1 of 4

৪৯. পুত্রদিগের প্রকারভেদ

৪৯তম অধ্যায়

পুত্রদিগের প্রকারভেদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কিদৃশী ভাৰ্য্যাতে কিদৃশ পুত্র উৎপন্ন হয়, পুত্র কয় প্রকার এবং অধ্যাঢ়াদি [অধ্যোঢ় প্রভৃতি] পুত্রে কাহার অধিকার? পুত্রের নিমিত্ত মানবগণের সতত বিবাদ উপস্থিত হইয়া থাকে; অতএব আপনি ঐ সমুদয় সবিশেষ কীৰ্ত্তন করিয়া আমার সংশয়চ্ছেদন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ঔরসজাত পুত্র আত্মস্বরূপ। যে স্ত্রী স্বামীর আজ্ঞানুসারে অন্য পুরুষদ্বারা পুত্র উৎপাদন করে, তাহার সেই পুত্র নিরুক্তজ-এবং যে স্ত্রী স্বামীর অনুমতিনিরপেক্ষ হইয়া জার[৩]দ্বারা পুত্র উৎপাদন করে তাহার সেই পুত্র প্রসূতিজ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। পতিত ব্যক্তি স্বীয় ভাৰ্য্যার গর্ভে পুত্র উৎপাদন করিলে ঐ পুত্র পতিতজ বলিয়া অভিহিত হয়। বিনামূল্যে অন্য হইতে যে পুত্রকে লাভ করা যায়, তাহাকে দত্তক পুত্র এবং মূল্যদ্বারা যে পুত্রকে প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাকে ক্রীতপুত্র বলিয়া কীৰ্ত্তন করা যাইতে পারে। যদি কোন ব্যক্তি গর্ভবতী স্ত্রীর পাণিগ্রহণ করে, তাহা হইলে ঐ স্ত্রীর ঐ গর্ভজাত পুত্রকে অধ্যুঢ় কহে। অবিবাহিতা কুমারীর গর্ভজাত পুত্রকে কানীন বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। এই সমুদয় ভিন্ন ছয় প্রকার অপধ্বংসজ পুত্র ও ছয় প্রকার অপসদ পুত্র আছে।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কিদৃশ পুত্রগণকে অপধ্বংসজ ও অপসদ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়, আপনি তাহা সবিস্তর আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ব্রাহ্মণজাতি ক্ষত্রিয়, বৈশ্যা ও শূদ্রা এই তিন স্ত্রীর গর্ভে যে ত্রিবিধ পুত্র, ক্ষত্রিয়ের অপর দুই স্ত্রীর গর্ভে যে দ্বিবিধ পুত্র এবং বৈশ্যজাতি শূদ্রার গর্ভে যে একবিধ পুত্র উৎপাদন করে, পণ্ডিতেরা সেই ছয় প্রকার পুত্রকেই অপধ্বংসজ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। শূদ্ৰজাতি ব্রাহ্মণীর গর্ভে যে পুত্র উৎপাদন করে, তাহাকে চণ্ডাল, ক্ষত্রিয়ের গর্ভে যে পুত্ৰ উৎপাদন করে, তাহাকে ব্রাত্য এবং বৈশ্যার গর্ভে যে পুত্র উৎপাদন করে, তাহাকে চেল বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে। বৈশ্যজাতি হইতে ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত পুত্র মাগধ ও ক্ষত্রিয়ার গর্ভজাত পুত্র বালক বলিয়া অভিহিত হয় এবং ক্ষত্রিয়ের ঔরসে ও ব্রাহ্মণীর গর্ভে যে পুত্র উৎপন্ন হয়, সে পুত্র সূত বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। পণ্ডিতেরা এই ছয় প্রকার পুত্রকেই অবসদ বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। এই আমি তোমার নিকট ছয় প্রকার অপধ্বংসজ ও ছয় প্রকার অপসদ পুত্রের বিষয় কীৰ্ত্তন করিলাম।”

যুধিষ্ঠির বলিলেন, “পিতামহ! যদি কেহ পরস্ত্রীতে পুত্র উৎপাদন করে, তাহা হইলে সেই পুত্রের অধিকারী কে হইবে?”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যদি কেহ পরস্ত্রীর গর্ভে পুত্র উৎপাদন করে, তাহা হইলে সেই পুত্ৰ উৎপাদকেরই হইবে; কিন্তু যদি উৎপাদক ঐ পুত্রকে পরিত্যাগ করে, তাহা হইলে ঐ পুত্র যাহার গর্ভে জন্মিবে, তাহার পাণিগ্রহীতার হইবে। আর যদি কেহ কোন গর্ভবতী কামিনীর পাণিগ্রহণ করে, তাহা হইলে ঐ গর্ভজাত পুত্র উৎপাদকর্ত্তৃক পরিত্যক্ত না হইলেও ঐ কামিনীর পাণিগ্রহীতার হইবে।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আমি বাল্যাবধি অবগত আছি যে, আপনার স্ত্রীতেই হউক, বা পরস্ত্রীতেই হউক, যে ব্যক্তি রেতঃসেক করে, ঐ রেলতাজনিত পুত্র তাহারই হইয়া থাকে। কিন্তু আপনি যে এক্ষণে কহিলেন, লোক পরস্ত্রীর গর্ভে পুত্রোৎপাদন পূৰ্ব্বক তাহাকে পরিত্যাগ করিলে তাহার জননীর পাণিগ্রহীতার হইবে এবং যদি কেহ গর্ভবতী রমণীর পাণিগ্রহণ করে, তাহা হইলে ঐ গর্ভসঞ্জাত পুত্র পাণিগ্রহীতার হইবে, ইহার কারণ কি?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যদি কেহ পরস্ত্রীর গর্ভে পুত্রোৎপাদনপূৰ্ব্বক কোন কারণবশতঃ তাহাকে পরিত্যাগ করে, তাহা হইলে ঐ পরিত্যক্ত পুত্রে তাহার অধিকার থাকিবার সম্ভাবনা কি? আর যদি কেহ পুত্রলাভার্থী হইয়া গর্ভবতী কামিনীর পাণিগ্রহণ করে, তাহা হইলে ঐ গর্ভজাত পুত্র তাহার হইবে না কেন? ঐ গর্ভজাত পুত্রে যদিও উহার উৎপাদকের সম্পূর্ণ লক্ষণ লক্ষিত হয়, তাহা হইলেও ঐ পুত্র উহার জননীর পাণিগ্রহীতারই হইবে। ঐরূপ পুত্রকে অধ্যোঢ় পুত্র কহে। কৃতক পুত্রে উৎপাদক বা জননীর কিছুমাত্র অধিকার নাই; যে ব্যক্তি তাহাকে গ্রহণ ও ভরণপোষণ করে, সে তাহারই হয়।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, পিতামহ! কৃতক পুত্র কি প্রকার?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যে পুত্রকে তাহার উৎপাদক বা জননী গুপ্তভাবে পরিত্যাগ করে, সেই পুত্রকে যদি কেহ দয়াপরবশ হইয়া গ্রহণ ও লালনপালন করে এবং ঐ সময় অনুসন্ধান করিয়াও তাহার উৎপাদক জননীর নির্ণয় করিতে পারে, তাহা হইলে ঐ পুত্র গ্রহীতার কৃতক পুত্র হয়।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কৃতক পুত্রের নামকরণ, বিবাহ ও অন্যান্য সংস্কার কিরূপে সম্পাদিত হইবে?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যদি ঐ পুত্রের নামকরণাদি সংস্কারের পূর্ব্বে গ্রহীতা উহার জননীর গোত্র ও বর্ণাদি অবগত হয়েন, তাহা হইলে তিনি ঐ গোত্র অনুসারে তাহার নামকরণাদি সংস্কার ও ঐ বর্ণের কন্যার সহিত তাহার বিবাহ সম্পাদন করিবেন, আর যদি তিনি তাহার জননীর গোত্র ও বর্ণাদি পরিজ্ঞাত না হয়েন, তাহা হইলে আপনার গোত্রানুসারেই ঐ পুত্রের নামকরণাদি সংস্কার সম্পাদনপূৰ্ব্বক আপনার বর্ণের কন্যার সহিত বিবাহ দিবেন। অধ্যোঢ় ও কানীন এই উভয়বিধ পুত্র অতি নিকৃষ্ট। ব্রাহ্মণাদি বর্ণচতুষ্টয় ঐ উভয়বিধ পুত্র এবং ক্ষেত্ৰজ ও অপসদ পুত্রের নামকরণাদি সংস্কার আপনাদের গোত্রানুসারে সম্পাদিত করিবেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার প্রশ্নানুরূপ উত্তর প্রদান করিলাম। অতঃপর আর তোমার কি শ্রবণ করিতে অভিলাষ আছে, প্রকাশ কর।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *