1 of 4

৪৫. কালাতীত বিবাহে কন্যার স্বয়ংকর্ত্তৃত্বের নিন্দা

৪৫তম অধ্যায়

কালাতীত বিবাহে কন্যার স্বয়ংকর্ত্তৃত্বের নিন্দা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কোন ব্যক্তি কোন কন্যার পাণিগ্রহণার্থ শুল্কপ্রদানপূর্ব্বক বিদেশে গমন করিয়া বহুকাল বাস করিলে ঐ কন্যার পিতার কর্ত্তব্য কি, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যদি কন্যার পিতা বরপক্ষীদিগকে শুল্ক প্রত্যর্পণ না করেন, তাহা হইলে তিনি কখনই অন্যকে ঐ কন্যা প্রদান করিতে পারেন না। শুল্কদাতাই তাহার সম্পূর্ণ অধিকারী। ঐরূপ স্থলে ঐ কন্যা শুল্কদাতার উপকারার্থ ন্যায়ানুসারে অন্য পুরুষদ্বারা সন্তান উৎপন্ন করিয়া লইতে পারে; কিন্তু অন্য কেহই বিধিপূৰ্ব্বক উহার পাণিগ্রহণ করিতে পারে না। যেসকল কন্যার নিমিত্ত কেহ শুল্ক প্রদান না করে, তাহারা কোন কারণবশতঃ বহুদিন অনূঢ়া থাকিলে পিতার অনুমতিক্রমে আপনারাই পতি মনোনীত করিয়া লইতে পারে; কিন্তু অনেকেই ঐ কার্য্য নিতান্ত নিন্দনীয় বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। পূৰ্ব্বে সাবিত্রী যে পিতার আজ্ঞানুসারে নানাস্থান পরিভ্রমণপূৰ্ব্বক স্বয়ং মনোনীত পতিকে বরণ করিয়াছিলেন, ধৰ্ম্মজ্ঞ মহাত্মাদিগের মধ্যে অনেকেই ঐ কার্য্যের নিন্দা করিয়া থাকেন। মহাত্মা জনকের পৌত্র সুক্ৰতু কহিয়া গিয়াছেন, কন্যাকে বর অন্বেষণ করিতে অনুমতি প্রদান করা অতিশয় গর্হিত ও শাস্ত্রবিরুদ্ধ কৰ্ম্ম। সাধু ব্যক্তিরা ঐরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠানে একান্ত পরাঙ্মুখ হইয়া থাকেন। স্ত্রীলোকের অস্বাতন্ত্র্যধৰ্ম্মের খণ্ডনকেই [অস্বাধীন ব্যবহারের বিলোপকে স্বাধীনতার প্রশ্রয়দানকে] আসুরধৰ্ম্ম বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। ঐ ধৰ্ম্ম নিতান্ত গর্হিত। পূৰ্ব্বকালে বিবাহকার্য্যে কেহই ঐরূপ পদ্ধতির অনুসরণ করেন নাই। ভাৰ্য্যা ও পতির পরস্পর সম্বন্ধ অতিশয় সূক্ষ্ম; কিন্তু রতি স্ত্রীপুরুষমাত্রেরই সাধারণ ধর্ম্ম। অতএব কেবল রতির নিমিত্ত স্বতন্ত্র স্ত্রীর পাণিগ্রহণ কখনই কর্ত্তব্য নহে।”

অপুত্রকের কন্যা ধনাধিকারনিরূপণ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! অপুত্রক ব্যক্তির কন্যাই পুত্রস্বরূপ। অতএব কন্যাসত্ত্বেও অন্যে তাহার ধনাধিকারী হইতে পারে কি না, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! পুত্র আত্মস্বরূপ ও দুহিতা পুত্র হইতে ভিন্ন নহে। অতএব দুহিতৃসত্ত্বে কখনই অন্যে অপুত্রকের ধনাধিকারী হয় না। মাতার যৌতুকধনে কন্যারই সম্পূর্ণ অধিকার। দৌহিত্র পিতা ও মাতামহ উভয়কেই পিণ্ডদান করিতে পারে, এই নিমিত্ত অপুত্রকের ধনে দৌহিত্র ভিন্ন অন্যের অধিকার নাই। ধর্ম্মশাস্ত্রানুসারে পুত্র ও দৌহিত্র উভয়ই সমান। কন্যাকে পুত্ররূপে কল্পনা করিবার পর যদি কোন ব্যক্তির পুত্ৰ উৎপন্ন হয় তাহা হইলে সেই ব্যক্তির ধন পাঁচ ভাগ করিয়া দুই ভাগ কন্যা ও তিন ভাগ পুত্র গ্রহণ করিবে, আর যদি কোন ব্যক্তি কন্যাকে পুত্ররূপে কল্পনা করিবার পর দত্তকপুত্রাদি গ্রহণ করে, তাহা হইলে তাহার ধন পাঁচ অংশ করিয়া তিন অংশ কন্যা ও দুই অংশ পুত্র গ্রহণ করিবে। কারণ দত্তকপুত্রাদি অপেক্ষা ঔরসী কন্যা শ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে। কন্যা বিক্রীতা হইলে, তাহার গর্ভে অসূয়াপরতন্ত্র অধৰ্ম্মনিষ্ঠ পরস্বপহারী কুসন্তানসমুদয় উৎপন্ন হয়; অতএব তাহারা দৌহিত্ৰিক [দৌহিত্রোচিত] কৰ্ম্মানুসারে কখনই মাতামহের ধনাধিকারী হইতে পারে না; কেবল পিতৃধনেই তাহাদিগের অধিকার থাকে।

“ধৰ্ম্মশাস্ত্রবিশারদ ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যম কহিয়াছেন যে, যে ব্যক্তি ধনলোভে স্বীয় পুত্রকে বিক্রয় করে, অথবা জীবিকানিৰ্ব্বাহের নিমিত্ত পণ লইয়া কন্যা দান করে, তাহাকে কালসূত্রাখ্য ঘোরতর সপ্ত নরকে নিপতিত হইয়া ক্লেদ, মূত্র ও পুরীষ ভক্ষণ করিতে হয়। বরের নিকট গোমিথুন [বৃষগাভী] রূপ শুল্ক গ্রহণ করিয়া তাহাকে কন্যা ও ঐ গোমিথুন প্রদান করাই আর্য্যবিবাহের নিয়ম। কেহ কেহ ঐ গোমিথুনগ্রহণকে শুল্ক বলিয়া নির্দ্দেশ করেন না এবং কেহ কেহ কহিয়া থাকেন, কন্যার পিতা বরের নিকট অল্প বা বহু ধন গ্রহণ করুন, তাহাকে বিক্রয়জনিত পাপ অবশ্যই লিপ্ত হইতে হয়। কেহ কেহ এই ধৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়া গিয়াছেন বটে; কিন্তু ইহাকে সনাতনধৰ্ম্ম বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায় না। সন্তানবিক্রয়ের কথা দূরে থাকুক পশুবিক্রয় করাও কর্ত্তব্য নহে। ইহলোকে অধৰ্ম্মলব্ধ অর্থদ্বারা কোন কার্য্য সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা নাই। কেহ কেহ বলপূৰ্ব্বক কন্যাহরণ করিয়া বিবাহ করে। ঐরূপ বিবাহকে রাক্ষসবিবাহ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। ঐরূপ বিবাহ করিলে নিশ্চয়ই অন্ধতম নরকে নিপতিত হইতে হয়।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *