1 of 4

৮. ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব—ভীষ্মের ব্রাহ্মণপ্রিয়তা

৮ম অধ্যায়

ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব—ভীষ্মের ব্রাহ্মণপ্রিয়তা

মহাত্মা ভীষ্ম এইরূপ ধৰ্ম্মসংযুক্ত বাক্য প্রয়োগ করিলে ধর্ম্মাত্মা যুধিষ্ঠির পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “পিতামহ। ইহলোকে পূজনীয় কে? আপনি কাহাকে নমস্কার করেন? আপনার প্রিয়তরই বা কে এবং বিপদে নিপতিত হইলে কাহার প্রতি আপনার মন প্রধাবিত হয়?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ব্রহ্মই যাঁহাদিগের পরম ধন, যাঁহারা স্বাধ্যায়লব্ধ আত্মপ্রত্যয়দ্বারা অপার আনন্দ অনুভব করিয়া থাকেন, যাঁহাদিগের কুলে বালক বৃদ্ধ প্রভৃতি সকলেই পুরুষপরম্পরাগত কাৰ্য্যভার অক্লেশে বহন করেন, আমি সেই ব্রাহ্মণদিগকে যারপরনাই প্রিয়তর জ্ঞান করিয়া থাকি। বিদ্যাবিনীত, জিতেন্দ্রিয়, মৃদুভাষী, সচ্চরিত্র, ব্রহ্মজ্ঞ ও বক্তা ব্রাহ্মণগণের গভীর স্বরযুক্ত শ্রুতিসুখকর মঙ্গলজনক বাক্য সভামধ্যে নৃপতির সমক্ষেই উচ্চারিত হইয়া থাকে। ঐ সমস্ত বাক্য শ্রবণ করিলে ইহলোকে ও পরলোকে সুখসমৃদ্ধি বৃদ্ধি হয়, সন্দেহ নাই। যাঁহারা সেই রাজসভায় আসীন হইয়া ঐ সকল বাক্য শ্রবণ করেন, আমি সেই সমস্ত গুণবান্ ব্যক্তিদিগকেও প্রিয়তর জ্ঞান করিয়া থাকি। যিনি ব্রাহ্মণগণের তৃপ্তিসাধনের নিমিত্ত পূতমনে সুপক্ক সুস্বাদু অন্ন প্রদান করেন, তিনিও আমার প্রেমাস্পদ।।

“যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করা বিস্ময়ের বিষয় নহে, কিন্তু অসূয়াশূন্য হইয়া দান করাই সুকঠিন। এই জীবলোকে মহাবলপরাক্রান্ত বহুসংখ্যক বীর আছেন, কিন্তু তাঁহাদিগের মধ্যে দানবীরই সৰ্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। হে যুধিষ্ঠির! সৎকুলসম্ভূত ধর্ম্মপরায়ণ তপস্বী বিদ্বান্ ব্রাহ্মণের কথা দূরে থাকুক, আমি যদি একজন সামান্য ব্রাহ্মণ হইতাম, তাহা হইলেও আপনাকে কৃতার্থ বিবেচনা করিতাম। অন্যান্য সর্ব্বাপেক্ষা তুমিই আমার প্রিয়; কিন্তু ব্রাহ্মণেরা তোমা অপেক্ষাও আমার প্রিয়তর। অধিক কি, আমি ব্রাহ্মণগণকে যেরূপ প্রিয়তর জ্ঞান করি, পিতা, পিতামহ ও অন্যান্য সুহৃদ্‌গণকেও সেরূপ জ্ঞান করি না। এক্ষণে এই ব্রাহ্মণভক্তিপ্রভাবে মহারাজ শান্তনু যে সমস্ত লোকে বিরাজিত রহিয়াছেন, আমারও যেন সেই সকল লোক লাভ হয়।

“আমি কখন ব্রাহ্মণগণের উদ্দেশে কায়মনোবাক্যে অল্প বা অধিকই হউক, যে কিছু সৎকৰ্ম্ম করিয়াছি, সেই কাৰ্য্যপ্রভাবেই আজ শরশয্যায় শয়ান হইয়াও আমার অন্তঃকরণে কিছুমাত্র অনুতাপের সঞ্চার হইতেছে না। লোকে আমাকে যে ব্রাহ্মণপ্রিয় বলিয়া আহ্বান করে, আমি সেই বাক্যে যারপরনাই প্রীতিলাভ করিয়া থাকি। ফলতঃ ব্রাহ্মণপ্রীতি অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পবিত্রতা আর কিছুই নাই। আমি ব্রাহ্মণগণের দাস; এই নিমিত্ত অচিরাৎ অনন্তকালের নিমিত্ত পবিত্র লোকসমুদয় লাভ করিব সন্দেহ নাই। এই জীবলোকে স্ত্রীজাতির যেমন পতিসেবাই পরমধৰ্ম্ম, পতিই পরমদেবতা ও পতিই পরমগতি, সেইরূপ ক্ষত্রিয়কুলের ব্রাহ্মণসেবাই পরমধৰ্ম্ম, ব্রাহ্মণই পরমদেবতা ও ব্রাহ্মণই পরমগতি। যদি ক্ষত্রিয় শতবর্ষবয়স্ক আর ব্রাহ্মণ দশবর্ষীয় হয়েন, তাহা হইলেও ঐ উভয়ের মধ্যে ব্রাহ্মণকেই পিতা ও ক্ষত্রিয়কে পুত্র বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে। নারী যেমন পতির অভাবে দেবরকেই পতিত্বে স্বীকার করে, সেইরূপ পৃথিবী ব্রাহ্মণকে প্রাপ্ত না হইয়াও ক্ষত্রিয়কে পতিত্বে বরণ করিয়াছে। অতএব তুমি ব্রাহ্মণকে পুত্রের ন্যায় রক্ষণাবেক্ষণ, গুরুর ন্যায় উহাদিগের উপদেশবাক্য শ্রবণ ও অগ্নির ন্যায় উঁহাদিগের অর্চ্চনা করিবে।

“সরলপ্রকৃতি, সত্যপরায়ণ, সাধুশীল, সৰ্ব্বভূতহিতানুষ্ঠান নিরত ব্রাহ্মণগণকে ক্রোধোদ্ধত ভুজঙ্গের ন্যায় নিরীক্ষণ করা কৰ্ত্তব্য। তাঁহাদিগের নিকট আপনার ক্রোধবল ও তেজোবল প্রদর্শন করা কদাপি বিধেয় নহে। ব্রাহ্মণের তপোবলই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ, আর ক্ষত্রিয়ের ক্রোধবলই সর্ব্বোৎকৃষ্ট; এই উভয়বিধ বলই অতি ভয়ঙ্কর। তপস্বী ব্রাহ্মণেরা ক্রোধাবিষ্ট হইলে অনায়াসে শত্রুবিনাশাদি বিষয়ে চরিতার্থতা লাভ করিতে সমর্থ হয়েন। ক্ষত্রিয় উপকারনিরত শান্তস্বভাব ব্রাহ্মণের প্রতি আপনার তেজোবল প্রদর্শন করিলে ঐ ব্রাহ্মণ তাঁহার ঐ উভয় বল নিঃশেষে বিনাশ করিতে পারেন, সন্দেহ নাই। গোপালক যেমন দণ্ড গ্রহণপূৰ্ব্বক গোসমুদয়কে রক্ষা করে, সেইরূপ ক্ষত্রিয় দণ্ডধারণপূর্ব্বক প্রতিনিয়ত বেদ ও ব্রাহ্মণগণকে রক্ষা করিবেন। পিতা যেমন পুত্রগণকে প্রতিপালন করেন, সেইরূপ ব্রাহ্মণগণের রক্ষণাবেক্ষণ ও তাঁহাদিগের জীবিকানির্ব্বাহোপযোগী অর্থ আছে কি না, তাহার তত্ত্বাবধারণ করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য।”