৪৮তম অধ্যায়
বর্ণসঙ্করের লক্ষণ—ধর্ম্মকৰ্ম্মনির্ণয়
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! অর্থলোভ, কাম ও বর্ণের অনভিজ্ঞতানিবন্ধন ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের স্ত্রীপুরুষ পরস্পর সংসর্গে প্রবৃত্ত হওয়াতে বর্ণসঙ্করের উৎপত্তি হয়। এক্ষণে আপনি সেই বর্ণসঙ্করদিগের ধর্ম্মকর্ম্ম কি প্রকার, কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ভগবান্ প্রজাপতি প্রথমে যজ্ঞের নিমিত্ত ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণের সৃষ্টি করিয়া উঁহাদের কার্য্যসমুদয় নির্দ্দেশ করিয়াছেন। ঐ বর্ণচতুষ্টয়ের মধ্যে ব্রাহ্মণ চারি বর্ণের কন্যারই পাণিগ্রহণ করিতে পারেন। ব্রাহ্মণের ঐ চারি ভাৰ্য্যার মধ্যে ব্রাহ্মণীর গর্ভে যে সমুদয় সন্তান উৎপন্ন হয়, তাহারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ার গর্ভে যাহারা সমুৎপন্ন হয়, তাহারা মূৰ্দ্ধাভিষিক্ত, যাহারা বৈশ্যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে, তাহারা অম্বষ্ঠ ও শুদ্রগর্ভে যাহারা জন্মে, তাহারা পারশব বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকে। আপনার বংশসম্ভূত ব্যক্তিদিগের সেবা করা শূদ্রাপুত্রের অবশ্য কর্ত্তব্য। শূদ্রাপুত্র বয়োজ্যেষ্ঠ হইলেও বিবিধ উপায় উদ্ভাবন করিয়া নষ্ট বিষয়ের উদ্ধার, সৰ্ব্বদা ব্রাহ্মণীপুত্রাদির সেবা ও তাহাদিগকে ধনাদি দান করা তাহার কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম।
‘ক্ষত্রিয় ক্ষত্রিয়াদি তিন বর্ণের কন্যারই পাণিগ্রহণ করিতে পারে। তন্মধ্যে ক্ষত্রিয়ার গর্ভে যাহারা উৎপন্ন হয়, তাহারা ক্ষত্রিয়, বৈশ্যার গর্ভে যাহারা সম্ভূত হয়, তাহারা মাহিষ্য এবং শূদ্রার গর্ভে যাহারা জন্মগ্রহণ করে, তাহারা উগ্র বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে।
“বৈশ্য বৈশ্য ও শূদ্রার পাণিগ্রহণ করিতে পারে। তন্মধ্যে যাহারা বৈশ্যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে, তাহারা বৈশ্য এবং শূদ্রার গর্ভে যাহারা সমুৎপন্ন হয়, তাহারা করণ বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকে। শূদ্র সবর্ণ কন্যা ভিন্ন আর কাহারও পাণিগ্রহণ করিতে পারে না। শূদ্রার গর্ভসম্ভূত পুত্র শূদ্র বলিয়াই অভিহিত হয়। যদি উৎকৃষ্ট বর্ণের কন্যার গর্ভে অপকৃষ্ট বর্ণের ঔরসে সন্তান সমুৎপন্ন হয়, তাহা হইলে ঐ সন্তান চারি বর্ণের নিন্দনীয় হইয়া থাকে। যদি ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণীর গর্ভে পুত্রোৎপাদন করে, তাহা হইলে ঐ পুত্র-সূত বলিয়া কথিত হয়। রাজাদির স্তুব পাঠ করা সূতের প্রধান কার্য্য। বৈশ্যের ঔরসে ব্রাহ্মণীর গর্ভে যে সমুদয় সন্তান জন্মে, তাহারা বৈদেহক ও মৌদ্গল্যনামে অভিহিত হইয়া থাকে। অন্তঃপুর রক্ষণাবেক্ষণ করাই উহাদিগের কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। ইহাদিগের উপনয়নাপদি সংস্কার নাই। শূদ্রের ঔরসে ব্রাহ্মণীর গর্ভে যে সন্তান সমুৎপন্ন হয়, তাহারা চণ্ডাল বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে। উহারা কুলের কলঙ্কস্বরূপ; নগরের বহির্ভাগে বাস করাই উহাদের উচিত। বধার্হ ব্যক্তিদিগকে হত্যা করা উহাদিগের প্রধান কার্য্য। যাহারা বৈশ্যের ঔরসে ক্ষত্রিয়ার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে, তাহারা বাক্যজীবী বন্দী এবং যাহারা শূদ্রের ঔরসে সম্ভূত হয় তাহারা মৎস্যজীবী নিষাদ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে; শূদ্রের ঔরসে বৈশ্যার গর্ভে যে সন্তান উৎপন্ন হয়, তাহাকে সূত্রধর বলিয়া কীৰ্ত্তন করা যায়। সূত্রধরের নিকট দান গ্রহণ করা ব্রাহ্মণের কৰ্ত্তব্য নহে।
“অম্বষ্ঠাদি বর্ণসঙ্করসমুদয় স্বজাতীয় ভাৰ্য্যাতে যে সমুদয় পুত্র উৎপাদন করে, তাহারা তাহাদের স্বজাতি বলিয়া পরিগণিত হয়; আর উহারা আপনাদিগের অপেক্ষা নীচ জাতিতে যে সন্তানসমুদয় উৎপাদন করে, তাহারা স্ব স্ব মাতৃজাতি প্রাপ্ত হইয়া থাকে। এইরূপে পুরুষ সমানজাতীয় স্ত্রীর গর্ভে যে পুত্ৰসমুদয় উৎপাদন করে, তাহারা সজাতীয় ও অসমানজাতীয় স্ত্রীর গর্ভে যে সন্তান উৎপাদন করে, তাহারা বিজাতীয় বলিয়া পরিগণিত হয়। যেমন শূদ্র ব্রাহ্মণীতে গমন করিলে চণ্ডালনামক অতি নিকৃষ্ট বাহ্যজাতি [আর্য্যবহির্ভূত] সমুৎপন্ন হয়, তদ্রূপ ঐ বাহ্যবর্ণ আবার ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণের কন্যাতে গমন করিলে তাহাদের গর্ভে চণ্ডাল অপেক্ষা নিকৃষ্ট জাতি জন্মগ্রহণ করে।
“এইরূপ ক্রমশঃ হীনজাতি হইতে পঞ্চদশবিধ হীনতর জাতির আবির্ভাব হয়। মগধদেশীয় সৈরিন্ধ্রীর গর্ভে সূত্রধরের ঔরসে যে সন্তান উৎপন্ন হয়, তাহারা সৈর বা আয়োগবনামে প্রসিদ্ধ হইয়া থাকে। উহাদের মধ্যে কতকগুলি রাজাদির প্রসাধনকার্য্য এবং কতকগুলি বাগুরাবন্ধন[ফাঁদ পাতিয়া হরিণাদি ধরা]দ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ করে। ঐ সৈরিন্ধ্রীর গর্ভে বৈদেহের ঔরসে মদ্যকর মৈরেয়ক, নিষাদের ঔরসে নৌকাজীবী মদ্গুর, চণ্ডালের ঔরসে মৃতদেহরক্ষক শ্বপাক, আয়োগবের ঔরসে মাংস [মাংসবিক্রেতা], মৈরেয়কের ঔরসে স্বাদুকর, মদ্গুরের ঔরসে ক্ষৌদ্র [পাচক] ও শ্বপাকের ঔরসে সৌগন্ধ উৎপন্ন হইয়া থাকে। আয়োগবীগর্ভে বৈদেহের ঔরসে মায়াজীবী, নিষাদের ঔরসে মদ্রনাভ ও চণ্ডালের ঔরসে পুরুস সমুৎপন্ন হয়। উহাদের মধ্যে মায়াজীবিগণ নিতান্ত নিষ্ঠুর ব্যবহার ও ক্রূরতাচরণ, মদ্রনাভেরা গর্দ্দভযুক্ত যানে আরোহণ এবং পুরুসেরা মৃত ব্যক্তির বস্ত্র পরিধান ও ভগ্নপাত্রে অশ্ব, গর্দ্দভ ও হস্তীর মাংস ভোজন করে। নিষাদীর গর্ভে বৈদেহের ঔরসে অরণ্য পশুঘাতক ক্ষুদ্র, চর্ম্মকারের ঔরসে কারাবর ও চণ্ডালের ঔরসে পাথুসৌপাক সমুৎপন্ন হয়। পাণ্ডুসৌপাকেরা বংশদ্বারা পাত্ৰাদি নির্ম্মাণ করিয়া জীবিকানির্ব্বাহ করে। বৈদেহীর গর্ভে নিষাদের ঔরসে আহিতুণ্ডিকের ও চণ্ডালের ঔরসে সৌপাকের উৎপত্তি হয়। সৌপাকদিগের ব্যবহার চণ্ডালদিগের ন্যায়, নিষাদীর গর্ভে সৌপাকের ঔরসে যে পুত্র জন্মে, তাহাকে অন্তেবসায়ী বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। অন্তেবসায়িগণ সতত শ্মশানে বাস করে। চণ্ডালাদি নীচ জাতিরা উহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া থাকে।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! পিতামাতার বর্ণব্যতিক্রমবশতঃ এইরূপ বর্ণসঙ্কর উৎপন্ন হয়। ঐ সমস্ত বর্ণসঙ্করেরা প্রচ্ছন্নভাবে বা প্রকাশ্যেই অবস্থান করুক, কর্ম্মদ্বারা উহাদিগকে জ্ঞাত হইতে হইবে। চারি বর্ণ ব্যতীত আর কোন জাতিই ধর্ম্মশাস্ত্রে নির্দ্দিষ্ট নাই। জাতির সংখ্যা করা নিতান্ত সুকঠিন। যজ্ঞহীন সজ্জনসংসর্গশূন্য চণ্ডালাদি বাহ্যজাতিসমুদয় আপনাদের জাতিনিয়ম পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক বিজাতীয় স্ত্রীদিগের সহিত সংসর্গ করাতে, অশেষবিধ বাহ্যজাতি সমুৎপন্ন হয়। ঐ সমুদয় জাতি স্ব স্ব কৰ্ম্মানুসারে জাতি ও জীবিকা প্রাপ্ত হয়। উহারা চতুষ্পথ, শ্মশান, শৈল ও বৃক্ষসমূহে অবস্থান এবং লৌহনিৰ্ম্মিত অলঙ্কার ধারণপূৰ্ব্বক স্ব স্ব কার্য্যদ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ করিয়া থাকে। উহাদিগকে কখন কখন অন্যরূপ ভূষণ ধারণ করিতেও দেখা যায়। গোব্রাহ্মণগণের যথোচিত সাহায্য, দয়া, সত্য, ক্ষমা ও আপনার দেহের মমতা, পরিত্যাগপূৰ্ব্বক অন্যকে পরিত্রাণ এই কয়টি ইহাদিগের সিদ্ধির লক্ষণ।
“বুদ্ধিমান মনুষ্য সবর্ণা স্ত্রীতেই পুত্র উৎপাদন করিবেন। অসবর্ণা স্ত্রীতে পুত্ৰ উৎপাদন করা শ্রেয়স্কর নহে। অসবর্ণার গর্ভজাত পুত্র পিতাকে নিতান্ত অবসন্ন করে। রমণীগণ কি বিদ্বান, কি মূর্খ সকলকেই কামক্রোধের বশবর্ত্তী করিয়া কুপথে নীত করে। পুরুষদূষণ স্ত্রীজাতির স্বভাব। অতএব বিচক্ষণ মনুষ্যেরা এই সমস্ত সবিশেষ অবগত হইয়া স্ত্রীলোকের প্রতি একান্ত আসক্তি প্রদর্শন করিবেন না।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যে ব্যক্তি উৎকৃষ্ট বর্ণের স্ত্রীর গর্ভে অপকৃষ্ট বর্ণের ঔরসে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক আর্য্যব্যক্তির ন্যায় রূপবেশাদিসম্পন্ন হয়, আমরা কিরূপে তাহাকে বর্ণসঙ্কর বলিয়া পরিজ্ঞাত হইব?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যে ব্যক্তি যোনিসঙ্কর হইতে সমুৎপন্ন হয়, তাহার নীচত্ব তাহার আর্য্যলোকবিরুদ্ধ কার্য্যদ্বারা অনায়াসে উপলব্ধি হইতে পারে। এই জীবলোকে অনার্য্যতা, অনাচার, ক্রূরতা ও যাগযজ্ঞাদিরাহিত্য পুরুষের নীচজাতিত্ব প্রখ্যাপিত করিয়া থাকে। যোনিসঙ্করসমুৎপন্ন মনুষ্য পিতা বা মাতা অথবা উভয়েরই স্বভাব অধিকার করে। উহারা কোনরূপেই আপনার নীচত্ব প্রচ্ছন্ন রাখিতে পারে না। উহারা পিতা বা মাতার ন্যায় রূপ পরিগ্রহ করিয়া জন্মগ্রহণ করে এবং ব্যাঘ্রাদি তির্য্যগযোনি যেমন আপনার বীজগুণ পরিত্যাগ করে না, তদ্রূপ উহারা পিতামাতার স্বভাব পরিত্যাগ করিতে পারে না। যোনিসঙ্কর হইতে অতি গোপনেও যাহার জন্ম হয়, সেও অল্প বা অধিকই হউক জন্মদাতার স্বভাব অবশ্যই প্রাপ্ত হইয়া থাকে। মনুষ্য নীচজাতি হইতে উৎপন্ন হইয়া আৰ্য্যের ন্যায় আচারনিরত হইলেও তাহার জাতিস্বভাবই নিকৃষ্টতা প্রকাশ করিয়া দেয়।
“বিবিধ স্বভাবসম্পন্ন নানাকার্য্যনিরত মনুষ্যমধ্যে ব্যবহার ও জাতি পরস্পর বিরুদ্ধ হইয়া থাকে। কখন নীচজাতিতে উৎকৃষ্ট ব্যবহার ও কখন বা উৎকৃষ্ট জাতিতে নিকৃষ্ট ব্যবহার দৃষ্টিগোচর হয়। শাস্ত্রজ্ঞান নীচের নীচত্ব অপকর্ষণ করিতে সমর্থ হয় না এবং নীচ আপনার অনুরূপ কার্য্যানুষ্ঠান করিয়া কদাচই ক্ষোভপ্রকাশ করে না। উৎকৃষ্ট জাতিসমুৎপন্ন ব্যক্তি যদি অসচ্চরিত্র হয়, তাহার সমাদর করা কখনই কর্ত্তব্য নহে। আর শূদ্রও যদি ধৰ্ম্মপরায়ণ ও সচ্চরিত্র হয়, তাহার সৎকার করা শ্রেয়স্কর। মনুষ্য কুলশীল ও কার্য্যদ্বারা আপনার পরিচয় প্রদান করিয়া থাকে। আর তাহার কুল যদি কোন কারণবশতঃ হীনদশায় নিপতিত হয়, তাহা হইলে সে কার্য্যদ্বারা পুনরায় তাহা উজ্জ্বল করিয়া থাকে। অতএব যাহাতে সঙ্কীর্ণ ও অনুরূপ নিকৃষ্ট জাতিতে সন্তানোৎপাদন করিতে না হয়, বিচক্ষণ মনুষ্য তদ্বিষয়ে নিরন্তর সাবধান হইবেন।”
