৪র্থ অধ্যায়
বিশ্বামিত্ৰচরিত্র—গাধিবংশ বর্ণন
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বে বিশ্বামিত্র যেরূপে ব্রাহ্মণত্ব ও ব্রহ্মর্ষিত্ব লাভ করিয়াছিলেন, আমি তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“ভরতবংশে আজমীঢ়নামে এক ধর্ম্মপরায়ণ যাজ্ঞিক মহীপাল ছিলেন। তাঁহার আত্মজের নাম জহ্নু [গঙ্গা]। দেবী জাহ্নবী ঐ মহাত্মার দুহিতৃত্ব [কন্যাত্ব] স্বীকার করিয়াছিলেন। জহ্নুর সিন্ধুদ্বীপনামে গুণসম্পন্ন এক পুত্র উৎপন্ন হয়। সিন্ধুদ্বীপ হইতে মহাবল বলাকাশ্বের জন্ম হয়। বলাকাশ্বের বল্লভনামে সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মের ন্যায় এক পুত্র জন্মে। দেবরাজসদৃশ প্রভাব মহারাজ কুশিক সেই বল্লভের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। কুশিকের পুত্র শ্রীমান্ গাধি। গাধি নিঃসন্তান হওয়াতে সন্তানকামনায় অরণ্যবাস আশ্রম করিয়াছিলেন। সেই অরণ্যবাসকালে তাঁহার সত্যবতীনামে এক অলোকসামান্য রূপলাবণ্যসম্পন্না কন্যা জন্মে। কিয়দ্দিন পরে ঐ কন্যা যৌবনবতী হইলে মহর্ষি চ্যবনের আত্মজ তপঃপরায়ণ ঋচীক গাধির নিকট সত্যবতীকে বিবাহ করিবার নিমিত্ত প্রার্থনা করিলেন কিন্তু মহারাজা গাধি ঋচীককে দরিদ্র বিবেচনা করিয়া তাঁহার প্রার্থনায় সম্মত হইলেন না। গাধিরাজ অসম্মত হওয়াতে মহাত্মা ঋচীক ক্রূদ্ধ হইয়া তথা হইতে প্রত্যাগমন করিবার উপক্রম করিলেন। তখন মহারাজ গাধি তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘তপোধন। যদি আপনি আমাকে শুল্ক প্রদানে সমর্থ হয়েন, তাহা হইলে আমি আপনাকে কন্যা সম্প্রদান করিতে পারি।’
“তখন ঋচীক কহিলেন, ‘মহারাজ! আমি তোমাকে কি শুল্ক প্রদান করিব, তাহা তুমি অবিলম্বে ব্যক্ত কর।’ গাধি কহিলেন, ‘তপোধন! আপনি আমাকে চন্দ্ররশ্মির ন্যায় ধবল, বায়ুবেগগামী, শ্যামৈককর্ণ, সহস্র অশ্ব প্রদান করুন, তাহা হইলে আমি আপনাকে কন্যাদান করিব।
মহর্ষি ঋচীকের গাধিকন্যা সত্যবতীপরিণয়
গাধিরাজ এই কথা কহিলে মহাত্মা ঋচীক অচিরাৎ তাঁহার নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া জলাধিপতি বরুণের সন্নিধানে গমনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘দেব! আমি আপনার নিকট চন্দ্রকিরণের ন্যায় ধবল, বায়ুবেগগামী, শ্যামৈককর্ণ সহস্র অশ্ব ভিক্ষা করিতেছি, আপনি অনুকম্পা প্রদর্শনপূর্ব্বক আমাকে প্রদান করুন।’ ঋচীক এইরূপ প্রার্থনা করিবামাত্র জলেশ্বর তাঁহার প্রার্থনায় সম্মত হইয়া কহিলেন, ‘তপোধন! তুমি যে স্থলে ইচ্ছা করিবে, তথা হইতেই এইরূপ সহস্র অশ্ব উত্থিত হইবে।’ তখন মহর্ষি ঋচীক বরুণের নিকট হইতে বিদায় লইয়া কান্যকুব্জের অদূরে জাহ্নবীতীরে গমনপূৰ্ব্বক এই স্থান হইতে ‘অশ্ব সমুদয় উত্থিত হউক’ বলিয়া চিন্তা করিলেন। তিনি চিন্তা করিবামাত্র জাহ্নবী হইতে সহস্র অশ্ব সমুত্থিত হইল। যে স্থান হইতে ঐ সমস্ত অশ্ব উত্থিত হইয়াছিল, সেই স্থান অদ্যাপি অশ্বতীর্ণনামে প্রখ্যাত রহিয়াছে।
“অনন্তর মহর্ষি ঋচীক পরমপ্রীত হইয়া গাধির নিকট গমনপূৰ্ব্বক তাঁহাকে সেই সকল অশ্ব শুল্ক প্রদান করিলেন। মহারাজ গাধি তদ্দর্শনে যারপরনাই বিস্মিত ও পাপভয়ে নিতান্ত ভীত হইয়া আপনার দুহিতাকে বিবিধ অলঙ্কারে অলঙ্কৃত করিয়া ঋচীকের হস্তে সমর্পণ করিলেন। মহর্ষি ঋচীক শাস্ত্রানুসারে সত্যবতীর পাণিগ্রহণ করিলেন। সত্যবতী মহর্ষিকে পতিত্বে লাভ করিয়া সাতিশয় সন্তুষ্টচিত্তে তাঁহার শুশ্রূষা করিতে লাগিলেন।
সত্যবতীর পুত্র ও ভ্রাতৃলাভার্থ চরুদ্বয় দান
“একদা ঋচীক সহধর্ম্মিণীর আচার-ব্যবহারে পরমপ্রীত ও প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, ‘প্রিয়ে! আমি তোমাকে বর প্রদান করিতেছি, তোমার অচিরে এক পুত্র উৎপন্ন হইবে।’ তখন সত্যবতী মাতৃসন্নিধানে গমন করিয়া নম্রমুখে ভর্ত্তার বর প্রদানবৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করিলেন। গাধিরাজমহিষী কন্যার বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বৎসে! তোমার ভর্ত্তা আমাকেও এক পুত্ররত্ন প্রদান করিয়া অনুগ্রহ প্রদর্শন করুন। সেই মহাতপাঃ নিশ্চয়ই আমাকে পুত্র প্রদান করিতে সমর্থ হইবেন।’
“জননী এই কথা কহিলে সত্যবতী দ্রুতপদসঞ্চারে স্বামিসন্নিধানে গমন করিয়া তাঁহার নিকট মাতার অভিলাষ ব্যক্ত করিলেন। মহর্ষি ঋচীক পত্নীর বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ‘প্রিয়ে! তোমার জননী আমার অনুকম্পায় অচিরাৎ এক গুণবান্ পুত্র প্রসব করিবেন। তুমি তোমার মাতার নিমিত্ত আমার নিকট যাহা প্রার্থনা করিলে, আমি কদাচ তাহা নিষ্ফল করিব না। আর আমি সত্যই কহিতেছি, তোমার গর্ভে আমার বংশধর এক গুণবান্ শ্রীমান্ পুত্র উৎপন্ন হইবে। তোমার জননী ঋতুস্নাতা হইয়া অশ্বত্থবৃক্ষ ও তোমাকে ঋতুস্নানের পর উড়ম্বরবৃক্ষ আলিঙ্গন করিতে হইবে। আর আমি মন্ত্রপূত করিয়া এই দুইটি চরু প্রদান করিতেছি, এই দুইটি তোমাকে ও তোমার জননীকে যথাক্রমে ভক্ষণ করিতে হইবে; তাহা হইলে তোমাদের উভয়েরই গর্ভসঞ্চার হইবে।’ মহর্ষি এই বলিয়া কাহাকে কোন্ চরুটি ভক্ষণ করিতে হইবে, তাহা নির্দ্দিষ্ট করিয়া দিলেন।
“তখন সত্যবতী পরম পরিতুষ্ট হইয়া জননীর নিকট আগমনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মাতঃ! মহর্ষি ঋচীক আমাকে এই চরুদ্বয় প্রদান করিয়াছেন। আমাদিগকে এই দুইটি ভক্ষণ এবং ঋতুস্নানের পর তোমাকে অশ্বখবৃক্ষ ও আমাকে উডুম্বরবৃক্ষ আলিঙ্গন করিতে হইবে।’ সত্যবতী এই কথা কহিলে মাতা তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বৎসে! আমি তোমার স্বামী অপেক্ষা পূজ্যতর; অতএব তুমি আমায় প্রতিপালন কর। তোমার স্বামী, যে এই মন্ত্রপূত চরুদ্বয় প্রদান করিয়াছেন, ইহার মধ্যে তোমার চরুটি আমাকে সমর্পণ ও আমার চরুটি তুমি স্বয়ং গ্রহণ কর এবং তিনি তোমাকে যে বৃক্ষ আলিঙ্গন করিতে কহিয়াছেন, আমি সেই বৃক্ষ আলিঙ্গন করিব এবং আমাকে যেটি আলিঙ্গন করিতে কহিয়াছেন, তুমি সেইটি আলিঙ্গন করিও। মহর্ষি নিশ্চয়ই স্বয়ং উৎকৃষ্ট পুত্রলাভের মানসে তোমাকে উৎকৃষ্ট চরু প্রদান ও উৎকৃষ্ট বৃক্ষ আলিঙ্গন করিতে উপদেশ করিয়াছেন। সুতরাং আমি তোমার চরু ভক্ষণ ও তোমার বৃক্ষ আলিঙ্গন করিলে নিশ্চয়ই আমার উৎকৃষ্ট পুত্র হইবে। তুমিও বহুদিনের পর মনোহর সহোদর সন্দর্শন করিয়া যারপরনাই প্রীতিলাভ করিবে।
চরুবিপর্য্যয়ে সন্তানবিপর্য্যয়
“অনন্তর সত্যবতী ও তাঁহার মাতা উভয়ে চরু ও বৃক্ষের বিপৰ্য্যাস [পৰ্য্যবাস—উল্টা-পাল্টা] করিয়া ভক্ষণ ও আলিঙ্গন করিলেন। কিয়দ্দিন পরে উভয়েরই গর্ভসঞ্চার হইল। অনন্তর একদা মহর্ষি ঋচীক স্বীয় পত্নীর গর্ভের লক্ষণ অবলোকন করিয়া উদ্বিগ্নচিত্তে কহিলেন, ‘প্রিয়ে! আমার স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, তোমরা বৃক্ষ ও চরুর বিপৰ্য্যাস করিয়াছ। আমি চরু প্ৰস্তুত করিবার সময় তোমার গর্ভে ত্রৈলোক্যবিখ্যাত ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ ও তোমার জননীর গর্ভে মহাবলপরাক্রান্ত ক্ষত্রিয় উৎপন্ন হইবেন মনে করিয়া তোমার চরুতে ব্রহ্মতেজ ও তোমার জননীর চরুতে ক্ষত্রিয়তেজ নিবেশিত করিয়াছিলাম। কিন্তু তোমরা পরস্পর চরু ও বৃক্ষের বিপৰ্য্যাস করাতে এক্ষণে নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে যে, তোমার মাতার গর্ভে এক শ্রেষ্ঠতম ব্রাহ্মণ উৎপন্ন হইবেন এবং তুমি অতি উগ্ৰকৰ্ম্মা ক্ষত্রিয়কুমার প্রসব করিবে। যাহা হউক, তুমি মাতৃস্নেহনিবন্ধন চরু ও বৃক্ষের বিপৰ্য্যাস করিয়া উৎকৃষ্ট কার্য্যের অনুষ্ঠান কর নাই।
“ঋচীক এই কথা কহিবামাত্র পতিপ্ৰাণা সত্যবতী দুঃখে একান্ত অধীর হইয়া ছিন্নমূলা লতার ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে সংজ্ঞালাভপূৰ্ব্বক ভর্ত্তার চরণে নিপতিত হইয়া কহিলেন, ‘নাথ! আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া এই বর প্রদান করুন যেন, আমার গর্ভে ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মাক্রান্ত সন্তান সমুৎপন্ন না হয়। বরং আমার পৌত্র ক্ষত্রিয়ের ন্যায় উগ্রকর্ম্মা হয়, ক্ষতি নাই। তখন মহাতপাঃ ঋচীক ‘তথাস্তু’ বলিয়া স্বীয় ভাৰ্য্যাকে বর প্রদান করিলেন।
পুত্ররূপে পরশুরাম ভাতৃরূপে বিশ্বামিত্রজন্ম
“অনন্তর যথাসময়ে সত্যবতী জমদগ্নিকে এবং গাধিরাজপত্নী বিশ্বামিত্রকে প্রসব করিলেন।
“হে মহারাজ! এই কারণে মহাতপাঃ বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয়বংশে জন্মপরিগ্রহ করিয়াও ব্রাহ্মণত্ব ও বেদজ্ঞতা লাভ করিয়া ব্রাহ্মণবংশের প্রতিষ্ঠাতা হইয়াছিলেন। তাঁহার পুত্রগণও বিকুলপরিবর্দ্ধক, তপস্বী, বেদজ্ঞ ও গোত্রকর্ত্তা ছিলেন। ভগবান মধুছন্দ, দেবব্রত, অক্ষীণ, শকুন্ত, বস্তু, কালপথ, যাজ্ঞবল্ক্য, স্থূল, উলূক, মুদগল, সৈন্ধবায়ন, বল্গুজঙ্ঘ, গালব, রুচিব, সালঙ্কায়ন, লীলাঢ্য, নারদ, কর্চ্চামুখ, বাহুলি, মুষল, বক্ষোগ্রীব, অনেকনেসম্পন্ন আঙ্ঘিক, শিলাযূপ, চক্র, মারুতন্তব্য, বাত, অশ্বলায়ন, শ্যামায়ন, গার্গ্য, জাবালি, শুশ্রুত, কারীষি, সংশ্রুত্য, পর, পৌরব, তন্তু, কপিল, তাড়কায়ন, উপগহন, অসুরায়ণি, শার্দ্দূলায়ন, মার্গকৃষি, হিরণ্যাক্ষ, জঙ্ঘারি, বাদ্ৰবায়ণি, সূতি, বিভূতি, সূত, সুরকৃৎ, অরণিনাচিক, চাম্পেয়, উজ্জয়ন, নবতন্তু, ববনখ, শয়ন, যতি, অম্ভোরুহ, মৎস্যাশী, শিরীষী, গর্দ্দভী, উৰ্দ্ধযোনি, উদাপেক্ষী ও নারদী প্রভৃতি মহাত্মারা বিশ্বামিত্রের পুত্র। উহারা সকলেই বেদজ্ঞ। মহাতপাঃ বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয়কুলে জন্মপরিগ্রহ করিয়া কেবল মহর্ষি ঋচীকের অনুগ্রহে ব্রাহ্মণ্যত্ব লাভ করিয়াছিলেন।
“এই আমি তোমার নিকট মহর্ষি বিশ্বামিত্রের জন্মবৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করিলাম, এক্ষণে তোমার অন্যান্য যে যে বিষয়ে সন্দেহ উপস্থিত হয়, কীৰ্ত্তন কর, আমি তৎসমুদয় দূর করিব।”
