1 of 4

৯. ব্রাহ্মণ-অবজ্ঞার ফল—শৃগাল-বানরসংবাদ

৯ম অধ্যায়

ব্রাহ্মণ-অবজ্ঞার ফল—শৃগাল-বানরসংবাদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যে দুরাত্মারা ব্রাহ্মণের নিকট প্রতিশ্রুত হইয়া অর্থ প্রদান না করে, তাহাদিগের কিরূপ গতিলাভ হয়, কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে অধিক হউক বা অল্পই হউক, অঙ্গীকার করিয়া প্রদান না করে, ক্লীব ব্যক্তির সন্তানকামনার ন্যায় তাহার সমুদয় আশা এবং সে জন্মাবধি তপস্যা, দান ও যজ্ঞ প্রভৃতি যেসকল সৎকর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, তৎসমুদয়ই পণ্ড হইয়া যায়। শ্যামবর্ণ একসহস্র অশ্বপ্রদান ভিন্ন ঐ পাপ হইতে মুক্ত হইবার উপায়ান্তর নাই। এক্ষণে আমি এই উপলক্ষে শৃগালবানরসংবাদনামক এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

“একদা এক বানর এক শৃগালকে শ্মশানমধ্যে পূতিগন্ধযুক্ত [পচা দুর্গন্ধযুক্ত] মাংস ভক্ষণ করিতে অবলোকন করিয়া কহিল, ‘শৃগাল! তুমি পূৰ্ব্বজন্মে এমন কি পাপানুষ্ঠান করিয়াছিলে যে, এক্ষণে তোমাকে শ্মশানে মৃতজন্তুর মাংস ভোজন করিতে হইতেছে?’

“তখন শৃগাল কহিল, ‘কপিবর! পূর্ব্বে আমি ব্রাহ্মণের নিকট অঙ্গীকার করিয়া অর্থ প্রদান করি নাই। সেই কারণে আমাকে এত কুৎসিত শৃগালযোনি লাভ করিয়া ক্ষুধার্ত্ত হইয়া মৃতজন্তুর মাংস ভক্ষণ করিতে হইতেছে। আমি তোমার নিকট আমার শৃগালযোনি প্রাপ্তির কারণ নির্দ্দেশ করিলাম। এক্ষণে তুমি কি নিমিত্ত বানরত্ব লাভ করিয়াছ, তাহা কীৰ্ত্তন কর।

“তখন বানর কহিল, ‘শৃগাল! পূৰ্ব্বে আমি লোভপ্রযুক্ত সতত ব্রাহ্মণের ফল অপহরণ করিতাম বলিয়া আমাকে বানরযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিতে হইয়াছে।’

শৃগাল বানরের পূৰ্ব্বজন্ম—বিপ্রের প্রতি কর্ত্তব্য

“হে ধৰ্ম্মরাজ! ঐ বানর ও শৃগাল পূর্ব্বে মনুষ্যজন্মে পরস্পর সখ্যভাবসম্পন্ন ছিল। এক্ষণে কর্ম্মদোষে তির্য্যগযোনি লাভ করিয়াছে। কিন্তু সৌভাগ্যবিশেষবশতঃ উহাদের পূর্ব্বজন্মবৃত্তান্ত স্মরণ ছিল। আমি পূৰ্ব্বে স্বীয় উপাধ্যায় ও মহর্ষি বেদব্যাসের প্রমুখাৎ এই ইতিহাস শ্রবণ করিয়াছি। ব্রাহ্মণগণ সৰ্ব্বদা আমাকে এই উপদেশ প্রদান করিতেন যে, ব্রহ্মস্ব অপহরণ করা কোনক্রমেই বিধেয় নহে। ব্রাহ্মণদিগকে প্রতিনিয়ত ক্ষমা করা অবশ্য কর্ত্তব্য। ব্রাহ্মণ বালক, দরিদ্র বা কৃপণ হইলেও উহাকে অবজ্ঞা করা বিধেয় নহে। ব্রাহ্মণের নিকট যাহা অঙ্গীকার করিবে, তাহা তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে অর্পণ করা উচিত। ব্রাহ্মণকে নিরাশ করা কোনক্রমেই কর্ত্তব্য নহে। প্রথমে আশা প্রদান করিয়া পরিশেষে হতাশ করিলে ব্রাহ্মণ পাবকের ন্যায় ক্রোধে প্রজ্বলিত হইয়া উঠেন। তিনি একবার ক্রোধদৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেই কাষ্ঠদহনের ন্যায় আশাবিঘাতককে এককালে ভস্মসাৎ করিতে পারেন। ব্রাহ্মণকে সন্তুষ্ট রাখিলে তিনি সর্ব্বদা মহা আহ্লাদ প্রকাশ করেন এবং সৰ্ব্বদা সমুদয় বিষয়ে চিকিৎসকের ন্যায় হিতকারী হয়েন।

“যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে প্রীত করিতে পারে, তাহার পুত্র, পৌত্র, বন্ধুবান্ধব, অমাত্য, পশু, নগর, জনপদ প্রভৃতি সমুদয় নিরাপদে অবস্থান করে। ব্রাহ্মণের তেজ সূৰ্য্যকিরণের ন্যায় তীব্র। অতএব ব্রাহ্মণের নিকট প্রতিশ্রুত হইয়া তাহা প্রদান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। ব্রাহ্মণকে দান করিলেই নিশ্চয়ই স্বর্গলাভ হয়। দান অপেক্ষা মহৎকাৰ্য্য আর কিছুই নাই। ইহলোকে ব্রাহ্মণকে দান করিলে পিতৃলোক ও দেবলোকের তৃপ্তিসাধন করা হয়। অতএব ব্রাহ্মণদিগকে দান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। ব্রাহ্মণই দানের প্রধান পাত্র। যে কোন সময়ে হউক না কেন, ব্রাহ্মণ গৃহে উপস্থিত হইলে তাঁহাকে পূজা না করিয়া বিদায় করা কদাপি বিধেয় নহে।”