1 of 4

৩৭. পূজ্য-পাত্রনিরূপণ

পূজ্য-পাত্রনিরূপণ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! অদৃষ্টপূৰ্ব্ব, চিরাশ্রিত ও দূর হইতে অভ্যাগত এই ত্রিবিধ ব্যক্তির মধ্যে কাহাকে সৎপাত্র বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়, তাহা আপনি কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! উহারা সকলেই সৎপাত্র। উহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ গার্হস্থ্য ও কেহ কেহ সন্ন্যাসধৰ্ম্ম আশ্রয় করিয়া থাকেন। উহাদিগকে প্রার্থনারূপ দান করা অবশ্য কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম; কিন্তু ভৃত্যবর্গকে কষ্ট প্রদান করিয়া দান করা নিতান্ত অনুচিত। যে ব্যক্তি ভৃত্যবর্গকে কষ্ট প্রদান করে, তাহাকে অবশ্যই ক্লেশভাগী হইতে হয়।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! প্রাণীগণের ক্লেশ ও ধৰ্ম্মহিংসা করিয়া, কাহাকে দান করিলে উৎকৃষ্ট ফললাভ হয়?”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ঋত্বিক, পুরোহিত, আচার্য্য, শিষ্য, সম্বন্ধী ও বান্ধবগণ অসূয়াবিহীন ও জ্ঞানবান্ হইলেই সম্মানাস্পদ ও দানের যোগ্যপাত্র হইয়া থাকেন। কিন্তু যাঁহারা জ্ঞানী ও অসূয়া বিহীন নহেন, তাঁহাদিগকে দান বা সৎকার করা নিতান্ত অকৰ্ত্তব্য; অতএব স্থিরচিত্তে মানবগণকে সবিশেষ পরীক্ষা করা আবশ্যক। যে ব্যক্তি অক্রোধ, সত্যবাক্য, অহিংসা, তপস্যা, সরলতা, অদ্রোহ, লজ্জা, তিতিক্ষা, জিতেন্দ্রিয়তা ও শম এই সমুদয় গুণে অলঙ্কৃত হয়েন এবং কখন কোন কুকার্য্যের অনুষ্ঠান না করেন, তিনিই যথার্থ সম্মানের পাত্র। কি চিরাশ্রিত, কি অভ্যাগত, কি অদৃষ্টপূৰ্ব্ব, কি দৃষ্টপূৰ্ব্ব যে কোন ব্যক্তিই হউন না কেন, ঐ সমুদয় গুণে সমলঙ্কৃত হইলেই তিনি সম্মানের ভাজন হইতে পারেন। বেদের অপ্রমাণ্যনির্দ্দেশ [মিথ্যাত্ব প্রতিপাদন], শালঙ্ঘন ও সামাজিক নিয়মভঙ্গ করিলেই মনুষ্য অসৎপাত্র বলিয়া পরিগণিত হয়। যে সমুদয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতাভিমানী, বেদনিন্দুক, শ্রুতিবিরোধী, কুতর্কে অনুরক্ত, আক্রোশনিরত, বহুভাষী, সর্ব্বাভিশঙ্কী [সৰ্ব্ববিষয়ে সংশয়যুক্], মূঢ়, অব্যবস্থিতচিত্ত [অস্থিরমতি] ও কটুভাষী হয়, তাহাদিগকে স্পর্শ করাও কৰ্ত্তব্য নহে। পণ্ডিতেরা ঐরূপ ব্রাহ্মণগণকে কুক্কুরতুল্য বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। যেমন কুক্কুরগণ চীৎকার ও অন্যকে বধ করিবার চেষ্টা করে, তদ্রূপ উহারাও কেবল বৃথা বাগ্‌জালবিস্তার ও সমুদয় শাস্ত্রের উচ্ছেদ করিবার চেষ্টা করিয়া থাকে। যে সমুদয় ব্রাহ্মণ শিষ্টব্যবহার, ধর্ম্ম ও শমদমাদি গুণ আশ্রয় করেন, তাঁহারা বহুকাল উন্নতভাবে বর্ত্তমান থাকেন। যাঁহারা যজ্ঞ দ্বারা দেবঋণ, বেদাধ্যয়ন দ্বারা ঋষিঋণ, ব্রাহ্মণভোজন দ্বারা বিপ্রঋণ ও আতিথ্য দ্বারা অতিথিঋণ হইতে মুক্ত হইয়া যত্নপূৰ্ব্বক সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করেন, তাঁহাদিগকে কখনই ধৰ্ম্মভ্রষ্ট হইতে হয় না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *