ব্রাহ্মণের প্রতি কর্ত্তব্য-উপদেশ
ভীষ্ম কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! ব্রাহ্মণগণ জন্মাবধি সকলের নমস্য। তাঁহারা অতিথিরূপে সুপক্ক অন্নের অগ্রভাগ ভোজন করিয়া থাকেন। তাঁহারা দেবগণের মুখস্বরূপ। তাঁহাদিগের হইতেই ধৰ্ম্মাদি ত্রিবর্গ উৎপন্ন হয়। তাঁহারা জীবলোকের সুহৃৎ! সেই সমস্ত ব্রাহ্মণ পূজিত হইয়া আমাদিগকে শুভানুধ্যান এবং আমাদিগের শত্রুগণকর্ত্তৃক অসৎকৃত হইয়া রোষাবিষ্টচিত্তে তাহাদের অশুভানুধ্যান করুন। পূৰ্ব্বে বিধাতা ব্রাহ্মণদিগকে সৃষ্টি করিয়া যেরূপ নিয়ম স্থাপন করিয়াছিলেন, পুরাবিৎ [অতীত বৃত্তান্তে অভিজ্ঞ] পণ্ডিতেরা তাহা কীৰ্ত্তন করিয়াছেন, শ্রবণ কর। প্রজাপতি ব্রাহ্মণগণকে সৃষ্টি করিয়া কহিলেন, ‘হে ব্রাহ্মণগণ! তোমরা সুরক্ষিত হইয়া সকলকে রক্ষা করিবে। ইহাই তোমাদিগের সর্ব্বোৎকৃষ্ট কার্য্য। ইহাদ্বারাই তোমরা শ্ৰেয়োলাভে সমর্থ হইবে। তোমরা আপনাদের কৰ্ত্তব্যকার্য্য সংশোধন করিয়া ব্রাহ্মী শ্রী [ব্রহ্মতেজ] লাভ করিবে। তোমরা সকলের আদর্শ ও নিয়ামক হইবে। শূদ্রের কার্য্যাবলম্বন করা, তোমাদের কদাপি কৰ্ত্তব্য নহে। তোমরা দাসত্ব স্বীকার করিলে নিশ্চয়ই ধৰ্ম্ম হইতে পরিভ্রষ্ট হইবে, আর স্বাধ্যায়সম্পন্ন হইলে শ্রী, বুদ্ধি, তেজ ও বিপুল মাহাত্ম্য অধিকার করিতে পারিবে। তোমরা দেবগণের উদ্দেশে অগ্নিতে হবনীয় দ্রব্য প্রদান করিলে তোমাদের যারপরনাই সৌভাগ্য জন্মিবে। তোমরা কোন স্থলে আতিথ্যস্বীকার করিলে গৃহস্থ শিশুদিগের ভোজন না হইলেও মহা অগ্রে তোমাদিগকে ভোজন করাইবে। তোমরা অহিংসক, শ্রদ্ধাশীল, জিতেন্দ্রিয় ও স্বাধ্যায়নিরত হইয়া সমুদয় ইচ্ছাই চরিতার্থ করিতে সমর্থ হইবে। ভূলোক ও দ্যুলোক মধ্যে যে সমস্ত পদার্থ আছে, তৎসমুদয়ই জ্ঞান, নিয়ম ও তপস্যাদ্বারা অধিকার করা যায়। অতএব জ্ঞানোপার্জ্জন, নিয়মানুষ্ঠান ও তপশ্চরণ করা তোমাদের অবশ্য কর্ত্তব্য।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! প্রজাপতি ব্রহ্মা ব্রাহ্মণগণের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত তাঁহাদিগকে এইরূপ উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণগণের তপোবল ক্ষত্রিয়ের বাহুবল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে কেহ তপস্বী, কেহ উগ্রস্বভাব, কেহ ক্ষিপ্রকারী এবং কেহ কেহ সিংহের ন্যায়, কেহ কেহ ব্যাঘ্রের ন্যায়, কেহ কেহ বরাহের ন্যায়, কেহ কেহ মকরাদি জলজন্তুর ন্যায় ও কেহ কেহ সর্পের ন্যায় প্রভাবশালী। উঁহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ আশীবিষ তুল্য উগ্র ও কেহ কেহবা নিতান্ত মৃদু এবং কেহ কেহবা বাঙ্নিষ্পত্তি ও কেহ কেহবা দর্শনমাত্রেই বিনাশ করিতে পারেন। ব্রাহ্মণগণ এইরূপ নানাপ্রকার স্বভাবসম্পন্ন হইলেও তাঁহাদিগের সকলকেই পূজা করা কর্ত্তব্য। মেকল, দ্রাবিড়, লাট, পৌণ্ড্র, কোন্নশির, শৌণ্ডিক, দরদ, দৰ্ব্ব, চৌল, শবর, বর্ব্বর, কিরাত ও যবন প্রভৃতি ক্ষত্রিয়গণ ব্রাহ্মণের কোপেই শূদ্রতা প্রাপ্ত হইয়াছে। ব্রাহ্মণদিগের পরাভবনিবন্ধন অসুরগণ সলিলে এবং ব্রাহ্মণগণের প্রসাদবলে দেবগণ স্বৰ্গমধ্যে অবস্থান করিতেছেন। যেমন আকাশের সৃষ্টি, হিমালয়পৰ্ব্বতের পরিচালন ও সেতুবন্ধন দ্বারা গঙ্গাস্রোতের প্রতিরোধ করা নিতান্ত দুঃসাধ্য, তদ্রূপ ব্রাহ্মণগণকে পরাভূত করা নিতান্ত সুকঠিন। ব্রহ্মবিরোধ [ব্রাহ্মণের সহিত বিবাদ] উপস্থিত করিয়া কোন নরপতিই পৃথিবীশাসনে সমর্থ হইতে পারে না। মহাত্মা ব্রাহ্মণগণ দেবগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। হে ধৰ্ম্মরাজ! যদি তোমার সসাগরা বসুন্ধরা উপভোগ করিবার বাসনা থাকে, তাহা হইলে সতত ব্রাহ্মণদিগের পূজা ও দান দ্বারা তাঁহাদিগের পরিতোষসম্পাদন করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য। দানগ্রহণ করিলে ব্রহ্মতেজের হ্রাস হইয়া থাকে। যাঁহারা প্রতিগ্রহ স্বীকার না করেন, সতত সাবধান হইয়া সেই সকল ব্রাহ্মণ হইতে কুলরক্ষা করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য।”
