৪৩তম অধ্যায়
বিপুলের পুরস্কার—গুরু-অনুগ্রহে সদ্গতি
ভীষ্ম কহিলেন, “তখন মহাত্মা দেবশর্ম্মা প্রিয়শিষ্য মহর্ষি বিপুলকে সমাগত দেখিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! তুমি মহাবনে যাহা যাহা দর্শন করিয়াছ, আমি তৎসমুদয় অবগত হইয়াছি। তুমি যেরূপে রুচিকে রক্ষা করিয়াছিলে, তাহা আমার, রুচির এবং তুমি বনমধ্যে যাহাদিগকে দর্শন করিয়াছ, তাহাদিগের অবিদিত নাই।
“বিপুল কহিলেন, ভগবন্! আমি মহাবনে যে নরমিথুন ও যে পুরুষগণকে দর্শন করিয়াছি, তাহারা কে এবং কিরূপেই বা আমার কার্য্যসমুদয়, পরিজ্ঞাত হইল, আপনি তাহা আমার নিকট সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।
“তখন দেবশর্ম্মা কহিলেন, ‘বৎস! তুমি মহারণ্যে যে স্ত্রীপুরুষ দর্শন করিয়াছ, তাহারা দিবারাত্রি এবং যে ছয় পুরুষকে পাশক্রীড়া করিতে দেখিয়াছ, তাহারা ছয় ঋতু। তোমার পাপ তাহাদিগের অগোচর নাই। তাহারা চক্রের ন্যায় নিয়ত সৰ্ব্বত্র পরিভ্রমণ করিতেছে। অতএব নির্জ্জনে পাপকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া, ‘আমার এই দুষ্কর্ম্ম কেহই পরিজ্ঞাত হইতে সমর্থ হইবে না’, এরূপ বিবেচনা করা কাহারও কর্ত্তব্য নহে। পাপাত্মারা নির্জ্জনে যে যে দুষ্কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, দিবা, রাত্রি ও ছয় ঋতু তৎসমুদয়ই দর্শন করিয়া থাকে। তুমি রুচিকে যেরূপে রক্ষা করিয়াছিলে, তাহা আমার নিকট ব্যক্ত কর নাই বলিয়া তোমার পরলোকে অসদ্গতিলাভ হইবে। তুমি ভয়প্রযুক্ত আমার নিকট আত্মকার্য্য নিবেদন না করিয়া “উহা কেহই অবগত হয় নাই।” মনে করিয়া হৃষ্টচিত্ত হইয়াছিলে, এই নিমিত্ত সেই বনমধ্যস্থ নরকলেবরধারী দিবা, রাত্রি ও ঋতুসমুদয় তোমাকে তোমার দুষ্কৃত স্মরণ করাইয়া দিয়াছে।
‘মানবগণ শুভ ও অশুভ যে কোন কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, দিবা, রাত্রি ও ঋতুসমুদয়ের কিছুই অবিদিত থাকে না। তুমি দুর্ব্বৃত্তা রুচিকে রক্ষা করিতে অসমর্থ হইয়া নিৰ্ব্বিকারচিত্তে তাহার শরীরে প্রবিষ্ট হইয়াছিলে, এই নিমিত্ত আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি। যদি তোমার চরিত্রের দোষ থাকিত তাহা হইলে আমি নিশ্চয়ই ক্রোধবশতঃ তোমাকে অভিশাপ প্রদান করিতাম, সন্দেহ নাই। স্ত্রীজাতি পুরুষে ও পুরুষগণ স্ত্রীতে আসক্ত হইয়া থাকে; অতএব যদি রুচিকে রক্ষা করিবার সময় তোমার মন বিকৃত হইত, তাহা হইলে নিঃসন্দেহে তোমাকে শাপ প্রদান করিতাম। যাহা হউক, তুমি যেরূপে আমার পত্নীকে রক্ষা করিয়াছিলে, তাহা আমার নিকট তোমার ব্যক্ত করা হইল। অতঃপর তুমি আমার বরে স্বর্গারূঢ় হইয়া পরমসুখে কালহরণ করিতে পারিবে।
‘মহর্ষি দেবশর্ম্মা মহাত্মা বিপুলকে এই কথা কহিয়া তাহাকে ও ভাৰ্য্যাকে সমভিব্যাহারে স্বর্গে আরোহণপূৰ্ব্বক পরমানন্দে কালহরণ করিতে লাগিলেন।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বে মহর্ষি মার্কণ্ডেয় ভাগীরথীতীরে উপবিষ্ট হইয়া কথাপ্রসঙ্গে আমার নিকট এই উপাখ্যান কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন। স্ত্রীগণকে সতত সাবধানে রক্ষা করা আবশ্যক। ইহলোকে সাধ্বী ও অসাধ্বী এই দুই প্রকার স্ত্রী আছে। লোকমাতা সাধ্বী স্ত্রীগণ এই সসাগরা পৃথিবীকে ধারণ করিতেছেন। কুলঘাতিনী পাপনিরতা দুশ্চরিত্রা রমণীগণকে তাহাদের শরীরজ দুষ্ট লক্ষণদ্বারা নির্ণয় করা যায়। মহাত্মারা বিপুলের ন্যায় উপায় অবলম্বন না করিলে, কখনই উহাদিগকে রক্ষা করিতে পারেন না। উহারা অতিশয় তীব্রস্বভাবসম্পন্ন, যে ব্যক্তি উহাদিগের সহিত কামক্রীড়ায় প্রবৃত্ত হয়, উহারা তাহাকেই প্রিয়জ্ঞান করিয়া থাকে। তদ্ভিন্ন আর কেহই উহাদের প্রিয় নাই। এক পুরুষের সহিত বিহার করিলে উহাদের কখনই তৃপ্তিলাভ হয় না। উহাদিগের প্রতি স্নেহ বা ঈর্ষা করা কাহারও কর্ত্তব্য নহে, কেবল ধর্ম্মরক্ষার নিমিত্ত অনাসক্তচিত্তে উহাদিগের সহিত সংসর্গ করা আবশ্যক। যে ব্যক্তি উহাদিগের সহিত ঐরূপ ব্যবহার না করে, তাহাকে অবশ্যই বিনষ্ট হইতে হয়। একমাত্র মহাত্মা বিপুলই যোগবলে গুরুপত্নীকে রক্ষা করিয়াছিলেন। তিনি ভিন্ন এই ত্রিলোকমধ্যে আর কেহই স্ত্রীজাতির রক্ষাবিধানে সমর্থ হয় না।”
