1 of 4

৪২. গুরুপত্নীর আদেশে বিপুলের পুষ্পহরণ

৪২ম অধ্যায়

গুরুপত্নীর আদেশে বিপুলের পুষ্পহরণ

ভীষ্ম কহিলেন, “অনন্তর মহাত্মা বিপুল ঘোরতর তপানুষ্ঠানপুৰ্ব্বক ‘আমি সিদ্ধ হইয়াছি ও উভয় লোক পরাজয় করিয়াছি’ বিবেচনা করিয়া মহা স্পর্দ্ধাসহকারে নির্ভীকচিত্তে পৃথিবী পর্য্যটন করিতে আরম্ভ করিলেন। কিয়ৎকাল পরে রুচির জ্যেষ্ঠা ভগিনী, অঙ্গরাজ চিত্ররথির সহধর্ম্মিণী প্রভাবতীর ভবনে একটি মহোৎসব উপস্থিত হইল। প্রভাবতী সেই উপলক্ষ্যে স্বীয় ভগিনী রুচিকে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন। ইতঃপূৰ্ব্বে এক দিব্যাঙ্গনা মনোহর বেশ ধারণ করিয়া আকাশপথে গমন করিতেছিল। তাহার অঙ্গ হইতে সহসা কতকগুলি দিব্যগন্ধযুক্ত কুসুম দেবশর্ম্মার আশ্রমের অনতিদূরে কাননমধ্যে নিপতিত হয়। ঋষিপত্নী রুচি স্বামীর সহিত ঐ কাননে ভ্রমণ করিতে করিতে ঐ সমুদয় পুষ্প দর্শন করিয়া গ্রহণ করিয়াছিলেন। এক্ষণে তিনি ভগিনীকর্ত্তৃক নিমন্ত্রিত হইয়া সেই পুষ্প মস্তকে বিন্যস্ত করিয়া অঙ্গরাজভবনে গমন করিলেন।

“অঙ্গরাজপত্নী প্রভাবতী সেই পুষ্প দর্শন করিয়া রুচিকে কহিলেন, ভগিনি! তুমি আশ্রমে গমনপূর্ব্বক আমার নিমিত্ত এই প্রকার পুষ্প পাঠাইয়া দিবে; কোনক্রমে বিস্মৃত হইও না।

“অনন্তর রুচি ভগিনীর আবাস হইতে স্বীয় আশ্রমে সমুপস্থিত হইয়া ভর্ত্তার নিকট ভগিনীর অনুরোধ নিবেদন করিলেন। তখন মহর্ষি দেবশর্ম্মা স্বীয় শিষ্য বিপুলকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, ‘বৎস! তুমি অবিলম্বে এইরূপ পুষ্প আহরণার্থ গমন কর।’ তখন মহাতপাঃ বিপুল গুরুবাক্য শ্রবণমাত্র যে প্রদেশে সেই দিব্যপুষ্প নিপতিত হইয়াছিল, তথায় গমন করিলেন এবং দেখিলেন, ঐ স্থানে আরও অনেকগুলি সেইরূপ পুষ্প নিপতিত রহিয়াছে। তৎসমুদয়ের মধ্যে একটিও ম্লান হয় নাই। মহাত্মা বিপুল সেই অপরিপ্লান [অমলিন—টাটকা] দিব্যগন্ধযুক্ত কুসুমগুলি প্রাপ্ত হইয়া মহা-আহ্লাদে চম্পকবনাকীর্ণ চম্পানগুরীতে প্রত্যাগমনে প্রবৃত্ত হইলেন।

নিজদোষশ্রবণভীত বিপুলের গুরু-আশ্রয়

“অনন্তর কিয়দ্দূর আগমন করিয়া দেখিলেন, সেই নির্জ্জন বনে এক নরমিথুন পরস্পর পরস্পরের হস্ত ধারণ করিয়া চক্রের ন্যায় পরিভ্রমণ করিতেছে। তন্মধ্যে একটি ঐ সময় অপেক্ষাকৃত শীঘ্র গমন করিল। অপরটি তদ্দর্শনে তাহাকে কহিল, তুমি কি নিমিত্ত শীঘ্র গমন করিলে?’ সে কহিল, ‘আমি আমার নিয়মানুসারে গমন করিয়াছি, শীঘ্র গমন করি নাই।’ এইরূপে পরস্পর উত্তর-প্রত্যুত্তর করিতে করিতে তাহাদের ঘোরতর কলহ উপস্থিত হইল। তখন তাহারা উভয়েই এই শপথ করিল যে, ‘আমাদিগের মধ্যে যে মিথ্যা কথা কহিয়াছে, তাহার যেন পরলোকে দ্বিজবর বিপুলের ন্যায় দুর্গতিলাভ হয়।’

‘নরমিথুন এইরূপ শপথ করিলে, মহাত্মা বিপুল তাহাদের বাক্য শ্রবণ করিয়া বিষণ্নবদনে মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, ‘আমি অতিকষ্টে কঠোর তপানুষ্ঠান করিয়াছি; কিন্তু এই নরমিথুনের বাক্যশ্রবণে বোধ হইতেছে, আমার নিতান্ত দুর্গতিলাভ হইবে। ঐ নরমিথুন যে আমাকে পাপকারী বলিয়া স্থির করিয়াছে, ইহার কারণ কি? আমি কি দুষ্কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছি?’ মহাত্মা বিপুল এইরূপ চিন্তা করিয়া বিষণ্নমনে স্বীয় দুষ্কৃত-বিষয়ের অনুধ্যান করিতে লাগিলেন। কিয়ৎকাল পরে অন্য ছয়জন মনুষ্য তাঁহার নেত্রপথে নিপতিত হইল। উহারা হর্য্যলোভের বশীভূত হইয়া সুবর্ণ ও রজতময় অক্ষদ্বারা ক্রীড়া করিতেছিল। উহারা ক্রীড়া করিতে করিতে শপথ করিয়া কহিল যে, আমাদিগের মধ্যে যে ব্যক্তি লোভবশতঃ অন্যায়াচরণ করিবে, তাহার পরলোকে বিপুলের ন্যায় দুর্গতি লাভ হইবে।’

“ঐ ছয় ব্যক্তি ঐরূপ শপথ করিলে, মহাত্মা বিপুল আপনাকে পাপকারী স্থির করিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু আপনার জন্মাবধি. কোন পাপই তাঁহার স্মৃতিপথে সমুদিত হইল না। পরিশেষে বহুদিবসের পর তাঁহার মনোমধ্যে উদয় হইল যে, ‘আমি ইন্দ্র হইতে গুরুপত্নী রুচিকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত তাঁহার শরীরমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছিলাম; কিন্তু গুরুর নিকট উহা ব্যক্ত করি নাই। তাহাতেই আমার ঘোরতর পাপ হইয়াছে।’

‘মহাত্মা বিপুল মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া চম্পানগরীতে আগমনপূৰ্ব্বক উপাধ্যায়কে এই পুষ্প দান এবং যথানিয়মে তাঁহার পূজা করিলেন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *