1 of 4

২০. বৃদ্ধার অষ্টাবক্রসেবা—পরস্পর প্ৰিয়ালাপ

২০তম অধ্যায়

বৃদ্ধার অষ্টাবক্রসেবা—পরস্পর প্ৰিয়ালাপ

ভীষ্ম কহিলেন, “মহর্ষি অষ্টাবক্র এই কথা কহিলে বৃদ্ধা অচিরাৎ তাঁহার নিকট দিব্যতৈল ও স্নানবস্তু উপস্থিত করিয়া অনুমতি গ্রহণপূৰ্ব্বক তাঁহার সর্ব্বাঙ্গে তৈলমর্দ্দন করিয়া দিল। তৈলমর্দ্দন সমাপ্ত হইলে মহর্ষি সেই বৃদ্ধার সহিত স্নানশালায় প্রবিষ্ট হইয়া অতি বিচিত্র অভিনব সিংহাসনে উপবেশন করিলেন; বৃদ্ধাও তাঁহার সমীপে সমুপবিষ্ট হইয়া ঈষদুষ্ণ সলিলদ্বারা তাঁহাকে স্নান করাইয়া দিতে আরম্ভ করিল। মহর্ষি সেই কদুষ্ণ সলিল ও বৃদ্ধার করস্পর্শদ্বারা পরম সুখানুভব করিতে লাগিলেন, কিন্তু স্নান করিতে করিতে যে সমুদয় রজনী অতিবাহিত হইল, তাহা কিছুমাত্র অবগত হইতে পারিলেন না। অনন্তর তিনি আসন হইতে উত্থিত হইয়া পূৰ্ব্বদিকে দৃষ্টিপাতপূৰ্ব্বক দেখিলেন ভগবান সূৰ্য্যদেব সমুদিত হইয়াছেন। তখন তিনি নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্টচিত্তে চিন্তা করিতে লাগিলেন, আমার কি মোহ উপস্থিত হইল, অথবা যথার্থই প্রাতঃকাল হইয়াছে?

“অনন্তর অনতিকালবিলম্বে তাঁহার সেই সন্দেহ দূরীকৃত হইলে তিনি ভগবান্ সূৰ্য্যদেবের উপাসনা করিয়া বৃদ্ধাকে কহিলেন, ‘ভদ্রে! এক্ষণে আমি কি করিব?’ তখন বৃদ্ধা অমৃততুল্য সুস্বাদু অতি উৎকৃষ্ট অন্ন উপনীত করিল। মহর্ষি সেই সুস্বাদু অন্নের রসাস্বাদন করিতে করিতে সমস্ত দিবা অতিবাহিত করিলেন। পরে পুনরায় সন্ধ্যাসময় সমুপস্থিত হইলে সেই বর্ষীয়সী আপনার ও মহর্ষির নিমিত্ত স্বতন্ত্র শয্যা প্রস্তুত করিয়া কহিল, ‘ভগবন্! আপনি এক্ষণে শয়ন করিয়া নিদ্রাসুখ অনুভব করুন।’ বৃদ্ধা মহর্ষিকে এই কথা কহিয়া তাঁহাকে শয়ন করাইয়া স্বয়ং আপনার শয্যায় শয়ন করিল এবং অর্দ্ধরাত্র সময়ে তাঁহার শয্যায় সমুপস্থিত হইল।

“তখন অষ্টাবক্র তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভদ্রে! পরস্ত্রীসংসর্গ করিতে আমার কোনমতেই ইচ্ছা হয় না; অতএব তুমি অচিরাৎ এই শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া স্বীয় শয্যায় গমন কর।

“দ্বিজবর এইরূপে প্রত্যাখ্যান করিলে বৃদ্ধা নিতান্ত দুঃখিত হইয়া তাঁহাকে কহিল, ‘ভগবন্! আমি স্বতন্ত্রা, আমার সহিত সংসর্গ করিলে আপনাকে পরদারামর্ষণজন্য [পরনারীগ্রহণ] দোষে লিপ্ত হইতে হইবে না।

“অষ্টাবক্র কহিলেন, ‘ভদ্রে! প্রজাপতি কহিয়াছেন যে, অবলাজাতির স্বাধীনতা নাই। স্ত্রীলোকমাত্রেই পরাধীন।’

“তখন বৃদ্ধা কহিল, ‘দ্বিজবর! আমি অনঙ্গপীড়ায় নিতান্ত কাতর হইয়া আপনার প্রতি আসক্ত হইয়াছি। অতএব আপনি যদি আমার অভিলাষ পূর্ণ না করেন, তাহা হইলে আপনাকে নিশ্চয়ই অধৰ্ম্মভাগী হইতে হইবে।’

“অষ্টাবক্র কহিলেন, ‘ভদ্রে! স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তিরা কামক্রোধাদি দোষে একান্ত অভিভূত হয়। আমি ধৈৰ্য্যগুণবশতঃ কামাদি রিপুসমুদয়কে বশীভূত করিয়াছি, অতএব তুমি অচিরাৎ আপনার শয্যায় শয়ন কর।’

“বৃদ্ধা কহিল, ‘দ্বিজবর! আমি আপনাকে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতপূৰ্ব্বক কহিতেছি, আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে রক্ষা করুন। যদি আপনি স্বীয় পত্নী ভিন্ন অন্য স্ত্রীর সংসর্গ নিতান্ত দোষাবহ বিবেচনা করেন, তাহা হইলে আমি আপনাকে আত্মসমর্পণ করিতেছি, আপনি অবিলম্বে আমার পাণিগ্রহণ করুন, তাহা হইলে আমার সংসর্গনিবন্ধন দোষের লেশমাত্রও জন্মিবে না। ফলতঃ আমি স্বতন্ত্রা, স্বয়ং আত্মসমর্পণ করিতে পারি। অতএব আপনি আমাকে বিবাহ করিয়া আমার সংস্কারসম্পাদন করুন। আমি আপনার প্রতি একান্ত আসক্ত হইয়াছি।’

“তখন অষ্টাবক্র কহিলেন, ‘ভদ্রে! ত্রিলোকমধ্যে কোন স্ত্রীরই স্বাধীনতা নাই। তুমি কিরূপে স্বাধীন হইলে? দেখ, কুমারাবস্থায় পিতা, যৌবনাবস্থায় ভর্ত্তা ও বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রেরা স্ত্রীজাতির রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া থাকে, সুতরাং স্ত্রীজাতির কখনই স্বাধীনতা থাকিবার সম্ভাবনা নাই।’

“বৃদ্ধা কহিল, ‘দ্বিজবর! আমি কুমারাবস্থা পর্য্যন্ত ব্রহ্মচর্য্যব্রত প্রতিপালন করিয়াছি। আমি এখন কন্যা, অতএব আমার প্রতি অশ্রদ্ধা না করিয়া আমার পাণিগ্রহণ করুন।’

“বৃদ্ধা এই কথা কহিবামাত্র মহর্ষি অষ্টাবক্র তাহাকে ষোড়শবর্ষদেশীয়া কন্যার [প্রায় সোড়শবর্ষীয়া কন্যার—কিছু কম যোল বছরের কন্যা] ন্যায় অবলোকন করিতে লাগিলেন। তখন তিনি তাহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভদ্রে! তুমি আমার প্রতি যেরূপ অনুরক্ত, আমিও তোমার প্রতি তদ্রূপ। কিন্তু মহর্ষি বদান্য আমাকে পরীক্ষার্থ এ স্থানে প্রেরণ করিয়াছেন, সুতরাং আমি কিরূপে তোমার সহিত সংসর্গে প্রবৃত্ত হইব?’ অষ্টাবক্র সেই কামিনীকে সেই কথা কহিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, কি আশ্চর্য্য! এই কামিনী ইতঃপূৰ্ব্বে অতি জীর্ণ ছিল; এক্ষণে দিব্যবস্ত্রাভরণবিভূষিত কন্যার বেশ ধারণ করিয়াছে, না জানি, পরে আবার কোন্ রূপ পরিগ্রহ করিবে। যাহা হউক, কামদমনশক্তি ও ধৈৰ্য্যগুণসত্ত্বেও আমি কদাচ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিব না। আমি যে সত্য করিয়াছি, সেই সত্য প্রতিপালনপূর্ব্বক নিশ্চয়ই সেই ঋষিকন্যাকে বিবাহ করিব।’ ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *