সর্ব্বজীবে দয়া—শিবিকপোত-শ্যেনবৃত্তান্ত
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! জরায়ুজাদি চতুর্ব্বিধ প্রাণী শরণাপন্ন হইলে যাঁহারা তাহাদিগকে রক্ষা করেন, তাঁহাদিগের কিরূপ ফললাভ হয়, তাহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইয়াছে; অতএব আপনি উহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আমি এই উপলক্ষ্যে একটি পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে এক প্রিয়দর্শন কপোত এক শ্যেনপক্ষীকর্ত্তৃক তাড়িত হইয়া ভয়ব্যাকুলমানসে নভোমণ্ডল হইতে মহাত্মা শিবিরাজার ক্রোড়ে নিপতিত ও শরণাপন্ন হইয়াছিল। তখন বিশুদ্ধস্বভাব মহারাজ শিবি সেই নীলোৎপলসদৃশ শ্যামবর্ণ প্রিয়দর্শন কপোতকে প্রাণভয়ে আশ্রয় গ্রহণ করিতে দেখিয়া, আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, ‘বিহঙ্গম! তোমার ভয় নাই। তুমি কোথায় কি করিয়াছ এবং কাহার ভয়েই বা এরূপ ভীত ও উদ্ভ্রান্তচিত্ত হইয়া এ স্থানে উপস্থিত হইয়াছ, তাহা ব্যক্ত কর। ঐ দেখ রক্ষাধ্যক্ষ তোমার অগ্রে অবস্থান করিতেছে, এক্ষণে কেহই তোমাকে আমার নিকট হইতে গ্রহণ করিবার ইচ্ছাও করিতে সমর্থ হইবে না; অতএব তুমিও বিশ্বস্ত ও ভয়বিহীন হও। আজ আমি তোমাকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত সমুদয় কাশিরাজ্য ও জীবন পর্য্যন্ত পরিত্যাগ করিতে পারি।’
গামাংসপ্রদানে শিবির কপোতরক্ষা
মহারাজ শিবি কপোতকে এইরূপ আশ্বাস প্রদান করিতেছেন, এমন সময় সেই শ্যেনপক্ষী তথায় সমুপস্থিত হইয়া নরপতিকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিল, ‘মহারাজ! এই মৃতকল্প কপোত আমার ভক্ষ্য। আমি বহু যত্নে ইহাকে প্রাপ্ত হইয়াছি। অতএব ইহাকে রক্ষা করা আপনার কখনই কর্ত্তব্য নহে। এই কপোতের মাংস, রুধির, মজ্জা ও মেদদ্বারা আমার বিলক্ষণ তৃপ্তিলাভ হইবে। অতএব আপনি আমার আহারের ব্যাঘাত করিবেন না। আমি ক্ষুৎপিপাসায় নিতান্ত কাতর হইয়াছি; অতএব আপনি অনুগ্রহ করিয়া এই কপোতকে পরিত্যাগ করুন। আমি ইহার অনুসরণপূৰ্ব্বক পক্ষ ও নখরদ্বারা ইহাকে ক্ষতবিক্ষত ও মৃতপ্রায় করিয়াছি। ঐ দেখুন, ইহার কেবল এক একবার নিশ্বাসপ্রশ্বাস বিনির্গত হইতেছে, এক্ষণে ইহাকে রক্ষা করা আপনার কখনই উচিত নহে। আপনি স্বীয় আধিকারস্থ মানবগণেরই প্রভু, তৃষ্ণার্ত্ত খেচরদিগের প্রতি আপনার প্রভুত্ব করিবার ক্ষমতা নাই। শত্রু, ভৃত্য, স্বজন ও ইন্দ্রিয়সমুদয়কে দমন ও ব্যবহার বিষয়ে ক্ষমতা প্রকাশ করা আপনার কর্ত্তব্য বটে; কিন্তু আকাশচারী বিহঙ্গকুলের প্রতি পরাক্রম প্রকাশ করা আপনার কখনই বিধেয় নহে। আমি আপনার শত্রু নহি, তদাচ যদি আপনি আমাকে আমার ভক্ষ্য প্রদান না করেন, তাহা হইলে অবশ্যই আপনাকে অধর্ম্মে লিপ্ত হইতে হইবে।
“শ্যেনপক্ষী এই কথা কহিলে, মহারাজ শিবি তাহার বাক্যশ্রবণে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া মনে মনে কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন, ‘বিহঙ্গম! আজ আমি তোমাকে বৃষ, বরাহ, মৃগ বা মহিষের মাংস প্রদান করিতেছি; তুমি তদ্বারা ক্ষুধাশান্তি কর। আমি কখনই শরণাগতপ্রতিপালনরূপ মহাব্রত পরিত্যাগ করিতে পারিব না। এই দেখ, কপোত কোনমতেই আমার ক্রোড় পরিত্যাগ করিতেছে না।’
“তখন শ্যেন কহিল, ‘মহারাজ! আমি বৃষ, বরাহ ও অন্যান্য জন্তু ভোজন করি না। সুতরাং ঐসকল জন্তুর মাংসে আমার প্রয়োজন কি? দেবগণ কপোতদিগকেই আমাদের ভক্ষ্য নির্দ্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। শ্যেনপক্ষীরা যে কপোতদিগকে ভক্ষণ করে, ইহা কাহারও অবিদিত নাই। এক্ষণে যদি এই কপোতের প্রতি আপনার নিতান্ত স্নেহ হইয়া থাকে, তাহা হইলে আপনি আমাকে এই কপোতপরিমিত স্বীয় গামাংস প্রদান করুন।’
“শ্যেনপক্ষী এই কথা কহিবামাত্র মহারাজ শিবি তাহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বিহগরাজ! আজ তুমি আমাকে এই আদেশ করিয়া আমার প্রতি নিতান্ত অনুগ্রহ প্রকাশ করিলে। আমি, অবিলম্বেই তোমাকে কপোতপরিমিত স্বীয় গাত্রমাংস প্রদান করিতেছি। মহাত্মা শিবি শ্যেনপক্ষীকে এ কথা কহিয়া তুলাদণ্ড সংস্থানপূর্ব্বক উহার এক দিকে কপোতকে সন্নিবেশিত করিয়া, অপর দিকে স্বীয় মাংস ছেদন করিয়া প্রদান করিতে লাগিলেন। নানারত্নভূষিত অন্তঃপুরচারিণী রমণীগণ সেই সংবাদ শ্রবণমাত্র হাহাকার করিয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইতে লাগিল। তাহাদিগের এবং মন্ত্রী ও ভৃত্যবর্গের ক্রন্দনকোলাহলে রাজভবন পরিপূর্ণ হইয়া গেল। ঐ সময় নরপতির সেই সত্যপালনপ্রভাবে নভোমণ্ডল মেঘাচ্ছন্ন ও পৃথিবী বিচলিত হইল। মহারাজ শিবি ক্রমে ক্রমে পার্শ্বদ্বয়, বাহুদ্বয় ও উরুদ্বয় হইতে সমুদয় মাংস ছেদনপূৰ্ব্বক তুলাদণ্ডে প্রদান করিলেন; তথাপি উহা কপোতপরিমিত হইল না। পরিশেষে যখন তাহার সর্ব্বাঙ্গে অস্থিমাত্র অবশিষ্ট রহিল, তখন তিনি স্বয়ং রুধিরাক্তকলেবরে তুলাদণ্ডের উপরিভাগে আরোহণ করিলেন।
কপোতরক্ষায় শিবির স্বর্গবাস
“তিনি তুলাদণ্ডে আরোহণ করিবামাত্র দেবরাজ ত্রিলোকবাসীদিগের সহিত সমবেত হইয়া তাঁহার নিকট সমুপস্থিত হইলেন। দেবগণ ভেরী ও দুন্দুভিধ্বনি করিয়া তাঁহার মস্তকে বারংবার অমৃত ও পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিলেন এবং গন্ধৰ্ব্ব ও অপ্সরাগণ লোকপিতামহ ব্রহ্মার ন্যায় তাঁহার সন্তোষসম্পাদনার্থ নৃত্যগীত করিতে আরম্ভ করিলেন। কিরৎক্ষণ পরে মহারাজা শিবি সেই সৎকার্য্যপ্রভাবে সুবর্ণময় অট্টালিকা, মণিকাঞ্চনময় তোরণ ও বৈদূর্য্যমণিময় স্তম্ভে সমলঙ্কৃত বিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক স্বর্গে প্রস্থান করিলেন।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এক্ষণে তুমি সেই মহাত্মা শিবিরাজের ন্যায় শরণাগত ব্যক্তিদিগকে রক্ষা করিতে কৃতসঙ্কল্প হও। যে ব্যক্তি ভক্ত, অনুরক্ত ও আশ্রিতদিগকে রক্ষা করে, সে পরলোকে নিশ্চয়ই অশেষ সুখভোগের অধিকারী হয়। যে মহীপাল সৎস্বভাবসম্পন্ন ও শিষ্টাচারনিরত হইয়া কপটতা পরিত্যাগ করিতে পারেন, তাহার অপ্রাপ্য কিছুই থাকে না। সেই বিশুদ্ধস্বভাব সত্যপরাক্রম কাশিরাজ শিবি স্বীয় সৎকার্য্যপ্রভাবে ত্রিলোকমধ্যে বিখ্যাত হইয়াছেন। যে ব্যক্তি শরণাগত ব্যক্তিকে রক্ষা করেন, তাঁহার নিশ্চয়ই সেই মহাত্মার ন্যায় পরলোকে সদ্গতিলাভ হয়। যে ব্যক্তি সর্ব্বদা মহাত্মা শিবির এই উপাখ্যান শ্রবণ বা কীৰ্ত্তন করে, সে নিষ্পাপ ও পবিত্র হয়, সন্দেহ নাই।”
