1 of 4

২৯. মতঙ্গের তীব্রতর সমস্যা

২৯তম অধ্যায়

মতঙ্গের তীব্রতর সমস্যা

ভীষ্ম কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! দেবরাজ ইন্দ্র এইরূপ কহিলেও মতঙ্গ তপস্যায় বিরত না হইয়া সংযতচিত্তে পুনরায় সহস্র বৎসর একপদে দণ্ডায়মান হইয়া ধ্যানে নিমগ্ন রহিলেন। অনস্তুর সহস্র বৎসর পরিপূর্ণ হইলে বৃত্রাসুরনিপাতী পুরন্দর পুনরায় তথায় উপস্থিত হইয়া পূর্ব্বোক্ত বাক্যসমুদয় কীৰ্ত্তনপুৰ্ব্বক মতঙ্গকে তপানুষ্ঠানে নিষেধ করিলেন।

“তখন মতঙ্গ কহিলেন, ‘হে পুরন্দর! আমি ব্রহ্মচারী হইয়া সমাহিতচিত্তে সহস্র বৎসর একপদে দণ্ডায়মান রহিয়াছি, তথাপি কি নিমিত্ত আমার ব্রাহ্মণ্যলাভ হইতেছে না?’

“দেবরাজ কহিলেন, ‘বৎস! তুমি চণ্ডালযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছ; অতএব কোনরূপেই ব্রাহ্মণ্যলাভে সমর্থ হইবে না। এক্ষণে আর তোমার বৃথা পরিশ্রম করিবার প্রয়োজন নাই। তুমি অন্য অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।’ তখন মতঙ্গ ইন্দ্ৰবাক্যশ্রবণে একান্ত শোকাৰ্ত্ত হইয়া গয়াতীর্থে গমনপূর্ব্বক এক বৎসর অঙ্গুষ্ঠের উপর নির্ভর করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। ঐরূপ কঠোর তপানুষ্ঠান করিতে তাঁহার শরীর অস্থিচর্ম্মাবশিষ্ট ও শিরাসমুদয়ে পরিব্যাপ্ত হইল। অনন্তর একদা তিনি সেই ঘোরতর নিয়মানুষ্ঠান করিতে করিতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন সৰ্ব্বভূতহিতৈষী বরদাতা বাসব তৎক্ষণাৎ তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে ধারণপূর্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! ব্রাহ্মণত্ব লাভ তোমার পক্ষে নিতান্ত বিরুদ্ধ বলিয়া রোধ হইতেছে। ফলতঃ ব্রাহ্মণ্যলাভ নিতান্ত সুকঠিন; উহার লাভচেষ্টা করিলে অশেষ বিঘ্ন উপস্থিত হয়। এই ভূমণ্ডলে ব্রাহ্মণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই। ব্রাহ্মণকে পূজা না করিলে অশেষ দুঃখ এবং পূজা করিলে বিবিধ সুখলাভ হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণ সমুদয় প্রাণীর মঙ্গলদাতা; ব্রাহ্মণ হইতেই দেবতা ও পিতৃগণ পরিতৃপ্ত হয়েন। ব্রাহ্মণগণ যখন যাহা বাসনা করেন, তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিতে পারেন। জীব পর্য্যায়ক্রমে বহুতর যোনি পরিভ্রমণ করিয়া পরিশেষে ব্রাহ্মণ্যলাভ করে। অতএব তুমি সেই দুর্ল্লভ ব্রাহ্মণ্যলাভের বাসনা পরিত্যাগ করিয়া অন্য বর প্রার্থনা কর। কখনও তদ্বিষয়ে কৃতকার্য্য হইবে না।

মতঙ্গের অকৃতকার্য্যতা—ইন্দ্রবরে সদগতি

“মতঙ্গ কহিলেন, ‘দেবেন্দ্র! আপনি আর কি নিমিত্ত আমাকে তিরস্কার করিয়া পীড়িতপীড়ন ও মৃত ব্যক্তির উপর প্রহার করিতেছেন? আমি তপোবলে ব্রাহ্মণ্যলাভের উপযুক্ত হইলেও আপনি কি নিমিত্ত আমাকে উহা প্রদান করিতেছেন না? অনেক ক্ষত্রিয়াদি বর্ণত্রয়ের পক্ষে নিতান্ত দুর্ল্লভ ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়াও নিয়মিতরূপে তাহা প্রতিপালন করিতেছে না। যাহারা দুর্ল্লভ ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়া তাহা প্রতিপালন না করে, তাহারা নিতান্ত পাপাত্মা ব্যক্তিগণ অপেক্ষাও অধম। কিন্তু জনসমাজে তাদৃশ ব্যক্তিগণও ব্রাহ্মণ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। অতএব যখন অনেকে অহিংসা ও শমদমাদি ধর্ম্মের অনুষ্ঠান না করিয়াও ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিগণিত হইতেছে, তখন আমি আত্মারাম, নির্দ্ধন্দ্ব, নিষ্পরিগ্রহ ও অহিংসাদি ধর্ম্মাবলম্বী হইয়াও কি নিমিত্ত ব্রাহ্মণ্যলাভে বঞ্চিত হইব? হায় হায়! আমার কি দূরদৃষ্ট! আমি ধৰ্ম্মজ্ঞ হইয়াও কেবল একমাত্র মাতৃদোষে এতাদৃশ দুরবস্থা প্রাপ্ত হইলাম। যখন আমি এতাদৃশ যত্নবান্ হইয়াও ব্রাহ্মণ্যলাভে অসমর্থ হইলাম, তখন নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, পুরুষকারপ্রভাবে দৈবকে অতিক্রম করা নিতান্ত সুকঠিন, যাহা হউক, অতঃপর অগত্যা আমাকে ব্রাহ্মণত্বলাভের আশা পরিত্যাগ করিতে হইল। এক্ষণে যদি আমার প্রতি আপনার অনুগ্রহবুদ্ধি হইয়া থাকে অথবা আমার যদি কিছুমাত্র সুকৃতি থাকে, তাহা হইলে আপনি আমাকে অভিলষিত বর প্রদান করুন।

“মহাত্মা মতঙ্গ এই কথা কহিবামাত্র বৃত্রাসুরনিপাতী সুররাজ ইন্দ্র তাঁহাকে বর প্রার্থনা করিতে কহিলেন। তখন মতঙ্গ কহিলেন, ‘দেবরাজ! আমি যেন আপনার বরপ্রভাবে কামচারী ও কামরূপী বিহঙ্গম হই। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় প্রভৃতি সমুদয় বর্ণই যেন আমার পূজা করে এবং আমার কীর্ত্তি যেন অক্ষয় হয়।’ তখন ইন্দ্র মতঙ্গকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বৎস! তুমি ছন্দোদেব নামে বিখ্যাত হইয়া কামিনীগণের পূজ্য হইবে এবং ত্রিলোকমধ্যে তোমার খ্যাতির পরিসীমা থাকিবে না।’

“হে ধৰ্ম্মরাজ! ত্রিলোকাধিপতি ইন্দ্র মতঙ্গকে এইরূপ বর প্রদান করিয়া তথা হইতে অন্তর্হিত হইলেন; মহাত্মা মতঙ্গও অচিরাৎ প্রাণত্যাগপূৰ্ব্বক উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিলেন। অতএব সর্ব্বোকৃষ্ট ব্রাহ্মণত্ব লাভ করা নিতান্ত সুকঠিন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *