1 of 4

২৬. পবিত্র দেশাদি কীৰ্ত্তন-শিলবৃত্তি-সিদ্ধসংবাদ

২৬তম অধ্যায়

পবিত্র দেশাদি কীৰ্ত্তন-শিলবৃত্তি-সিদ্ধসংবাদ

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! যৎকালে ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণে পরিবেষ্টিত হইয়া বৃহস্পতির ন্যায় বুদ্ধিমান, ব্রহ্মর ন্যায় ক্ষমাশীল, ইন্দ্রের ন্যায় পরাক্রান্ত, সূর্য্যের ন্যায় তেজঃপুঞ্জ, শরশয্যাশায়ী মহাত্মা ভীষ্মকে তীর্থমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিতে কহেন, সেই সময় অত্রি, বশিষ্ঠ, ভৃগু, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, অঙ্গিরাঃ, গৌতম, অগস্ত্য, সুমতি, বিশ্বামিত্র, সুলশিরা, সংবৰ্ত্তন, প্রমিতি, দম, বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য্য, ব্যাস, চ্যবন, কশ্যপ, ধ্রুব, দুর্ব্বাসা, জমদগ্নি, মার্কণ্ডেয়, গালব, ভরদ্বাজ, রৈভ্য, যবক্রীত, ত্রিত, স্থূলাক্ষ, শবলাক্ষ, কণ্ব, মেধাতিথি, কৃশ, নারদ, পর্ব্বত, সুধন্বা, একত, নিতম্ভূ, ভুবন, ধৌম্য, শতানন্দ, অকৃতব্রণ, পরশুরাম ও কচ প্রভৃতি মহাত্মা মহর্ষিগণ ভীষ্মের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত সেই স্থানে সমুপস্থিত হইয়াছিলেন। ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির তীর্থমাহাত্ম্য শ্রবণান্তর ভ্রাতৃগণের সহিত তাঁহাদিগের যথোচিত সৎকার করিলেন। মহর্ষিগণ ধৰ্ম্মরাজকর্ত্তৃক সৎকৃত হইয়া মধুরবাক্যে মহাত্মা ভীষ্মকে সম্ভাষণ করিতে লাগিলেন। মহামতি ভীষ্ম তাঁহাদিগের মধুরবাক্য শ্রবণে আপনাকে স্বর্গস্থ জ্ঞান করিয়া যারপরনাই পুলকিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সেই মহাত্মা মহর্ষিগণ মহামতি ভীষ্মকে আমন্ত্রণ করিয়া অন্তর্হিত হইলেন। তাঁহারা অন্তর্হিত হইলেও পাণ্ডবগণ তাঁহাদিগের উদ্দেশ করিয়া বারংবার স্তব ও প্রণাম করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের তপঃপ্রভাবে দিক্‌সমুদয় প্রকাশিত দেখিয়া পাণ্ডুতনয়দিগের মন একেবারে বিস্ময়রসে পরিপূর্ণ হইল।

অনন্তর ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে ভীষ্মের চরণে প্রণিপাত করিয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “পিতামহ! কোন্ দেশ, কোন্ রাষ্ট্র, কোন্ আশ্রম, কোন্ নদী ও কোন্ পৰ্ব্বতকে পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আমি এই উপলক্ষ্যে শিলবৃত্তি [উঞ্ছবৃত্তি—কৃষকপরিত্যক্ত ক্ষেত্রস্থ ধান্যাদিতে জীবিকাকারী] ও সিদ্ধ এই দুই ব্রাহ্মণের পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা এক সিদ্ধ মহর্ষি সমুদয় পৃথিবী পরিভ্রমণ করিতে করিতে এক শিলবৃত্তি ব্রাহ্মণের গৃহে সমুপস্থিত হইলেন। মহাত্মা শিলবৃত্তি তাঁহাকে গৃহে সমাগত দেখিয়া বিধিপূৰ্ব্বক তাঁহার সৎকার করিলেন। সিদ্ধ মহর্ষি তৎকর্ত্তৃক সৎকৃত হইয়া তাঁহার আবাসে পরমসুখে একরাত্রি যাপন করিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে মহাত্মা শিলবৃত্তি গাত্রোত্থান ও প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপনপূর্ব্বক পবিত্র হইয়া তত্ত্বদর্শী মহাত্মা সিদ্ধের নিকটে সমাগত হইয়া তাঁহার সহিত বেদ ও উপনিষদের বিষয় কথোপকথন করিতে লাগিলেন।

“কিয়ৎক্ষণ পরে মহাত্মা শিলবৃত্তি সিদ্ধকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ভগবন্! কোন্ কোন্ দেশ, রাষ্ট্র, আশ্রম, পৰ্ব্বত ও নদীকে পরম পবিত্র বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়, তাহা আপনি আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।

গঙ্গার মাহাত্ম্য

“তখন সিদ্ধ শিলবৃত্তিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহর্ষে! ভাগীরথী গঙ্গা যে সমুদয় দেশ, রাজ্য, আশ্রম ও পৰ্ব্বতের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইতেছেন, তৎসমুদয়কেই পরম পবিত্র বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। প্রাণীগণ ভগবতী ভাগীরথীর আরাধনা করিয়া যে গতিলাভ করিতে পারে, তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য, যজ্ঞ ও দানদ্বারা তাহা লাভের সম্ভাবনা নাই। যাহারা গঙ্গাজলে অবগাহন করে, তাহাদিগকে কখনই স্বর্গচ্যুত হইতে হয় না। গঙ্গাসলিলদ্বারা যাহাদিগের সমুদয় কার্য্য সম্পন্ন হয়, তাহারা দেহান্তে অনন্তকাল স্বর্গসুখ অনুভব করে। যাহারা প্রথমে বিবিধ পাপকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া পশ্চাৎ গঙ্গার আরাধনা করে, তাহাদিগের নিশ্চয়ই উৎকৃষ্ট গতিলাভ হয়। ভাগীরথীর পবিত্র জলে স্নান করিলে যেরূপ পুণ্যলাভ হয়, শত শত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেও সেইরূপ পুণ্যলাভের সম্ভাবনা নাই। যে ব্যক্তির যতগুলি অস্থি গঙ্গাজলে নিপতিত হয়, সে তত সহস্র বৎসর স্বর্গে বাস করিতে পারে। দিবাকর যেমন উদয়কালে গাঢ়তর অন্ধকার তিরোহিত করিয়া সুশোভিত হয়েন, সেইরূপ মনুষ্য গঙ্গাসলিল প্রভাবে পাপশূন্য হইয়া বিরাজিত হইয়া থাকে। যে প্রদেশে পবিত্র গঙ্গাজল প্রবাহিত হয় না, সেই প্রদেশ শশধরশূন্য বিভাবরী, পুষ্পশূন্য তরু, ধৰ্ম্মপরিভ্রষ্ট বর্ণ ও আশ্রম, সোমরসপরিশূন্য যজ্ঞ, দিবাকর বিরহিত অন্তরীক্ষ, পৰ্ব্বতহীন পৃথিবী ও বায়ুশূন্য আকাশের ন্যায় নিতান্ত হতশ্রী হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। এই ত্রিলোকমধ্যস্থ সমুদয় প্রাণীই পবিত্র গঙ্গাসলিলদ্বারা তপিত হইলে যারপরনাই তৃপ্তিলাভ করে। সূর্য্যকিরণসন্তপ্ত গঙ্গাজল গোময়ান্তৰ্গত যাবক অপেক্ষা শুদ্ধি সম্পাদন করিয়া থাকে। লোকে পবিত্রতাসম্পাদক সহস্র চন্দ্রায়ণব্রত অনুষ্ঠান করিলেও গঙ্গাসলিলপায়ীর তুল্য ফললাভে সমর্থ হয় কিনা সন্দেহ। অন্যত্র সহস্ৰযুগ একপদে দণ্ডায়মান থাকিলে যে ফললাভ হয়, গঙ্গাতে এক মাস ঐরূপে অবস্থান করিলে তদপেক্ষা সমধিক ফললাভ হইয়া থাকে!

‘যে ব্যক্তি অযুতযুগ অধোমুখে বৃক্ষে লম্বমান থাকে আর যে ব্যক্তি গঙ্গাতীরে ইচ্ছানুরূপ বাস করে, ঐ দুই ব্যক্তির মধ্যেও গঙ্গাতীরবাসীই পূর্ব্বোক্ত কঠোর তপস্বী অপেক্ষা সমধিক ফলভাগী হয়, সন্দেহ নাই। যেমন তুলারাশি হুতাশনে নিক্ষেপ করিলে ভস্মীভূত হয়, সেইরূপ লোকে গঙ্গায় স্নান করিলে তাহার সমুদয় পাপই বিনষ্ট হইয়া থাকে। যে সমস্ত মনুষ্য শোকদুঃখে নিতান্ত অভিভূত হইয়া আশ্রয় লাভের অভিলাষ করে, ভগবতী ভাগীরথীই তাহাদিগের পরম আশ্রয় হইয়া থাকেন। বিহগরাজ গরুড়কে দর্শন করিলে ভুজঙ্গেরা যেমন বিষশূন্য হয়, সেইরূপ গঙ্গাদৰ্শন করিবামাত্রই মনুষ্যগণ পাপবিহীন হইয়া থাকে। যাহার নিতান্ত অধাৰ্ম্মিক ও মৰ্য্যাদাশূন্য, একমাত্র গঙ্গাই তাহাদিগের মৰ্য্যাদা, আশ্রয় ও শুভকৰ্ম্মফল প্রদান করিয়া থাকেন। যে নরাধম বিবিধ পাপে বিলিপ্ত হইয়া নরকে পতনোন্মুখ হয়, সে ভাগীরথীর আশ্রয় গ্রহণ করিলে নিশ্চয়ই সমুদয় পাপবিমুক্ত হইয়া থাকে।

‘যে মহাত্মা সতত ভাগীরথীর সেবা করেন, তিনি পরলোকে ইন্দ্রাদি দেবগণ ও মহর্ষিদিগের সমকক্ষ হয়েন। যাহারা বিনয়াচার বিহীন ও অশুভকৰ্ম্মানুষ্ঠায়ী, তাহারাও ভাগীরথীর আশ্রয় গ্রহণ করিলে, সদাচারপরায়ণ হইতে পারে। সুরগণের অমৃত, পিতৃগণের স্বধা ও নাগগণের সুধা যেমন প্রীতিকর, গঙ্গাজল মনুষ্যদিগের সেইরূপ প্রীতিপ্রদ হইয়া থাকে। বালকেরা যেমন ক্ষুধায় কাতর হইয়া মাতার উপাসনা করে, সেইরূপ মনুষ্যেরা শ্রেয়োলাভার্থী হইয়া ভাগীরথীর আরাধনা করিয়া থাকে। ব্রহ্মলোক যেমন সকল লোক হইতে শ্রেষ্ঠ, সেইরূপ স্নানার্থীদিগের পক্ষে জাহ্নবী সমুদয় স্রোতস্বতী অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। পৃথিবী ও ধেনু যেমন দেবগন্ধর্ব্বাদির উপজীব্য, সেইরূপ গঙ্গা পৃথিবীস্থ সমুদয় প্রাণীর উপজীবন [প্রাণতুল্য] বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়েন। সুরগণ যেমন চন্দ্রসূর্য্যসংস্থিত অমৃত পান করেন, মনুষ্যেরা সেইরূপ গঙ্গাসলিল পান করিয়া থাকেন। জাহ্নবীর পুলিন হইতে বালুকা লইয়া কলেবরে লিপ্ত করিলে মনুষ্য দেবতার ন্যায় হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। মস্তকে গঙ্গামৃত্তিকা ধারণ করিলে সুনির্ম্মল সূর্য্যের ন্যায় রূপ হয়।

‘বায়ু গঙ্গাসলিলযুক্ত হইয়া যাহাকে স্পর্শ করে, সে অচিরাৎ সমুদয় পাপ হইতে মুক্তিলাভ করিয়া থাকে। মানবগণ দুঃখে একান্ত কাতর হইয়াও যদি গঙ্গাদর্শন করে, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ তাহাদের সমুদয় দুঃখ দূরীভূত হইয়া যায়। ভাগীরথী হংস ও কোক [চক্রবাক] প্রভৃতি বিহঙ্গমগণের গীতশব্দে গন্ধৰ্ব্বদিগকে এবং স্বীয় উত্তুঙ্গ তীরভূমিদ্বারা পর্ব্বতসমুদয়কে পরাস্ত করিয়াছেন। হংসাদি বিবিধ বিহঙ্গমাকীর্ণ গো-কুলপরিপূর্ণ গঙ্গাকে অবলোকন করিলে স্বর্গভূমি পর্য্যন্ত বিস্মৃত হইতে হয়। গঙ্গাতীরে অবস্থান করিয়া যাদৃশ প্রীতিলাভ হয়, স্বর্গলোকে অবস্থানপূৰ্ব্বক বিবিধ সুখভোগ করিলেও তাদৃশ প্রীতিলাভের সম্ভাবনা নাই। মানবগণ কায়মনোবাক্যে পাপাচরণ করিয়াও একবার গঙ্গাসন্দর্শন করিলেই পবিত্রতালাভে সমর্থ হয়, সন্দেহ নাই। মনুষ্য গঙ্গাদর্শন, গঙ্গা জলস্পর্শন ও গঙ্গায় অবগাহন করিলে তাহার উর্দ্ধতন সপ্ত ও অধস্তন সপ্ত পুরুষের সদ্গতিলাভ হয়। যে ব্যক্তি গঙ্গামাহাত্ম্য শ্রবণ, গঙ্গাদর্শনাভিলায, গঙ্গাদর্শন, গঙ্গাসলিলস্পর্শ, গঙ্গাজলপান ও গঙ্গাসলিলে অবগাহন করে, ভগবতী ভাগীরথী তাহার উভয় কুল পবিত্র করে। গঙ্গাদর্শন, গঙ্গাজলস্পর্শ ও গঙ্গার নাম কীৰ্ত্তন করিয়া শত শত পাপাত্মা পাপ হইতে বিমুক্ত হইতেছে। যিনি স্বীয় জন্ম, জীবন ও শাস্ত্রাধ্যয়ন সার্থক করিতে বাসনা করেন, গঙ্গাতীরে গমন করিয়া দেবতা ও পিতৃগণের তর্পণ করা তাঁহার অবশ্য কৰ্ত্তব্য। গঙ্গাতীরে গমন করিলে যেরূপ ফললাভ হয়, পুত্র, ধন ও যজ্ঞাদি কৰ্ম্মানুষ্ঠানদ্বারা তাদৃশ ফললাভের সম্ভাবনা নাই। যাহারা অসমর্থ হইয়াও মঙ্গলদায়িনী পবিত্রতোয়া জাহ্নবীকে অবলোকন না করে, পঙ্গু, মৃত, জন্মান্ধ ব্যক্তিদিগের সহিত তাহাদিগের কিছুমাত্র প্রভেদ নাই।

‘ত্রিকালজ্ঞ মহর্ষি ও ইন্দ্রাদি দেবগণ যাঁহাকে উপাসনা করেন, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ, যতি ও ব্রহ্মচারী প্রভৃতি আশ্রমবাসীরা যাঁহাকে আশ্রয় করেন, সেই পুণ্যতোয়া ভাগীরথীর আশ্রয় গ্রহণ করা সমুদয় ব্যক্তির পক্ষে সৰ্ব্বতোভাবে শ্রেয়ঃ । যে ব্যক্তি মৃত্যুকালে মনোমধ্যে ভাগীরথীকে চিন্তা করে, তাহার নিশ্চয়ই পরম গতিলাভ হয়। গঙ্গার উপাসনা করিলে যাবজ্জীবন ব্যাঘ্রাদি হিংস্ৰজন্তু, রাজা ও পাপ হইতে ভয়ের লেশমাত্রও থাকে না। পুণ্যদায়িনী গঙ্গা গগনমণ্ডল হইতে নিপতিত হইলে ভগবান ভূতভাবন তাঁহাকে মস্তকে ধারণ করিয়াছিলেন। দেবগণ সতত তাঁহার উপাসনা করিয়া থাকেন। ত্রিপথগামিনী ভাগীরথীরদ্বারা ত্রিলোক সমালংঙ্কৃত হইয়া রহিয়াছে। যিনি সেই গঙ্গার সলিল সেবা করেন, তিনি নিশ্চয়ই কৃতার্থ হয়েন। যেমন দেবগণের মধ্যে সূর্য্য, পিতৃগণের মধ্যে চন্দ্র ও মনুষ্যদিগের মধ্যে রাজা শ্রেষ্ঠ, তদ্রূপ নদীর মধ্যে গঙ্গাই উৎকৃষ্ট। গঙ্গাবিহীন হইলে মানবদিগের যেরূপ দুঃখ উপস্থিত হয়, পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র ও ধননাশ হইলেও তাদৃশ দুঃখ উপস্থিত হয় না। গঙ্গা দর্শন করিলে আহ্লাদের পরিসীমা থাকে না। অরণ্য দর্শন এবং অভিলষিত বিষয়, পুত্র ও ধনলাভ হইলেও গঙ্গা দর্শনের তুল্য প্রীতিলাভ হয় না। ত্রিপথগামিনী গঙ্গা পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় নয়নপ্রীতিকর।

‘যিনি গঙ্গার প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ হইয়া নিয়ত তাঁহার অনুগত হয়েন, গঙ্গা নিশ্চয়ই তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন। কি ভূচর, কি খেচর, কি দেবতা, কি অন্যান্য প্রাণী গঙ্গাসলিলে অবগাহন করা সকলেরই প্রধান কার্য্য। গঙ্গা ভস্মীভূত সাগরসন্ততিসমুদয়কে পবিত্র করিয়া স্বর্গে নীত করিয়াছেন বলিয়া উহার যশঃসৌরভে বিশ্বসংসার পরিপূর্ণ হইয়াছে। যাহাদিগের কলেবর ভাগীরথীর পবনোব্ধুত বেগবান্ পবিত্র তরঙ্গে অভিষিক্ত হয়, তাহারা সূর্য্যতুল্য তেজস্বী হইয়া থাকে। যে মহাত্মারা সমৃদ্ধিদায়িনী দুরবগাহ বেগবতী গঙ্গাতে দেহত্যাগ করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের নিশ্চয়ই দেবগণের সারূপ্যলাভ হইয়াছে। ইন্দ্রাদি দেবতা, মহর্ষি ও অন্যান্য মনুষ্যগণনিষেবিত বিশ্বরূপা সুরধনী অন্ধ, জড় ও দরিদ্রদিগের সমুদয় কামনা পরিপূর্ণ করিয়া থাকেন। যে পুণ্যাত্মারা অন্নপ্রদা, কৰ্ম্মফলদায়িনী, ত্রিলোকপাবনী ত্রিপথগার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের নিশ্চয় স্বর্গলাভ হইয়াছে। যাঁহারা গঙ্গাতীর আশ্রয়, গঙ্গাদর্শন ও গঙ্গাজল পান করেন, দেবগণ তাঁহাদিগকে ইহলোকে সুখ ও পরলোকে উৎকৃষ্ট গতি প্রদান করিয়া থাকেন।

যাঁহারা পতিতোদ্ধারিণী সৰ্ব্বভূতের আশ্রয় বিষ্ণুমাতা ভগবতী ভাগীরথীর তীরে বাস করিয়াছিলেন, তাঁহারা নিশ্চয়ই স্বর্গে গমন করিয়াছেন। যাঁহার খ্যাতি ভূমণ্ডল, নভোমণ্ডল, পাতালতল ও সমুদয় দিগবিদিক্‌ পরিব্যাপ্ত করিয়াছে, মানবগণ সেই গঙ্গার জল সেবন করিয়া কৃতকার্য্য হইয়া থাকে। যাঁহারা স্বয়ং গঙ্গাদর্শন করেন এবং অন্যান্য ব্যক্তিকে গঙ্গাদর্শন করান, কার্ত্তিকেয়জননী সুবর্ণগর্ভা ধর্ম্মার্থকামপ্রদা ভাগীরথী তাঁহাদিগকে মোক্ষপদ প্রদান করিয়া থাকেন। যাঁহারা প্রতিনিয়ত গঙ্গায় প্রাতঃস্নান করেন; তাঁহাদের নিশ্চয়ই ত্রিবর্গলাভ হয়। পৃথিবী ও আকাশের অলঙ্কারস্বরূপা হিমালয়দুহিতা শিবগেহিনী গঙ্গা ত্রিলোক পবিত্র করিয়াছেন। তরঙ্গমালাসমলঙ্কৃতা বিশ্বদর্শিনী ভাগীরথী প্রথমে স্বর্গ হইতে দেবাদিদেব মহাদেবের মস্তকে নিপতিত হইয়া তৎপরে হিমালয়ে, পরিশেষে হিমালয় হইতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইয়াছেন। যাঁহারা জাহ্নবীজলে অবগাহন করেন, বিশ্বত্ৰাণকারিণী নিৰ্ম্মলতোয়া জাহ্নবী তাঁহাদিগের পথস্বরূপ হয়েন। যিনি ক্ষমা, ধারণ ও রক্ষণবিষয়ে পৃথিবীর তুল্য, যাঁহার তেজ সূর্য্য ও অনলের ন্যায়, ব্রাহ্মণগণ নিরন্তর সেই জহ্নুতনয়ার উপাসনা করিয়া থাকেন। যাঁহারা মনে মনেও বিষ্ণুপাদসম্ভূতা মহর্ষিগণপূজ্যা পতিতপাবনী গঙ্গার শরণাপন্ন হয়েন, তাঁহাদিগেরও ব্রহ্মলোকলাভ হইয়া থাকে। ভাগীরথী জননীর ন্যায় লোকসমুদয়কে ইষ্টগতি প্রদান করিয়া থাকেন; অতএব মোক্ষলাভার্থী মহাত্মাদিগের পক্ষে গঙ্গার উপাসনাই সৰ্ব্বতোভাবে শ্রেয়। জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি সিদ্ধিলাভের নিমিত্ত বিশ্বভোগপ্রদা জগন্মাতা ভাগীরথীকে আশ্রয় করিবেন। মহাত্মা ভগীরথ অতি কঠোর তপানুষ্ঠানপূর্ব্বক দেবগণকে প্রসন্ন করিয়া ভগবতী জাহ্নবীকে পৃথিবীতে সমাসীন করিয়াছেন, মানবগণ নিরন্তর সেই ভাগীরথীর শরণাপন্ন হইলে উভয়লোকে নির্ভয়ে কালহরণ করিতে পারে।

‘এই আমি তোমার নিকট স্বীয় বুদ্ধিসাধ্যানুসারে ভাগীরথীর গুণের কিয়দ্দংশমাত্ৰ কীৰ্ত্তন করিলাম। মাদৃশ ব্যক্তি কখনই গঙ্গার গুণসমুদয় পরিমাণ ও কীৰ্ত্তন করিতে পারে না। যদি সুমেরুর রত্নসমুদয় ও সমুদ্রের অগাধ জলরাশির পরিমাণ করা যায়, তথাপি গঙ্গাজলের গুণসমুদয় পরিমাণ করা যায় না; অতএব ভক্তিপরায়ণ হইয়া নিরন্তর কায়মনোবাক্যে জাহ্নবীর এই সমুদয় গুণের সমাদর করা মানবগণের অবশ্য কর্ত্তব্য। তুমি ভগবতী ভাগীরথীর আরাধনা করিলে, ত্রিলোকে স্বীয় যশ বিস্তৃত করিয়া অচিরাৎ পরমসিদ্ধি লাভপূর্ব্বক অভীষ্ট লোকে গমন করিতে পারিবে। ভক্তবৎসলা ভাগীরথী ভক্তিপরায়ণ মহাত্মাদিগকে সুখ প্রদান করিয়া থাকেন। অতএব প্রার্থনা করি তোমার ও আমার বুদ্ধি যেন গঙ্গাদর্শনমাত্রে প্রসন্ন ও ধর্ম্মবিষয়ে আসক্ত হয়।’

“হে ধৰ্ম্মরাজ। মহামতি সিদ্ধ, মহাত্মা শিলবৃত্তির নিকট এইরূপে গঙ্গার মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিয়া স্বর্গমার্গে অধিরূঢ় হইলেন। মহাত্মা শিলবৃত্তিও ঐ মহাপুরুষের উপদেশানুসারে যথাবিধি গঙ্গার আরাধনা করিয়া অচিরাৎ দুর্ল্লভ গতি লাভ করিলেন। অতএব এক্ষণে তুমি ভক্তিপরায়ণ হইয়া জহ্নুকন্যার উপাসনা করিলে নিশ্চয়ই উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিতে পারিবে।”

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণে পরিবেষ্টিত হইয়া ভীষ্মের মুখে এইরূপ গঙ্গামাহাত্ম্যযুক্ত অপূৰ্ব্ব ইতিহাস শ্রবণ করিয়া যারপরনাই প্রীতিলাভ করিলেন। যে ব্যক্তি এই গঙ্গাস্তবসম্বলিত পবিত্র ইতিহাস শ্রবণ বা পাঠ করেন, তাঁহার সমুদয় পাপ বিনষ্ট হইয়া যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *