২১তম অধ্যায়
অষ্টাবক্রের পরীক্ষান্তে বৃদ্ধার নিজরূপ প্রকাশ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! ঐ স্ত্রী যখন অষ্টাবক্রকে পাণিগ্রহণ করিতে অনুরোধ ও উহার শয্যায় গমন করিল, তৎকালে উহার ঐ মহাতেজা মহর্ষি হইতে অভিশাপের আশঙ্কা হইল না কেন? আর ভগবান্ অষ্টাবক্রই বা কিরূপে তথা হইতে গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন, আপনি এই বৃত্তান্তদ্বয় আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! অনন্তর মহর্ষি অষ্টাবক্র সেই স্ত্রীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভদ্রে! তুমি কি নিমিত্ত আপনার রূপ পরিবর্ত্তিত করিলে, তাহা আমার নিকট তোমাকে অবশ্যই প্রকাশ করিতে হইবে।’ মহর্ষি অষ্টাবক্র এইরূপ অনুরোধ করিলে সেই কামিনী তাঁহাকে কহিলেন, ‘মহর্ষে! স্বর্গ, মর্ত্ত্য প্রভৃতি সমুদয় লোকেই স্ত্রীপুরুষগণ কামাবিষ্ট হইয়া থাকে। এক্ষণে তুমি পরদারনিরত কি না, এই বিষয়ে আমার সংশয় উপস্থিত হওয়াতে আমি তোমার পরীক্ষা করিলাম। তুমি আপনার নিয়ম ভঙ্গ না করিয়া সমুদয় লোক পরাজয় করিয়াছ। আমি উত্তরদিক তোমাকে স্ত্রীলোকের চাপল্য দর্শন করাইবার নিমিত্তই আমি বৃদ্ধার রূপ ধারণ করিয়াছিলাম। ইহলোকে বৃদ্ধারাও কামজ্বরে সমাক্রান্ত হইয়া থাকে। আজ ব্রহ্মা ও ইন্দ্রাদি দেবগণ তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছেন। তুমি মহাত্মা বদান্যকর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া যে কাৰ্য্যের নিমিত্ত এই স্থানে উপস্থিত হইয়াছ, আমি তোমাকে উপদেশ প্রদান করিয়া সেই কাৰ্য্য সম্পাদন করিলাম। অতঃপর তুমি নির্ব্বিঘ্নে গমনপূর্ব্বক বাঞ্ছিত কন্যাকে লাভ করিতে পারিবে এবং কালক্রমে ঐ কন্যা পুত্রবতীও হইবে। এই আমি তোমার জিজ্ঞাসানুরূপ উত্তর প্রদান করিলাম। ত্রিলোকমধ্যে কেহই ব্রাহ্মণের অনুরোধ অতিক্রম করিতে পারে না। এক্ষণে তোমার গৃহে গমন করাই কৰ্ত্তব্য। আর যদি তোমার অন্য কিছু শ্রবণ করিতে বাসনা থাকে, তাহা হইলে ব্যক্ত কর, আমি অবশ্যই তাহা তোমার নিকট কীৰ্ত্তন করিব। মহাত্মা বদান্য তোমার নিমিত্তই আমাকে প্রসন্ন করিয়াছেন, আমি তাঁহার সম্মানরক্ষার নিমিত্ত তোমাকে এইরূপ উপদেশ প্রদান করিলাম।
বদান্যকন্যার সহিত অষ্টাবক্রের বিবাহ
“স্ত্রীবেশধারিণী উত্তরদিক্ এই কথা কহিলে মহাত্মা অষ্টাবক্র তাঁহার অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক গৃহে প্রতিগমন করিলেন এবং স্বজনদিগকে আলিঙ্গনপূৰ্ব্বক কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিয়া মহাত্মা বদান্যের আশ্রমে সমুপস্থিত হইলেন। মহর্ষি বদান্য তাঁহাকে সমাগত দেখিয়া কহিলেন, বৎস! যে যে স্থানে গমন ও যাহা যাহা দর্শন করিয়াছ, তৎসমুদয় আমার নিকট কীৰ্ত্তন কর। তখন মহাত্মা অষ্টাবক্র মহর্ষি বদান্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আমি আপনার আজ্ঞানুসারে গন্ধমাদনপৰ্ব্বতে সমুপস্থিত হইয়া উহার উত্তরাংশে এক দেবীর সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। তিনি আপনার অভিপ্রায় আমার নিকট কীৰ্ত্তন করিলেন। তৎপরে আমি তাঁহার অনুজ্ঞা গ্রহণপূৰ্ব্বক গৃহে প্রত্যাগমন করিয়াছি।’ মহাত্মা অষ্টাবক্র এই কথা কহিলে মহর্ষি বদান্য তাঁহাকে কহিলেন, ‘বৎস! তুমি কন্যাদানের যোগ্যপাত্র। তোমাকে কন্যাদান করিতে আমার কিছুমাত্র আপত্তি নাই। তুমি এক্ষণে শুভনক্ষত্রে আমার কন্যার পাণিগ্রহণ কর।’ মহর্ষি বদান্য এইরূপ অনুজ্ঞা করিলে ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মা অষ্টাবক্র বিধিপূৰ্ব্বক সেই কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়া স্বীয় আশ্রমে আগমনপূর্ব্বক পরমসুখে কালহরণ করিতে লাগিলেন।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! যখন মহাত্মা অষ্টাবক্র বদান্যের কন্যাদর্শনে চঞ্চলচিত্ত হইয়া তাহার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন, তখন স্ত্রীপুরুষের সহধৰ্ম্ম যে ইন্দ্রিয়সুখসাধনস্বরূপ, তাহার আর সন্দেহ নাই।”
