1 of 4

২৫. বিবিধ তীর্থমাহাত্ম্য

২৫তম অধ্যায়

বিবিধ তীর্থমাহাত্ম্য

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! তীর্থদর্শন, তীর্থস্নান ও তীর্থ মাহাত্ম্য শ্রবণ শ্রেয়ঃসাধন বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে; অতএব এই পৃথিবীতে যেসমস্ত পবিত্র তীর্থ বিদ্যমান রহিয়াছে, আপনি তৎসমুদয়ের বিষয় কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষি অঙ্গিরা তীর্থসমূহের বিষয় যেরূপ কহিয়া গিয়াছেন, তুমি অনন্যমনে তাহা শ্রবণ কর, নিশ্চয়ই তোমার উৎকৃষ্ট ধর্ম্মলাভ হইবে। একদা মহর্ষি গৌতম তপোধন অঙ্গিরার তপোবনে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘ভগবন্! তীর্থসমুদয়ের পবিত্রতাবিষয়ে আমার অতিশয় সংশয় উপস্থিত হইয়াছে। অতএব আপনি তীর্থসমুদয় পবিত্র কি না, এবং তাহা যদি পবিত্র হয়, তাহা হইলে কোন্ তীর্থসমূহে স্নান করিলে পরলোকে কিরূপ শুভফল লাভ হয়, আপনি তাহার। যথার্থ তত্ত্ব কীৰ্ত্তন করুন।

‘অঙ্গিরা কহিলেন, ‘মহর্ষে! তীর্থসমুদয় পরম পবিত্র, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। মানুষ উপবাস করিয়া তরঙ্গমালাসঙ্কুল চন্দ্রভাগা ও বিতস্তাতে সপ্তাহ অবগাহন করিলে পাপশূন্য ও মুনির ন্যায় পবিত্র হয়। কাশ্মীরদেশে যেসমস্ত নদী ও মহানদী সিন্ধুতে নিপতিত হইয়াছে, সেইসকল নদীতে অবগাহন করিলে সচ্চরিত্র হইয়া স্বর্গলাভ করিতে পারে। পুষ্কর, প্রভাস, নৈমিষ, সাগরোদক, দেবকী, ইন্দ্ৰমার্গ ও স্বর্গবিন্দুতে অবগাহন করিলে মনুষ্য সুরলোক লাভপূৰ্ব্বক অপ্সরাগণের স্তবে জাগরিত হয়। হিরণ্যবিন্দুতে অবগাহন ও পূত হইয়া উহাকে অভিবাদন এবং কুশেশয় ও দেবস্তুতীর্থে পর্য্যটন করিলে সর্ব্বপাপ বিনষ্ট হয়। মনুষ্য তিন রাত্রি উপবাস করিয়া গন্ধমাদনপৰ্ব্বতের সমীপস্থ ইন্দ্রতোয়া ও করতোয়া এবং কুরঙ্গতীর্থে অবগাহন করিলে অশ্বমেধযজ্ঞের ফললাভে সমর্থ হয়। গঙ্গাদ্বার, কুশাবৰ্ত্ত, বিশ্ব, নীলপর্ব্বত ও কনখলতীর্থে স্নান করিলে নিষ্পাপ হইয়া সুরলোকে গমন করিতে পারা যায়।

‘ব্রহ্মচারী, জিতক্রোধ, সত্যসন্ধ ও অহিংস্র হইয়া সলিলহ্রদ তীর্থে অবগাহন করিলে অশ্বমেধযজ্ঞের ফললাভ হয়। যে স্থানে ভাগীরথী গঙ্গা উত্তরদিকে নিপতিত হইতেছেন, সেই স্থানের নাম মহাদেবের ত্রিস্থান। যিনি সেই ত্রিস্থান তীর্থে একমাস উপবাস করিয়া অবগাহন করেন, তিনি দেবগণের সাক্ষাৎকারলাভে সমর্থ হয়েন। সপ্তগঙ্গ, ত্রিগঙ্গ ও ইন্দ্রমার্গে অবগাহনপুৰ্ব্বক পিতৃগণের তর্পণ করিলে স্বর্গভোগানন্তর পুনরায় জীবলোকে জন্মগ্রহণ করিয়া সুধার আস্বাদনে সমর্থ হওয়া যায়। যে মনুষ্য অগ্নিহোত্ৰপরায়ণ ও পবিত্র হইয়া একমাসমাত্র উপবাসপূৰ্ব্বক মহাশ্ৰমতীর্থে অবগাহন করে, তাহার নিশ্চয়ই সিদ্ধিলাভ হয়। ভৃগুতুঙ্গপ্রদেশে লোভপরাঙ্মুখ হইয়া মহাহ্রদতীর্থে স্নান করিয়া তিনরাত্রি উপবাস করিলে ব্রহ্মহত্যা পাপ হইতে মুক্ত হওয়া যায়। বলাকাপ্রদেশে কন্যাকূপে স্নান ও তৰ্পণ করিলে দেবগণমধ্যে যশঃ ও কীৰ্ত্তিলাভ হইয়া থাকে। দেবিকা, সুন্দরিকাহ্রদ ও অশ্বিনীতীর্থে. অবগাহন করিলে পরলোকে অপূর্ব্ব রূপ ও তেজ লাভ হয়। মহাগঙ্গা কৃত্তিকাঙ্গারকতীর্থে অবগাহনপূৰ্ব্বক একপক্ষ উপবাস করিলে নিষ্পাপ হইয়া স্বর্গে গমন করিতে পারা যায়। কিঙ্কিণিকাশ্রম ও বৈমানিকতীর্থে অবগাহন করিলে কামচারী ও অঙ্গরাদিগের দিব্য আলয়ে পূজিত হওয়া যায়।

‘মনুষ্য ব্রহ্মচারী ও জিতক্রোধ হইয়া তিনরাত্রি কালিকাশ্রম ও বিপাশাতীর্থে তর্পণ করিলে জন্মবন্ধন হইতে বিমুক্ত হইতে পারে। কৃত্তিকাশ্ৰমতীর্থে স্নান করিয়া পিতৃগণের তর্পণ ও অর্চ্চনাদ্বারা মহাদেবের তুষ্টিসম্পাদন করিলে নিষ্পাপ হইয়া স্বর্গলাভ করা যায়। মনুষ্য মহাপুরতীর্থে স্নান ও তিন রাত্রি উপবাস করিলে যাবতীয় স্থাবর ও জঙ্গম জন্তুগণের ভয় হইতে বিমুক্ত হইতে পারে। দেবদারুবনতীর্থে স্নান ও পিতৃগণের তৰ্পণ করিয়া তথায় সাত রাত্রি বাস করিলে দেবলোক লাভ হয়। শরস্তম্ব, কুশস্তম্ব ও দ্রোণশৰ্ম্মপদতীর্থে নির্ঝরজলে স্নান করিলে অপ্সরাগণকর্ত্তৃক সেবিত হওয়া যায়। চিত্রকূট, জনস্থান ও মন্দাকিনীতীর্থে অবগাহনপুৰ্ব্বক উপবাস করিলে রাজলক্ষ্মী লাভ হইয়া থাকে। শ্যামাশ্ৰমতীর্থে গমন, অবস্থান ও স্নান করিয়া একপক্ষ উপাস করিলে দূরশ্রবণাদি গুণলাভ হয়। কৌশিকতীর্থে লোভপরাঙ্মুখ হইয়া একবিংশতি দিন বায়ুমাত্র ভক্ষণ করিলে, স্বর্গলাভে সমর্থ হওয়া যায়। মাতঙ্গরূপী অনালম্ব, অন্ধক ও সনাতনতীর্থে স্নান করিলে একরাত্রিমধ্যে সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। নৈমিষ ও স্বৰ্গতীর্থে জিতেন্দ্রিয় হইয়া স্নান ও একমাস পিতৃগণের তর্পণ করিলে নরমেধের ফললাভ হয়; গঙ্গাহ্রদ ও উৎপলবনতীর্থে অবগাহন ও একমাস পিতৃগণের তৰ্পণ করিলে অশ্বমেধের ফললাভ হইয়া থাকে। গঙ্গাযমুনাসঙ্গম ও কালঞ্জরগিরিতীর্থে অবগাহম ও একমাস পিতৃগণের তর্পণ করিলে দশ অশ্বমেধের ফললাভ হয়। যষ্টিহ্রদতীর্থে স্নান করিলে অন্নদান অপেক্ষা সমধিক ফললাভ হইয়া থাকে। প্রয়াগে মাঘী পূর্ণিমাতে তিনকোটি দশসহস্র তীর্থের সমাগম হয়। যিনি সেই মাঘী পূর্ণিমাতে প্রয়াগে পবিত্র হইয়া স্নান করেন, তিনি নিষ্পাপ হইয়া স্বর্গলাভ করিয়া থাকেন।

‘মরুদগণ ও পিতৃগণের আশ্রয় এবং বৈবস্বততীর্থে স্নান করিলে তীর্থের ন্যায় পবিত্রতালাভে সমর্থ হওয়া যায়। ব্রহ্মসর ও ভাগীরথীতীর্থে অবগাহন, পিতৃগণের তর্পণ ও তথায় একমাসকাল উপবাস করিয়া অবস্থান করিলে চন্দ্রলোক লাভ হইয়া থাকে। উৎপাতকতীর্থে স্নান ও অষ্টাবক্রতীর্থে তর্পণ করিয়া দ্বাদশ দিন অনাহারে থাকিলে নরমেধযজ্ঞের ফললাভ হয়। তিনবার ব্রহ্মহত্যা করিয়া অশ্বপৃষ্ঠ, গয়া, নিরবিন্দপর্ব্বত ও ক্রৌঞ্চপদীতে গমন, করিলে একবার ঐ ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপ হইতে মুক্তিলাভ হইয়া থাকে। কালবিঙ্কতীর্থে অবগাহন করিলে প্রায় কিছুই অবিদিত থাকে না। অগ্নিপুরে স্নান করিলে অগ্নিকন্যাপুরে অবস্থান করা যায়। করবীপুরে ও দেবহ্রদে স্নান এবং বিশালাতীর্থে তর্পণ ও স্নান করিলে ব্রহ্মত্বলাভ হইয়া থাকে। আবৰ্ত্তনন্দা ও মহানন্দায় গমন করিলে অপ্সরাগণে পরিবেষ্টিত হইয়া নন্দনবনে পরমসুখসম্ভোগ করিতে পারা যায়। কার্ত্তিকী পূর্ণিমাতে সমাহিতচিত্তে উৰ্ব্বশীতীর্থে গমন ও নিয়মানুসারে লৌহিত্যতীর্থে স্নান করিলে পুণ্ডরীকযজ্ঞের ফললাভ হয়। রামহ্রদে স্নান ও বিপাশাতীর্থে তর্পণ করিয়া দ্বাদশ দিন অনাহারে অবস্থান করিলে পাপের লেশমাত্রও থাকে না। অতি পবিত্রমনে মহাহ্রদে স্নান করিয়া একমাস অনাহারে অবস্থান করিতে পারিলে জমদগ্নিতুল্য সদগতিলাভ হইয়া থাকে। দৃঢ়ব্রত ও হিংসাপরিশূন্য হইয়া বিন্ধ্যাচলে শরীরকে একান্ত সন্তপ্ত করিয়া একমাস তপস্যা করিলে নিশ্চয়ই সিদ্ধিলাভ হয়। নর্ম্মদা ও সুর্পারকসলিলে অবগাহন-পূৰ্ব্বক একপক্ষ উপবাসী থাকিলে নরপতিবংশে জন্মলাভ হয়। সমাহিতচিত্তে তিনমাস সংযত হইয়া জম্বুমার্গে গমন করিলে এক দিবসের মধ্যেই সিদ্ধিলাভ হয়। কোকামুখে অবগাহন এবং চণ্ডালিকাশ্রমে গমনপূর্ব্বক কৌপীনধারণ ও শাক ভক্ষণ করিতে পারিলে দশটি কুমারীলাভ হইয়া থাকে।

যিনি কুমারিকাহ্রদের উপকূলে অবস্থান করেন, তাঁহাকে আর শমনসদনে গমন করিতে হয় না; তিনি নিশ্চয়ই স্বর্গলোক লাভ করেন। যিনি সমাহিতচিত্তে অমাবস্যাতে প্রভাসতীর্থে অবগাহন করেন, তাঁহার সিদ্ধি ও অমরত্ব লাভ হয়। উজ্জ্বালকতীর্থ, আর্ষ্টিসেনের আশ্রম ও পিঙ্গরআশ্রমে স্নান করিলে পাপের লেশমাত্রও থাকে না। যিনি ত্রিরাত্র উপবাস করিয়া কুল্যাতীর্থে অবগাহন ও অঘমর্ষণমন্ত্র জপ করেন, তাঁহার অশ্বমেধযজ্ঞের ফললাভ হয়। পিণ্ডারকর্ত্তীর্থে স্নান করিয়া একরাত্রি বাস করিলে অগ্নিষ্টোমযজ্ঞের ফললাভ হইয়া থাকে। যিনি ধর্ম্মারণ্যপরিশোভিত ব্ৰহ্মসরোবরে গমন করিয়া অবগাহন করেন, তিনি পুণ্ডরীকযজ্ঞের ফললাভে অধিকারী হয়েন। জিতেন্দ্রিয় হইয়া একমাস মৈনাকপর্ব্বতের তীর্থে অবগাহন ও সন্ধ্যোপাসনা করিলে সর্ব্বমেধযজ্ঞ ফললাভ হইয়া থাকে। ভ্রূণহা ব্যক্তি শত যোজন হইতে কালোদক, নন্দিকুণ্ড ও উত্তরমানসে গমন করিতে পারিলে ভ্রুণহত্যাপাপ হইতে মুক্ত হইতে পারে। একবার নন্দীশ্বরের মূর্ত্তি অবলোকন করিতে পারিলে আর পাপের লেশমাত্রও থাকে না। স্বর্গমাগতীর্থে অবগাহন করিলেই ব্রহ্মলোক লাভ হইয়া থাকে। সুবিখ্যাত হিমালয়পর্ব্বত অতিপবিত্র, সমুদয় রত্নের আকর, সিদ্ধচারণগণনিষেবিত ও ভগবান ভূতনাথের শ্বশুর। যে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ দেহ অতি অসার বিবেচনা করিয়া ঐ পৰ্ব্বতে গমনপূর্ব্বক তত্ৰত্য মুনি ও দেবতাদিগের অর্চ্চনায় নিরত থাকিয়া তথায় কলেবর পরিত্যাগ করেন, তিনিই সিদ্ধিলাভপূৰ্ব্বক অনায়াসে সনাতন ব্রহ্মলোকে গমন করিতে সমর্থ হয়েন। যিনি কাম, ক্রোধ ও লোভ পরিত্যাগ করিয়া তীর্থস্থানে অবস্থান করেন, তাঁহার কোন বস্তুই দুর্ল্লভ থাকে না। যেসকল তীর্থ নিতান্ত দুর্গম, তৎসমুদয় মনোমধ্যে চিন্তা করা কর্ত্তব্য। এই তীর্থ গমন অপেক্ষা পবিত্র কার্য্য ও স্বৰ্গফলপ্রদ আর কিছুই নাই। তীর্থযাত্রা উপাখ্যান ব্রাহ্মণ, আত্মহিতকর সাধু, সুহৃৎ ও শিষ্যগণের নিকট কীৰ্ত্তন করা বিধেয়। এই তীর্থযাত্রা উপাখ্যান মহর্ষি কাশ্যপ অঙ্গিরাঃ মুনির এবং অঙ্গিরাঃ গৌতমের নিকট কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন। এই উপাখ্যান মহির্ষগণের জপ্য, রহস্য ও পরম পবিত্র। লোকে ইহা প্রত্যহ জপ করিলে পবিত্ৰদেহ হইয়া স্বর্গলাভ করিতে পারে। যিনি এই অঙ্গিরাকীর্ত্তিত তীর্থযাত্রা উপাখ্যান শ্রবণ করেন, তিনি অতি উৎকৃষ্ট বংশে জন্মপরিগ্রহণপূৰ্ব্বক জাতিস্মর হয়েন।’ ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *