1 of 4

২. মৃত্যুজয়প্রশ্ন—ইক্ষ্বাকুবংশীয় দুর্য্যোধননৃপকথা

২য় অধ্যায়

মৃত্যুজয়প্রশ্ন—ইক্ষ্বাকুবংশীয় দুর্য্যোধননৃপকথা

অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন ভীষ্ম এইরূপ উপাখ্যান কীৰ্ত্তন করিলে ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির শোক-বিহীন হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, “পিতামহ! সমুদয় শাস্ত্রই আপনার পরিজ্ঞাত আছে, আমি আপনার নিকট এই অপূৰ্ব্ব উপাখ্যান শ্রবণ করিয়া পরমপ্রীত হইয়াছি। এক্ষণে পুনৰ্ব্বার ধর্ম্মসংক্রান্ত কথা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাঞ্ছা হইয়াছে। অতএব গৃহস্থ কিরূপ ধর্ম্মপরায়ণ হইয়া মৃত্যুকে জয় করিতে পারে, তাহা আপনি সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আমি এই উপলক্ষে একটি পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে প্রজাপতি মনুর পুত্র মহারাজ ইক্ষ্বাকু সূর্য্যের ন্যায় তেজঃপুঞ্জকলেবর একশত পুত্র উৎপাদন করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে মাহিষ্মতীগৰ্ভসম্ভূত সত্যধৰ্ম্ম পরায়ণ মহারাজ দশাশ্ব তাঁহার দশম পুত্র। দশাশ্বের ঔরসে মহারাজ মদিরাশ্বের জন্ম হয়। ঐ মহাত্মা সত্য, তপস্যা, দান, বেদ ও ধনুৰ্ব্বেদে একান্ত অনুরক্ত হইয়াছিলেন। উঁহার পুত্র মহাবলপরাক্রান্ত মহারাজ দ্যুতিমান, দ্যুতিমানের পুত্র দেবরাজের ন্যায় ঐশ্বৰ্য্যশালী লোকবিশ্রুত ধৰ্ম্মপরায়ণ সুবীর; সুবীরের পুত্র শস্ত্রধারীদিগের অগ্রগণ্য মহাত্মা সুদুর্জ্জয়। ঐ সুদুর্জ্জয়ের ঔরসে সংগ্রামনিপুণ অসামান্য-বলশালী দুর্য্যোধননামক ভূপতি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ঐ মহাত্মার রাজ্যে দেবরাজ সুচারুরূপে বারিবর্ষণ করিতেন। তাঁহার নগর সৰ্ব্বদাই বিবিধ ধন, রত্ন, পণ্য ও পশুতে পরিপূর্ণ থাকিত। ঐ মহাত্মার রাজ্যশাসন সময়ে কোন ব্যক্তিই কৃপণ, দরিদ্র, পীড়িত বা কৃশ ছিল না। সকলেই সদ্ব্যবহারনিরত, প্রিয়বাদী, অসূয়াবিহীন, জিতেন্দ্রিয়, ধর্ম্মপরায়ণ, অনৃশংস, পরাক্রান্ত, শ্লাঘাবিহীন, যাজ্ঞিক, দমগুণসম্পন্ন, মেধাবী, ব্রহ্মনিষ্ঠ, সত্যপ্রতিজ্ঞ, পরাবমানবিরত [পরের অপমানকার্য্যে বিমুখ], দাতা ও বেদবেদাঙ্গপারদর্শী ছিলেন। দেবনদী নর্ম্মদা স্বয়ং সেই পুরুষশ্রেষ্ঠ মহারাজকে পতিত্বে বরণ করেন। তাঁহার গর্ভে দুর্য্যোধনের সুদর্শনানামে এক পরমাসুন্দরী কন্যা জন্মে। ঐ কন্যার তুল্য রূপবতী রমণী আর। কখন ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করেন নাই।

অগ্নির দুৰ্য্যোধনকন্যা সুদর্শনার পাণিগ্রহণ

“একদা ভগবান হুতাশন সেই রাজকন্যার রূপলাবণ্যদর্শনে বিস্মিত হইয়া তাহার পাণিগ্রহণাভিলাষে ব্রাহ্মণবেশে মহারাজ দুর্য্যোধনের নিকট গমনপূর্ব্বক স্বীয় অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। কিন্তু দুৰ্য্যোধন তাঁহাকে দরিদ্র ও আপনার অসবর্ণ বিবেচনা করিয়া তাঁহার অভিলাষ পূর্ণ করিলেন না। দুৰ্য্যোধন প্রত্যাখ্যান করাতে হুতাশন নিতান্ত বিষগ্ন হইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। কিয়দ্দিন পরে মহারাজ দুৰ্য্যোধন যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলে অগ্নি তাঁহার যজ্ঞে প্রজ্বলিত হইলেন না। তখন তিনি নিতান্ত দুঃখিত হইয়া ঋত্বিকগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বিপ্রগণ! যখন অগ্নি আমার যজ্ঞে প্রজ্বলিত হইলেন না, তখন নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে যে, আমার অথবা আপনাদের অতি গুরুতর পাপ আছে। অতএব আপনারা বিশেষরূপে ইহার কারণানুসন্ধান করুন।’

নরপতি এই কথা কহিলে ব্রাহ্মণগণ সংযত ও বাগ্‌যত হইয়া পাবকের শরণাপন্ন হইলেন। তখন ভগবান্ হুতাশন রজনীযোগে শরৎকালীন সূর্য্যের ন্যায় তেজঃপুঞ্জকলেবর ধারণপূর্ব্বক তাঁহাদিগের সম্মুখেই আবির্ভূত হইয়া কহিলেন, ব্রাহ্মণগণ! আমি মহারাজ দুর্য্যোধনের কন্যা সুদর্শনার পাণিগ্রহণ করিতে অভিলাষী হইয়াছি। যদি তিনি আমাকে কন্যাদানে সম্মত হয়েন, তাহা হইলে আমি তাঁহার যজ্ঞে প্রজ্বলিত হইব।

‘হুতাশন এই কথা কহিলে ব্রাহ্মণগণ যারপরনাই বিস্ময়াপন্ন হইলেন এবং পরদিন প্রাতঃকালে গাত্রোত্থানপূৰ্ব্বক বিস্ময়াবিষ্ট চিত্তে নরপতির নিকট গমন করিয়া সেই বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। মহারাজ দুর্য্যোধন ব্রহ্মাদি ঋত্বিকগণের মুখে অনলের প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া পরম পুলকিত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ ভগবান্ হুতাশনের উদ্দেশে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আমি আপনাকে কন্যাদান করিব স্বীকার করিলাম, কিন্তু আপনাকে সৰ্ব্বদা আমার আলয়ে অবস্থান করিতে হইবে। তখন ভগবান হুতাশন মূর্ত্তিমান হইয়া রাজার নিকট গমনপূৰ্ব্বক তাঁহার প্রার্থনায় সম্মত হইলেন। তখন রাজা দুৰ্য্যোধন পরম-আহ্লাদে স্বীয় কন্যা সুদর্শনাকে নানাবিধ অলঙ্কারে অলঙ্কৃতা করিয়া ভগবান্ হুতাশনকে সম্প্ৰদান করিলেন। অগ্নিও যজ্ঞকালীন বেদবিহিত বসুধার ন্যায় সেই কন্যাকে গ্রহণপূৰ্ব্বক তাহার রূপলাবণ্য, বয়ঃক্রম ও কুলশীলাদি দ্বারা একান্ত প্রীত হইয়া দুর্য্যোধনের প্রার্থনানুসারে তাঁহার আবাসে বাস করিয়া পুত্রোৎপাদনবিষয়ে যত্ন করিতে লাগিলেন। সেই অবধি অদ্যাপি মাহিষ্মতী পুরীতে ভগবান্ হুতাশন বিদ্যমান আছেন। তোমার কনিষ্ঠভ্রাতা সহদেব দিগ্বিজয়-সময়ে মাহিষ্মতীতে গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়া আসিয়াছেন।

সুদর্শনানন্দন সুদর্শনের মৃত্যুজয়বাসনা

“কিয়দ্দিন পরে সুদর্শনা অগ্নির সহযোগে এক পূর্ণচন্দ্রসদৃশ সুকুমার কুমার প্রসব করিলেন। ঐ কুমারের নাম সুদর্শন হইল। সুদর্শন বাল্যাবস্থাতেই সমুদয় বেদশাস্ত্র অধ্যয়ন করিলেন। ঐ সময় নৃগের পিতামহ রাজা ওঘবানের ওঘবতীনামে এক কন্যা এবং ওঘরথনামে এক পুত্র হইয়াছিল। নরপতি, ওঘবান্, সেই দেবকন্যাসদৃশ কন্যাকে মহাত্মা সুদর্শনের হস্তে সম্প্রদান করিলেন। তখন ধীমান্ সুদর্শন গৃহস্থাশ্রমে একান্ত অনুরক্ত হইয়া ওঘবতীর সহিত পরমসুখে কুরুক্ষেত্রে অবস্থান করিতে লাগিলেন।

‘একদা মহাত্মা অগ্নিতনয় ‘গৃহাশ্রমে থাকিয়া মৃত্যুকে পরাজয় করিব’ এই প্রতিজ্ঞা করিয়া ওঘবতীকে কহিলেন, ‘প্রিয়ে! তুমি কদাচ অতিথিসেবায় পরাঙ্মুখ হইও না। অতিথি যাহাতে সন্তুষ্ট হয়েন, তুমি অবিচারিতচিত্তে তাহাই করিবে। অধিক কি, অতিথিকে আত্মসমর্পণ করিতে হইলেও তাহাতে পরাঙ্মুখ হইও না। গৃহস্থদিগের পক্ষে অতিথিসেবা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম আর কিছুই নাই। যদি আমার বাক্যে তোমার শ্রদ্ধা থাকে, তাহা হইলে অবিচলিতচিত্তে ইহা প্রতিপালন কর। আমি গৃহে থাকি বা না থাকি, তুমি কদাচ অতিথির অবমাননা করিও না। তখন ওঘবতী কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘নাথ! আপনি যে বিষয়ে অনুমতি প্রদান করিবেন, তাহা আমার কখনই অকৰ্ত্তব্য বলিয়া বোধ হইবার নহে। সুদর্শন মৃত্যুজয়াভিলাষে ভাৰ্য্যাকে এই আদেশ করিলে, মৃত্যু তাঁহাকে পরাজয় করিবার মানসে, রন্ধ্রান্বেষী হইয়া তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন।

অতিথিরূপধারী ধৰ্ম্মের সুদর্শনাপরীক্ষা

“অনন্তর একদা হুতাশনতনয় কাষ্ঠ আহরণার্থ বহির্গত হইলে ধৰ্ম্ম ব্রাহ্মণবেশে তাঁহার গৃহে উপস্থিত হইয়া ওঘবতীকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘অয়ি বরবৰ্ণিনি! আজ আমি তোমার গৃহে অতিথি হইলাম। যদি গৃহস্থাশ্রমধৰ্ম্মে তোমার শ্রদ্ধা থাকে তাহা হইলে আমার সেবা কর।’

“অতিথি ব্রাহ্মণ এই কথা কহিলে, ‘রাজকন্যা ওঘবতী তাঁহাকে আসন ও পাদ্যাদি প্রদান করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনাকে কি প্রদান করিতে হইবে, তাহা ব্যক্ত করুন। আমি অবশ্যই তাহা প্রদান করিব।’

“তখন ব্রাহ্মণ কহিলেন, ‘রাজনন্দিনী! আমি তোমার সহিত সম্ভোগবাসনা করি। যদি গৃহস্থাশ্রমে তোমার যথার্থ বক্তি থাকে তাহা হইলে তুমি আত্মপ্রদানপূর্ব্বক আমার প্রিয়ানুষ্ঠান কর।’ অতিথি ঐরূপ বিসদৃশ প্রার্থনা করিলে রাজকন্যা তাঁহাকে অন্যান্য নানাবিধ প্রলোভন প্রদর্শন করিতে লাগিলেন; কিন্তু ব্রাহ্মণ আর কিছুতেই সম্মত হইলেন না। তখন ওঘবতী স্বামীর বাক্য স্মরণ করিয়া অতি লজ্জিতভাবে অতিথির বাক্য স্বীকার করিলেন; অতিথিও তাঁহার হস্তধারণপূৰ্ব্বক গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন।

“ঐ সময় দ্বিজবর সুদর্শন কাষ্ঠ আহরণ করিয়া স্বীয় আশ্রমে আগমনপূৰ্ব্বক ‘প্রিয়ে! কোথায় গমন করিলে’ বলিয়া বারংবার স্বীয় পত্নীকে আহ্বান করিতে লাগিলেন; কিন্তু ওঘবতী তাঁহাকে কিছুমাত্র প্রত্যুত্তর প্রদান করিলেন না। অতিথি তাঁহাকে করদ্বারা স্পর্শ করাতে তিনি আপনাকে উচ্ছিষ্ট বিবেচনা করিয়া নিতান্ত লজ্জিতভাবে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। তখন সুদর্শন পুনরায় পত্নীকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন, ‘আমার প্রিয়া কোথায় গমন করিল? তাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আমার আর কিছুই নাই। সেই সরলহৃদয়া পতিপ্রাণা ওঘবতী কি নিমিত্ত আজ পূর্ব্বের ন্যায় হাস্যবদনে আমার প্রত্যুদ্গমন করিতেছে না?’

‘সুদর্শন পত্নীকে বারংবার এইরূপ আহ্বান করিতে আরম্ভ করিলে কুটীরস্থিত অতিথি তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘ব্রহ্মন! আমি একজন ব্রাহ্মণ, অতিথিরূপে আপনার আলয়ে আগমন করিয়াছি। আপনার এই সহধর্ম্মিণী বিবিধ অতিথি সৎকারদ্বারা আমার তুষ্টি সম্পাদনপূৰ্ব্বক আমার প্রার্থনানুরূপ কাৰ্য্য সংসাধন করিতেছেন, এক্ষণে আপনার যাহা কর্ত্তব্য হয় করুন।’

“হে ধৰ্ম্মরাজ! হুতাশনতনয় যখন কাষ্ঠ লইয়া গৃহে আগমন করেন, সেই সময় মৃত্যু তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আগমন করিয়াছিলেন। তিনি অতিথি ব্রাহ্মণের সেই কথা শুনিবামাত্র ‘সুদর্শন ব্রতভঙ্গপাপে [অতিথির উদ্দেশে পূৰ্ব্বপ্রতিশ্রুতিভঙ্গ পাপে] দূষিত হইলেই উহাকে বিনাশ করিব’ মনে করিয়া লৌহমুষল উদ্যত করিয়া রহিলেন। তখন সুদর্শন কায়মনোবাক্যে ক্রোধ ও ঈর্ষা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক হাস্যমুখে অতিথিকে কহিলেন, ‘ব্রহ্মন্! আপনি পরমসুখে আমার ভার্য্যা লইয়া সম্ভোগ করুন, তদ্বিষয়ে আমার কিছুমাত্র অসন্তোষ নাই। অতিথিসৎকার করাই গৃহস্থের পরমধৰ্ম্ম। আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, অতিথিকে স্বীয় প্রাণ, ভাৰ্য্যা ও আমার যাহা কিছু ধন আছে, সমুদয়ই প্রদান করিব। আমি এক্ষণে যাহা কহিলাম, তদ্বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ করিবেন না। পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, সলিল, জ্যোতি, বুদ্ধি, আত্মা, মন, কাল ও দিক্‌ সমুদয় প্রাণীগণের দেহে আবির্ভূত হইয়া উহাদিগের পাপপুণ্যসকল প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করিতেছেন। অতএব যদি আমার প্রতিজ্ঞা সত্য হয়, তাহা হইলে উহারা আমাকে রক্ষা করুন, নচেৎ এক্ষণেই ভস্মসাৎ করিয়া ফেলুন।’ সুদর্শন এই কথা কহিবামাত্র চতুর্দ্দিক হইতে ‘হে ব্রহ্ম! তুমি যাহা প্রতিজ্ঞা করিলে, তাহা কখনই মিথ্যা হইবার নহে’ বলিয়া দৈববাণী হইতে লাগিল।

ধৰ্ম্মবরে সস্ত্রীক সুদর্শনের অমরপুরে প্রবেশ

“অনন্তর সেই অতিথি ব্রাহ্মণ স্বীয় কলেবরপ্রভাবে ভূলোক ও দ্যুলোক পরিব্যাপ্ত করিয়া সমুত্থিত বায়ুর ন্যায় সহসা সেই কুটীর হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন এবং গৃহস্বামী ব্রাহ্মণের সন্নিহিত হইয়া গম্ভীরস্বরে ত্রিলোক প্রতিধ্বনিত করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘হে সুদর্শন! আমি স্বয়ং ধৰ্ম্ম; তোমার চিত্ত পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত আগমন করিয়াছিলাম। এক্ষণে তোমার সত্যনিষ্ঠা দেখিয়া যারপরনাই প্রীতিলাভ করিলাম। তুমি এই ব্রতপালন প্রভাবে তোমার অনুবর্ত্তী এই মৃত্যুকে পরাজয় করিয়াছ। এই মৃত্যু সততই তোমার রন্ধ্রান্বেষণ করিয়া থাকেন; কিন্তু তুমি স্বীয় অসাধারণ ধৈর্য্যপ্রভাবে ইহাকে বশীভূত করিলে। তোমার এই পতিব্রতা সহধর্ম্মিণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে, ত্রিলোকমধ্যে এমন আর কেহই নাই। ইনি তোমার গুণগ্রাম ও স্বীয় পাতিব্রত্যধৰ্ম্ম দ্বারা সতত রক্ষিত হইতেছেন; ইঁহার ব্রত ভঙ্গ করে কাহার সাধ্য? অতঃপর ইনি যাহা বলিবেন, কদাচ তাহার অন্যথা হইবে না। এই ব্রহ্মবাদিনী রমণী তপোবলে লোকসকলকে পবিত্র করিবার নিমিত্ত ওঘবতীনদীনামে প্রাদুর্ভূত হইবেন। ইঁহার অর্দ্ধশরীর নদীরূপে পরিণত ও অর্দ্ধশরীর তোমার অনুগামী হইবে। যে যে লোকে গমন করিলে পুনরায় প্রতিনিবৃত্ত হইতে হয় না, তুমি এই দেহে ইঁহার সহিত সেই সমস্ত নিত্যলোক লাভ করিবে।

‘হে সুদর্শন! তুমি গার্হস্থ্যধৰ্ম্মপ্রভাবে কাম, ক্রোধ ও মৃত্যুকে পরাজয় করিয়াছ এবং তোমার সহধর্ম্মিণীও নিরন্তর তোমাকে শুশ্রূষা করিয়া স্নেহ, অনুরাগ, তন্দ্রা ও মোহকে বশীভূত করিয়াছেন। অতএব নিশ্চয়ই তোমার ও তোমার সহধর্ম্মিণীর উৎকৃষ্ট ঐশ্বৰ্য্য ও সূক্ষ্মভূতময় [সূক্ষ্মদেহে বর্ত্তমান প্রাণীময়] লোকসমুদয় লাভ হইবে।

“ধৰ্ম্ম তপোধন সুদর্শনকে এই কথা কহিবামাত্র দেবরাজ ইন্দ্র সহস্র শুক্ল অশ্ব-সংযোজিত রথ লইয়া তথায় আগমনপূৰ্ব্বক সুদর্শন ও তাঁহার পতিপ্রাণী সহধর্ম্মিণীকে তাহাতে আরোপিত করিয়া দেবলোকে প্রস্থান করিলেন।

অতিথিসেবা-প্রশংসা

“হে ধৰ্ম্মরাজ! এইরূপে সুদর্শন অতিথিসৎকারদ্বারা গৃহস্থধর্ম্ম প্রতিপালন করিয়া মৃত্যু, আত্মা, লোকসমুদয়, পঞ্চভূত, বুদ্ধি, কাল, মন, আকাশ, কাম ও ক্রোধ আয়ত্ত করিয়াছিলেন। এক্ষণে তুমি মনোমধ্যে বিবেচনা করিয়া দেখ, গৃহস্থের পক্ষে অতিথি অপেক্ষা কোন দেবতাই শ্রেষ্ঠ নহেন। যদি অতিথি যথোপচারে অর্চ্চিত হইয়া গৃহস্থের শুভানুধ্যান করেন, তাহা হইলে উহা শত যজ্ঞ অপেক্ষাও সমধিক ফলপ্রদ হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। যদি কোন গৃহস্থ সচ্চরিত্র অতিথিকে উপস্থিত দেখিয়া যথোচিত সৎকার না করে, তাহা হইলে সেই অতিথি তাহাকে আপনার সমগ্র পাপ প্রত্যর্পণপূর্ব্বক তাহার পুণ্য লইয়া প্রস্থান করিয়া থাকেন। এই আমি তোমার নিকট গৃহস্থ যেরূপে মৃত্যুকে পরাজয় করিয়াছিলেন, তাহা কীৰ্ত্তন করিলাম। এই উপাখ্যান আয়ুষ্কর, যশস্কর ও পাপনাশক সম্পদ্‌ভার্থী, ব্যক্তি উহা হৃদয়ঙ্গম করিবেন। যিনি প্রতিদিন এই সুদর্শনচরিত কীৰ্ত্তন করেন, তাঁহার অতি পবিত্র লোকসমুদয় লাভ হইয়া থাকে।”