সৰ্ব্বলোকপূজ্য বিপ্রের লক্ষণ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! এই ত্রিলোকমধ্যে কোন ব্যক্তিরা পূজ্য, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি এই উপলক্ষ্যে নারদ বাসুদেব সংবাদ নামক এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা মহাত্মা কেশব নারদকে কৃতাঞ্জলিপুটে নমস্কার করিতে দেখিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি ভক্তিপূৰ্ব্বক কাহাকে নমস্কার করিতেছেন? যদি বলিবার কোন বাধা না থাকে, তাহা হইলে উহা কীৰ্ত্তন করুন।’
“নারদ কহিলেন ‘কেশব! আমি যাঁহাদিগকে পূজা করিতেছি, শ্রবণ কর। ইহলোকে তোমার তুল্য শ্রোতা আর কেহই নাই। যাঁহারা বরুণ, বায়ু, সূর্য্য, পৰ্ব্বত, অগ্নি, মহাদেব, কার্ত্তিকেয়, লক্ষ্মী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, বৃহস্পতি, চন্দ্র, জল, পৃথিবী ও সরস্বতীকে নমস্কার করিয়া থাকেন, যাঁহারা বেদপারদর্শী, বেদপরায়ণ, যাঁহারা আত্মশ্লাঘাবিহীন, সৰ্ব্বদা ও সন্তুষ্ট ও ক্ষমাশীল হইয়া অনাহারে দেবকার্য্য সাধন করেন, যাঁহারা জিতেন্দ্রিয় হইয়া যজ্ঞানুষ্ঠানপূর্ব্বক শস্য, ধন, গাভী ও ভূমি প্রভৃতি দ্রব্যসমুদয় বিপ্রসাৎ করিয়া থাকেন, যাঁহারা বনমধ্যে ফলমূল ভক্ষণপূৰ্ব্বক সঞ্চয়পরাঙ্মুখ হইয়া তপানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়েন, যাঁহারা ভৃত্যভরণনিরত [ভৃত্যপোষণতৎপর] ও অতিথিসেবাপরায়ণ হইয়া দেবতার অবশিষ্ট দ্রব্য ভোজন করেন, যাঁহারা নিয়মিতরূপে বেদাধ্যয়ন করিয়া ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বনপূর্ব্বক যাজন ও অধ্যাপনাদি কার্য্যে নিযুক্ত থাকেন, যাঁহারা সমুদয় ভূতের প্রতি দয়া প্রকাশ ও মধ্যাহ্নকাল পর্য্যন্ত বেদাধ্যয়ন করেন, যাঁহারা অসুয়াশূন্য হইয়া একান্তমনে বেদপাঠ করিয়া আচার্য্যকে প্রসন্ন করিতে যত্নবান হয়েন, যাঁহারা ব্রতধারী, ব্রহ্মণ্যনিষ্ঠ, সত্যপ্রতিজ্ঞ ও হব্যকব্যের অনুষ্ঠানকর্ত্তা, যাঁহারা মমতা, প্রয়োজন ও প্রতিদ্বন্দ্বপরিশূন্য হইয়া নিয়ত দিগম্বরবেশে অবস্থান করেন, যাঁহারা সত্যনিষ্ঠ, অহিংসাব্রতপরায়ণ ও শমদমাদিগুণে বিভূষিত, যাঁহারা গৃহস্থ হইয়া কপোতের ন্যায় সঞ্চয়পরাঙ্মুখ হয়েন এবং দেবতা ও অতিথিসেবায় সতত নিযুক্ত থাকেন, যে শিষ্টাচারসম্পন্ন ব্যক্তিদিগের কার্য্যানুষ্ঠান দ্বারা ত্রিবর্গ ক্রমশঃ ক্ষীণ হইয়া পরিবর্দ্ধিত হয়, যাঁহারা শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন ও লোভ-পরাঙ্মুখ হইয়া ধৰ্ম্মাদি ত্রিবর্গের অনুষ্ঠান করেন, যাঁহারা বায়ু ভক্ষণ, সলিল পান ও যজ্ঞশেষ ভোজন করিয়া বিবিধ ব্রতপালনে প্রবৃত্ত হয়েন, যাঁহারা দারপরিগ্রহ করেন না, যাঁহারা অগ্নিহোত্রব্রত পালন করিয়া থাকেন, যাঁহারা বেদের একমাত্র আধার এবং সমুদয়: ভূত যাঁহাদের আশ্রয় গ্রহণ করে, আমি সেই সমুদয় ব্রাহ্মণকে নমস্কার করিয়া থাকি। উহারা সকলেই সৰ্ব্বলোকশ্রেষ্ঠ ও সমুদয় লোকের অজ্ঞানান্ধকারনাশক। অতএব তুমিও প্রতিনিয়ত ব্রাহ্মণগণকে পূজা কর।
‘ব্রাহ্মণগণ পূজিত হইলে উভয় লোকেই সুখ প্রদান করিয়া থাকেন। তুমি তাঁহাদিগকে পূজা করিলে, তাঁহারা তোমাকে নিশ্চয়ই সুখ প্রদান করিবেন। যে সকল ব্যক্তি সতত গো, ব্রাহ্মণ, সত্য ও অতিথিসেবায় একান্ত অনুরক্ত; যাঁহারা শান্তিগুণাবলম্বী; ঈর্ষাপরিশূন্য বেদাধ্যয়ননিরত; যাঁহারা শ্রদ্ধান্বিত ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া একমাত্র বেদ অবলম্বনপূর্ব্বক দেবগণকে নমস্কার করেন; যাঁহারা ব্রতপরায়ণ হইয়া ব্রাহ্মণগণকে নমস্কারপূৰ্ব্বক দানে প্রবৃত্ত হয়েন; যাঁহারা কৌমার ব্রহ্মচারী হইয়া তপানুষ্ঠান দ্বারা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন; যাঁহারা দেবতা, অতিথি, পোষ্যবর্গ ও পিতৃগণকে যথানিয়মে ভোজ্যবস্তু প্রদানপূর্ব্বক স্বয়ং অবশিষ্ট অন্নভোজনে প্রবৃত্ত হয়েন; যাঁহারা যথানিয়মে সোমযজ্ঞে আহুতি প্রদান করেন এবং যাঁহারা তোমার ন্যায় পিতা, মাতা ও গুরুজনের প্রতি সতত ভক্তিপরায়ণ হয়েন, তাঁহারা অনায়াসে সমুদয় আপদ হইতে সমুত্তীর্ণ হইয়া থাকেন।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! দেবর্ষি নারদ কৃষ্ণকে এই কথা কহিয়া তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন। এক্ষণে তুমিও তদনুসারে দেবতা, ব্রাহ্মণ, পিতৃগণ, অতিথিদিগকে পূজা কর, তাহা হইলে অনায়াসে সদ্গতিলাভে সমর্থ হইবে।”
