা ধর্ম্মের প্রশংসা করিয়া পৃথিবী পৰ্য্যটন করেন, অথচ স্বয়ং ঐ সমস্ত ধর্ম্ম প্রতিপালনে পরাঙ্মুখ হয়েন, সেই সমস্ত ধর্ম্মসংস্কারকারক পামরদিগকে যে ব্যক্তি সুবর্ণ, গো ও অশ্ব প্রদান করে, সে নিরয়গামী হইয়া দশ বৎসর মৃত গোমহিষাদির মাংসভোজী পুক্কস, চণ্ডাল ও যাহারা রাগ [ক্রোধ] মোহাদির বশীভূত হইয়া অন্যের কার্য্যাকাৰ্য্য সমুদয় প্রকাশ করে, তাহারা তাহাদিগের বিষ্ঠা ভক্ষণ করিয়া থাকে, সন্দেহ নাই। যে গৃহস্থ পঞ্চযজ্ঞানুষ্ঠানকালে অভ্যাগত ব্রহ্মচারী ব্রাহ্মণকে পরিতুষ্ট করিয়া, আহার প্রদান না করে, তাহার অশুভ লোকসমুদয় লাভ হয়।”

ব্রহ্মচৰ্য্যাদি-ব্ৰতলক্ষণ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! উৎকৃষ্ট ব্রহ্মচর্য্য কি, শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্মলক্ষণ কি প্রকার, উৎকৃষ্ট পবিত্রতাই বা কাহাকে বলে, আপনি এই সমুদয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মদ্যমাংসপরিত্যাগই উৎকৃষ্ট ব্রহ্মচর্য্য। বেদ প্রতিপাদিত ধৰ্ম্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম্ম আর বিষয়বৈরাগ্যই পবিত্রতা।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! মনুষ্য কোন্ সময়ে ধৰ্ম্মানুষ্ঠান, কোন্ সময়ে অর্থ উপার্জ্জন ও কোন্ সময়েই বা বিষয় ভোগ করিবে, আপনি তাহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বাহ্ণ অর্থোপার্জ্জন, মধ্যাহ্নে ধৰ্ম্মসঞ্চয় ও অপরাহ্ণে বিষয়ভোগ করা কর্ত্তব্য। ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কাম এই তিনের মধ্যে একের উপর নিরন্তর আসক্ত থাকা গৃহস্থের বিধেয় নহে। ব্রাহ্মণগণের সম্মানন, গুরুলোকের অর্চ্চনা ও সকল প্রাণীর প্রতি সরল ব্যবহার করা অবশ্যই কর্ত্তব্য। অনুদ্ধতস্বভাব ও প্রিয়বাদী হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। ধর্ম্মাধিকরণে মিথ্যাবাক্যপ্রয়োগ, নরপতিগণের নিকট শঠতা, গুরুজনসন্নিধানে মিথ্যাব্যবহার, অগ্নিত্যাগ, বেদপরিত্যাগ ও ব্রাহ্মণের প্রতি আক্রোশপ্রকাশ করিলে ব্ৰহ্মহত্যাপাতকে লিপ্ত হইতে হয়। গোহত্যা ও নরপতিকে প্রহার করিলে ভ্রূণহত্যা-পাপ জন্মে।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, ‘পিতামহ! ব্রাহ্মণ কিরূপ গুণসম্পন্ন হইলে সাধু বলিয়া পরিগণিত হয়েন, কিরূপ ব্রাহ্মণকে ধন প্রদান করিলে মহাফললাভ হয় এবং কি প্রকার ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো কৰ্ত্তব্য, তাহা কীর্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ব্রাহ্মণগণ ক্রোধবিহীন, ধর্ম্মপরায়ণ, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয় হইলেই সাধু বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকেন। সেই সমস্ত ব্রাহ্মণকে এবং যাঁহারা নিরহঙ্কৃত, সহিষ্ণু, জিতেন্দ্রিয়, সৰ্ব্বভূতহিতৈষী, মিত্ৰতাপরায়ণ, লোভবিহীন, পবিত্র, বিদ্বান, লজ্জাশীল, সত্যবাদী ও স্বকৰ্ম্মপরায়ণ, তাঁহাদিগকে দান করিলে মহাফললাভ হয়। যে ব্রাহ্মণ চারিবেদ ও সমুদয় বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করেন এবং ষড়বিধ কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়েন, তিনিই ভোজন করাইবার উপযুক্ত পাত্র যথার্থ গুণবান পাত্রে দান করিলে দাতার সহস্রগুণ ফললাভ হয়। শাস্ত্রজ্ঞান, সদ্ব্যবহার ও সচ্চরিত্রসম্পন্ন একমাত্র ব্রাহ্মণকে দান করিতে পারিলেই দাতার কুল পবিত্র হয়। অতএব পূর্ব্বোক্তরূপ ব্রাহ্মণকে গো, অশ্ব, ধন ও অন্যান্য নানাবিধ বস্তু প্রদান করা কর্ত্তব্য। উক্তরূপ পাত্রে দান করিতে পারিলে পরকালে আর দাতাকে অনুতাপ করিতে হয় না। সদ্‌গুণসম্পন্ন সাধুসম্মত ব্যক্তি যদি দূরদেশে অবস্থান করেন, তাহা হইলে যত্নপূৰ্ব্বক তাঁহাকে তথা হইতে আনয়ন করিয়া তাঁহার সৎকার করা সৰ্ব্বতোভাবে কৰ্ত্তব্য।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *