নারীচরিত্র—নারদ-পঞ্চচূড়া-সংবাদ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কামিনীগণ নিতান্ত লঘুচিত্ত ও সমুদয় দোষের আকর বলিয়া জনসমাজে বিখ্যাত রহিয়াছে; অতএব তাহাদের কিরূপ স্বভাব, তাহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইয়াছে, আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি এই নারদ-পঞ্চচূড়াসংবাদ নামক প্রাচীন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে দেবর্ষি নারদ সমুদয় লোক পর্য্যটন করিয়াছিলেন। তিনি একদা ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে ব্রহ্মলোকের অপ্সরা পঞ্চচূড়াকে দর্শন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘নিতম্বিনি! আমি তোমাকে কোন বিষয় জিজ্ঞাসা করিব, তোমাকে তাহার উত্তর প্রদান করিতে হইবে।’
“তখন পঞ্চচূড়া কহিল, ‘মহর্ষে! যদি আপনি আমাকে আমার বক্তব্য ও সাধ্যায়ত্ত বিষয় জিজ্ঞাসা করেন, তাহা হইলে আমি অবশ্যই সাধ্যানুসারে আপনার জিজ্ঞাসানুরূপ উত্তর প্রদান করিব।’
“নারদ কহিলেন, ‘সুন্দরি! তোমাকে অবক্তব্য বা অসাধ্য বিষয়ক প্রশ্ন করা আমার উদ্দেশ্য নহে। এক্ষণে তোমার নিকট স্ত্রীজাতির স্বভাবের বিষয় শ্রবণ করিতে আমার বাসনা হইয়াছে, তুমি উহা কীৰ্ত্তন কর।’
“মহর্ষি নারদ এইরূপ অনুরোধ করিলে, পঞ্চচূড়া তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ‘মহর্ষে! আমি নারী হইয়া কিরূপে স্ত্রীজাতির নিন্দা করিব? স্ত্রীলোকের স্বভাব আপনার অবিদিত নাই; অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমি কামিনীকুলের নিন্দা করিতে পারিব না।’
“নারদ কহিলেন, ‘সুন্দরি! তুমি যথার্থ কহিয়াছ, নারী হইয়া নারীদিগের নিন্দা করা অকৰ্ত্তব্য বটে; কিন্তু আমার মতে মিথ্যাবাক্যপ্রয়োগ করিলেই দোষে লিপ্ত হইতে হয়; সত্য কহিলে কিছুমাত্র দোষের আশঙ্কা নাই। অতএব তুমি অবিশঙ্কিতচিত্তে যথার্থরূপে স্ত্রীজাতির স্বভাবের বিষয় কীৰ্ত্তন কর।’
“তখন পঞ্চচুড়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিল, ‘মহর্ষে! যদি নিতান্তই আমার মুখে স্ত্রীজাতির নিন্দা শ্রবণ করিতে আপনার অভিলাষ হইয়া থাকে, তবে শ্রবণ করুন। কামিনীগণ সৎকুলসদ্ভূত, রূপসম্পন্ন ও সধবা হইলেও স্বধর্ম্ম পরিত্যাগ করে। উহাদের অপেক্ষা পাপপরায়ণ আর কেহই নাই। উহারা সকল দোষের আকর। উহারা অবসরপ্রাপ্ত হইলেই ধনবান ও রূপবান পতিদিগকে পরিত্যাগপূৰ্ব্বক পরপুরুষসম্ভোগে প্রবৃত্ত হয়। উহাদের অন্তঃকরণে কিছুমাত্র ধর্ম্মভয় নাই। উহারা অনায়াসে লজ্জা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক পরপুরুষদিগের সহিত সংসর্গ করে। পুরুষ, পরস্ত্রীসম্ভোগে অভিলাষী হইয়া, তাহার নিকট গমনপূর্ব্বক অল্পমাত্র চাটুবাক্যপ্রয়োগ করিলেই সে তৎক্ষণাৎ তাহার প্রতি অনুরক্ত হয়।
কামিনীগণ কেবল পরপুরুষের অভাব ও পরিজনের ভয়ে ভর্ত্তার বশীভূত হইয়া থাকে। উহারা কাহারও সংসর্গে পরাঙ্মুখ নহে। উহারা পুরুষের রূপ বা বয়ঃক্রম বিবেচনা করে না। পুরুষপ্রাপ্ত হইলেই তাহার সহিত সংসর্গ করে। উহারা ধৰ্ম্মভয়, কুলভয়, দয়া বা অর্থলোভে কদাচ পতির বশীভূত হয় না। কুলকামিনীগণ সতত যৌবনসম্পন্ন দিব্যাভরণভূষিত বেশ্যাদিগের ন্যায় ব্যবহার করিতে অভিলাষ করে। পতিগণ উহাদিগের অতি যত্নসহকারে রক্ষা করিলেও উহারা কুব্জ, অন্ধ, জড়, বামন, পঙ্গু প্রভৃতি কুৎসিত পুরুষদিগের সহিত সংসর্গ করে। উহাদের মত কামোন্মত্ত আর কেহই নাই। উহারা পুরুষপ্রাপ্ত না হইলে, কৃত্রিম পুংলিঙ্গ প্রস্তুত করিয়া পরস্পর পরস্পরের নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে। উহারা কেবল পুরুষের অপ্রাপ্তি, পরিজনের ভয় ও বধবন্ধনের আশঙ্কায় আপনাদের ধৰ্ম্মরক্ষা করে। উহারা নিতান্ত চঞ্চলস্বভাব। উহাদিগকে স্বধৰ্ম্মে সংস্থাপন করা ও উহাদের মনের ভাব অবগত হওয়া নিতান্ত দুঃসাধ্য। যেমন কাষ্ঠরাশি দ্বারা অগ্নির, অসংখ্য নদী দ্বারা সমুদ্রের ও সৰ্ব্বভূতসংহার দ্বারা অন্তকের তৃপ্তিলাভ হয় না, তদ্রূপ অসংখ্য পুরুষসংসর্গ করিলেও স্ত্রীলোকের তৃপ্তি জন্মে না। সুশ্রী পুরুষকে দর্শন করিবামাত্র উহাদের যোনি আর্দ্র হয়। ভর্ত্তৃগণ সমুদয় অভিলষিত দ্রব্য প্রদান, প্রিয়কাৰ্য্যানুষ্ঠান ও যত্নসহকারে রক্ষা করিলেও উহারা তাহাদিগকে পরিত্যাগ করে। সুরতক্রীড়া উহাদের যেরূপ প্রিয়, বিবিধ ভোগ্যবস্তু, দিব্য অলঙ্কার ও বিচিত্র গৃহ প্রভৃতি কোন দ্রব্যই উহাদের তাদৃশ প্রীতিকর নহে। তুলাদণ্ডের একদিকে যম, বায়ু, মৃত্যু, পাতাল, বাড়বানল, ক্ষুরধার বিষ, সর্প ও বহ্নি এবং অপর দিকে স্ত্রীজাতিকে সংস্থাপন করিলে স্ত্রীজাতি কখনই ভয়ানকত্বে উহাদের অপেক্ষা ন্যূন হইবে না। বিধাতা যে সমুদয় সৃষ্টিকাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া মহাভূতসমুদয় [ক্ষিতি, জল, তেজ, বায়ু, আকাশ] ও স্ত্রীপুরুষের সৃষ্টি করেন, সেই সময়ই স্ত্রীদিগের দোষের সৃষ্টি করিয়াছেন।”
