1 of 4

২৭. তপস্যায় ব্রাহ্মণত্বলাভ—মতঙ্গ-গর্দ্দভীর সংবাদ

২৭তম অধ্যায়

তপস্যায় ব্রাহ্মণত্বলাভ—মতঙ্গ-গর্দ্দভীর সংবাদ

গভীর সংবাদ বৈশম্পায়ন বলিলেন, অনন্তর ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পুনরায় ভীষ্মকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘পিতামহ! আপনি বৃদ্ধ এবং প্রাজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞান, সচ্চরিত্র ও বিবিধ সগুণসম্পন্ন। এই নিমিত্ত আমি আপনাকে ধর্ম্মসংক্রান্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতেছি। আপনি ভিন্ন এই ত্রিলোকমধ্যে আর কাহারও নিকট ধর্ম্মসংক্রান্ত প্রশ্ন করা যায় না। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র কোন্ কার্য্যদ্বারা ব্রাহ্মণত্বলাভে সমর্থ হয়? তপস্যা, সকার্য্য ও শাস্ত্রজ্ঞান এই কয়েকটির মধ্যে কোনটি ক্ষত্রিয়াদি বর্ণত্রয়ের ব্রাহ্মণত্বলাভের উপযোগী, তাহা আপনি সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

“ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ। ক্ষত্রিয় প্রভৃতি বর্ণত্রয়ের ব্রাহ্মণত্বলাভ হওয়া নিতান্ত সুকঠিন। ব্রাহ্মণত্ব সৰ্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। জীব বারংবার জন্মমৃত্যু লাভ ও বহুবিধ যোনিতে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পরিশেষে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। এই স্থলে আমি মতঙ্গগর্দ্দভী সংবাদ নামক এক প্রাচীন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

যজ্ঞসম্ভারে অসমর্থ মতঙ্গের জন্মদোষ প্রকাশ

“পূৰ্ব্বকালে এক ব্রাহ্মণের স্ত্রীর গর্ভে শূদ্রের ঔরসে এক পুত্র উৎপন্ন হয়। ঐ পুত্রের নাম মতঙ্গ। মতঙ্গ সৰ্ব্বগুণসম্পন্ন ছিলেন। ব্রাহ্মণ মতঙ্গকে আপনার ঔরসজাত বিবেচনা করিয়া উহার জাতকর্ম্মাদি সমুদয় অনুষ্ঠান করেন। একদা ঐ ব্রাহ্মণ মতঙ্গকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! আমি দেবগণের উদ্দেশে এক যজ্ঞানুষ্ঠান করিব, তুমি অবিলম্বে যজ্ঞীয় দ্রব্যসম্ভার আহরণ কর।’ মতঙ্গ ব্রাহ্মণের আদেশ প্রাপ্তিমাত্র বেগগামী গর্দ্দভশিশুযুক্ত রথে আরোহণপূর্ব্বক যজ্ঞীয় দ্রব্য আহরণার্থ প্রস্থান করিলেন। কিন্তু তিনি যে স্থানে গমন করিতে অভিলাষী হইয়াছিলেন, রথযোজিত গর্দ্দভশিশু সেই দিকে গমন না করিয়া স্বীয় জননীর অভিমুখেই গমন করিতে লাগিল। তদ্দর্শনে মতঙ্গ রোষাবিষ্ট হইয়া বারংবার উহার নাসিকায় কশাঘাত করিতে লাগিলেন। তখন পুত্রবৎসলা গর্দ্দভী পুত্রের নাসায় অতিশয় আঘাত লাগিয়াছে দেখিয়া করুণভাবে তাহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, ‘বৎস! তুমি দুঃখিত হইও না। এক্ষণে এক চণ্ডাল তোমাকে সঞ্চালিত করিতেছে। ব্রাহ্মণ কদাচ এইরূপ নিষ্ঠুরস্বভাব হয়েন না। ব্রাহ্মণ জগতের মিত্র; তিনি সকল ভূতের আচার্য্য ও শাসনকর্ত্তা; এই ব্যক্তি ব্রাহ্মণ হইলে কি তোমাকে এইরূপ নির্দ্দয়ভাবে প্রহার করিতে পারিত? এই দুরাত্মা অতিশয় পাপস্বভাব, শিশুর প্রতি ইহার কিছুমাত্র দয়ার উদ্রেক হইতেছে না। এই নির্দ্দয় যেমন ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তদনুরূপ কার্য্যসাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছে। ইহার জাতিসুলভ অসদ্‌ভাব ইহাকে তোমার প্রতি সদ্ভাবপ্রদর্শনে একান্ত পরাঙ্মুখ হইতেছে।’

“গর্দ্দভী এইরূপ কর্কশবাক্য প্রয়োগ করিলে, মতঙ্গ তাহা শ্রবণ করিবামাত্র সত্বর রথ হইতে অবরোহণ করিয়া তাহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘কল্যাণি! আমার জননী যেরূপে দূষিত হইয়াছেন, আমি যে নিমিত্ত চণ্ডাল হইয়াছি, তুমি তৎসমুদয় অকপটে আমার নিকট কীৰ্ত্তন কর।’

“তখন গর্দ্দভী কহিল, ‘তুমি কামোন্মত্তা ব্রাহ্মণীর গর্ভে নাপিতের ঔরসে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছ। এই নিমিত্ত তোমার ব্রাহ্মণত্ব তিরোহিত হইয়াছে ও তুমি চণ্ডাল হইয়াছ।

“মতঙ্গ গভীর মুখে এই কথা শ্রবণ করিবামাত্র যজ্ঞীয় দ্রব্য আহরণের অভিলাষ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক অচিরাৎ গৃহে প্রতিগমন করিলেন। তখন সেই ব্রাহ্মণ তাঁহাকে প্রতিনিবৃত্ত দেখিয়া কহিলেন, ‘বৎস! আমি তোমাকে যজ্ঞীয় দ্রব্য আহরণরূপ গুরুতর কার্য্যসাধনে নিযুক্ত করিয়াছিলাম। তুমি তাহা সুসিদ্ধ না করিয়া কি নিমিত্ত প্রতিনিবৃত্ত হইলে, তোমার কোন অমঙ্গল হয় নাই ত!’

মতঙ্গের ব্রাহ্মণত্বলাভের অধ্যবসায়

“তখন মতঙ্গ কহিলেন, পিতঃ! যে ব্যক্তি চণ্ডালজাতি বা তদপেক্ষা নিকৃষ্ট জাতিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহার আর মঙ্গল কি? যাহার জননী দুঃশীলা, সে কিরূপে কুশলী হইবে? এই গর্দ্দভী কহিতেছে যে, তুমি ব্রাহ্মণীর গর্ভে শুদ্রের ঔরসে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছ। ইহার বাক্য কদাপি মিথ্যা হইবার নহে। অতএব আমি এক্ষণে ব্রাহ্মণত্ব লাভের নিমিত্ত অতি কঠোর তপানুষ্ঠান করিব। মতঙ্গ এই বলিয়া তৎক্ষণাৎ অরণ্যে প্রস্থান করিলেন এবং তথায় অবস্থানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণত্ব লাভের অভিলাষে যত্নসহকারে অতি কঠোর তপানুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। তখন দেবগণ তাঁহার সেই দুষ্কর তপস্যাদর্শনে নিতান্ত ভীত হইয়া সেই অরণ্যমধ্যে ইন্দ্রকে প্রেরণ করিলেন। ইন্দ্র তথায় আগমনপুৰ্ব্বক তপস্বী মতঙ্গকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘মতঙ্গ। তুমি বিবিধ পার্থিব ভোগ পরিত্যাগপূর্ব্বক কি নিমিত্ত তপানুষ্ঠান করিতেছ? এক্ষণে আমি তোমাকে বরপ্রদান করিতে আসিয়াছি, তুমি আমার নিকট অভীষ্ট বর প্রার্থনা কর।’ মতঙ্গ কহিলেন, ‘ভগবন্‌! আমি ব্রাহ্মণত্বলাভের নিমিত্ত এই তপানুষ্ঠান করিতেছি। ব্রাহ্মণত্ব ভিন্ন অন্য কোন বরই প্রার্থনা করি না। ব্রাহ্মণত্বলাভ হইলেই আমি গৃহে প্রতিগমন করিব। তখন ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্র মতঙ্গের সেই অসঙ্গত প্রার্থনাবাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ‘মতঙ্গ! তুমি যাহা লাভ করিতে ইচ্ছা করিতেছ, উহা নিতান্ত দুর্ল্লভ। তুমি এই অসুলভ বিষয়লাভের চেষ্টা করিয়া নিশ্চয়ই বিনাশপ্রাপ্ত হইবে। ব্রাহ্মণত্ব সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তপস্যাদ্বারা কোনক্রমেই উহা অধিকার করা যাইতে পারে না। অতএব তুমি অবিলম্বে এই দুরাশা পরিত্যাগ কর। ত্রিলোকমধ্যে যাহা পরম পবিত্র বলিয়া সমাদৃত হইয়া থাকে, তুমি চণ্ডালযোনিতে জন্মগ্রহণ করিয়া কিরূপে তাহা প্রাপ্ত হইতে সমর্থ হইবে?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *