1 of 4

৬. দৈব-পুরুষকার—ব্রহ্মা ও বশিষ্ঠসংবাদ

৬ষ্ঠ অধ্যায়

দৈব-পুরুষকার—ব্রহ্মা ও বশিষ্ঠসংবাদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি সৰ্ব্বশাস্ত্ৰপারদর্শী; অতএব দৈব ও পুরুষকার এই উভয়ের মধ্যে কোটি শ্রেষ্ঠ তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! এই স্থূলে ব্রহ্মাবশিষ্ঠসংবাদনামে এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

“পূৰ্ব্বকালে মহর্ষি বশিষ্ঠ ব্রহ্মার নিকট দৈব ও পুরুষকার এই উভয়ের মধ্যে কোন্‌টি শ্রেষ্ঠ, এই প্রশ্ন করিলে ভগবান্ কমলযোনি মধুরবাক্যে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহর্ষে! বীজ ব্যতীত কোন দ্রব্য উৎপন্ন বা কোন ফল লব্ধ হয় না। বীজ হইতে বীজ এবং বীজ হইতেই ফল উৎপন্ন হইয়া থাকে। যেমন কৃষকেরা ক্ষেত্রে যেরূপ বীজ বপন করে, তাহাদিগের তদনুরূপ ফললাভ হয়, তদ্রূপ মানবগণ ধর্ম্ম ও অধৰ্ম্ম এই উভয়ের মধ্যে যেরূপ কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, তাহাদের তদনুরূপ ফললাভ হইয়া থাকে। যেমন উপযুক্ত ক্ষেত্র ভিন্ন স্থানান্তরে বীজ বপন করিলে তাহাতে কোন ফলোদয় হয় না, তদ্রূপ পুরুষকার ব্যতীত দৈব কখন সুসিদ্ধ হইবার নহে।

“পণ্ডিতেরা পুরুষকারকে ক্ষেত্র এবং দৈবকে বীজ বলিয়া নির্দ্দেশ করেন। ক্ষেত্র ও বীজ এই উভয়ে একত্র সমাগত হইলেই ফল সমুৎপন্ন হয়। কৰ্ত্তাই অনুষ্ঠিত কাৰ্য্যের ফলভোগ করেন।

মানবগণ যে শুভকাৰ্য্যবলে সুখ এবং পাপকৰ্ম্মপ্রভাবে দুঃখ ভোগ করে, ইহলোকেই তাহার প্রমাণ প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে। কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিলে অবশ্যই তাহার ফললাভ হয়, কিন্তু কৰ্ম্মানুষ্ঠান না করিলে কিছুমাত্র ফললাভের সম্ভাবনা নাই! কাৰ্য্যকুশল ব্যক্তিরা অনায়াসে সর্ব্বত্র প্রতিভা লাভ করিতে পারে; কিন্তু অকৃতকর্ম্মা ব্যক্তিরা তাহাতে বঞ্চিত হইয়া অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করিতে থাকে। ইহা প্রসিদ্ধই আছে যে, তপানুষ্ঠান করিলে সৌভাগ্য ও বিবিধ রত্নাদি লাভ হয়। ফলতঃ কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিতে পারিলে কিছুই দুর্ল্লভ থাকে না, কিন্তু কৰ্ম্ম পরিত্যাগপূৰ্ব্বক কেবল দৈববল অবলম্বন করিলে কিছুই লাভ হয় না। একমাত্র পুরুষকারপ্রভাবে স্বৰ্গভোগ, সদাচার ও মনীষিতা [মনের উচ্চভাব] প্রভৃতি সমুদয় লাভ করিতে পারা যায়।

“জ্যোতির্ম্মণ্ডল, নাগগণ, যক্ষসমুদয় এবং চন্দ্র, সূৰ্য্য ও বায়ু প্রভৃতি দেবতাসকল একমাত্র পৌরুষবলে মনুষ্যলোক অতিক্রম করিয়া দেবলোকে গমন করিয়াছেন। অকৃতকৰ্ম্মা ব্যক্তিরা কখনই অর্থ, মিত্রবর্গ, ঐশ্বৰ্য্য ও সুশ্রীকতা [সৌন্দৰ্য্য] লাভ করিতে সমর্থ হয় না। ব্রাহ্মণগণ শৌচ, ক্ষত্রিয়গণ পরাক্রম, বৈশ্যেরা পৌরুষ এবং শূদ্রেরা সেবাদ্বারা সম্পত্তি লাভ করিয়া থাকেন। কৃপণ, অলস, নিষ্কৰ্ম্মা, কুকৰ্ম্মা, পরাক্রমহীন ও তপঃপরাঙ্মু ব্যক্তিরা কখনই সম্পদ লাভ করিতে সমর্থ হয় না। দেখ, যে ভগবান বিষ্ণু দেবাসুরসঙ্কুল ত্রিলোকের সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনি স্বয়ং সমুদ্রে শয়ন করিয়া তপানুষ্ঠান করিতেছেন। যদি কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিলে তাহার ফলোদয় না হইত তাহা হইলে কেহই তাহার অনুষ্ঠান করিত না, সকলেই একমাত্র দৈবের উপর নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিত। যে ব্যক্তি কৰ্ম্মানুষ্ঠান না করিয়া কেবল দৈবের অনুসরণ করে, কামিনীর ক্লীবপতি সহবাসের ন্যায় তাহার সমুদয় পরিশ্রম পণ্ড হইয়া যায়। দৈব প্রতিকূল হইলে ইহলোকে নানাবিধ দুরবস্থা উপস্থিত হয়; কিন্তু পুরুষকারের হানি হইলে পরকালে অশেষ অমঙ্গল হইয়া থাকে।

“পুরুষকারপ্রভাবে কৰ্ম্ম অনুষ্ঠিত হইলে উহা অনায়াসে দৈবের অনুসরণ করিয়া থাকে; কিন্তু কৰ্ম্মানুষ্ঠান ভিন্ন দৈব স্বয়ং কখন কিছুমাত্র প্রদান করিতে সমর্থ হয় না। যখন দেবলোকেরও স্থানসমুদয় অনিত্য বলিয়া স্থির করা যাইতেছে, তখন দেবতারা যে কৰ্ম্মের অধীন, তাহার আর সন্দেহ নাই। ইহলোকে দৈব প্রায়ই সহজে অনুকূল হয় না; প্রত্যুত স্বীয় পরাভবশঙ্কায় কৰ্ম্মের মহাবিঘ্ন উৎপাদন করে। দেবগণ মহর্ষিদিগের তপস্যার বিঘ্ন করিতে চেষ্টা করেন; কিন্তু মহর্ষিগণও তপোবলে দেবগণকে পরাভূত করিয়া থাকেন। এইরূপে যদিও পুরুষকারের প্রাধান্য নির্দ্দেশ করা যাইতেছে, তথাপি দৈবকে নিতান্ত তুচ্ছ জ্ঞান করা বিধেয় নহে। দৈব লোকের কর্ম্মে প্রবৃত্তি জন্মাইবার কারণ। লোকে দৈবপ্রভাবে কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়া পরলোকে উৎকৃষ্ট ফলভোগ করে।

“যাহা হউক, দৈবের উপর নির্ভর করা কদাপি কৰ্ত্তব্য নহে। আপনার সাধ্যানুরূপ পুরুষকার অবলম্বন করা সকলেরই উচিত। আত্মাই মনুষ্যগণের বন্ধু ও শত্রু। আত্মাই মানবগণের সৎকৰ্ম্ম ও কুকর্ম্মের সাক্ষিস্বরূপ। যে ব্যক্তির পুণ্যদ্বারা পাপ ও পাপদ্বারা পুণ্য বিনষ্ট হইয়া যায়, তাহাকে স্বৰ্গনরকরূপ পুণ্য-পাপের ফলভোগ করিতে হয় না। মনুষ্য পুণ্যবলে সমুদয় দেবলোক লাভ করিতে পারে। পুণ্যবান ব্যক্তির প্রভাবে দৈব প্রতিহত হইয়া যায়।

“দেখ, মহারাজ যযাতি স্বর্গভ্রষ্ট হইয়াও পুণ্যবান দৌহিত্রগণকর্ত্তৃক পুনৰ্ব্বার স্বর্গারূঢ় হইয়াছেন। রাজর্ষি পুরূরবা ব্রাহ্মণগণের প্রভাবে ঐলনামে বিখ্যাত হইয়া স্বর্গে প্রারোহণ [অসাধারণভাবে আরোহণ] করিয়াছেন। কোশলাধিপতি মহারাজ সৌদাস অশ্বমেধাদি বিবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াও মহর্ষি বশিষ্ঠের শাপে রাক্ষসত্ব লাভ করিয়াছিলেন। মহাধনুর্দ্ধর পরশুরাম স্বীয় কৰ্ম্মদোষে স্বর্গারোহণ করিতে সমর্থ হয়েন নাই। দ্বিতীয় বাসবের ন্যায় একশত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াও একমাত্র মিথ্যাবাক্যপ্রয়োগনিবন্ধন মহারাজ বসুকে রসাতলে গমন করিতে হইয়াছে। বিরোচননন্দন মহারাজ বলি বিষ্ণুর পুরুষকারবলে দেবগণকর্ত্তৃক ধর্ম্মপাশে বদ্ধ হইয়া পাতালতলে নীত হইয়াছেন। মহারাজ জনমেজয় দেবরাজ ইন্দ্রকে পদাঘাত করিতে উদ্যোগ ও ব্রাহ্মণপত্নীদিগের প্রাণসংহার করিয়াছিলেন এবং মহর্ষি বৈশম্পায়ন অজ্ঞানবশতঃ বালকহত্যা ও ব্রহ্মহত্যাপাপে লিপ্ত হইয়াছিলেন; তথাপি দৈব তাঁহাদিগের দণ্ডবিধান করিতে সমর্থ হয়েন নাই। রাজর্ষি নৃগ মহাযজ্ঞে ভ্রান্তিক্রমে এক ব্রাহ্মণকে অন্যস্বামিক গো প্রদান করিয়া কৃকলাসত্ব [কাকলাসদেহ] প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। মহারাজ ধুন্ধুমার গিরিব্রজপুরে বহুকাল যজ্ঞানুষ্ঠানপূৰ্ব্বক উহার ফলস্বরূপ দেবতাদিগের বর গ্রহণ না করিয়া গিরিব্রজে নিদ্রিত হইয়াছিলেন।

“তপোনিয়মসম্পন্ন সংশিতব্রত মহর্ষিগণ তপোবলেই শাপ প্রদান করিয়া থাকেন, কখনই দৈববল অবলম্বন করেন না। দুর্ল্লভ ঐশ্বৰ্য্যাদি পাপাত্মাদিগের অধিকৃত হইয়াও উহাদিগকে পরিত্যাগ করে। লোভমোহের বশীভূত নরাধমদিগকে দৈব কখনই পরিত্রাণ করিতে সমর্থ হয় না। যেমন অল্পমাত্র হুতাশন বায়ুসহকারে বিপুল হইয়া উঠে, তদ্রূপ দৈব পুরুষকারদ্বারা সংযুক্ত হইলে অচিরাৎ পরিবর্দ্ধিত হয়। যেমন তৈলক্ষয় হইলে দীপশিখার হ্রাস হয়, তদ্রূপ কৰ্ম্মময় হইলে দৈবের হ্রাস হইয়া থাকে। ইহলোকে কৰ্ম্মবিহীন ব্যক্তিরা বিপুল ঐশ্বৰ্য্য, বিবিধ ভোগ্যবস্তু ও স্ত্রীসমূহ প্রাপ্ত হইয়াও ঐ সমুদয় ভোগ করিতে সমর্থ হয় না; কিন্তু উদযোগপরায়ণ মহাত্মারা পুরুষকারপ্রভাবে পাতালগত দেবরক্ষিত রত্নও লাভ করিতে পারেন। দানশীল মহাত্মারা নিৰ্দ্ধন হইলেও দেবগণ তাঁহাদিগকে আশ্রয় করিয়া উৎকৃষ্ট স্বর্গফল প্রদান করেন। দেবতারা মনুষ্যদিগের বিবিধ রত্নভূষিত গৃহও শ্মশানভূমিসদৃশ জ্ঞান করিয়া থাকেন। সুতরাং দেবলোক যে মনুষ্যলোক হইতে শ্রেষ্ঠ তাহাতে সন্দেহ নাই।

“ইহলোকে কর্ম্মবিহীন ব্যক্তিরা দৈববলে কখনই তৃপ্তিলাভে সমর্থ হয় না। আর যাহারা কুপথে পদার্পণ করে, দৈব পুরুষকারের সাহায্য ব্যতীত কদাচ তাহাদিগকে নিবারণ করিতে পারে না; দৈবের প্রভুত্ব নাই। যেমন শিষ্য গুরুর অনুগমন করে, তদ্রূপ দৈবকে নিরন্তর পুরুষকারের অনুসরণ করিতে হয়।

“হে মহর্ষে! এই আমি যোগবলে তোমার নিকট পুরুষকারের সমুদয় ফল কীৰ্ত্তন করিলাম। লোকে পূৰ্ব্বকৃত কৰ্ম্মজনিত দৈবের অনুকূলতা-প্রভাবে ঐহিক সুখ ও ইহলোককৃত শাস্ত্রানুযায়ী সৎকর্ম্মপ্রভাবে স্বর্গলোক প্রাপ্ত হয়।”