1 of 4

১. আনুশাসনিকপাধ্যায়

১ম অধ্যায়

আনুশাসনিকপাধ্যায়

নারায়ণ, নরোত্তম নর ও দেবী সরস্বতীকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

রাজা যুধিষ্ঠির মহাত্মা ভীষ্মের নিকট আনুপূর্ব্বিক মোক্ষধর্ম্ম শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “পিতামহ! আপনি বহুবিধ সূক্ষ্ম শমগুণের কথা কীৰ্ত্তন করিলেন; কিন্তু আমি উহা বিশেষরূপে শ্রবণ করিয়াও শান্তিলাভে সমর্থ হইতেছি না। অজ্ঞাননিবন্ধন পাপানুষ্ঠান করিলে তদ্বিষয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তির শোক করা কর্ত্তব্য নহে, কিন্তু জ্ঞানপূৰ্ব্বক পাপাচরণ করিলে কিরূপে শান্তিলাভ হইতে পারে?

ভীষ্মের শরপীড়াসম্ভাবনায় যুধিষ্ঠিরের খেদ

“হে পিতামহ! আপনার কলেবর শরনিকরে ক্ষতবিক্ষত হইয়া সলিলধারাবাহী অচলের ন্যায় অনবরত রুধিরপ্রবাহ বৰ্ষণ করিয়া আমারই কুকৰ্ম্মের পরিচয় প্রদান করিতেছে। উহা দর্শন করিয়া আমি কোনক্রমেই শান্তিলাভে সমর্থ হইতেছি না। আপনি যে আমার নিমিত্তই এইরূপ দুরবস্থাগ্রস্ত হইয়াছেন, ইহা অপেক্ষা কষ্টকর আর কিছুই নাই। আমি আপনার এই অবস্থা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া বর্ষাসলিলসিক্ত পদ্মের ন্যায় নিতান্ত মসৃণভাব [মলিন ভাব-পদ্মের পরাগ বর্ষার ধারায় ধুইয়া গিয়া সৌগন্ধাদির অভাব ঘটায় পদ্মের প্রভাহানি হয়।] প্রাপ্ত হইয়াছি। আর এই সমস্ত মহীপাল আমারই নিমিত্ত পুত্র ও মিত্রগণের সহিত সমরশায়ী হইয়াছেন। ইহাদিগের এইরূপ দুরবস্থা স্মরণ করিয়া শোকাবেগে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে।

“হায়! আমরা উভয়পক্ষ ক্রোধের বশীভূত হইয়া এই গর্হিতাচরণ করিয়াছি। না জানি, এই পাপপ্রভাবে আমাদিগকে কি প্রকার দুর্গতিলাভ করিতে হইবে। দুর্য্যোধন আপনার এই দুরবস্থা দর্শন করিল না, ইহা তাহার অল্প সৌভাগ্যের বিষয় নহে। আমিই আপনার ও সুহৃদগণের এইরূপ বিপৎপাতের প্রধান কারণ। আমি আপনাকে বিষন্নবদনে শরশয্যায় শয়ান দেখিয়া যারপরনাই দুঃখিত হইতেছি। দুর্য্যোধন কুরুকুলের কলঙ্কস্বরূপ হইয়াও ভ্রাতৃবর্গ ও সৈন্যগণের সহিত ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মানুসারে সমরশয্যায় শয়ন করিয়া আমা অপেক্ষা সুখী হইয়াছে। আজ তাহাকে আপনার এই সমরশয্যা নিরীক্ষণ করিতে হইল না। অতএব এক্ষণে আমার এই প্রাণধারণ অপেক্ষা মৃত্যুলাভ করাই শ্রেয়। যদি আমি ভ্রাতৃগণের সহিত শত্ৰুশরে কলেবর পরিত্যাগ করিতাম, তাহা হইলে আমায় আপনাকে এইরূপ শরনিপীড়িত ও দুঃখিত দেখিতে হইত না। এক্ষণে বোধ হইতেছে, বিধাতা আমাদিগকে পাপানুষ্ঠান করিবার নিমিত্তই সৃষ্টি করিয়াছেন। যাহা হউক, আমরা যাহাতে পরলোকে এই পাপের হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারি, আপনি আমাদের হিতানুষ্ঠানবাসনায় তদ্বিষয়ে উপদেশ প্রদান করুন।

ভীষ্মসান্ত্বনা—কাল-মৃত্যু-ব্যাধ-গৌতমী-সৰ্পকথা

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! তুমি কাল, অদৃষ্ট ও ঈশ্বরের অধীন আত্মাকে কি নিমিত্ত পুণ্যপাপের কারণ বলিয়া অবগত হইতেছ? আত্মা কোন কার্য্যেরই কারণ হইতে পারে না। এই স্থলে কাল, ব্যাধ ও পন্নগের সহিত মৃত্যু ও গৌতমীর যেরূপ কথোপকথন হইয়াছিল, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

“পূৰ্ব্বকালে গৌতমীনামে শান্তিপরায়ণা এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী ছিলেন। অন্ধের যষ্ঠির ন্যায় তাঁহার একটিমাত্র পুত্র ছিল। একদা এক ভুজঙ্গ সেই পুত্রকে দংশন করাতে সে অবিলম্বে মৃত্যুমুখে নিপতিত হইল। ঐ সময় অর্জ্জুনকনামক এক ব্যাধ ক্রোধাবিষ্টচিত্তে সেই সর্পকে স্নায়ুপাশে [নাড়ীদ্বারা নির্ম্মিত রজ্জুতে] বদ্ধ করিয়া গৌতমীর নিকটে আগমনপূৰ্ব্বক কহিল, ভদ্রে! এই পন্নগাধম তোমার পুত্রকে দংশন করিয়াছে। এক্ষণে বল, ইহাকে কি প্রকারে বিনাশ করিব। এই শিশুঘাতী পাপাত্মার প্রাণরক্ষা করা কখনই কর্ত্তব্য নহে; অতএব শীঘ্র বল, ইহাকে হুতাশনে নিক্ষেপ করিব, না খণ্ড খণ্ড করিয়া ছেদন করিয়া ফেলিব?’

হিংসায় গৌতমীর উপেক্ষা–ব্যাধের আগ্রহ

“তখন গৌতমী কহিলেন, “অর্জ্জুনক! তুমি নিতান্ত নিৰ্ব্বোধ; ইহাকে পরিত্যাগ কর। কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি উৎকৃষ্ট লোকলাভের প্রত্যাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক আপনাকে পাপভারে নিপীড়িত করিয়া থাকে? যাঁহারা ধার্ম্মিক, তাঁহারা ভেলার ন্যায় অনায়াসেই দুঃখসাগর পার হইতে পারেন, কিন্তু যাহারা পাপভারে আক্রান্ত হইয়াছে, তাহারা সলিলনিক্ষিপ্ত শস্ত্রের ন্যায় দুঃখসাগরে নিমগ্ন হইয়া যায়। দেখ, এই ভুজঙ্গমকে বধ করিলে আমার পুত্র কদাচ জীবিত হইবে না এবং ইহার জীবনরক্ষা করিলেও আমার কিছুমাত্র ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা নাই; অতএব এরূপ স্থলে এই জীবিত জন্তুর প্রাণ বিনাশ করিয়া কে অনন্ত কালের নিমিত্ত নরকযন্ত্রণা ভোগ করিবে?’

“ব্যাধ কহিল, ‘দেবি! আমি তোমার গুণগ্রাম সবিশেষ অবগত আছি। গুরুলোকেরা স্বভাবতই পরদুঃখে দুঃখিত হইয়া থাকেন। কিন্তু তুমি যেরূপ কহিতেছ, উহা শোকশূন্য ব্যক্তির উপযুক্ত উপদেশ। এক্ষণে তুমি আমাকে আজ্ঞা কর, আমি এখনই এই দুষ্ট সর্পকে বিনাশ করিব। যাঁহারা শান্তগুণাবলম্বী তাঁহারাই উপস্থিত স্বপ্রিয় ঘটনাকে কালকৃত বিবেচনা করিয়া শোক পরিত্যাগ করিয়া থাকেন। কিন্তু যাঁহারা প্রতীকারপরায়ণ, তাঁহাদিগের শোকানল শত্রুনাশদ্বারাই নির্ব্বাণ হইয়া যায়। আর যাহারা এই উভয়গুণবিরহিত, তাহারা মোহবশতঃ প্রতিনিয়ত অপ্রিয়ের অনুশোচনা করিয়া থাকে। অতএব তুমি এই ভুজঙ্গকে বিনাশ করিয়া অবিলম্বে পুত্ৰবিনাশজনিত দুঃখ পরিত্যাগ কর।

“গৌতমী কহিলেন, ‘ব্যাধ! মাদৃশ ধর্ম্মাত্মাদিগের কদাচ কিছুমাত্র দুঃখ উপস্থিত হয় না। ধৰ্ম্মাত্মারা সততই বিবেক অবলম্বন করিয়া থাকেন। আমার এই পুত্ৰ মৃত্যুকর্ত্তৃক আক্রান্ত হইয়াছিল বলিয়া সর্প উহাকে দংশন করিয়াছে; সুতরাং আমি এক্ষণে কোন মতেই এই ভুজঙ্গের প্রাণসংহার করিতে পারি না। বিশেষতঃ ব্রাহ্মণের ক্রোধ করা কর্ত্তব্য নহে; ক্রোধ হইতে পীড়া উপস্থিত হইয়া থাকে। অতএব আমার এ বিষয়ে কিছুমাত্র ক্রোধ উপস্থিত হয় নাই। তুমি ক্ষমা অবলম্বনপূৰ্ব্বক এই ভুজঙ্গকে অচিরাৎ পরিত্যাগ কর।

“ব্যাধ কহিল, ‘ভদ্রে! শত্রুবিনাশদ্বারা যে ধনকীৰ্ত্তাদি লাভ হয়, তাহা অক্ষয়। শত্রুবিনাশে কালবিলম্ব করা কর্ত্তব্য নহে। বলবান্ শত্রুকে সংহার করিয়া অচিরাৎ ধনকীৰ্ত্তাদি লাভ করাই প্রশস্ত। যদি এই সর্প কালবশে বিনষ্ট হইয়া যায়, তাহা হইলে তোমার শুক্রক্ষয়জনিত শ্ৰেয়োলাভ হইবে বটে, কিন্তু সেই লাভ কখনই প্রশংসনীয় হইতে পারে না।

“গৌতমী কহিলেন, ‘ব্যাধ! এই ভুজঙ্গমকে বিনাশ করিয়া আমার কি প্রীতি ও ইহাকে দৃঢ়তর বন্ধন করিয়াই আমার কি ফললাভ হইবে? অতএব এই সর্পকে ক্ষমা করাই কৰ্ত্তব্য হইতেছে। মোক্ষলাভের নিমিত্ত যত্ন করা আমার সর্ব্বতোভাবে বিধেয়।

“ব্যাধ কহিল, ‘সুভগে! এই একমাত্র ভুজঙ্গমকে বিনাশ করিলে অনেক লোকের প্রাণরক্ষা হইবে। অতএব বহু লোকের জীবনরক্ষায় উপেক্ষা প্রদর্শনপূর্ব্বক ইহাকে রক্ষা করা কোনক্রমেই বিশুদ্ধ যুক্তির অনুমোদিত নহে। ধর্ম্মপরায়ণ মনুষ্যেরা অপরাধীর প্রাণদণ্ড করিয়া থাকেন। অতএব অবিলম্বে এই পাপকে বিনাশ করা উচিত।’

“গৌতমী কহিলেন, ‘ব্যাধ! এই সর্পের প্রাণসংহার করিলে আমার পুত্র কদাচ পুনর্জ্জীবিত হইবে না; আর ঐ কাৰ্য্যদ্বারা আমারও পুণ্যলাভের সম্ভাবনা নাই। অতএব তুমি অচিরাৎ এই জীবিত সর্পকে পরিত্যাগ কর।’

“ব্যাধ কহিল, ‘ভদ্রে! সুররাজ ইন্দ্র বৃত্তাসুরকে সংহার করিয়া শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াছেন এবং রুদ্রদেবও যজ্ঞ বিনষ্ট করিয়া যজ্ঞভাগ প্রাপ্ত হইয়াছেন। অতএব তুমি সুরগণের অনুকরণপূৰ্ব্বক অশঙ্কিতচিত্তে অবিলম্বে এই শত্রুকে বিনাশ কর।’

ব্যাধের সর্পবধে নিৰ্ব্বন্ধ—সর্প-ব্যাধসংবাদ

“ব্যাধ সর্পকে বিনাশ করিবার মানসে গৌতমীকে এইরূপ বারংবার কহিলেও তাঁহার মন কিছুমাত্র বিচলিত হইল না। ঐ সময় সেই পাশনিপীড়িত ভুজঙ্গম কথঞ্চিৎ ধৈৰ্য্যাবলম্বনপূৰ্ব্বক মৃদুস্বরে মনুষ্যভাষায় ব্যাধকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ‘অরে মূর্খ! এ বিষয়ে আমার অপরাধ কি? আমি পরাধীন; মৃত্যু আমাকে প্রেরণ করাতেই আমি এই শিশুকে দংশন করিয়াছি। অতএব এই শিশুর বিনাশনিবন্ধন যদি কাহাকেও দোষী হইতে হয়, তাহা হইলে মৃত্যুই এ বিষয়ে দোষী হইবে।

“লুব্ধক [ব্যাধি] কহিল, ‘সর্প! যদিও তুমি অন্যের বশবর্ত্তী হইয়া এই পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছ বটে; তথাপি তুমিও ইহার এক প্রধান কারণ বলিয়া তোমাকে দোষী হইতে হইবে। চক্র ও দণ্ডাদি যেমন মৃৎপাত্র নির্ম্মাণের কারণ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়, তদ্রূপ তুমিও এই বালকবিনাশের কারণ; অতএব যখন তুমি দোষী বলিয়া প্রতিপন্ন হইতেছ, তখন তোমাকে বিনাশ করা আমার অবশ্য কর্ত্তব্য।’

“সর্প কহিল, ‘লুব্ধক! চক্ৰদণ্ডাদি যেমন পরবশ, আমিও তদ্রূপ। সুতরাং কিরূপে আমাকে দোষী বলিয়া নির্দ্দেশ করিতেছ? আর যদিও তুমি আমাকে এ বিষয়ের কারণ বলিয়া নির্দ্দেশ কর, তাহা হইলেও আমাকে একাকী অপরাধী বলিয়া বিবেচনা করা তোমার কর্ত্তব্য নহে। চক্ৰদণ্ডাদি যেমন পরস্পর পরস্পরের প্রযোজক [নিয়োগকর্ত্তা—যোজনাকারী], তদ্রূপ আমি, কাল ও মৃত্যু প্রভৃতি আমরা সকলেই পরস্পর পরস্পরের প্রেরক। এইরূপ পরস্পর পরস্পরের প্রেরকত্বনিবন্ধন সকলের সহিত সকলেরই কাৰ্য্যকারণ ভাব সংঘটন হইতে পারে। সুতরাং এরূপ স্থলে আমি একাকী কখনই দোষী ও বধাহ বলিয়া গণ্য হইতে পারি না। অতএব যদি এ বিষয়ে দোষ স্বীকার কর, তাহা হইলে আমাদের সকলেরই দোষ হইতে পারে।’

“লুব্ধক কহিল, ‘সর্প! মৃত্যু যদিও এই কাৰ্য্যের প্রধান কারণ বটে, তথাপি তিনি কখন ইহার বিনাশকৰ্ত্তা নহেন। তুমিই ইহার বিনাশের প্রধান হেতু; সুতরাং তোমাকে সংহার করা আমার অবশ্য কর্ত্তব্য। লোক যদি অসৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াও পাপে লিপ্ত না হয়, তাহা হইলে শাস্ত্ৰসমুদয় বৃথা হইয়া যায় এবং নরপতিরাও তস্করাদির দণ্ডবিধান করিতে পারেন না।’

“সর্প কহিল, লুব্ধক! প্রযোজক [যিনি কাৰ্য্য করান, তিনি প্রযোজক, প্রযোজক মুখ্যকৰ্ত্তা; যিনি কাৰ্য্য করেন, তিনি প্রযোজ্য, প্রযোজ্য গৌণকর্ত্তা] কৰ্ত্তা বর্ত্তমান থাকিলেও প্রযোজ্য ব্যতীত ক্রিয়াসাধন হয় না। এই নিমিত্ত প্রযোজ্যকে আপাততঃ কার্য্যের সাধক বলিয়া বোধ করা যায়। এই শিশুবিনাশবিষয়ে আমি প্রযোজ্য বলিয়াই তুমি আমাকে দোষী বিবেচনা করিতেছ; কিন্তু বিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখিলে এ বিষয়ে আমাকে দোয়ী না বলিয়া বরং আমার প্রযোজক মৃত্যুকে দোষী বলিতে পার।

“লুব্ধক কহিল, ‘অরে পন্নগাধম! তুই নিতান্ত নিৰ্ব্বোধ, নৃশংস ও শিশুঘ্ন [শিশুঘাতী]। আমি তোকে নিশ্চয়ই বধ করিব। আর কেন বৃথা বাগ্‌জাল বিস্তার করিতেছিস?

“সর্প কহিল, ‘হে ব্যাধ! যেমন ঋত্বিকগণ যজমানকর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন বলিয়া তাঁহারা ফললাভে অধিকারী হয়েন না, আমিও তদ্রূপ মৃত্যুকর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া এই শিশুর প্রাণসংহার করিয়াছি বলিয়া কখনই এই পাপের ফলভাগী হইব না। মৃত্যু আমাকে প্রেরণ করাতেই আমি বালককে বিনাশ করিয়াছি; সুতরাং আমি কি নিমিত্ত দোষী হইব?’

মৃত্যুর আত্মদোষক্ষালন—সর্পমৃত্যুসংবাদ

“সর্প ও ব্যাধ পরস্পর এইরূপ বাগ্বিতণ্ডা [তর্কবিতর্ক] করিতেছে, এমন সময় মৃত্যু তথায় উপস্থিত হইয়া সৰ্পকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভুজঙ্গম! আমি কালকর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া তোমাকে প্রেরণ করিয়াছি। সুতরাং তুমি বা আমি আমরা কেহই এই শিশুর বিনাশের কারণ নহি। জলদজাল যেমন বায়ুর বশবর্ত্তী, আমিও তদ্রূপ কালের অধীন। এই ভূমণ্ডলে যে সমুদয় সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক জন্তু বিদ্যমান রহিয়াছে, তাহারা সকলেই কালের বশবর্ত্তী! স্বর্গ বা মর্ত্যভূমিতে যেসকল স্থাবরজঙ্গমাত্মক পদার্থ বিদ্যমান আছে, তৎসমুদয়ই কালের অধীন। ফলতঃ সমুদয় জগৎই কালের বশবর্ত্তী হইয়া রহিয়াছে। প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি উভয়েই কালের বশীভূত। কাল বারংবার সূৰ্য্য, চন্দ্র, বিষ্ণু, ইন্দ্র, জল, অগ্নি, আকাশ, পৃথিবী, মিত্র, অশ্বিনীকুমারযুগল, অদিতি, নদী, সমুদ্র, ঐশ্বৰ্য্য ও অনৈশ্বৰ্য্য এ সমুদয় সৃষ্টি এবং সংহার করিয়া থাকেন। হে ভুজঙ্গম! তুমি এই সমুদয় অবগত হইয়াও কি নিমিত্ত আমাকে দোষী বলিয়া স্থির করিতেছ? এক্ষণে যদি আমাকে দোষী বলিয়া বিবেচনা কর, তাহা হইলে তুমি যে নির্দ্দোষ, তাহার প্রমাণ কি?

“সর্প কহিল, ‘হে মৃত্যো! আমি আপনাকে দোষী বা নির্দ্দোষ বলিয়া উল্লেখ করিতেছি না। আমি এইমাত্র কহিতেছি যে, আপনিই আমাকে ঐ শিশু-বধার্থে নির্দ্দেশ করিয়াছেন। কালের দোষ থাকুক বা না থাকুক, আমি তাহার বিচারের কর্ত্তা নহি। এক্ষণে কেবল স্বদোষপ্রক্ষালন করা এবং আপনার প্রতি দোষারোপ না করাই আমার উদ্দেশ্য।

“পাশনিবদ্ধ ভুজঙ্গম মৃত্যুকে এই কথা কহিয়া ব্যাধকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিল, “বনচর! তুমি মৃত্যুর বাক্য শ্রবণ করিলে; অতএব নিরপরাধে আমাকে পাশবদ্ধ করা তোমার নিতান্ত অকৰ্ত্তব্য।’

“ব্যাধ কহিল, ‘সর্প! আমি তোমার ও মৃত্যুর উভয়েরই বাক্য শ্রবণ করিলাম; কিন্তু তোমার নির্দ্দোষিতা কোনরূপেই সপ্রমাণ হইতেছে না। মৃত্যু ও তুমি তোমরা উভয়েই এই বালকবধের কারণ হইয়াছ; তোমাদিগের তুল্য সাধুদিগের দুঃখকর, দুরাত্মা ও ক্রূর কেহই নাই। তোমাদিগকে ধিক্‌! আমি তোমাকে অবশ্যই নিপাতিত করিব।

“মৃত্যু কহিলেন, ‘নিষাদ [ব্যাধ]! আমাদিগকে কালের বশীভূত হইয়া কাৰ্য্য করিতে হয়; অতএব আমাদিগের প্রতি দোষারোপ করা তোমার কখনই কর্ত্তব্য নহে।’

“ব্যাধ কহিল, ‘মৃত্যো! যদি আমি তোমাদিগকে কালের বশবর্ত্তী বলিয়া তোমাদের প্রতি ক্রোধ না করি, তাহা হইলে ত’কোন ব্যক্তিরই উপকারীর প্রশংসা ও অপকারীর নিন্দা করা বিধেয় নহে।’

“মৃত্যু কহিলেন, ‘বনচর [ব্যাধ]! আমি ত’ পূর্ব্বেই তোমাকে কহিয়াছি যে, প্রাণীগণ যে কোন কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, কালই তাহাদিগকে সেই কার্য্যে প্রেরণ করিয়া থাকেন। ইহলোকে কালপ্রভাবে সমুদয় কার্য্য অনুষ্ঠিত হইতেছে, অতএব উপকারীর স্তুতি বা অপকারকের নিন্দা করা বুদ্ধিমান্ ব্যক্তির কর্ত্তব্য নহে। আমরা কালকর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়াই এইরূপ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছি, সুতরাং অনর্থক আমাদিগকে অপরাধী করা তোমার কোনক্রমেই উচিত হইতেছে না।’

কালের বাক্যে প্রশ্নমীমাংসা—কর্ম্মের প্রাধান্য

“মৃত্যু ব্যাধকে এইরূপ উপদেশ প্রদান করিতেছেন, এমন সময় কাল সেই স্থানে সমুপস্থিত হইয়া ব্যাধকে কহিলেন, ‘নিষাদ! কি আমি, কি মৃত্যু, কি সর্প আমরা কেহই এই বালক বিনাশবিষয়ে অপরাধী নহি। উহার পূর্ব্বানুষ্ঠিত কৰ্ম্মই আমাদিগকে উহার বিনাশসাধনে নিয়োগ করিয়াছে। ফলতঃ এই বালক স্বীয় কৰ্ম্মবশতঃ অকালে কালকবলে নিপতিত হইয়াছে; অতএব কর্ম্মকেই ইহার বিনাশের কারণ বলিতে হইবে। কৰ্ম্ম পুত্রের ন্যায় মনুষ্যকে পাপ হইতে পরিত্রাণ করিতে পারে এবং কৰ্ম্মই মনুষ্যের পাপপুণ্য প্রকাশ করিয়া দেয়। যেমন মনুষ্য কৰ্ম্মসমুদয়ের বশীভূত, কৰ্ম্মসমুদয়ও তদ্রূপ মনুষ্যের আয়ত্ত। কুম্ভকার যেমন মৃৎপিণ্ডদ্বারা স্বেচ্ছানুসারে ঘটশরাদি নির্ম্মাণ করে, তদ্রূপ মনুষ্য স্বেচ্ছানুসারে কাৰ্য্য করিতে পারে। ছায়া ও রৌদ্রের ন্যায় কর্ম্ম ও কৰ্ত্তা নিরন্তর পরস্পর সুসম্বদ্ধ রহিয়াছে। অতএব কি আমি, কি মৃত্যু, কি তুমি, কি ব্রাহ্মণী আমাদিগের মধ্যে কাহাকেও এই শিশুর বিনাশের কারণ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায় না। এই শিশু স্বয়ংই ইহার বিনাশের কারণ।’

‘কাল এই কথা কহিলে, বৃদ্ধা গৌতমী লোক সমুদয়কে কৰ্ম্মের বশবর্ত্তী অবগত হইয়া ব্যাধকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘অৰ্জ্জুনক! কাল, সর্প বা মৃত্যু আমার পুত্রের বিনাশের কারণ নহে। আমার সন্তান স্বীয় কৰ্ম্মদোষেই নিহত হইয়াছে; আমিও আপনার কৰ্ম্মবশতঃ পুত্রশোক প্রাপ্ত হইয়াছি। এক্ষণে কাল ও মৃত্যু যথাস্থানে গমন করুন এবং তুমিও ঐ সর্পকে পরিত্যাগ কর।’

“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহানুভবা ব্রাহ্মণী এই কথা কহিলে কাল ও মৃত্যু যথাস্থানে গমন করিলেন, অর্জ্জুনক ব্যাধ শোকবিহীন সর্পকে পরিত্যাগ করিল এবং গৌতমীও পুত্রশোক-পরিত্যাগপূৰ্ব্বক শান্তিলাভ করিলেন। অতএব তুমিও এক্ষণে মনুষ্যগণকে কর্ম্মের বশীভূত বিবেচনা করিয়া, শোকবিহীন হইয়া শান্তিলাভ কর। ইহলোকে সকলেই স্বকার্য্যনিবন্ধ প্রাণত্যাগ করিয়া থাকে। নরপতিগণ যে সংগ্রামে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তদ্বিষয়ে তোমার অথবা দুর্য্যোধনের কিছুমাত্র দোষ নাই। স্ব স্ব কর্ম্মবশতই তাঁহাদিগকে কালপ্রভাবে দেহত্যাগ করিতে হইয়াছে।”