1 of 4

৩০. বীতহব্যের ব্রাহ্মণত্বলাভ—বংশ-বিবরণ

৩০তম অধ্যায়

বীতহব্যের ব্রাহ্মণত্বলাভ—বংশ-বিবরণ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি আমার নিকট এই মহৎ উপাখ্যান কীৰ্ত্তন করিয়া ব্রাহ্মণ্যের দুর্ল্লভত্ব প্রতিপাদন করিলেন। কিন্তু আমি শ্রবণ করিয়াছি, পূৰ্ব্বে মহর্ষি বিশ্বামিত্র ও মহারাজ বীতইব্য ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াও ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। মহর্ষি বিশ্বামিত্র যে কারণে ব্রাহ্মণ্যলাভ হইয়াছিল, তাহা আপনি কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। এক্ষণে মহাত্মা বীতহব্য কিরূপে ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন, তাহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইয়াছে, আপনি উহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! মহারাজ বীতহব্য যেরূপে লোকসৎকৃত [১] দুর্ল্লভ ব্রাহ্মণ্যলাভ করিয়াছিলেন, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বকালে প্রজাপালননিরত মনুর ঔরসে শর্য্যাতি নামে এক মহাত্মা জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। সেই শর্য্যাতির বংশে মহারাজ বৎসের জন্ম হয়। তিনি হৈহয় ও তালজঙ্ঘ নামে দুইটি পুত্র উৎপাদন করেন। লোকে সেই হৈহয়কেই বীতহব্য নামে কীৰ্ত্তন করিয়া থাকে। মহারাজ বীতহব্য দশ স্ত্রীর গর্ভে, মহাবলপরাক্রান্ত বুদ্ধিবিশারদ একশত পুত্র উৎপাদন করিয়াছিলেন। ঐ রাজপুত্রগণ সকলেই বেদজ্ঞ ও ধনুর্ব্বিদ্যা বিশারদ ছিলেন।

বীতিহোত্রপুত্র বিধ্বস্ত কাশি-রাজের ভরদ্বাজাশ্রয়

“ঐ সময় বারাণসীতে হর্য্যশ্ব নামে এক বিখ্যাত ভূপতি ছিলেন। মহারাজ বীতব্যের মহাবলপরাক্রান্ত পুত্রগণ গঙ্গা যমুনার মধ্যভাগে তাহার সহিত তুমুল সংগ্রাম করিয়া পরিশেষে তাঁহার প্রাণসংহারপূর্ব্বক অকুতোভয়ে স্বস্থানে প্রত্যাগমন করিলেন। হর্য্যশ্ব নিহত হইলে তাঁহার পুত্র মূর্ত্তিমান ধৰ্ম্মস্বরূপ মহাত্মা সুদেব কাশীর সিংহাসনে অধিরূঢ় হইয়া রাজ্যপালন করিতে লাগিলেন। বীতহব্যের পুত্রগণ পুনৰ্ব্বার তথায় সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকেও সংহারপূর্ব্বক যথাস্থানে প্রস্থান করিলেন। তৎপরে সুদেবসন্তান মহাত্মা দিবোদাস সেই গঙ্গার উত্তর ও গোমতী নদীর দক্ষিণকূলে সংস্থাপিত বর্ণচতুষ্টয়সমাকীর্ণ অমরাবতীর ন্যায় সমৃদ্ধিশালিনী বারাণসীর সিংহাসনে অধিরূঢ় হইয়া পরাক্রান্ত শত্ৰুদিগের ভয়ে ইন্দ্রের অনুমতিক্রমে স্বীয় রাজধানী সুদৃঢ় ও সমধিক শোভাসম্পন্ন করিলেন। তখন বীতহব্যের পুত্রগণ পুনৰ্ব্বার যুদ্ধার্থী হইয়া তথায় সমুপস্থিত হইলেন। মহাবল পরাক্রান্ত মহারাজ দিবোদাসও সংগ্রামস্থলে সমুপস্থিত হইয়া সহস্রবৎসর তাঁহাদিগের সহিত দেবাসুরসংগ্রামসদৃশ ঘোরতর যুদ্ধ করিলেন। পরিশেষে তাঁহাকে হতবাহন, হতযোধ ও ক্ষীণকোষ [বাহন, সৈন্য ও ধনহীন] হইয়া নিতান্ত দৈন্যদশায় নিপতিত হইতে হইল। তখন তিনি রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া পলায়নপূৰ্ব্বক মহর্ষি ভরদ্বাজের পবিত্র আশ্রমে সমুপস্থিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহার শরণাপন্ন হইলেন। বৃহস্পতিতনয় মহাত্মা ভরদ্বাজ কাশিরাজ দিবোদাসকে আশ্রমে সমাগত দেখিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! তুমি কি নিমিত্ত এখানে উপস্থিত হইলে তাহা বিশেষরূপে আমার নিকট কীৰ্ত্তন কর। আমি অবশ্যই তোমার প্রিয়কার্য্য সাধন করিব।’

ঋষি-অনুগ্রহে দিবোদাসের বীরপুত্রলাভ

“দিবোদাস কহিলেন, ‘ভগবন্! বীতহব্যের আত্মজেরা রণস্থলে আমার বংশনাশ করিয়াছে। এক্ষণে আমি একাকী বংশবিনাশশোকে কাতর হইয়া আপনার শরণাপন্ন হইলাম। আপনি শিষ্যস্নেহ নিবন্ধন আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে রক্ষা করুন। সেই পাপাত্মারা আমার বংশে আমি ভিন্ন আর কাহাকেও অবশিষ্ট রাখে নাই। তখন প্রবলপ্রতাপ মহাভাগ ভরদ্বাজ দিবোদাসের সেই করুণ বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! তুমি এক্ষণে আর ভীত হইও না। আমি তোমার পুত্রলাভের নিমিত্ত এক যজ্ঞানুষ্ঠান করিব। তুমি সেই বলবীর্য্যপ্রভাবে বীতহব্যের বংশ ধ্বংস করিতে সমর্থ হইবে।

“মহর্ষি ভরদ্বাজ এই বলিয়া দিবোদাসকে বিদায় করিয়া তাঁহার পুত্রোৎপাদনের নিমিত্ত যজ্ঞানুষ্ঠান করিলেন। ঐ যজ্ঞপ্রভাবে মহীপাল দিবোদাসের প্রতর্দ্দন নামে এক পুত্র উৎপন্ন হইল। প্রতর্দ্দন জন্মগ্রহণ করিবামাত্র ত্রয়োদশ বৎসর বয়স্কের ন্যায় পরিবর্দ্ধিত হইলেন এবং সমগ্র বেদ ও ধনুর্ব্বেদ আয়ত্ত করিলেন। অনন্তর মহর্ষি ভরদ্বাজ তাঁহাকে যোগ উপদেশ প্রদান করিতে লাগিলেন। সেই যোগপ্রভাবে প্রতর্দ্দনের দেহে ত্রিলোকমধ্যস্থ সমস্ত তেজঃ প্রবিষ্ট হইল। তখন তিনি সুরর্ষি ও বন্দিগণ কর্ত্তৃক স্তয়মান হইয়া প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডের ন্যায় সুশোভিত হইলেন। অনন্তর সেই মহাবলপরাক্রান্ত দিবোদাসতনয় শরাসন, খড়্গ, চর্ম্ম ও বৰ্ম্ম ধারণ করিয়া রথারোহণপূৰ্ব্বক প্রদীপ্ত পাবকের ন্যায় পিতার নিকট গমন করিলেন। সুদেবতনয় দিবোদাস স্বীয় পুত্র প্রতর্দ্দনকে নিরীক্ষণ করিয়া যারপরনাই হর্ষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং বীতহব্যের আত্মজেরা যে তাঁহার শরনিকরে কলেবর পরিত্যাগ করিবে, তদ্বিষয়ে এককালে নিঃসংশয় হইয়া পুত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া আপনাকে কৃতার্থ বিবেচনা করিলেন।

“কিয়দ্দিন পরে মহীপাল দিবোদাস যুবরাজ প্রতৰ্দ্দনকে বীতহব্যের আত্মজগণের বিনাশসাধনার্থ অনুমতি করিলেন।। প্রতর্দ্দন পিতৃ-আজ্ঞা প্রাপ্তিমাত্র অস্ত্রশস্ত্র লইয়া রথারোহণপূৰ্ব্বক গঙ্গাপার হইয়া বীতহব্যের নগরাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। বীতহব্যের আত্মজগণ প্রতর্দ্দনের রথনির্ঘোষ, শ্রবণ করিয়া নগরাকার রথসমুদয়ে আরোহণপূৰ্ব্বক যুদ্ধার্থ নির্গত হইলেন এবং অনতিবিলম্বে প্রতৰ্দ্দনের সন্নিহিত হইয়া জলধর যেমন হিমাচলের উপর বারিধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ তাঁহার প্রতি অনবরত শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবল-পরাক্রান্ত প্রতর্দ্দন শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক বীতহব্যতনয়গণের নিক্ষিপ্ত শরসমুদয় খণ্ড খণ্ড করিয়া অচিরাৎ বজ্ৰানলসন্নিভ শরসমূহদ্বারা তাঁহাদিগের মস্তকছেদন করিলেন। বীতহব্যের আত্মজগণ প্রতর্দ্দননিক্ষিপ্ত শরনিকরে ছিন্নমস্তক হইয়া, রুধিরাক্তকলেবরে, কুঠারকর্ত্তিত কিংশুকবৃক্ষের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইলেন।

‘অনন্তর মহারাজ বীতহব্য পুত্রগণকে সমরশয্যায় শয়ান দেখিয়া নগর পরিত্যাগপূৰ্ব্বক মহর্ষি ভৃগুর আশ্রমে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহার আশ্রয় প্রার্থনা করিলে, মহর্ষি ভৃগুও তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করিলেন। মহারাজ বীতহব্য রাজ্য পরিত্যাগপূৰ্ব্বক পলায়নে প্রবৃত্ত হইলে, দিবোদাসতনয় প্রতর্দ্দন তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইয়াছিলেন। তিনি বীতহব্যের গমনের অনতিবিলম্বেই মহর্ষি ভৃগুর আশ্রমে সমুপস্থিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, “মহাত্মা ভৃগুর শিষ্যগণমধ্যে এই আশ্রমে কে উপস্থিত আছেন, তিনি অবিলম্বে মহর্ষিকে আমার আগমনসংবাদ প্রদান করুন। আমি মহর্ষির সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছি।’

ভৃগু-কৌশলে বীতহব্যের ব্রাহ্মণত্বপ্রতিপাদন

“মহাবীর দিবোদাসতনয় উচ্চৈঃস্বরে এই কথা কহিলে, মহর্ষি ভৃগু তৎক্ষণাৎ আশ্রম হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া তাঁহাকে আমন্ত্রণপূৰ্ব্বক বিধানানুসারে সৎকার করিয়া কহিলেন,‘“মহারাজ! আমি তোমার কোন্ কার্য্য অনুষ্ঠান করিব?’ তখন প্রতর্দ্দন কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনার আশ্রমে বীতহব্য অবস্থান করিতেছেন, এক্ষণে আপনি তাঁহাকে পরিত্যাগ করুন। তাঁহার আত্মজগণ আমার বংশ বিলুপ্ত এবং আমার কাশিরাজ্য ও সমুদয় ধনরত্ন উচ্ছিন্ন করিয়াছে। আমি বীতহব্যের সেই বলমদমত্ত শতপুত্র বিনাশ করিয়াছি, এক্ষণে তাঁহাকে বিনাশ করিলেই পিতৃঋণ হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিব।’ তখন ধর্ম্মপরায়ণ মহর্ষি ভৃগু বীতহব্যের প্রতি একান্ত কৃপাপরতন্ত্র হইয়া প্রতর্দ্দনকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! আমার এই আশ্রমমধ্যে কেহই ক্ষত্রিয় নাই, সকলেই ব্রাহ্মণ।’ মহর্ষি ভৃগু এই কথা কহিলে, ‘প্রতর্দ্দন তাঁহার পাদবন্দনপূৰ্ব্বক প্রফুল্লমনে কহিলেন, ‘ভগবন্! সেই দুরাত্মা বীতহব্য ক্ষত্রিয়; সে এক্ষণে ভীত হইয়া আপনার আশ্রয় গ্রহণ করাতে, আপনি তাঁহার ক্ষত্রিয়ত্ব তিরোহিত করিয়া ব্রাহ্মণত্ব প্রখ্যাপন করিতেছেন; সুতরাং আমারই বলবীর্য্যপ্রভাবে সে জাতিচ্যুত হইল। আমি ইহা দ্বারাই আপনাকে কৃতকার্য্য বিবেচনা করিতেছি। এক্ষণে আপনি আমার শুভানুধ্যান ও গমনে অনুমতি প্রদান করুন।’ মহারাজ প্রতর্দ্দন এইরূপে উরগ যেমন মানুষের প্রতি বিষ পরিত্যাগ করে, সেইরূপ বীতহব্যের প্রতি দারুণ বাক্য প্রয়োগ করিয়া মহর্ষি ভৃগুর অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। মহারাজ বীতহব্যও এইরূপে ভৃগুর বাক্যপ্রভাবে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইলেন।

“এইরূপে মহারাজ বীতহব্য মহর্ষি ভৃগুর বাঙ্‌নিষ্পত্তিমাত্রেই [১] ব্ৰহ্মর্ষিত্ব ও ব্রহ্মবাদিত্ব লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার গৃৎসমদ নামে এক পুত্র উৎপন্ন হইয়াছিল। মহাত্মা গৃৎসমদের রূপ অবিকল ইন্দ্রের ন্যায় ছিল। একদা দৈত্যগণ তাঁহাকে দেবরাজ ইন্দ্র বোধ করিয়া একান্ত নিপীড়িত করে। ঋগবেদ মধ্যে তাঁহার গুণ কীৰ্ত্তিত হইয়াছে। ব্রাহ্মণেরা উহার সবিশেষ শ্লাঘা করিয়া থাকেন। তাঁহার সুচেতা নামে এক পুত্র জন্মে। সুচেতার পুত্র বর্চ্চা। বর্চ্চার পুত্র বিহব্য। বিহুব্যের পুত্র বিতত্য। বিতত্যের পুত্র সত্য। সত্যের পুত্র সন্ত। সন্তের পুত্র তম। তমের পুত্র প্রকাশ। প্রকাশের পুত্র বাগিন্দ্র। বাগিন্দ্রের পুত্র প্রমাত। প্ৰমাত ঘৃতাচীর গর্ভে রুরু নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে শুনকের জন্ম হয়। মহাত্মা শৌনক সেই শুনকের পুত্র। ইঁহারা সকলেই ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। এইরূপে মহারাজ বীতহব্য ক্ষত্রিয় হইয়াও মহর্ষি ভৃগুর অনুগ্রহে সবংশে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়াছিলেন। এই আমি তোমার নিকট বীতহব্যের বংশপরম্পরা ও তাঁহার ব্রাহ্মণত্বলাভের বিষয় কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে আর কি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা হয়, প্রকাশ কর।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *