বিপত্নী-সম্ভোগার্থ ইন্দ্রের আগমন
ভীষ্ম কহিলেন, “ঐ সময় দেবরাজ এই উপযুক্ত অবসর বিবেচনা করিয়া রমণীজনলোভনীয় [নারীগণের চিত্তাকর্ষক] মনোহর বেশ ধারণপূর্ব্বক মহাত্মা দেবশর্ম্মার আশ্রমে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিলেন, মহাতপাঃ বিপুল চিত্রার্পিত পুত্তলিকার ন্যায় নিশ্চেষ্টভাবে উপবিষ্ট রহিয়াছে এবং পুর্ণেন্দুবন্দনা কমলনয়না পৃথুনিতম্বিনী [স্থূলনিতম্বা] রুচি তাহার নিকটে অবস্থান করিতেছেন। সুররাজ আশ্রমে প্রবিষ্ট হইবামাত্র পরমাসুন্দরী রুচি তাঁহার অসামান্য রূপমাধুরী দর্শনে বিস্মিত হইয়া, গাত্রোত্থান এবং তাঁহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিতে চেষ্টা করিলেন; কিন্তু মহাত্মা বিপুলের প্রভাবে তাঁহার সে চেষ্টা বিফল হইয়া গেল। তখন দেবরাজ সেই ঋষিপত্নীকে মধুরবাক্যে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মৃদুহাসিনি! আমি ইন্দ্র; অনঙ্গবাণে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া তোমার নিকট আগমন করিয়াছি; অতএব শীঘ্র আমার মনোরথ পূর্ণ কর।’ দেবরাজ এইরূপে আত্মপরিচয় প্রদান করিলেও রুচি স্বীয় শরীরস্থিত বিপুলের প্রভাবে তাঁহার বাক্যে প্রত্যুত্তর প্রদান বা গাত্রোত্থান করিতে পারিলেন না।
“ঐ সময় মহাত্মা বিপুল গুরুপত্নীর অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া যোগবলে তাঁহার ইন্দ্রিয়সমুদয় পূৰ্ব্বাপেক্ষা দৃঢ়তররূপে রুদ্ধ করিয়া ইন্দ্রের বাক্য শ্রবণ করিতে লাগিলেন। তখন দেবরাজ রুচিকে নিশ্চেষ্ট দেখিয়া পুনৰ্ব্বার সলজ্জভাবে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘সুন্দরি! তুমি অবিলম্বে আমার মনোরথ পূর্ণ কর।’ তখন সুররাজ পুনরায় এই কথা কহিলে, ঋষিপত্নী তাঁহাকে মধুরবাক্যে অভ্যর্থনা করিতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু দেহমধ্যস্থ মহাত্মা বিপুলের প্রভাবে হঠাৎ তাঁহার মুখ হইতে ‘হে দেবরাজ! তুমি কি নিমিত্ত এ স্থানে আগমন করিয়াছ?’ এই বাক্য বিনির্গত হইল। অকস্মাৎ এইরূপ কঠোর বাক্য মুখ হইতে বিনির্গত হওয়াতে রুচি নিতান্ত লজ্জিত হইয়া রহিলেন। দেবরাজও সেই অপ্রীতিকর বাক্য শ্রবণ করিয়া নিতান্ত দুৰ্ম্মনায়মান হইলেন; পরিশেষে সুররাজ দিব্যচক্ষুদ্বারা দর্পণস্থ প্রতিবিম্বের ন্যায় সেই ব্রাহ্মণপত্নীর দেহমধ্যে অতুল-তেজঃসম্পন্ন মহাতপাঃ বিপুলকে দর্শন করিলেন। বিপুলকে অবলোকন করিবামাত্র অভিশাপভয়ে তাঁহার কলেবর কম্পিত হইতে লাগিল।
বিপুল তিরস্কৃত ইন্দ্রের প্রস্থান
“তখন মহাতপাঃ বিপুল অবিলম্বে গুরুপত্নীর দেহ হইতে স্বীয় কলেবরে প্রবেশ করিয়া ইন্দ্রকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘অরে পাপাত্মন্! দুর্ব্বুদ্ধে! তোর এই অজিতেন্দ্রিয়তা দোষনিবন্ধন অতি অল্পকালমধ্যেই দেবতা ও মনুষ্যগণ তোর অর্চ্চনায় বিরত হইবেন। একবার এইরূপ অজিতেন্দ্রিয়তা নিবন্ধন মহর্ষি গৌতমের অভিশাপে তোর সর্ব্বাঙ্গে স্ত্রীচিহ্ন উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহা তুই বিস্মৃত হইয়াছিস। তোর তুল্য মূর্খ, দুশ্চরিত্র ও নীচ আর কেহই নাই। আমি স্বয়ং আমার গুরুপত্নীকে রক্ষা করিতেছি। অতএব তুই অবিলম্বে প্রস্থান কর। আজ তোর প্রতি আমার দয়া উপস্থিত না হইলে এতক্ষণ আমার তেজে তোর কলেবর দগ্ধ হইয়া যাইত। তুই অচিরাৎ এ স্থান হইতে পলায়ন কর। নচেৎ আমার গুরু মহাতপাঃ দেবশর্ম্মা আশ্রমে প্রত্যাগত হইয়া ক্রোধদীপ্ত চক্ষুদ্বারা তোকে দগ্ধ করিয়া ফেলিবেন। ব্রাহ্মণগণকে সতত সম্মান করা তোর অবশ্য কর্ত্তব্য। অতএব তুই আর কখন এইরূপ গর্হিত কার্য্যের অনুষ্ঠান করিস্ না। কখন ব্রাহ্মণগণের প্রতি অত্যাচার করিয়া যেন তাঁহাদের তেজে তোকে পুত্র ও অমাত্যগণের সহিত বিনষ্ট হইতে না হয়। তুই মনে করিতেছিস, আমি অমর, কেহই আমার অনিষ্ট করিতে সমর্থ হইবে না। কিন্তু তপোবলের অসাধ্য কিছুই নাই।’
গুরুপত্নীর সতীত্ব রক্ষায় বিপুলের বরলাভ
“মহাত্মা বিপুল এইরূপ তিরস্কার করিলে দেবরাজ তাঁহার বাক্যশ্রবণে নিতান্ত লজ্জিত হইয়া কোন উত্তর প্রদান না করিয়াই সেই স্থানে অন্তর্হিত হইলেন। তাঁহার অন্তর্দ্ধানের মুহূর্ত্তকাল পরে মহাতপাঃ দেবশর্ম্মা যজ্ঞসমাপনপূর্ব্বক স্বীয় আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন। তখন প্রিয়শিষ্য মহাতপাঃ বিপুল গুরুর চরণে প্রণিপাতপূৰ্ব্বক তাঁহাকে ভাৰ্য্যা প্রদান করিয়া পূৰ্ব্ববৎ অশঙ্কিতচিত্তে তাঁহার নিকট দণ্ডায়মান রহিলেন এবং মহর্ষি দেবশর্ম্মা ভার্য্যার সহিত একাসনে উপবিষ্ট হইয়া কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিলেতাঁতাহাকে কহিলেন, ‘ভগবন্! ইন্দ্র এখানে আসিয়া গর্হিত কার্য্যানুষ্ঠানের চেষ্টা করিয়াছিল; আমি গুরুপত্নীকে তাহার হস্ত হইতে রক্ষা করিয়াছি।’ তখন মহাতপাঃ দেবশর্ম্মা বিপুলের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহার সুশীলতা, সৎস্বভাব, তপস্যা, নিয়ম, দৃঢ়তর গুরুভক্তি ও ধৰ্ম্মনিষ্ঠানিবন্ধন তাঁহাকে অসংখ্য সাধুবাদ প্রদান ও আলিঙ্গনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! আমি বর প্রদান করিতেছি, ধৰ্ম্মে তোমার স্থিরবুদ্ধি হইবে।’
“দেবশর্ম্মা এইরূপ বর প্রদান করিলে, মহাত্মা বিপুল তাঁহার অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক নানাস্থানে বিচরণ করিতে আরম্ভ করিলেন।
মহাতপাঃ দেবশর্ম্মাও ভার্য্যার সহিত সমবেত হইয়া ইন্দ্রের ভয় পরিত্যাগপূৰ্ব্বক সেই বিপিনে [বনে] পরমসুখে কালহরণ করিতে লাগিলেন।”
