৭ম অধ্যায়
কৰ্ম্মভেদে পরলোকগতিভেদ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! লোকে যে সমস্ত শুভকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে, আপনি তৎসমুদয়ের কীৰ্ত্তন করুন। উহা, জ্ঞাত হইতে আমার অতিশয় অভিলাষ হইয়াছে।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! তুমি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিলে, উহা মহর্ষিগণেরও গোপনীয়। এক্ষণে আমি দেহান্তে যাহার যে গতিলাভ হয়, তাহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“মনুষ্য যে যে শরীরে যে যে অবস্থায় যে যে কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, তাহাকে পরজন্মে সেই সেই শরীরে সেই সেই অবস্থায় তত্তৎকর্ম্মের ফলভোগ করিতে হয়। ফলভোগ ব্যতীত কৰ্ম্ম কদাচই বিনষ্ট হয় না। পাঁচ ইন্দ্রিয় ও আত্মা সেই কর্ম্মের সাক্ষিস্বরূপ। অভ্যাগত ব্যক্তির কাৰ্য্যসাধনের নিমিত্ত চক্ষু ও মনকে নিয়োগ এবং তুষ্টিসম্পাদনের নিমিত্ত মিষ্টবাক্যপ্রয়োগ এবং তাঁহার অনুগমন ও উপাসনা করাও গৃহস্থের কর্ত্তব্য। যে গৃহস্থ এই পাঁচ কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করেন, তাঁহার পঞ্চদক্ষিণ [দক্ষিণম্বরূপ পাঁচ প্রকার দ্রব্য দানসাব্যস্ত] যজ্ঞের অনুষ্ঠান করা হয়। পথপরিশ্রান্ত অদৃষ্টপূৰ্ব্ব পথিককে সুস্বাদু অন্ন প্রদান করিলে প্রচুর ফললাভ হইয়া থাকে। অগ্নিয়ের শয়ন এবং স্থণ্ডিলশায়ীদিগকে গৃহ ও শয্যা, চীরবল্কলপরিধায়ীদিগকে বসন ও আভরণ আর যোগনিযুক্ত তপোধনকে যান ও বাহন প্রদান করিলে রাজার পৌরুষলাভ হয়। সমুদয় রস আস্বাদনে বিরত হইলে সৌভাগ্যবৃদ্ধি এবং আমিষ পরিত্যাগ করিলে পশু ও পুত্রলাভ হইয়া থাকে। যিনি অধোমুখে বৃক্ষে লম্বমান হয়েন, যিনি জলে বাস করেন এবং যিনি নিরন্তর ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিয়া থাকেন, তাঁহার অভীষ্ট গতিলাভ হয়, সন্দেহ নাই। অতিথিসৎকারের নিমিত্ত পাদ্য, আসন, প্রদীপ, অন্ন ও গৃহ প্রদান করাকেই পঞ্চযজ্ঞ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। যুদ্ধে গমন ও রণশয্যায় শয়ন করিলে অক্ষয় লোকলাভ হইয়া থাকে।
“দানদ্বারা ধন, মৌনাবলম্বনদ্বারা অপ্রতিহত আজ্ঞা, তপস্যাদ্বারা উপভোগ ও ব্রহ্মচর্য্যদ্বারা জীবন এবং অহিংসাদ্বারা রূপ, ঐশ্বৰ্য্য ও আরোগ্য লাভ করিবে। যাঁহারা কেবল ফলমূল ভক্ষণ করেন, তাঁহারা রাজ্য, যাঁহারা পত্রমাত্ৰ ভক্ষণ করিয়া থাকেন, তাঁহারা স্বর্গ এবং যাঁহারা আহারাদি সমস্ত পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রায়োপবেশন করেন, তাঁহারা সর্ব্বত্রই সুখলাভ করিয়া থাকেন। শাকমাত্র ভক্ষণ করিলে গোধন, তৃণমাত্র ভক্ষণ করিলে স্বর্গ, স্ত্রী পরিত্যাগপূৰ্ব্বক তিনবার স্নান ও বায়ুভক্ষণ করিলে যজ্ঞফল, সত্যবাক্য প্রয়োগ করিলে স্বর্গ এবং যজ্ঞে দীক্ষা গ্রহণ করিলে উৎকৃষ্ট ফললাভ হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণ পবিত্র হইয়া সলিলমাত্র পান ও অগ্নিহোত্রের অনুষ্ঠান করিলে রাজ্য এবং অনশনব্রত অবলম্বন করিয়া গায়ত্রাদি মন্ত্রপাঠ করিলে সুরলোক লাভ করিতে পারেন। দ্বাদশবার্ষিক যজ্ঞে উপবাস, ব্রতসাধনের নিমিত্ত ক্ষীরাদি আহার ও দ্বাদশ বৎসর তীর্থপর্য্যটন করিলে দুঃখনাশ ও মানসধৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করিলে সুরলোক প্রাপ্ত হইয়া থাকে। নির্ব্বোধেরা যাহা প্রাণান্তেও পরিত্যাগ করিতে পারে না, কলেবর জীর্ণ হইলেও যাহা জীর্ণ হয় না, যাহা প্রাণান্তকর রোগবিশেষ বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকে, সেই তৃষ্ণাকে অকপটে পরিত্যাগ করিতে পারিলেই সুখলাভ করা যায়।
“বৎস যেমন সহস্র সহস্ৰ ধেনুমধ্যে আপনার জননীর নিকট গমন করিয়া থাকে, সেইরূপ পূৰ্ব্বকৃত কৰ্ম্ম জন্মান্তরে কর্ত্তাকেই প্রাপ্ত হয়, সন্দেহ নাই। যেমন পুষ্প ও ফল প্রেরিত না হইয়াও যথাসময়ে বিকশিত ও সুপক্ক হয়, সেইরূপ পূৰ্ব্বকৃত কাৰ্য্যসমুদয় প্রকৃত সময়ে নিঃসন্দেহ পরিণত হইয়া থাকে। মনুষ্য জরাগ্রস্ত হইলে তাহার কেশকলাপ জীর্ণ ও দন্তসমুদয় শীর্ণ এবং কর্ণ ও চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়সমুদয় বিকল হইয়া যায়; কিন্তু তাহার বিষয়বাসনা কিছুতেই অপনীত হয় না। পিতার প্রতি উৎপাদন করিলে প্রজাপতি ব্রহ্মাকে ও মাতার প্রতি উৎপাদন করিতে পারিলে পৃথিবীকে পরিতৃপ্ত করা যায়। উপাধ্যায়কে প্রীত করিতে পারিলে ব্রহ্মের সৎকার করা হইয়া থাকে। যিনি এই তিনটি বিষয়ের সবিশেষ সমাদর করেন, তাঁহার সকল ধর্ম্মই প্রতিপালন করা হয়; আর যে ব্যক্তি এই তিন বিষয়ে আস্থা প্রদর্শন করে না, তাঁহার সমস্ত কার্য্যই নিষ্ফল হইয়া থাকে।”
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে জনমেজয়! মহাত্মা ভীষ্ম এইরূপ উপদেশ প্রদান করিলে যুধিষ্ঠির প্রভৃতি পাণ্ডবগণ যারপরনাই বিস্মিত হইলেন এবং অতি-প্রফুল্লচিত্তে ঐ বাক্যের সবিশেষ প্রশংসা করিতে লাগিলেন। জয়লাভাদির নিমিত্ত মন্ত্রপ্রয়োগ, দক্ষিণাদান ব্যতিরেকে সোমযাগ অনুষ্ঠান ও মন্ত্র ব্যতীত হোম করিলে যে পাপ হয়, মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করিলেও সেই পাপ জন্মিয়া থাকে, সন্দেহ নাই।
এই আমি মহাত্মা ব্যাসের বাক্যানুসারে শুভাশুভ-প্রাপ্তি বিষয়ে তোমাকে উপদেশ প্রদান করিলাম। অতঃপর আর কোন বিষয় শ্রবণ করিতে অভিলাষ হয়, ব্যক্ত কর।
