৩য় অধ্যায়
যুধিষ্ঠিরের বিশ্বামিত্রব্রাহ্মণত্ব-শ্রবণেচ্ছা
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যদি ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই তিন বর্ণের ব্রাহ্মণ্যলাভ করিবার অধিকার নাই, তবে ক্ষত্রিয় কুলোদ্ভব মহাত্মা বিশ্বামিত্র কিরূপে ব্রাহ্মণ্যত্বলাভ করিলেন, তাহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে।
‘অমিতপরাক্রম মহাত্মা বিশ্বামিত্র তপোবলে মহর্ষি বশিষ্ঠের শতপুত্রের যুগপৎ প্রাণসংহার এবং ক্রোধাবিষ্ট হইয়া কালান্তক যমোপম অসংখ্য রাক্ষসের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তাহা হইতে ইহলোকে ব্রহ্মর্ষিগণসঙ্কুল পবিত্র কুশিকবংশ সংস্থাপিত হইয়াছে, ঋচীকপুত্র মহাতপাঃ শুনঃশেফ মহারাজ অম্বরীষের যজ্ঞে ব্যাধরূপে পরিগণিত হইলে ঐ মহাত্মাই তাঁহাকে মুক্ত করিয়াছিলেন। হরিশ্চন্দ্র আত্মাতেজঃপ্রভাবে যজ্ঞে দেবগণকে পরিতুষ্ট করিয়া ঐ মহাত্মার পুত্রত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ঐ মহর্ষির পঞ্চাশৎপুত্র দেবরাজকে জ্যেষ্ঠভ্রাত বলিয়া নমস্কার না করাতে উঁহারা অভিশাপে চণ্ডালত্ব লাভ করেন। ইক্ষ্বাকুকুলোদ্ভব মহারাজ ত্রিশঙ্কু গুরুকর্ত্তৃক অভিশপ্ত ও বন্ধুবান্ধব পরিত্যক্ত হইয়া দক্ষিণদিক্ অবলম্বনপূৰ্ব্বক অধোমুখে অবস্থান করিলে ঐ কুশিকবংশাবতংস মহানুভবই তাঁহাকে স্বর্গারূঢ় করেন। ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি ও অমরগণনিষেবিত পবিত্র কৌশিকীনদী তীর্থ বলিয়া বিখ্যাত আছে। রম্ভানাম্নী অপ্সরা ঐ মহাত্মার তপোভঙ্গ করিবার নিমিত্ত উঁহার তপোবনে সমুপস্থিত হইয়া উঁহার শাপে শিলাময়ী হইয়াছিল। পূৰ্ব্বে মহর্ষি বশিষ্ঠ ঐ মহাত্মার ভয়ে আপনাকে পাশাবদ্ধ করিয়া এক নদীমধ্যে নিমগ্ন ও কিয়ৎপরে পাশবিমুক্ত হইয়া উহা হইতে উত্থিত হয়েন। সেই নদী অদ্যাপি বিপাশানামে বিখ্যাত রহিয়াছে। মহাত্মা বিশ্বামিত্র ত্রিশঙ্কুর যাজনক্রিয়া সম্পাদনপূৰ্ব্বক বশিষ্ঠপুত্রগণ কর্ত্তৃক অভিশপ্ত হইয়া দেবরাজ ইন্দ্রের স্তব করিলে তিনি প্রীতমনে তাঁহাকে শাপ হইতে মুক্ত করিয়াছিলেন। সেই কুশিকবংশতিলক মহাত্মা উত্তরদিক্ অবলম্বন করিয়া মহারাজ উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব ও ব্রহ্মর্ষিগণমধ্যে সৰ্ব্বদা তারারূপে শোভা পাইতেছেন। আমি তাঁহার এই সমুদয় কাৰ্য্য পর্য্যালোচনা করিয়া যারপরনাই কৌতূহলাক্রান্ত হইয়াছি। অতএব ঐ মহাত্মা ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণপূৰ্ব্বক দেহান্তর প্রাপ্ত না হইয়াই কিরূপে ব্রাহ্মণ্যত্ব লাভ করিলেন? মতঙ্গ ব্রাহ্মণীর গর্ভে শূদ্রের ঔরসে জন্মগ্রহণপূৰ্ব্বক চণ্ডালত্ব প্রাপ্ত হইয়া যারপরনাই যত্ন করিয়াও ব্রাহ্মণ্যত্বলাভে সমর্থ হয়েন নাই; কিন্তু বিশ্বামিত্রের কিরূপে উহা লাভ হইল, তাহা আপনি আমার নিকট সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”
