১১শ অধ্যায়
লক্ষ্মীচরিত্র—লক্ষ্মীর বাসস্থান নির্ণয়
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! লক্ষ্মী কিরূপ স্ত্রী ও কিরূপ পুরুষের নিকট অবস্থান করেন, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! একদা কন্দর্পজননী রুক্মিণী অসাধারণ রূপলাবণ্যবতী লক্ষ্মীকে নারায়ণের ক্রোড়ে সমাসীন সন্দর্শন করিয়া মহা আহ্লাদে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ত্রিলোকেশ্বরি! তুমি কোন্ কোন্ স্থানে ও কিরূপ ব্যক্তির নিকট অবস্থান করিয়া থাক, তাহা যথার্থরূপে কীৰ্ত্তন কর।’
“তখন চন্দ্রাননা কমলা নারায়ণের সমক্ষে মধুরবাক্যে রুক্মিণীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘সুন্দরি! আমি সত্যবাদী, কার্য্যদক্ষ, ক্রোধবিহীন, দৈবপরায়ণ, কৃতজ্ঞ, জিতেন্দ্রিয় ও উদারচিত্ত ব্যক্তিদিগের নিকট অবস্থান করিয়া থাকি। যাহারা অকর্ম্মণ্য, নাস্তিক, লম্পট, কৃতঘ্ন, আচারভ্রষ্ট, নৃশংস, তস্কর, গুরুদ্বেষ্টা, মূঢ়স্বভাব, কপট এবং বল, বীৰ্য্য, বুদ্ধি ও সারাংশবিহীন, যাহাদিগের ক্রোধ ও হর্ষের পাত্রপাত্র বিবেচনা নাই, যাহারা কিছুমাত্র অর্থলাভের প্রত্যাশা করে না এবং অল্পমাত্র অর্থলাভ হইলেই পরিতুষ্ট হয়, আমি সেই সমুদয় ক্ষুদ্রচিত্ত মানবগণের নিকট কখনই অবস্থান করি না। যাহারা স্বধৰ্ম্মনিরত, ধৰ্ম্মজ্ঞ, বৃদ্ধদিগের সেবায় একান্ত আসক্ত, পুণ্যাত্মা, ক্ষমাশীল ও বুদ্ধিমান, আমি তাহাদিগের নিকট সতত অবস্থান করিয়া থাকি।
‘যে কামিনীগণ গৃহোপকরণসমুদয় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিয়া রাখে, কার্য্যানুষ্ঠানসময়ে যাহাদের কিছুমাত্র বিবেচনা থাকে না, যাহারা সতত স্বামীর প্রতিকুলবাক্য বিন্যাস করে, পরভুবনে অবস্থান করিতে যাহারা একান্ত অনুরক্ত, যাহাদিগের ধৈৰ্য্য ও লজ্জার লেশমাত্র নাই এবং যাহারা নির্দ্দয়, অশুচি, বিরক্তচিত্ত, কলহপ্রিয় ও নিদ্ৰাপরায়ণ, আমি সৰ্ব্বতোভাবে তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া থাকি। যে কামিনীগণ পতির প্রতি একান্ত অনুরক্ত, ক্ষমাশীল, সত্যনিষ্ঠ, জিতেন্দ্রিয়, সত্যসরলতাদিগুণ সম্পন্ন, দেবতা ও ব্রাহ্মণের প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ, সৌভাগ্যসম্পন্ন ও সৌন্দৰ্য্যযুক্ত, আমি সতত তাঁহাদিগের নিকটেই অবস্থান করি। যান, কন্যা, ভূষণ, যজ্ঞ, সলিলসংযুক্ত মেঘ, প্রফুল্ল পদ্মবন, শারদীয় নক্ষত্রমণ্ডল, হস্তী, গোষ্ঠ, আসন, বিকশিত পঙ্কজপরিপূর্ণ সরোবর, হংসবকাদির স্বরে নিনাদিত দ্রুমবিভূষিত করিকরসমালোড়িত, সিদ্ধতাপসুসেবিত নদী, মত্তহস্তী, বৃষভ; নরপতি, সিংহাসন, সৎপুরুষ, স্বাধ্যায়নিরত ব্রাহ্মণ, প্রজাপালননিরত ক্ষত্রিয়, কৃষিকাৰ্য্যপরায়ণ বৈশ্য, সেবানিরত শূদ্র আমার প্রধান আবাসস্থান। যে গৃহে প্রতিনিয়ত হোম এবং দেবতা, গো ও ব্রাহ্মণগণের অর্চ্চনা সম্পাদিত হয়, আমি কদাচ সেই গৃহ পরিত্যাগ করি না। ভগবান্ নারায়ণ ধৰ্ম্ম, ব্রাহ্মণ্যতা এবং লোকানুরাগের একমাত্র আধার, এই নিমিত্ত আমি একতানমনে [একাগ্রচিত্তে] অভিন্নদেহে উঁহার শরীরে অবস্থান করি। নারায়ণ ভিন্ন আর কুত্রাপি আমি শরীরে অবস্থান করি না। আমি সদয়ভাবে যাহার নিকট অবস্থান করি, তাহার অর্থ ও যশঃ ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইতে থাকে।”
