১৪শ অধ্যায়
শঙ্কর-উপাসনায় কৃষ্ণের সৎপুত্রলাভ-বৃত্তান্ত
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি সুরাসুরগুরু বিশ্বরূপ সর্ব্বান্তৰ্য্যামী ভূতভাবন ভগবান মহাদেবের নাম ও ঐশ্বৰ্য্যসমুদয় অবগত আছেন। এক্ষণে ঐ সমুদয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! সেই ভগবান্ মহাদেবের গুণসমুদয় কীৰ্ত্তন করা আমার সাধ্য নহে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও ইন্দ্রাদি দেবগণের সৃষ্টিকৰ্ত্তা সেই ভগবান্ সৰ্ব্বগত হইয়াও সৰ্ব্বত্র লক্ষিত হয়েন না। তিনি প্রকৃতি ও পুরুষ হইতে অতীত বলিয়া ব্রহ্মাদি পিশাচ পৰ্য্যন্ত সকলেই তাঁহার উপাসনা করিয়া থাকেন। তত্ত্বদর্শী যোগবিদ্ মহর্ষিগণ কেবল সেই সূক্ষ্ম অথচ স্থূল, অক্ষর পরব্রহ্মস্বরূপ মহাদেবেরই চিন্তা করেন। ঐ দেবদেব প্রথমে আত্মতেজঃপ্রভাবে প্রকৃতি ও পুরুষকে নির্ম্মাণ করিয়া তদ্বারা প্রজাপতি ব্রহ্মার সৃষ্টি করিয়াছেন। জন্ম, জরা ও মরণের বশীভূত মাদৃশ মানবগণ কখনই সেই মহাত্মা মহেশ্বরকে পরিজ্ঞাত হইয়া তাঁহার গুণকীর্ত্তন করিতে সমর্থ হয় না। কেবল এই যদুকুলশ্রেষ্ঠ শঙ্খচক্রগদাধর ভগবান্ বাসুদেবই দিব্যচক্ষুদ্বারা তাঁহাকে দর্শন করিতে পারেন। মহাত্মা বাসুদেব বদরিকাশ্রমে সহস্র বৎসর কেবল সেই সনাতন মহেশ্বরের আরাধনা করিয়াই তাঁহার প্রসাদে জগদ্ব্যাপ্ত ও সৰ্ব্বভূতের প্রিয়তম হইয়াছেন। ইনি প্রতিযুগেই অবিচলিত ভক্তিপ্রভাবে সেই চরাচরগুরু দেবদেব মহাদেবের প্রীতিসম্পাদন করিয়া থাকেন। ইনি পুত্রলাভের অভিলায়ে সেই দেবদেবের আরাধনায় নিযুক্ত হইয়া তাঁহার ঐশ্বর্য্য প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। ঐ মহাত্মার তুল্য শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই। কেবল মহাবাহু ভগবান্ বাসুদেবই সেই সনাতন দেবদেবের নাম, গুণ ও ঐশ্বৰ্য্যসমুদয়ের বিষয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিতে পারেন।”
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মহাত্মা ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে এই কথা কহিয়া ভগবান্ বাসুদেবকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “মহাত্মন্! মহারাজ যুধিষ্ঠিরের ভূতপতি ভগবান্ ভবানীপতির মাহাত্ম্য শ্রবণ করিতে অভিলাষ হইয়াছে। অতএব তুমি তাহা উহার নিকট কীৰ্ত্তন কর। পূৰ্ব্বে ব্রহ্মযোনি মহাতপা তণ্ডী ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মার নিকট ভগবান্ ভূতনাথের সহস্রনাম কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন। এক্ষণে এই বেদব্যাস প্রভৃতি মহর্ষিগণ তোমার মুখে সেই সনাতন, আনন্দময়, জ্ঞানস্বরূপ, বিশ্বস্রষ্টা, ভগবান্ দেবদেবর মাহাত্ম্য শ্রবণ করুন।”
বাসুদেব কহিলেন, “শান্তনুতনয়! যখন ব্রহ্মাদি দেবতা ও তত্ত্বদর্শী মুনিগণ সেই ভূতভাবন ভগবান্ মহেশ্বরের কাৰ্য্যগতি ও আদি অন্ত পরিজ্ঞাত হইতে পারেন না, তখন মনুষ্য কিরূপে উহা সম্পূর্ণরূপে পরিজ্ঞাত হইবে? যাহা হউক, আমি এক্ষণে সেই অসুরনাশন ভগবান্ যজ্ঞপতির যৎকিঞ্চিৎ গুণ আপনাদিগের নিকট কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।”
ভগবান্ বাসুদেব এই বলিয়া পবিত্রচিত্তে আচমনপূর্ব্বক মহাত্মা যুধিষ্ঠির, ভীষ্ম ও মহর্ষিগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে মহাশয়গণ! পূর্ব্বে আমি শাম্বকে লাভ করিবার নিমিত্ত যোগবল আশ্রয় করিয়া যেরূপে ভগবান্ ভূতনাথের দুর্ল্লভ সাক্ষাৎকার লাভ করিয়াছিলাম, অগ্রে তাহা আপনাদিগের নিকট নিবেদন করিয়া পশ্চাৎ তাঁহার নামসমুদয় কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
‘মহাবীর প্রদ্যুম্নকর্ত্তৃক শম্বরদৈত্য নিহত হইবার দ্বাদশ বৎসর অতীত হইলে একদা জাম্ববতী রুক্মিণীর গর্ভজাত প্রদ্যুম্ন, চারুদেষ্ণ প্রভৃতি পুত্রগণকে দর্শনপূৰ্ব্বক পুত্রার্থিনী হইয়া আমার নিকট আগমন করিয়া কহিলেন, ‘নাথ! আপনি অবিলম্বে আমাকে একটি মহাবলপরাক্রান্ত আপনার তুল্য গুণবান্ পরমসুন্দর পুত্র প্রদান করুন। ত্রিলোকমধ্যে আপনার কিছুই অসাধ্য নাই। আপনি ইচ্ছা করিলে নূতন লোকসমুদয়েরও সৃষ্টি করিতে পারেন। পূৰ্ব্বে আপনি যেরূপে দ্বাদশ বর্ষ কঠোর ব্রত অনুষ্ঠানপূর্ব্বক ভগবান পশুপতির আরাধনা করিয়া তাঁহার প্রসাদে রুক্মিণীর গর্ভে চারুদেষ্ণ, সুচারু, চারুবেশ, যশোধর, চারশ্রবা, চারুযশা, প্রদ্যুম্ন ও শম্ভু এই কয়েকটি মহাবলপরাক্রান্ত পুত্র উৎপাদিত করিয়াছেন, এক্ষণে আমাকেও সেইরূপে একটি পুত্র প্রদান করিতে হইবে। জাম্ববতী এইরূপ অনুরোধ করিলে, আমি তাঁহাকে কহিলাম, ‘দেবি! আমি তোমার বাক্যানুসারে মহাদেবের আরাধনা করিতে চলিলাম; তুমি প্রফুল্লচিত্তে অনুমতি কর। তখন জাম্ববতী কহিলেন, ‘নাথ! আপনি নিঃশঙ্কচিত্তে ভূতভাবন ভবানীপতির আরাধনা করিতে গমন করুন। ব্রহ্মা, শিব, কশ্যপ, চন্দ্র, সূৰ্য্য, অগ্নি, সাবিত্রী, ব্রহ্মবিদ্যা এবং নদী, ক্ষেত্র, ওষধি, যজ্ঞবাহ, বেদ, ঋযি, যজ্ঞ, সমুদ্র, দক্ষিণা, স্তোভ, নক্ষত্র, পিতৃলোক, গ্রহ, দেবপত্নী, দেবকন্যা, দেবমাতা, মন্বন্তর, গো, ঋতু, বৎসর, ণ, লব, মুহূৰ্ত্ত, নিমেষ ও যুগসমুদয় আপনাকে রক্ষা করিবেন। কোন স্থানেই আপনার কোন বিপদ উপস্থিত হইবে না।
তপস্যার্থ কৃষ্ণের হিমালয়যাত্রা
“রাজপুত্রী জাম্ববতী এইরূপে প্রস্থানকালীন মঙ্গলাচরণ করিলে আমি পিতা, মাতা ও মাতামহ উগ্রসেনের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাদিগের অনুজ্ঞা গ্রহণ করিলাম। তৎপরে আমি গদ ও বলদেবের নিকট সমুপস্থিত হইয়া ঐ বিষয় তাঁহাদিগেরও গোচর করিলে তাঁহারা পরমপ্রীত হইয়া কহিলেন, ‘ভ্রাতঃ! আমরা প্রার্থনা করি, নির্ব্বিঘ্নে তোমার তপস্যার ফললাভ হউক। এইরূপে গুরুজনেরা সকলেই অনুজ্ঞা প্রদান করিলে আমি গরুড়কে স্মরণ করিবামাত্র বিহগরাজ আমার নিকট সমুপস্থিত হইয়া আমাকে লইয়া হিমালয়পর্ব্বতে সমুপস্থিত হইল। আমি তথায় অবতীর্ণ হইয়া চতুর্দ্দিকে অতি অদ্ভুত ভাবসমুদয় অবলোকন করিতে করিতে মহাত্মা উপমন্যুর অতি আশ্চৰ্য্য আশ্রম নিরীক্ষণ করিলাম। ঐ আশ্রম বেদাধ্যয়নশব্দে প্রতিধ্বনিত, গন্ধৰ্ব্ব ও দেবগণে সমাকীর্ণ এবং ধব [শাকট—সেওড়া], অর্জ্জুন [অৰ্জ্জুনবৃক্ষ], কদম্ব, নারিকেল, কুরুবক, কেতকী, জম্বু, পাটল [পারুল], বট, বরুণ [তমাল], বৎসনাভ [বিষবৃক্ষ], বিল্ব, সরল, কপিত্থ [কয়েদবেল], পিয়াল, শাল, তাল, বদরী, ইঙ্গুদ, পুন্নাগ, অশোক, তাম্র, মাধবীলতা, মধূক, কোবিদার, চম্পক, পনস ও ফলপুষ্পসুশোভিত অন্যান্য নানাবিধ বন্য বৃক্ষে পরিপূর্ণ।
“কোন স্থান গুল্ম ও লতাতে, কোন স্থান কদলীবনে, কোন স্থান নানাবিধ পক্ষীর জীবনোপায়ভূত বিবিধ ফলশালী বৃক্ষে, কোন স্থান ভস্মরাশিতে, কোন স্থান দিব্যসরোবরে এবং কোন স্থান বিচিত্রকুসুমাকীর্ণ বিশাল অগ্নিকুণ্ডে পরিশোভিত রহিয়াছে। রুরু, বানর, শার্দ্দূল, সিংহ, দ্বীপী, হরিণ, ময়ূর, মার্জ্জার, ভুজঙ্গম, মহিষ, ভল্লুক, মদমত্ত হস্তী ও অন্যান্য নানাবিধ পশুগণ উহার চতুর্দ্দিকে অবস্থান করিতেছে। বিহঙ্গমগণ বিবিধ স্বরে পরমকুতূহলে নিরন্তর কলরব করিতেছে। সমীরণ বিবিধ পুষ্পরেণু ও গজগণ্ডস্থল মদগন্ধে সুবাসিত হইয়া মন্দ মন্দ সঞ্চারিত হইতেছে। দিব্যাঙ্গনাগণ মধুরস্বরে গান করিতেছে। নির্ঝরকুলের ঝর্ঝরশব্দ, কুঞ্জরগণের বৃংহিতধ্বনি, কিন্নরদিগের সুমধুর গীতশব্দ ও সামবেদজ্ঞদিগের বেদধ্বনি ঐ আশ্রমকে সতত প্রতিধ্বনিত করিতেছে। পবিত্রতোয়া জহ্নুকন্যা উহাতে নিয়ত বিরাজমান রহিয়াছেন। চীরচৰ্ম্মবল্কলধারী, অগিতুল্য, তেজস্বী, পরমধার্ম্মিক, বাতাহারী, অম্বুপায়ী [জলপায়ী], জপ্যনিত্য [সৰ্ব্বদা জপকারী], সংপ্রক্ষাল [সর্ব্বদা জলবাসী], ধ্যাননিত্য [সৰ্ব্বদা ধ্যানরত], ধূমপ্রাশ [যজ্ঞধূমপায়ী], ঊষ্মপ, ক্ষীরপ, গোচারী, অশ্মকুট্ট, দন্তোলূখল, মরীচিপ [সূর্য্যকিরণপায়ী], ফেনপ, মৃগচারী, অশ্বত্থফলভক্ষণ ও উদকশায়ী তাপসগণ প্রতিনিয়ত ঐ আশ্রমে তপস্যা করিতেছেন। শিবাদি দেবগণ সতত উহাতে বিদ্যমান রহিয়াছেন এবং মহাত্মাদিগের প্রভাবে নকুলগণ সর্পকুলের সহিত ও ব্যাঘ্রগণ মৃগসমুদয়ের সহিত মিত্রভাবে ক্রীড়া করিতেছে।
উপমন্যুর উপদেশযুক্ত রুদ্রমাহাত্ম্যবশ্রণ
‘‘আমি এইরূপে বেদবেদাঙ্গপারগ নিয়মপরায়ণ মহর্ষিগণসেবিত পরমরমণীয় সেই আশ্রমের বিবিধ পদার্থ অবলোকন করিতে করিতে তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়া জটাজুটমণ্ডিত, চীরধারী, তপস্বী, তেজঃপ্রদীপ্তকলেবর, শিষ্যগণপরিবৃত, শান্তস্বভাব, যুবা উপমন্যুকে অবলোকনপূৰ্ব্বক অভিবাদন করিলাম। মহাত্মা উপমন্যু আমাকে নিরীক্ষণ করিয়া প্রীতমনে কহিলেন, ‘বাসুদেব! তুমি নির্ব্বিঘ্নে আসিয়াছ ত’? তুমি স্বয়ং পূজনীয় হইয়া যে আমাকে পূজা করিতেছ এবং অন্যের দর্শনীয় হইয়াও যে আমাকে দর্শন করিতে আসিয়াছ, ইহাদ্বারা স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, আমার তপস্যা ফলিত হইয়াছে।’ তখন আমি কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহার মঙ্গলবার্ত্তা জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলাম, ‘ভগবন্! আপনার শিষ্য এবং আশ্রমস্থ মৃগ ও পক্ষিগণ ত’ নির্ব্বিঘ্নে আছে? আপনার ধর্ম্ম ও অগ্নিত্রয়ের ত’ কুশল?’
“আমি এইরূপ কুশলপ্রশ্ন করিলে মহাত্মা উপমন্যু আমার বাক্যে প্রত্যুত্তর প্রদান করিয়া কহিলেন, ‘বাসুদেব! তুমি অবিলম্বেই আপনার অনুরূপ পুত্র লাভ করিবে, সন্দেহ নাই। এই তপোবনে ভগবান্ ব্যোমকেশ দেবী পার্ব্বতীর সহিত নিরন্তর বিহার করিয়া থাকেন। তুমি কঠোর তপানুষ্ঠানপূর্ব্বক তাঁহাকে প্রসন্ন কর, তাহা হইলেই তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে। পূৰ্ব্বে দেবতা ও ঋষিগণ তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য, সত্য ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহদ্বারা সেই দেবাদিদেবকে প্রসন্ন করিয়া স্ব স্ব অভিলষিত বর প্রাপ্ত হইয়াছেন। তিনি তেজ ও তপস্যার নিধিস্বরূপ। সেই অচিন্ত্যস্বভাব এই স্থানে শুভাশুভ ভাবসমুদয় সৃষ্টি ও সংহার করিয়া দেবী পার্ব্বতীর সহিত অবস্থান করিয়া থাকেন। মহাবলপরাক্রান্ত দানবরাজ হিরণ্যকশিপু ঐ ভগবানের বরপ্রভাবে দেবরাজ্য অধিকার করিয়া দশকোটি বৎসর উপভোগ করিয়াছিলেন। তাঁহার আত্মজ মন্দর ঐ দেবদেবের বরপ্রভাবে সুররাজ ইন্দ্রের সহিত দশকোটি বৎসর ঘোরতর সংগ্রাম করেন।
“ঐ মন্দরের কলেবরে তোমার সুদর্শনচক্র ও ইন্দ্রের ভয়ঙ্কর বজ্ৰ জীর্ণ তৃণের ন্যায় ব্যর্থ হইয়াছিল। পূৰ্ব্বে ভগবান্ উমাপতি ঐ চক্ৰদ্বারা সলিলমধ্যস্থ এক অসুরকে সংহার করিয়াছিলেন। তিনি অসুরবিনাশার্থই ঐ চক্র নির্ম্মাণ করেন। উহা জ্বলনতুল্য নিতান্ত দুর্নিরীক্ষ্য। রুদ্রদেব ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তি উহা অবলোকন করিতে সমর্থ নহে। ঐ চক্র অসাধারণ তেজঃসম্পন্ন বলিয়া ভগবান্ উমানাথ স্বয়ং উহার নাম সুদর্শন রাখিয়াছেন এবং তদবধি উহার ঐ নাম লোকমধ্যে প্রখ্যাত হইয়া গিয়াছে। পূৰ্ব্বে সেই অদ্ভুত চক্রও মন্দরের প্রতি প্রযুক্ত হইয়া নিষ্ফল হইয়াছিল। ফলতঃ মন্দর রুদ্রদেবের বরপ্রভাবে বজ্র প্রভৃতি সুতীক্ষ্ণ অস্ত্রসমুদয় অনায়াসে সহ্য করিত। দেবগণ ঐ দুর্দ্দান্ত দানবকর্ত্তৃক নিপীড়িত হইয়া অসুরগণের সহিত তুমুল কলহে প্রবৃত্ত হন। ভগবান্ উমাপতি বিদ্যুৎপ্রভের প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে ত্রিলোকের আধিপত্য ও শতলক্ষ পুত্র প্রদান করিয়াছিলেন। বিদ্যুৎপ্রভ তাঁহার প্রসাদে ত্রৈলোক্যৈশ্বর্য্য লাভ করিয়া লক্ষ বৎসর ভোগ করেন। উঁহারই প্রসাদে কুশদ্বীপ বিদ্যুৎপ্রভের রাজধানী হইয়াছিল। অবশেষে তিনি শঙ্করের অনুচরত্ব লাভ করিয়াছিলেন।
“প্রজাপতি ব্রহ্মা শতমুখনামে এক অসুরকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন। ঐ মহাবলপরাক্রান্ত অসুর মহাদেবের তুষ্টিসম্পাদনের নিমিত্ত শত বৎসরেরও অধিক কাল আপনার দেহমাংস হুতাশনে আহুতি প্রদান করিয়াছিল। পরিশেষে ভগবান শূলপাণি তাহার সেই অসাধারণ ভক্তিদর্শনে তাহার প্রতি যারপরনাই সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, ‘শতমুখ! আমি তোমার কি উপকারসাধন করিব, তাহা প্রকাশ কর।’ তখন শতমুখ কহিল, ‘ভগবন! আপনার প্রসাদে আমার যেন সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা জন্মে এবং শাশ্বত ব্রহ্মবিদ্যা যেন আমার অন্তরে নিরন্তর প্রতিভাত হয়।’ তখন শূলপাণি তাহার বাক্যে সম্মত হইয়া ‘তথাস্তু’ বলিয়া তাহাকে বর প্রদান করিলেন। পূৰ্ব্বে প্রজাপতি ব্রহ্মা যোগবল অবলম্বনপূৰ্ব্বক পুত্রলাভের নিমিত্ত্ব তিনশত বৎসরব্যাপী এক যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। মহাদেব তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হইয়া যজ্ঞশীল সহস্র পুত্র প্রদান করেন। সুরগণপ্রশংসিত পরমধার্ম্মিক যোগেশ্বর যাজ্ঞবল্ক্য ও মহর্ষি বেদব্যাস মহাদেবের আরাধনা করিয়া তাঁহার প্রসাদে অতুল যশ লাভ করিয়াছিলেন।
“পূৰ্ব্বে সুররাজ ইন্দ্র বালখিল্যগণকে মহর্ষি কশ্যপের যজ্ঞে পলাশবৃন্ত [পলাশপাতার বোঁটা] আহরণ করিতে দেখিয়া, উপহাস করাতে তাঁহারা ক্রোধাবিষ্ট হইয়া দ্বিতীয় ইন্দ্র সৃষ্টি করিবার বাসনায় তপানুষ্ঠানপূর্ব্বক মহাদেবকে সন্তুষ্ট করিয়াছিলেন। দেবাদিদেব বালখিল্যগণের প্রতি প্রসন্ন হইয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, ‘তোমাদের তপোবলে অচিরাৎ এক পক্ষীন্দ্রের সৃষ্টি হইবে। সে ইন্দ্রকে পরাভব করিবে, সন্দেহ নাই।’ পূৰ্ব্বে মহাদেবের রোষপ্রভাবে সলিলসমুদয় বিনষ্ট হইয়া গিয়াছিল। দেবগণ তদ্দর্শনে ঐ দেবাদিদেবের উদ্দেশে সপ্তকপালযজ্ঞের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক তাঁহাকে প্রসন্ন করিয়া পুনরায় ভূলোকমধ্যে জল প্রবর্ত্তিত করেন।
“মহর্ষি অত্রির পত্নী অনসূয়া ভর্ত্তাকে পরিত্যাগপূৰ্ব্বক আর ‘আমি ভর্ত্তার বশবর্ত্তী হইব না’ স্থির করিয়া, মহাদেবের শরণাপন্ন হইয়া তাঁহাকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত তিনশত বৎসর অনাহারে মুষলে শয়ন করিয়াছিলেন। দেবাদিদেব তাঁহার ভক্তিদর্শনে তাঁহার নিকট আগমনপূর্ব্বক ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, ‘অনসূয়ে! তুমি আমার বরে স্বামিসহবাস ভিন্ন অনায়াসে এক পুত্র লাভ করিবে। ঐ পুত্র তোমার নামে বিখ্যাত এবং অভিলষিত খ্যাতিলাভ করিতে সমর্থ হইবে।’
“মহাত্মা বিকর্ণ ভক্তবৎসল ভগবান ভবানীনাথকে প্রসন্ন করিয়া সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন। জিতেন্দ্রিয় শাকল্য ক্রমাগত নয় বৎসর একচিত্তে মহাদেবকে আরাধনা করিলে, তিনি পরম পরিতুষ্ট হইয়া শাকল্যকে কহিলেন, ‘বৎস! তুমি গ্রন্থকর্ত্তা হইবে। ত্রিলোকমধ্যে তোমার খ্যাতির পরিসীমা থাকিবে না। তোমার কুল মহর্ষিগণদ্বারা উজ্জ্বল ও অক্ষয় হইবে এবং তোমার পুত্র তোমার গ্রন্থের সূত্ৰকৰ্ত্তা হইবে।’
সাবর্ণিমনু প্রভৃতির শিব-উপাসনার ফল
“পূৰ্ব্বে সত্যযুগে সাবৰ্ণিনামে এক বিখ্যাত মহর্ষি ছিলেন। ছয়সহস্র বৎসর তপানুষ্ঠান করিলে, মহাদেব তাঁহার সমক্ষে আবির্ভূত হইয়া কহিলেন, ‘বৎস! আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি। তুমি ইহলোকে অজর, অমর ও বিখ্যাত গ্রন্থকর্ত্তা হইবে। পূর্ব্বে দেবরাজ ইন্দ্র বারাণসীতে ভস্মদিহ্মাঙ্গ ভগবান্ ভূতনাথকে আরাধনা করিয়া তাঁহার প্রসাদে দেবরাজত্ব লাভ করিয়াছিলেন। পূৰ্ব্বকালে দেবর্ষি নারদ ভক্তিপূৰ্ব্বক মহাদেবকে অর্চ্চনা করিয়াছিলেন। দেবদেব তাঁহার ভক্তিদর্শনে প্রসন্ন হইয়া তাহাকে কহিলেন, ‘নারদ! ইহলোকে তোমার তুল্য তেজস্বী, তপস্বী ও যশস্বী আর কেহ বিদ্যমান থাকিবে না। তুমি সতত গীতবাদ্যদ্বারা আমাকে সন্তুষ্ট করিবে।’
মাতার নিকট উপমন্যুর শঙ্করপ্রভাবশ্রবণ
“হে মাধব! এতক্ষণে আমি যে নিমিত্ত যে গুণে মহাদেবকে সন্দর্শন ও তাঁহার নিকট হইতে যাহা লাভ করিয়াছি, আজ তৎসমুদয় বিস্তারিতরূপে কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে সত্যযুগে ব্যাঘ্রপদনামে এক বেদবেদাঙ্গপারদর্শী মহাতপস্বী মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার ঔরসে আমি ও আমার অনুজ ধৌম্য আমরা উভয়ে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছি। একদা আমি স্বীয় অনুজ ধৌম্যের সহিত ক্রীড়া করিতে করিতে এক আশ্রমে সমুপস্থিত হইয়া দেখিলাম, তথায় গাভীদোহন হইতেছে। গাভীদোহন দর্শন করিবামাত্র বালস্বভাববশতঃ আমার দুগ্ধপান করিতে ইচ্ছা হইল। তখন আমি ধৌম্যসমভিব্যাহারে জননীর নিকট গমনপূর্ব্বক কহিলাম, মাতঃ! আমাদিগকে দুগ্ধান্ন প্রদান কর, আমরা ভোজন করিব।’ আমি ঐ কথা কহিলে জননী গৃহে দুগ্ধ না থাকাতে নিতান্ত দুঃখিত হইয়া জলে পিষ্ট [পিটুলী] মিশ্রিত করিয়া দুগ্ধ বলিয়া আমাদিগকে প্রদান করিলেন।
“আমি ইতিপূৰ্ব্বে যজ্ঞ-উপলক্ষে পিতার সহিত এক জ্ঞাতিভবনে গমন করিয়াছিলাম। তথায় সুরনন্দিনীর অমৃততুল্য সুস্বাদু দুগ্ধ পান করাতে উহার আস্বাদ বিলক্ষণ অবগত ছিলাম, সুতরাং সেই জননীপ্রদত্ত পিষ্টরস [পিটুলীগোলা জল] পান করিয়া আমার কিছুমাত্র তৃপ্তিলাভ হইল না। তখন আমি তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলাম, ‘মাতঃ! তুমি আমাদিগকে যাহা প্রদান করিয়াছ, ইহা ত’ দুগ্ধান্ন নহে।’ আমি এই কথা কহিলে, জননী দুঃখশোকে কাতর হইয়া স্নেহবশতঃ আমাকে আলিঙ্গন ও আমার মস্তকাঘ্রাণ করিয়া কহিলেন, ‘বৎস! আমরা বনবাসী, নিয়ত ফলমূল আহার করিয়া জীবিকানির্ব্বাহ করি। বালখিল্য প্রভৃতি মুনিগণ যে নদীতীরে অবস্থান করেন, আমরা সেই স্থানে অবস্থান করি। গাভীবিহীন বন, গিরিগহ্বর ও আশ্রমবাসী মুনিগণের দুগ্ধলাভের সম্ভাবনা কি; মুনিগণ কখন গ্রাম্য ব্যক্তিদিগের মত আহারসুখ অনুভব করেন না। ইঁহারা কেবল অরণ্যের ফলমূল ভোজন করিয়াই জীবিকানির্ব্বাহ করেন। নদীতীর, গিরিগহ্বর ও বিবিধ তীর্থস্থানে অবস্থান করিয়া নিয়ত জপানুষ্ঠান ও তপশ্চরণ করাই আমাদের প্রধান কর্ম্ম। ভগবান্ ভূতনাথই আমাদিগের একমাত্র অবলম্বন। তাঁহাকে প্রসন্ন করিতে না পারিলে আমাদিগের দুগ্ধ, অশন, বসন ও অন্যান্য সুখলাভের সম্ভাবনা কি? তাঁহাকে প্রসন্ন করিতে পারিলেই তুমি অনায়াসে অভীষ্ট ফললাভে সমর্থ হইবে।’
“আমি জননীর এই সমুদয় বাক্য শ্রবণ করিয়াই কৃতাঞ্জলিপুটে প্রণতভাবে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলাম, ‘মাতঃ! মহাদেব কে? তিনি কিরূপে প্রসন্ন হয়েন, কোন্ স্থানে অবস্থান করেন, কিরূপে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎকার করিতে হয়, কিরূপ অনুষ্ঠান করিলে তিনি সন্তুষ্ট হয়েন, তাঁহার রূপই বা কি প্রকার এবং তিনি প্রসন্ন হইলেই বা কি প্রকারে তাহা অবগত হওয়া যায়, তৎসমুদয় কীর্ত্তন কর।’
“তখন সেই পুত্রবৎসলা জননী আমার গাত্রমার্জ্জন ও মস্তকাঘ্রাণপূৰ্ব্বক বাষ্পকুললোচনে কাতরবচনে আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! মূঢ় ব্যক্তিরা কখনই সেই দুরারাধ্য, দুর্ব্বোধ্য, দুর্ল্লক্ষ্য, ভগবান্ দেবদেবকে পরিজ্ঞাত হইতে পারে না। মনীষিগণ তাঁহার অসংখ্য রূপ, বিচিত্র স্থান ও বিবিধ প্রকার প্রসন্নতা কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। পূর্ব্বে তিনি যে সমুদয় রূপ ধারণ করিয়াছিলেন এবং তিনি যেরূপে প্রসন্ন হয়েন ও ক্রীড়া করেন, কেহই বিশেষরূপে তাহা পরিজ্ঞাত হইতে সমর্থ হয় না। সেই সর্ব্বান্তৰ্য্যামী বিশ্বরূপ ভগবান শূলপাণি ভক্তগণের প্রতি প্রসন্ন হইয়া যে সমুদয় রূপ ধারণ করিয়াছিলেন, দেবগণ ব্রাহ্মণদিগের প্রতি দয়া করিয়া তৎসমুদয় কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। এক্ষণে আমি তোমার নিকট সংক্ষেপে ঐ সমস্ত কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
‘ভুতভাবন ভগবান্ ভবানীপতি স্বেচ্ছানুসারে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, আদিত্য, অশ্বিনীকুমারযুগল, বিশ্বদেব, মনুষ্য, দেবনারী, প্রেত, পিশাচ, কিরাত, শবর, কূৰ্ম্ম, মৎস্য, শঙ্খ্য, যক্ষ, রাক্ষস,সর্প, দৈত্য, দানব, জন্তু, গৰ্ত্তবাসী জন্তু, জলজন্তু, ব্যাঘ্র, সিংহ, মৃগ, তরক্ষু, ভল্লুক, উলূক, কুক্কুর, শৃগাল, কৃকলাস, হংস, কাক, ময়ূর, বক, সারস, গৃধ্র, চক্রাঙ্গ, নীলকণ্ঠ, পৰ্ব্বত, গো, অশ্ব, হস্তী, উষ্ট্র, গর্দ্দভ, ছাগ ও শার্দ্দূলের রূপ ধারণ করিয়া থাকেন। কখন দণ্ডধারী, কখন ছত্রধারী, কখন কমণ্ডলুধারী, কখন ব্রাহ্মণ, কখন ষণ্মুখ, কখন বহুমুখ, কখন ত্রিনেত্র ও কখন বহুশীর্ষ হয়েন। কখন অসংখ্য কটি, পদ, উদর, বক্ত্র, পাণি ও পার্শ্বদ্বারা বিভূষিত অসংখ্যগণে পরিবৃত হইয়া থাকেন। কখন কখন ঋষি, গন্ধৰ্ব্ব, সিদ্ধ ও চারণগণের রূপ ধারণ করেন। কখন ভস্মাচ্ছাদিত ও অৰ্দ্ধচন্দ্রে বিভূষিত হয়েন। সেই সৰ্ব্বভূতান্তক সর্ব্বান্তৰ্য্যামী, সৰ্ব্ববাদী, ভূতভাবন, ভগবান্ মহাদেব এইরূপে সৰ্ব্বত্র অবস্থান করিতেছেন। পণ্ডিতগণ তাঁহাকে অসংখ্যনামে নির্দ্দেশ ও অসংখ্য প্রকারের স্তব করিয়া থাকেন। তাঁহার নিকট যে ব্যক্তি যেরূপ অভিলাষ ও যাহা প্রার্থনা করে, তিনি নিশ্চয়ই তাহা পরিজ্ঞাত হয়েন। অতএব যদি তোমার মঙ্গলাভের বাসনা হয়, তাহা হইলে তুমি সেই ভগবানের শরণাপন্ন হও।
‘তিনি কখন আনন্দিত, কখন ক্রূদ্ধ ও কখন ক্রীড়ায় প্রবৃত্ত হয়েন। কখন চক্র, কখন শূল, কখন গদা, কখন মুষল, কখন খড়্গ ও কখন পট্টিশ ধারণ করেন। কখন নাগমেখলা [১], নাগকুণ্ডল [২] ও নাগযজ্ঞোপবীত [১,২ সর্পের কটিবন্ধ, সর্পের কুণ্ডল ও সর্পের পৈতা] সম্পন্ন রহেন। কখন নাগচৰ্ম্মের উত্তরচ্ছদ ধারণ করেন। কখন প্রমথগণে পরিবৃত হইয়া নৃত্য, গীত, হাস্য ও বিবিধ বাদ্য করিয়া থাকেন। কখন উন্মত্ত হইয়া পরিভ্রমণ, জৃম্ভণ [হাই] পরিত্যাগ ও রোদন করেন। কখন প্রচণ্ড মূর্ত্তি ধারণ করিয়া প্রাণীগণকে ভয়প্রদর্শনপূৰ্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে হাস্য করেন। কখন বা জাগরিত থাকেন ও কখন নিদ্রিত হয়েন। কখন স্বয়ং জপ ও তপস্যা করেন এবং কখন বা অন্যকে স্বীয় নাম জপ ও আপনার উদ্দেশে তপস্যা করান। কখন দান, গ্রহণ, যোগ ও ধ্যানে প্রবৃত্ত হয়েন; কখন বেদী, যূপ, কাষ্ঠ ও হুতাশনমধ্যে অবস্থান করেন। কখন বালক, কখন বৃদ্ধ ও কখন যুবারূপে লক্ষিত হয়েন। কখন মুনিপত্নী ও মুনিকন্যাদিগের সহিত ক্রীড়া করেন। কখন ঊর্দ্ধকেশ, মহালিঙ্গসম্পন্ন, নগ্ন ও বিকৃতলোচন হয়েন। কখন গৌরবর্ণ, কখন শ্যামাঙ্গ, কখন পাণ্ডুবর্ণ, কখন নীললোহিতবর্ণ, কখন বিকৃতাঙ্গ ও কখন বিশালাক্ষ হইয়া থাকেন। কেহই সেই আদিরূপী নিরাকার পরমপুরুষের আদি ও অন্ত পরিজ্ঞাত হইতে পারেন না। তিনি স্বয়ং দিগম্বর হইয়া সৰ্ব্বাচ্ছাদক নামে অভিহিত হইয়া থাকেন। সেই সূক্ষ্ম মনোবৃত্তির বিষয়ীভূত যোগস্বরূপ মহাত্মা মহেশ্বর প্রাণীগণের প্রাণ, মন ও জীবরূপে অবস্থান করিতেছেন। তিনি কখন বাদক, কখন গায়ক, কখন অসংখ্যনেত্র, কখন একবক্ত্র হইয়া থাকেন। এক্ষণে তুমি সেই ভগবান্ শূলপাণির প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ হইয়া তদ্গতচিত্তে তাঁহার আরাধনা কর, অবশ্যই অভীষ্ট লাভ করিতে পারিবে।
উপমন্যুর শঙ্কর উপাসনা—তপঃপরীক্ষা
‘জননীর এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র মহাদেবের প্রতি আমার একান্ত ভক্তির উদ্রেক হইল। তখন আমি তপস্যা অবলম্বন করিয়া তাঁহাকে প্রসন্ন করিতে অভিলাষী হইলাম। দেবমানের একশত বৎসর বামাঙ্গুষ্ঠের উপর নির্ভর করিয়া অবস্থান ও ফলাহার, দ্বিতীয় শত বৎসর জলপান এবং তদন্তর সাতশত বৎসর বায়ু ভক্ষণ করিয়া দেবদেবের আরাধনা করিলাম।
‘এইরূপে দেবমানের সহস্র বৎসর তপস্যা করিলে ত্রিলোকেশ্বর মহাদেব আমার প্রতি পরম পরিতুষ্ট হইয়া, আমি তাঁহার একান্ত ভক্ত কি না তাহা জানিবার মানসে দেবগণপরিবেষ্টিত ইন্দ্ররূপধারণপূৰ্ব্বক শুভ্রবর্ণ, অরুণনেত্র, সঙ্কুচিত, চতুর্দ্দন্ত, বিকটাকার, মদমত্ত মাতঙ্গের উপর আরোহণ করিয়া আমার নিকট উপস্থিত হইলেন। ঐ সময় তাঁহার শরীর হইতে তেজচ্ছটা বিনির্গত হইতেছিল। মস্তকে কিরীট, গলদেশে হার, ভুজে কেয়ূরভূষণ শোভা পাইতেছিল। অপ্সরাগণ তাঁহার মস্তকোপরি শ্বেতচ্ছত্র ধারণ করিয়া রহিয়াছিল এবং গন্ধৰ্ব্বগণ তাঁহার সমক্ষে গান করিতেছিল।
উপমন্যুর শিবানুরাগ
তিনি আমার সমীপে আগমনপূৰ্ব্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “দ্বিজবর! আমি তোমার প্রতি পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি। অতএব তুমি অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” তখন আমি ইন্দ্ররূপী মহাদেবের সেই বাক্যশ্রবণে পরিতুষ্ট না হইয়া তাঁহাকে কহিলাম, “দেবরাজ! আমি নিশ্চয় বলিতেছি যে, মহাদেব ভিন্ন অন্য কোন দেবতার নিকট বরলাভের প্রার্থনা করি না। মহেশ্বরের কথা ব্যতীত আমি অন্য কোন কথাতেই সন্তুষ্ট নহি। পশুপতির অনুমতি অনুসারে আমি কৃমি বা বহুশাখাসঙ্কুল বৃক্ষ হইতেও প্রস্তুত আছি; কিন্তু অন্যের বরপ্রভাবে ত্রিভুবনের একাধিপত্যলাভ হইলেও তাহা তৃণজ্ঞান করিয়া থাকি। মহাদেবের প্রতি ভক্তিমান হইয়া যদি আমাকে চণ্ডালগৃহে জন্মপরিগ্রহ করিতে হয়, তাহাও শ্রেয়ঃ; কিন্তু তাঁহা হইতে বিমুখ হইয়া যদি স্বর্গলাভ হয়, তাহাও আমার হিতজনক নহে। যে ব্যক্তি বিশ্বেশ্বরে ভক্তিবিহীন হয়, জল ও বায়ু ভক্ষণ করিয়া থাকিলে তাহার দুঃখের হ্রাস হইবার সম্ভাবনা কি? যাঁহারা হরচরণস্মরণ ভিন্ন ক্ষণকালও অতিবাহিত করেন না, তাঁহাদিগের নিকট অন্য ধৰ্ম্মসংক্রান্ত কথা উল্লেখ করা নিতান্ত নিরর্থক। কলিযুগে প্রতিনিয়ত মহাদেবের প্রতি ভক্তিমান্ হওয়া সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। মহাদেবের প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ হইলে, সংসারজন্য ভয়ের লেশমাত্রও থাকে না। মহাত্মা মহেশ্বর যাহাদের প্রতি প্রসন্ন না হয়েন, তাহাদিগের কোন সময়েই তাঁহার প্রতি ভক্তির উদ্রেক হয় না।
“হে দেবেন্দ্র! আমি মহাদেবের আজ্ঞায় কীট, পতঙ্গ ও কুক্কুরযোনি লাভ করিতে সম্মত আছি, কিন্তু আপনি আমাকে ইন্দ্রত্ব প্রদান করিলেও আমি তাহা লাভ করিতে কামনা করি না। ফলতঃ কি স্বর্গ, কি দেবরাজ্য, কি ব্রহ্মলোক, কি পূর্ণভাব, কি অন্যান্য ঐশ্বৰ্য্য, কিছুতেই আমার প্রার্থনা নাই, কেবলমাত্র মহাদেবের দাসত্ব আমার প্রার্থনীয়। যে কাল পর্য্যন্ত ভগবান্ চন্দ্রশেখর আমার প্রতি প্রসন্ন না হইবেন, আমি ততকাল জন্ম, মৃত্যু ও জরার জন্য শত শত দুঃখসম্ভোগ করিব। ইহলোকে সেই সূৰ্য্য, শশধর ও অগ্নিতুল্য তেজঃপুঞ্জকলেবর, ত্রিভুবনের সারভূত, জরামৃত্যুবিহীন, অদ্বিতীয় পুরুষ রুদ্রদেবকে প্রসন্ন করিতে না পারিলে কেহই শান্তিলাভ করিতে পারে না। যাহা হউক, যদি স্বীয় কৰ্ম্মদোষে আমাকে বারংবার ইহলোকে জন্মপরিগ্রহ করিতে হয়, তাহা হইলে যেন সেই সেই জন্মে মহাদেবের প্রতি আমার অচলা ভক্তি বিদ্যমান থাকে।”
উপমন্যুকর্ত্তৃক রুদ্ৰমাহাত্ম্যবর্ণন
“ইন্দ্র কহিলেন, ‘উপমন্যো! তুমি অন্য দেবগণের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শনপূর্ব্বক একমাত্র মহাদেবের নিকটই বরলাভের অভিলাষ করিতেছ। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, সেই মহাদেব যে সকল কারণের কারণ ও জগতের সৃষ্টিকর্ত্তা, তাহার প্রমাণ কি?
“আমি কহিলাম, দেবরাজ! ব্রহ্মবাদী মহর্ষিগণ কহিয়া থাকেন, দেবাদিদেব মহাদেব নিত্য ও অনিত্য, ব্যক্ত ও অব্যক্ত, এক ও বহু; সুতরাং তিনিই সকল কারণের কারণ ও জগতের সৃষ্টিকর্ত্তা। আমি ইহা সবিশেষ জ্ঞাত হইয়া একমাত্র তাঁহার নিকটই বর প্রার্থনা করিয়া থাকি। তাঁহার আদি নাই, মধ্য নাই ও অন্ত নাই। তিনি অচিন্তনীয়, জ্ঞানরূপ, ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন ও পরমাত্মা। তাঁহা হইতে নিত্যসিদ্ধ অবিনাশী ঐশ্বৰ্য্যসমুদয় উৎপন্ন হইয়া থাকে। তিনি কোন বীজ হইতে উদ্ভূত নহেন, কিন্তু তাহা হইতেই সমুদয় বীজ উৎপন্ন হইয়াছে। তিনি প্রকৃতির অতীত জ্যোতিঃস্বরূপ। তাঁহার স্বরূপ বুদ্ধি প্রভৃতি সমুদয় বৃত্তির অবিষয়ীভূত। তাঁহাকে জ্ঞাত হইলে শোকতাপ তিরোহিত হইয়া যায়। তিনি ভূতভাবন, ভূতপালক, অন্তর্য্যামী, সৰ্ব্বগামী ও সর্ব্বদাতা; হেতুবাদদ্বারা তাঁহার স্বরূপ নিরূপণ করা যায় না। তিনি মুক্তিপদ ও তত্ত্বজ্ঞানীদের উপাস্য। তিনি তোমারও আত্মা, সুরগণেরও অধীশ্বর ও সকল জীবের গুরু। তিনি স্বীয় মহিমায় সমুদয় ব্যাপ্ত করিয়া ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি সম্পাদনপূৰ্ব্বক উহার মধ্যে ভূতভাবন ভগবান্ ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করেন। তিনি ব্যতিরেকে আর কেহই অগ্নি, জল, অনিল, পৃথিবী, আকাশ, বুদ্ধি, মন ও মহত্তত্ত্বকে সৃষ্টি করিতে সমর্থ নহে। ভগবান্ ভূতপতি মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার, রূপরসাদি বিষয় ও ইন্দ্রিয়সমুদয়ের পরম আশ্রয়স্থান বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকেন।
‘লোকে যে পিতামহ ব্রহ্মাকে জগস্রষ্টা বলিয়া থাকে, তিনি ঐ দেবাদিদেবকে আরাধনা করিয়া জগৎসৃষ্টির ক্ষমতা লাভ করিয়াছেন। তাঁহারই প্রভাবে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর উৎকৃষ্ট ঐশ্বর্য্য হইয়াছে। তাঁহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই। সেই ত্রিলোকনাথ ব্যতিরেকে কোন দেবতাই দৈত্যদানবগণের আধিপত্য মোচন ও শাসন করিতে সমর্থ হয়েন না। দিক, কাল, বায়ু, সলিল এবং চন্দ্র, সূৰ্য্য ও গ্রহনক্ষত্র প্রভৃতি তেজঃপদার্থসমুদয় তাঁহা হইতেই সমুদ্ভূত হইয়াছে। সেই মহেশ্বরই যজ্ঞ ও ত্রিপুরাসুরের উৎপত্তিবিনাশের কারণ। তিনি সকলের স্রষ্টা, সৰ্ব্বকামপ্রদাতা ও দৈত্যদানবগণের রাজ্যাপহারক।
“হে দেবরাজ! তাঁহার মহিমা আর অধিক কি কীৰ্ত্তন করিব, তাঁহারই অনুগ্রহে সিদ্ধ, গন্ধৰ্ব্ব, দেবতা ও মহর্ষিগণ তোমার আরাধনা করিয়া থাকেন। তাঁহার প্রভাবে জীবগণের উপভোগের নিমিত্ত এই স্থাবরজঙ্গমাত্মক বিশ্ব উৎপন্ন হইয়াছে। তিনি সমুদয় লোকে ওতপ্রোতভাবে অবস্থান করিতেছেন। সুররাজ অসুরগণকর্ত্তৃক নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া যদি শিবতুল্য অন্য কোন দেবতাকে নিরীক্ষণ করিতেন, তাহা হইলে অবশ্যই তাঁহার শরণাপন্ন হইতেন। তিনি ভয়ঙ্কর সংগ্রামে দেব, যক্ষ ও উরগগণের রাজ্যাদি অপহৃত হইলে পুনরায় উহা প্রদান করিয়া থাকেন। তিনি ত্রিপুর, অন্ধক, দুন্দুভি, মহিম এবং রাক্ষস ও নিবাতকবচগণকে একবার ঐশ্বৰ্য্য প্রদান করিয়া পুনরায় তাঁহাদিগকে সংহার করিয়াছিলেন। পূৰ্ব্বে বহ্নিমুখে তাঁহারই রেতঃ আহুত হইয়াছিল। তাঁহারই রেতঃপ্রভাবে সুবর্ণময় গিরি উৎপন্ন হয়। তিনি ত্রিলোকমধ্যে দিগম্বর ও উৰ্দ্ধরেতা বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। তিনি অর্দ্ধনারীশ্বর [অর্দ্ধদেহে নারী ও অর্দ্ধদেহে পুরুষ] অথচ অনঙ্গ [কাম] বিজয়ী। দেবগণ তাঁহারই পরমস্থানের সবিশেষ প্রশংসা করেন। তিনিই শ্মশানে ভূতগণের সহিত ক্রীড়া ও নৃত্য করিয়া থাকেন। তিনি ব্যতিরেকে আর কাহারও ঐশ্বৰ্য্য অবিনশ্বর নহে। তাঁহার অনুচরগণ তাঁহার তুল্য বরলাভ করিয়া, ঐশ্বৰ্য্যগৰ্ব্বে গর্ব্বিত হইয়া থাকে। তাঁহা ব্যতিরেকে আর কোন্ দেবতা বারিবর্ষণ ও উত্তাপদান করিতে পারেন এবং কে-ই বা তেজঃপ্রভাবে প্রজ্বলিত হইয়া থাকেন? তাঁহা হইতেই ওষধি উৎপন্ন হয়। তিনিই সমুদয় ধনের স্থান। তাঁহা ব্যতিরেকে আর কে এই স্থাবরজঙ্গমাত্মক বিশ্বমধ্যে স্বেচ্ছানুসারে বিহার করিয়া থাকেন? মহর্ষি, গন্ধৰ্ব্ব, সিদ্ধ ও যোগিগণ জ্ঞানযজ্ঞাদিদ্বারা সেই দেবদেবেরই আরাধনা করেন। তিনি কৰ্ম্মফলশূন্য।
“আমি তাঁহাকেই এই বিশ্বের কারণ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকি। স্থূল, সূক্ষ্ম, উপমানশূন্য, ইন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, সগুণ ও নির্গুণ। তিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারকর্ত্তা, কালত্রয়স্বরূপ ও সকলের কারণ। তিনি ক্ষর, অক্ষর ও প্রকৃতি। তাঁহা হইতে বিদ্যা, অবিদ্যা, কাৰ্য্য, অকাৰ্য্য, ধর্ম্ম ও অধর্ম্ম প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে। আমি সেই দেবদেবকেই সকলের কারণ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকি। দেখুন, রুদ্রদেব সৃষ্টিবিনাশার্থ আপনার লিঙ্গের সহিত শক্তিচিহ্ন সংযোগ করিয়া রাখিয়াছেন। পূৰ্ব্বে আমার জননী কহিয়াছেন যে, মহাদেবই লোকোৎপাদনের একমাত্র কারণ, তাঁহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেবতা আর কেহই নাই। এক্ষণে যদি আপনার অভিলাষ হয়, তাহা হইলে আপনি অচিরাৎ তাঁহার শরণাপন্ন হউন। ব্রহ্মাদি দেবগণ সমবেত এই তিনলোক তাঁহারই লিঙ্গনিঃসৃত বীৰ্য্য হইতে উৎপন্ন হইয়াছেন। ব্রহ্মাদি দেবতা ও দৈত্যগণ তাঁহার প্রসাদে পূর্ণমনোরথ হইয়া তাঁহা অপেক্ষা আর কাহাকেই শ্রেষ্ঠ বলিয়া বিবেচনা করেন না। বেদমধ্যে তাঁহার মহিমা কীৰ্ত্তিত আছে। এক্ষণে আমি ইহলোকে সুখ ও পরলোকে মোক্ষলাভের নিমিত্ত সেই রুদ্রদেবের উপাসনা করিতেছি। যখন সুরগণ সেই দেবাদিদেবের লিঙ্গ পূজা করিয়া থাকেন তখন তিনি যে সকল কারণের কারণ, ইহাতে হেতুবাদ প্রদর্শন করিবার আর আবশ্যকতা নাই। দেবগণ সেই মহেশ্বরের লিঙ্গ ব্যতিরেকে আর কাহারও লিঙ্গ পূজা করেন নাই ও করিতেছেন না। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, আপনি ও অন্যান্য দেবগণ আপনারা সকলেই সেই দেবাদিদেবের লিঙ্গ পূজা করিয়া থাকেন, সুতরাং তিনিই সকল দেবতার অগ্রগণ্য।
“ব্রহ্মার চিহ্ন পদ্ম, বিষ্ণুর চিহ্ন চক্র ও আপনার চিহ্ন বজ্র বিদ্যমান রহিয়াছে; কিন্তু প্রজারা আপনাদিগের কাহারও চিহ্নে চিহ্নিত নহে। তাহারা হরপার্ব্বতীর চিহ্নানুসারে লিঙ্গ ও যোনি চিহ্ন ধারণ করিয়াছে। সুতরাং উহারা যে শিব ও শিবা হইতে উদ্ভূত তাহার আর সন্দেহ নাই। স্ত্রীজাতি পাৰ্ব্বতীর অংশে সদ্ভূত হইয়াছে বলিয়া যোনিচিহ্নে চিহ্নিত আর পুরুষেরা মহাদেবের অংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছে বলিয়া লিঙ্গচিহ্নিত হইয়াছে; যাহারা উঁহাদের উভয়েরই চিহ্নে চিহ্নিত নহে, তাহারা ক্লীবপদবাচ্য হইয়া জনসমাজ হইতে বহিষ্কৃত হয়। এই জীবলোকে পুংলিঙ্গধারীকে শিবের ও স্ত্রীলিঙ্গধারীকে পার্ব্বতীর অংশ বলিয়া অবগত হইবে। এই চরাচর বিশ্ব হরপার্বতীদ্বারাই ব্যাপ্ত রহিয়াছে। সেই দেবাদিদেব হইতে আমার উৎকৃষ্ট বর বা নিধনলাভ হউক, উভয়ই আমার প্রার্থনীয়। ফলতঃ মহাদেব ভিন্ন অন্য কোন দেবতারই প্রতি আমার আস্থা নাই। অতএব হে দেবরাজ! তুমি এই স্থানে অবস্থান বা স্বস্থানে প্রস্থান, যাহা ইচ্ছা হয় কর।
উপমন্যুর শিবসাক্ষাৎকার
“আমি দেবরাজকে এই কথা কহিয়া ‘হায়! অদ্যাপি ভূতভাবন ভগবান্ ভবানীপতির প্রসন্নতা লাভ করিতে পারিলাম না’ বলিয়া মনে মনে চিন্তা করিতেছি, এমন সময় দেখিলাম সেই ইন্দ্রসমারূঢ় ঐরাবত ক্ষণকালমধ্যে হংস, কুন্দ, চন্দ্র, মৃণাল ও রজতের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন, ক্ষীরোদার্ণবসদৃশ শ্বেতবর্ণ, কৃষ্ণপুচ্ছ, পিঙ্গললোচন বৃষ হইয়া বজ্রসারময়, তপ্তকাঞ্চনসন্নিভ, ঈষৎবক্রাগ্র, সুতীক্ষ্ণ শৃঙ্গদ্বারা যেন অবনীমণ্ডল বিদারণ করিতেছে। তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ সুবর্ণে সমলঙ্কৃত হইয়াছে। মুখ, নাসা, কর্ণ, কটি, খুর ও পার্শ্বদেশ অপূৰ্ব্ব শোভা ধারণ করিয়াছে। স্কন্ধ এবং ককুদ বিপুল স্কন্ধদেশ সমাচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে। দেবদেব ভগবান্ শূলপাণি পাৰ্ব্বতীর সহিত সমবেত হইয়া সেই তুষার গিরিসন্নিভ শুভ্রমেঘতুল্য বৃষের উপরিভাগে আরোহণপূর্ব্বক পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় শোভা পাইতেছেন। তাঁহার তেজ হইতে অনল উৎপন্ন হইয়া সহস্র সূর্য্যের ন্যায় সমুদয় জগৎ সমাচ্ছন্ন করিয়া দেদীপ্যমান হইতেছে। ঐ সময় সেই দেবাদিদেবকে দেখিয়া বোধ হইতে লাগিল যেন, যুগান্তকালীন সংবৰ্ত্তক হুতাশন প্রাণীগণকে সংহার করিতে উদ্যত হইয়াছে। ভগবান্ মহেশ্বরের সেই জগদ্ব্যাপ্ত দুর্নিরীক্ষ্য তেজ নিরীক্ষণ করিয়া আমি নিতান্ত চিন্তাকুল ও উদ্বিগ্নহৃদয় হইলাম।
শিবহস্তস্থিত অস্ত্ৰবিবরণ—ব্রহ্মাদির স্তুতি
“অনন্তর মুহূর্ত্তমধ্যে সেই তেজ সমুদয় দিক পরিব্যাপ্ত করিয়া দেবাদিদেবের মায়াভাবে প্রশান্ত ভাব ধারণ করিল। তখন আমি দেখিলাম, অতুল তেজঃসম্পন্ন ভগবান্ ভূতনাথ অষ্টাদশভুজসম্পন্ন, সর্ব্বাভরণভূষিত, শুক্লবস্ত্র ও শুক্লমাল্য পরিশোভিত, শুক্লযজ্ঞোপবীতধারী হইয়া বিধুম পাবকের ন্যায় শোভা পাইতেছেন। চারুদর্শনা পার্ব্বতী তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট আছেন। তাঁহার আত্মতুল্যপরাক্রান্ত অনুচরগণ চতুর্দ্দিকে নৃত্য, গীত ও বাদ্য করিতেছে! তাঁহার মস্তকস্থিত শশধর সূৰ্য্যত্রয়ের ন্যায় দেদীপ্যমান নেত্রদ্বয়দ্বারা সমধিক সমুজ্জ্বল হইয়াছে। তিনি রত্নভূষিত সুবর্ণময় পদ্মের অপূৰ্ব্ব মালা ও তেজোময় মূৰ্ত্তিমান্ অস্ত্রসমুদয় ধারণ করিয়াছেন। তাঁহার এক হস্তে ইন্দ্রায়ুধতুল্য ভীষণ পিনাক বিদ্যমান রহিয়াছে; এক সপ্তশীর্ষ [সাত মাথা] তীক্ষ্ণদংষ্ট্র বিষপূর্ণ বিষধর উহার জ্যা [গুণ—ছিলা] বেষ্টনপূৰ্ব্বক অবস্থান করিতেছে। অপর হস্তে পাশুপতনামক দিব্যাস্ত্র কালানলের ন্যায় ও ভীষণ মাৰ্ত্তণ্ডের ন্যায় শোভা পাইতেছে। ঐ অস্ত্র এক পদ, সহস্র মস্তক, সহস্র উদর, সহস্র ভুজ, সহস্র জিহ্বা ও সহস্র নেত্রসম্পন্ন; উহা দেখিলে বোধ হয় যেন অনবরত অগ্নিস্ফুলিঙ্গসমুদয় উদগিরণ করিতেছে। ঐ অস্ত্র ব্রাহ্ম [ব্রহ্মাস্ত্র], নারায়ণ, ঐন্দ্র, আগ্নেয় ও বারুণ অস্ত্র হইতে শ্রেষ্ঠ; উহার প্রভাবে সমুদয় অস্ত্র নিরাকৃত হইয়া থাকে। পূৰ্ব্বে ভগবান্ ভূতভাবন ঐ অস্ত্রদ্বারা অবলীলাক্রমে ত্রিপুর দগ্ধ করিয়াছিলেন। তিনি ইচ্ছা করিলে নিমেষমধ্যে ঐ অস্ত্রদ্বারা ত্রিভুবন দগ্ধ করিতে পারেন। ঐ অস্ত্রের অবধ্য কেহই নাই। আমি তাঁহার হস্তে আরও একটি অত্যাশ্চর্য্য দিব্যাস্ত্র দর্শন করিলাম। লোকসমাজে উহা শূল বলিয়া বিখ্যাত আছে। ঐ অস্ত্র পাশুপতের তুল্য অথবা তাহা হইতেও শ্রেষ্ঠ। ভগবান্ মহাদেব ঐ লোকবিখ্যাত অস্ত্রদ্বারা অনায়াসে স্বর্গমর্ত্ত্য বিদীর্ণ, মহোদধি শুষ্ক এবং বিশ্বসংসার নষ্ট করিতে পারেন। পূৰ্ব্বে রাক্ষসকুলোদ্ভব মহাবীর লবণ উহাদ্বারা ইন্দ্রতুল্যপরাক্রমশালী ত্রিলোকবিজয়ী যুবনাশ্বতনয় মান্ধাতাকে সসৈন্যে নিহত করিয়াছে। তৎকালে ঐ শূল দর্শন করিয়া বোধ হইতে লাগিল যেন, উহা ভ্রূকুটিবন্ধ করিয়া তর্জ্জন করিতেখে, যেন মহাদেবের হস্তে কালসূৰ্য্য সমুদিত হইয়াছে এবং যে তিনি কালান্তক পাশ ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। ঐ দেবাদিদেব পূর্ব্বকালে জমদগ্নিপুত্র পরশুরামের প্রতি পরম পবিতৃতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে যে ক্ষত্রিয়কুলভয়ঙ্কর পরশু প্রদান করিয়াছিলেন, যাহাদ্বারা সমরাঙ্গনে মহাপরাক্রান্ত কার্ত্তকার্য্য নিহত হইয়াছে, যাহার প্রভাবে পরশুরাম একবিংশতিবার পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করেন, প্রজ্বলিত সুতাশনসদৃশ সেই ভয়ঙ্কর কুঠারও তৎকালে তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত ছিল। হে মাধব! এতদ্ভিন্ন অসংখ্য অস্ত্র সেই পরমপুরুষের নিকট বিদ্যমান ছিল; কেবল এইগুলি প্রধান বলিয়া বিশেষরূপে তোমার নিকট করিলাম।
“ঐ সময়ে লোকপিতামহ ব্রহ্মা হংসসংযুক্ত মনোগামী দিব্যবিমানে আরূঢ় হইয়া সেই দেবাদিদেবের দক্ষিণপার্শ্বে, গরুড়ারূঢ় শঙ্খচক্রগদাধারী ভগবান নারায়ণ তাঁহার বামপার্শ্বে, কার্ত্তিকেয় ময়ূরোপরি আরোহণপূৰ্ব্বক শক্তি ও ঘণ্টা ধারণ করিয়া পাৰ্ব্বতীর সম্মুখে এবং তৎসদৃশ প্রভাবসম্পন্ন নন্দী শূলধারণপূৰ্ব্বক তাঁহার পুরোভাগে অবস্থান করিতেছেন। স্বায়ম্ভুবাদি মনু, ভৃগু প্রভৃতি মহর্ষি ও ইন্দ্রাদি দেবগণ সকলেই তাঁহার নিকট সমুপস্থিত ছিলেন। প্রমথ ও মাতৃগণ তাঁহার চতুর্দ্দিক পরিবেষ্টন করিয়া নানাপ্রকার স্তবপাঠে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। ব্রহ্মা ও নারায়ণ সামবেদ উচ্চারণ এবং দেবরাজ ইন্দ্র শতরুদ্রীয় পাঠ করিতেছিলেন। ঐ তিন মহাত্মাকে দেখিয়া তৎকালে বোধ হইল, যেন, গার্হপত্যাদি অগ্নিত্ৰয় ঐ স্থানে বিদ্যমান রহিয়াছেন এবং উঁহাদের মধ্যস্থলে ভগবান্ মহাদেবকে অবলোকন করিয়া জ্ঞান হইতে লাগিল যেন, সূৰ্য্য শরৎকালীন মেঘ হইতে বহির্গত হইয়া পরিবেশমধ্যে অবস্থান করিতেছেন।
উপমন্যুর শিবস্তব
‘হে কেশব! আমি সেই জগৎপতি মহাদেবকে সন্দর্শন করিয়া এই বলিয়া তাঁহার স্তব করিতে আরম্ভ করিলাম, “হে দেবাদিদেব মহাদেব! তুমি ইন্দ্রস্বরূপ, বজ্রধারী এবং পিঙ্গল ও অরুণবর্ণ। তুমি পিনাক, শঙ্খ ও শূল ধারণ করিয়া থাক। তোমার কেশপাশ কৃষ্ণবর্ণ ও আকুঞ্চিত, কৃষ্ণাজিন তোমার উত্তরীয়, কালীমূৰ্ত্তি তোমার একান্ত প্রিয়। তুমি শুক্লবর্ণ, শুক্লাম্বরধারী, শুক্লভস্মদিহ্মাঙ্গ [শ্বেতবর্ণ ভস্মদ্বারা লিপ্তদেহ] এবং শুদ্ধ কর্ম্মে একান্ত অনুরক্ত। তুমি রক্তবর্ণ, রক্তাম্বর, রক্তধ্বজ, রক্তপতাকা ও রক্তমাল্যধারী। তুমি পীতবর্ণ, পীতাম্বর; পীতচ্ছত্র ও কিরীটধারী! তুমি গলদেশে অর্দ্ধহার, ভুজে অর্দ্ধকেয়ূর ও কর্ণে অর্দ্ধকুণ্ডল ধারণ করিতেছ। তোমার গমনবেগ পবনের ন্যায়। তুমি সুরেন্দ্র, মুনীন্দ্র ও মহেন্দ্র। তুমি উৎপলমিশ্রিত পদ্মমাল্যধারী। তোমার অর্দ্ধশরীর চন্দন ও অর্দ্ধশরীর মাল্যদ্বারা সুশোভিত রহিয়াছে। তুমি আদিত্যবত্ৰু, আদিত্যনয়ন, আদিত্যবর্ণ ও আদিত্যপ্রতিম। তুমি সোম, সৌম্যবক্ত্র, সৌম্যমূৰ্ত্তি, সৌম্যদন্ত ও সর্ব্বশ্রেষ্ঠ। তুমি শ্যাম, গৌর, অর্দ্ধপীত, অর্দ্ধপাণ্ডুর। তুমি অর্দ্ধনারীশ্বর, বৃষভবাহন ও গজেন্দ্রগমন। তুমি স্বয়ং দুষ্প্রাপ্য; কিন্তু তোমার অগম্য স্থান কুত্রাপি নাই। প্রমথগণ তোমার গুণগান ও অনুগমন করে। তুমি তাহাদিগের প্রতি একান্ত অনুরক্ত ও তাহাদিগের ব্রতস্বরূপ। তোমার বর্ণ কখন শ্বেতমেঘসদৃশ এবং সন্ধ্যারাগতুল্য হয়। তোমার নামের নিরূপণ নাই। তোমার মস্তক বিচিত্রমাল্য ও কুসুমদ্বারা এবং ললাটদেশ অর্দ্ধচন্দ্রদ্বারা বিভূষিত। তুমি অগ্নিমুখ, অগ্নিরূপী, অগ্নিনেত্র, চন্দ্রনেত্র, মনোহরমূৰ্ত্তি ও অতি দুষ্প্রাপ্য। তুমি খেচর, বিষয়নিরত, ভূচর, ভুবন ও স্থাবরজঙ্গমস্বরূপ। তুমি দিগম্বর, দিব্যবস্ত্রধারী, জগন্নিবাস এবং জ্ঞান ও সুখস্বরূপ; তোমার মস্তকে সমুজ্জ্বল মুকুট, হস্তে অপূৰ্ব্ব কেয়ুর ও কণ্ঠে সৰ্পময় হার নিরন্তর বিরাজিত রহিয়াছে। তুমি বিচিত্র ভরণভূষিত, ত্রিনেত্র, অসংখ্যলোচন, যোগী, সাঙ্খশাস্ত্র এবং স্ত্রী, পুরুষ ও নপুংসক স্বরূপ। তুমি যজ্ঞসম্পাদক দেবতা ও অথৰ্ব্ববেদস্বরূপ। তুমি সৰ্ব্বতাপনাশন, শোকহর্ত্তা ও বহুমায়াধারী। তোমার স্বর মেঘের ন্যায় অতি গম্ভীর। তুমি বীজ ও ক্ষেত্রের প্রতিপালক এবং সৃষ্টিকর্ত্তা। তুমি দেবদেব, বিশ্বপতি, পবনের ন্যায় বেগবান্ ও পবনস্বরূপ। তুমি কাঞ্চনমাল্যধারী, দৈত্যদিগের পূজনীয় ও প্রচণ্ড বেগবান। তুমি পর্ব্বতে ক্রীড়া করিয়া থাক। তুমি সৰ্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার এক মস্তক ছেদন করিয়াছ। তুমি মহিষঘ্ন, ত্রিরূপধারী ও সৰ্ব্বরূপময়। তুমি ত্রিপুরহন্তা, যজ্ঞবিঘাতক [দক্ষযজ্ঞনাশক], কালনাশক ও কালদণ্ডধারী। তুমি কার্ত্তিকেয়, বিশাখ ও ব্রহ্মদণ্ডস্বরূপ। তুমি ভব, সৰ্ব্ব, বিশ্বরূপ, ঈশান, ভগঘ্ন ও অন্ধকঘাতী। তুমি চিন্ত্য, অচিন্ত্য, মায়াবী এবং আমাদিগের পরমগতি ও হৃদয়স্বরূপ।
“পণ্ডিতেরা তোমাকে দেবগণের মধ্যে ব্রহ্মা, ইন্দ্র, রুদ্রগণের মধ্যে নীললোহিত, সৰ্ব্বভূতের মধ্যে আত্ম, সাশাস্ত্রমধ্যে পরমপুরুষ, পবিত্রদিগের মধ্যে ঋষভদেব, আশ্রমীদিগের মধ্যে গৃহস্থ, ঈশ্বরগণমধ্যে, মহেশ্বর, যক্ষগণের মধ্যে কুবের, যজ্ঞাধিষ্ঠাতা দেবগণের মধ্যে বিষ্ণু, পর্ব্বতমধ্যে সুমেরু ও হিমালয়, নক্ষত্রমধ্যে চন্দ্র, ঋষিগণমধ্যে বশিষ্ঠ, গ্ৰহমধ্যে সূৰ্য্য, আরণ্য পশুর মধ্যে সিংহ, গ্রাম্য পশুর মধ্যে বৃষ, আদিত্যগণমধ্যে বিষ্ণু, বসুগণমধ্যে পবন, পক্ষিগণের মধ্যে গরুড়, ভুজঙ্গগণমধ্যে অনন্ত, বেদমধ্যে সামবেদ, যজুৰ্ব্বেদের মধ্যে রুদ্রাধ্যায়, পরমহংসমধ্যে সনৎকুমার, সাঙ্খ্যবেত্তাদিগের মধ্যে কপিল, পিতৃগণের মধ্যে ধৰ্ম্মরাজ, লোকসমুদয়ের মধ্যে ব্রহ্মলোক, গতিসমুদয়ের মধ্যে মোক্ষ, সাগরগণের মধ্যে ক্ষীরোদ, বর্ণচতুষ্টয়ের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণমধ্যে দীক্ষিত ব্রাহ্মণ বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। তুমি সৰ্ব্বভূতের আদি, সংহারকর্ত্তা ও কালস্বরূপ। তুমি সমুদয় তেজ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তুমি ভক্তবৎসল ও যোগেশ্বর। আমি ঐশ্বৰ্য্যবিহীন ও নিতান্ত কাতর হইয়া ভক্তিভাবে তোমার আরাধনা করিতেছি। তুমি প্রসন্ন হইয়া আমার অভিলাষ পূর্ণ কর। যদিও অজ্ঞানবশতঃ আমার অপরাধ হইয়া থাকে, আমাকে ভক্ত মনে করিয়া তোমাকে তাহা ক্ষমা করিতে হইবে। আমি তোমার বিপরীত রূপদর্শনে বিমোহিত হইয়াছিলাম বলিয়া তোমাকে পাদ্য-অর্ঘ্য প্রদান করি নাই।
উপমন্যুর প্রতি শিবের প্রসন্নতা
‘আমি এইরূপে ভক্তিভাবে সেই ভূতভাবন ভগবান্ মহাদেবকে স্তব করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাকে পাদ্য-অর্ঘ্য প্রভৃতি সমুদয় নিবেদন করিলাম। ঐ সময় আমার মস্তকে শীতলাম্বুসম্বলিত দিব্যগন্ধসমন্বিত পুষ্পবৃষ্টি নিপতিত হইল। দেবকিঙ্করগণ দিব্যদুন্দুভিধ্বনি করিতে আরম্ভ করিল। সুখাবহ সুগন্ধি বায়ু প্রবাহিত হইতে লাগিল। অনন্তর পার্ব্বতীসমন্বিত ভূতভাবন ভগবান্ পিনাকপাণি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া, দেবগণকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ত্রিদশগণ! ঐ দেখ, মহাত্মা উপমন্যু আমার প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ হইয়া স্তব করিতেছে।” তখন দেবগণ ভগবান্ শূলপাণির বাক্য শ্রবণ করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাকে নমস্কারপূর্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি সৰ্ব্বলোকের ঈশ্বর ও জগৎপতি। আমরা প্রার্থনা করি, আপনার প্রসাদে মহাত্মা উপমন্যুর সমুদয় অভিলাষ পূর্ণ হউক।”
‘দেবগণ এই কথা কহিলে, ভগবান্ ভূতনাথ হাস্যমুখে কহিলেন, “বৎস! তুমি আমার রূপ নিরীক্ষণ কর। আমি তোমার প্রতি যারপরনাই প্রীতিলাভ করিয়াছি। তুমি আমার একান্ত ভক্ত ও অনুরক্ত। আমি তোমাকে পরীক্ষা করিয়া যথেষ্ট তুষ্টিলাভ করিলাম। অতএব তুমি এক্ষণে অভিলষিত বর প্রার্থনা কর, আমি তোমার সমস্ত কামনাই পূর্ণ করিব।”
‘আমি দেবাদিদেবকর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া পুলকপূর্ণ কলেবরে আনন্দাশ্রু বিসর্জ্জন এবং ক্ষিতিতলে জানুযুগল সংস্থাপনপূৰ্ব্বক তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া গদবাক্যে কহিলাম, “হে দেবদেব! আজ আপনি আমার সমক্ষে অবস্থান করাতে বোধ হইতেছে যেন, অদ্যই আমি জীবলোকে নূতন জন্মগ্রহণ করিলাম। আজ আমার জন্ম সার্থক হইল। দেবগণও যে আরাধ্য পরমপূজ্য, অমিতপরাক্রম মহাত্মাকে নিরীক্ষণ করিতে অসমর্থ হয়েন, আজ আমি তাঁহাকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিলাম; সুতরাং আমার ন্যায় ধন্য ও কৃতপুণ্য লোক আর কেহই নাই। যোগিগণ যাঁহাকে পরমতত্ত্ব, নিত্য, অনির্ব্বচনীয়, অজ, জ্ঞানস্বরূপ ও অবিনাশী বলিয়া ধ্যান করিয়া থাকেন, তুমি সেই সৰ্ব্বজ্ঞ ও সকলের আদি দেবতা। তুমি সৃষ্টিপ্রারম্ভে দক্ষিণ অঙ্গ হইতে প্রজাপতি ব্রহ্মাকে ও বামাঙ্গ হইতে লোকরক্ষাৰ্থ বিষ্ণুকে সৃষ্টি করিয়া থাক। প্রলয়কাল সমুপস্থিত হইলে লোকসংহারার্থ তোমা হইতে রুদ্রদেবের সৃষ্টি হয়। সেই মহাতেজাঃ রুদ্র কালমূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া সমস্ত ভূত বিনাশ করিয়া থাকেন। তুমি এই স্থাবরজঙ্গমাত্মক বিশ্ব সৃষ্টি করিয়া প্রলয়কালে প্রাণীগণের স্মৃতিশক্তির বিলোপ কর। তুমি সর্ব্বগামী, সকল ভূতের অন্তরাত্মা, সকল কারণের কারণ ও অদৃশ্য। এক্ষণে যদি তুমি প্রসন্ন হইয়া আমাকে বর প্রদান করিতে অভিলাষ করিয়া থাক, তাহা হইলে এই বর প্রদান কর যেন, তোমার প্রতি আমার প্রগাঢ় ভক্তি থাকে। তোমার অনুগ্রহে যেন আমি ত্রিকালজ্ঞ হই এবং বন্ধুবান্ধবের সহিত সতত দুগ্ধান্ন ভোজন করিতে পাই। আর তুমি যেন আমাদিগের এই আশ্রমে নিরন্তর অবস্থান কর।”
উপমন্যুর শিববরলাভ—কৃষ্ণকর্ত্তৃক আশ্বাসবাণী
‘তখন ত্রিলোকপূজিত চরাচরগুরু ভগবান্ ভূতনাথ আমাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “বৎস! তুমি মৎপ্রদত্ত বরপ্রভাবে অজর, অমর, যশস্বী, তেজস্বী, শোকদুঃখশূন্য ও দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন হইবে। মহর্ষিগণ সতত তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত আগমন করিবেন। তুমি সুশীতল, গুণবান, সৰ্ব্বজ্ঞ ও প্রিয়দর্শন হইবে এবং স্থিরযৌবন ও অনলের ন্যায় তেজস্বী হইয়া কালযাপন করিবে। তুমি যে স্থানে ক্ষীরসমুদ্রের সমাগম বাসনা করিবে, ঐ পয়োনিধি সেই স্থানেই প্রাদুর্ভূত হইবে। এক্ষণে বন্ধুবান্ধবগণ সমভিব্যাহারে স্বেচ্ছানুসারে অমৃততুল্য দুগ্ধান্ন ভোজন কর।
“অতঃপর এক কল্প অতীত হইলে তুমি আমার নিকট সমুপস্থিত হইবে। তোমার কুল, গোত্র ও বন্ধুগণ চিরস্মরণীয় হইবে। আমার প্রতি তোমার প্রগাঢ় ভক্তি থাকিবে। আমি তোমার এই আশ্রমে নিরন্তর অবস্থান করিব। এক্ষণে তুমি পরমসুখে অবস্থান কর। কিছুমাত্র উৎকণ্ঠিত হইও না। তুমি আমাকে স্মরণ করিলেই আমি তোমার সমক্ষে প্রাদুর্ভূত হইব।” কোটিসূৰ্য্যসম তেজস্বী ভগবান্ উমাপতি আমাকে এইরূপ বরপ্রদান করিয়া সেই স্থানেই অন্তর্হিত হইলেন।
‘হে বাসুদেব! আমি সমাধিবলে এইরূপে দেবদেব মহাদেবের দর্শনলাভ করিয়াছিলাম। তিনি আমাকে যেরূপ বর প্রদান করিয়াছেন, আমি তদনুরূপ ফললাভ করিয়াছি। ঐ দেখ, সিদ্ধ, মহর্ষি, বিদ্যাধর, যক্ষ, গন্ধৰ্ব্ব ও অপ্সরাগণ এই স্থানে উপস্থিত হইয়াছেন, বৃক্ষসকল সমস্ত ঋতুর পুষ্পফলে নিরন্তর সুশোভিত রহিয়াছে এবং ভগবান্ ভূতভাবনের প্রসাদে আশ্রমস্থ সমুদয় পদার্থ দিব্যভাব প্রাপ্ত হইয়াছে।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষি উপমন্যু এই কথা কহিলে, আমি বিস্ময়াবিষ্টচিত্তে তাঁহাকে কহিলাম, তপোধন! আপনার আশ্রমে যখন স্বয়ং ভগবান্ মহাদেব সতত বাস করিয়া থাকেন, তখন আপনার অপেক্ষা ধন্য ও কৃতপুণ্য লোক আর কেই নেই। এক্ষণে সেই ত্রিলোকনাথ কি আমাকে দর্শন প্রদান করিয়া আমার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিবেন?
“তখন উপমন্যু কহিলেন, বাসুদেব! তুমি আমার ন্যায় অনতিকালমধ্যে সেই দেবদেবকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইবে। আমি দিব্যচক্ষুপ্রভাবে সততই তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিতেছি। তুমি ছয় মাস আরাধনা করিতে করিতেই তাঁহার দর্শনলাভে কৃতকার্য্য হইবে এবং তাঁহা হইতে আটটি ও দেবী পার্ব্বর্ত্তী হইতে ষোলটি বর লাভ করিবে। আমি তাঁহারই অনুগ্রহে ত্রিকালজ্ঞ হইয়াছি।
তিনি যখন এই সমস্ত মহর্ষিগিদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি বিতরণ করিয়াছেন, তখন তোমাকে উপক্ষো করিবেন কেন? তুমি ব্রহ্মপরায়ণ, অনৃশংস ও শ্রদ্ধাশীল; সুতরাং তোমার তুল্য লোকের সহিত সমাগম দেবগণের নিতান্ত স্পৃহনীয়। এক্ষণে আমি তোমাকে এক মন্ত্র প্রদান করিতেছি, উহার প্রভাবে তুমি অচিরাৎ মহাদেবের সাক্ষাৎকারলাভে সমর্থ হইবে।’ কখন আমি মহাত্মা উপমন্যুকে সম্বোধন করিয়া কহিলাম, ‘ব্রহ্মন্! যখন আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছেন, তখন আমি নিশ্চয়ই সেই অসুরকুলান্তক দেবাদিদেবের দর্শনলাভে কৃতকার্য্য হইব।’
উপমন্যুকর্ত্তৃক কৃষ্ণের দীক্ষা শঙ্করসাক্ষাৎকার
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এইরূপে সেই মুনিবরের সহিত মহাদেববিষয়ক বাক্যালাপ করিতে করিতে মুহূর্তের ন্যায় অষ্টাহ অতীত হইল। অনন্তর ঐ ব্রাহ্মণ আমার মস্তকমুগুন এবং আমাকে দণ্ড, কুশ, চীর ও মেখলা গ্রহণ করাইয়া শাস্ত্রানুসারে দীক্ষিত করিলেন। পরে আমি এক মাস ফলাহার ও চারি মাস জলপানপূর্ব্বক ঊৰ্দ্ধবাহু হইয়া একপদে অবস্থান করিলাম। অনন্তর যষ্ঠ মাস উপস্থিত হইলে দেখিলাম, আকাশমণ্ডলে একেবারে সহস্র সূর্য্যের তেজ প্রকাশিত হইয়াছে। ঐ তেজোমণ্ডলের মধ্যস্থলে নীলপর্ব্বতের ন্যায় একখণ্ড মেঘ আমার দৃষ্টিগোচর হইতে লাগিল। ঐ মেঘ ইন্দ্রায়ুধ ও বিদ্যুন্মালায় [বিদ্যুৎশ্রেণীতে] বিভূষিত। ভগবান্ মহাদেব স্বীয় ভাৰ্য্যা পার্ব্বতীর সহিত সেই মেঘের মধ্যে অবস্থান করিয়া যুগপৎ সমুদিত চন্দ্ৰসূর্য্যের ন্যায় শোভা পাইতেছিলেন। তখন আমি পুলকিতগাত্রে বিস্ময়বিকাশিতলোচনে সেই দেবগণের একমাত্র গতি আর্ত্তপরিত্রাণকর্ত্তা [১] ভগবান্ মহাদেবকে সন্দর্শন করিতে লাগিলাম।
“তিনি কিরীট, গদা, শূল, ব্যাঘ্রাজিন, জটা, দণ্ড, পিনাক, বজ্র, অঙ্গদ, নাগযজ্ঞোপবীত ও বিবিধ বর্ণযুক্ত দিব্যমাল্য ধারণ করিয়াছিলেন। তৎকালে তাঁহাকে শরৎকালীন পরিবেশগত [মণ্ডলমধ্যস্থিত] চন্দ্র ও দুর্নিরীক্ষ্য দিবাকরের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। প্রমথগণ তাঁহার চতুর্দ্দিক পরিবেষ্টন করিয়া অবস্থান করিতেছিল। একাদশ শত রুদ্র, আদিত্য, বসু, সাধ্য ও বিশ্বদেবগণ তাঁহার স্তব এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও ইন্দ্র তাঁহার নিকট সামবেদ পাঠ করিতেছিলেন। দেবর্ষি, ব্রহ্মর্ষি, যোগীশ্বর, পৃথিবী, অন্তরীক্ষ, নদী, পর্ব্বত, সমুদ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, মাস, পক্ষ, ঋতু, রাত্রি, সংবৎসর, মুহূর্ত্ত, নিমেষ, যুগপৰ্য্যায়, বেদ, যজ্ঞ, দীক্ষা, দক্ষিণা, পাবক, হবিঃ, যজ্ঞীয় দ্রব্য, সনৎকুমার, মরীচি, অঙ্গিরা, অত্রি, পুলহ, ক্রতু, সপ্তমনু, সোম, ভৃগু, দক্ষ, কশ্যপ, বশিষ্ঠ, কাশ্য, প্রজাপালক [সন্তানরক্ষক] মাতৃগণ, দেবকন্যা, দেবপত্নী, বিদ্যাধর, দানব, গুহ্যক ও রাক্ষসগণ এবং গীতবাদ্যবিশারদ অপ্সরা ও গন্ধৰ্ব্বগণ তাঁহার স্তবপাঠ করিতেছিলেন। বিদ্যাধর, দানব, গুহ্যক, রাক্ষস প্রভৃতি স্থাবর জঙ্গমাত্মক সমুদয় ভূতই কায়মনোবাক্যে তাঁহার প্রতি ভক্তি প্রকাশ করিতেছিল। ঐ সময় ভূতভাবন ভবানীনাথ আমার সমীপে অবস্থান করাতে ব্রহ্মা ও ইন্দ্র প্রভৃতি সকলেই আমাকে দর্শন করিতে লাগিলেন। সেই দেবদেবের তেজঃপ্রভাবে তাঁহাকে অরলোকন করিতে আমার ক্ষমতা ছিল না।
কৃষ্ণের শঙ্কর-স্তব
“অনন্তর সেই ভূতভাবন ভগবান্ ভবানীপতি আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “বাসুদেব! তুমি আমার রূপ দর্শন করিয়া আমার নিকট স্বীয় প্রার্থনা ব্যক্ত কর। তুমি সহস্র সহস্রবার আমার আরাধনা করিয়াছ। ত্রিলোকমধ্যে তোমার তুল্য আমার পরমভক্ত আর কেহই নাই।’ দেবাদিদেব মহাদেব আমাকে এই কথা কহিলে, আমি তাঁহার চরণে নিপতিত হইলাম। জগন্মাতা পাৰ্ব্বতী আমাকে ভূতপতির চরণে প্রণত দেখিয়া আমার প্রতি নিতান্ত প্রসন্ন হইলেন।
“তখন আমি সেই ব্রহ্মাদি দেবগণের পূজনীয় দেবদেব মহেশ্বরকে ভক্তিভাবে স্তব করিয়া কহিলাম, ‘হে সনাতন বিশ্ববিধাতঃ! মহর্ষিগণ তোমাকে দেবের অধিপতি, তপস্যা, সত্য এবং সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণরূপ বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। তুমি ব্রহ্মা, রুদ্র, বরুণ, অগ্নি, মনু, ভব, ধাতা, বিধাতা ও সূৰ্য্যস্বরূপ। তোমা হইতে স্থাবরজঙ্গমাত্মক সমুদয় প্রাণীর সৃষ্টি হইয়াছে। তুমিই এই চরাচর ত্রিলোকের সৃষ্টি করিয়াছ এবং মহর্ষিগণ তোমাকে সমুদয় ইন্দ্রিয়, মন, পঞ্চ প্রাণ ও সপ্ত অগ্নির স্বরূপ এবং ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ও ঔবযোগ্য দেবতা হইতে শ্রেষ্ঠ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। তুমি সমুদয় বেদ, যজ্ঞ, সোমরস, দক্ষিণা, অগ্নি, ঘৃত, যজ্ঞোপকরণদ্রব্য, দান, অধ্যয়ন, ব্রত, নিয়ম, লজ্জা, কীৰ্ত্তি, শ্রী, ধৃতি, তুষ্টি, মোক্ষদা, সিদ্ধি, কাম, ক্রোধ, ভয়, লোভ, মন ও মৎসরস্বরূপ। তোমা হইতেই আধি ও ব্যাধি সমুদয় সমুদ্ভূত হইয়াছে। তুমিই ক্রিয়া, হর্ষাদি চিত্তবিকার, প্রণয়, বাসনাবীজ, মনের উৎপত্তিস্থান, নিত্যসিদ্ধ ঐশ্বৰ্য্য, অব্যক্ত পরব্রহ্ম, অচিন্ত্য, সূর্য্য, জ্যোতির্ম্ময়, গুণসমুদয়ের আদি ও জীবসমুদয়ের লয়স্থান। বেদার্থবিদ পণ্ডিতেরা তোমাকে মহত্তর, আত্মা, মতি, ব্রহ্মা, বিশ্ব, শম্ভু, স্বয়ম্ভু, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, চেতনা, জ্ঞান, খ্যাতি ও স্মৃতিস্বরূপ বলিয়া ধ্যান করেন। বেদবি ব্রাহ্মণগণ, তোমাকে ঐরূপে পরিজ্ঞাত হইয়া সংসারমূল অজ্ঞানতা হইতে মুক্ত হয়েন।
“তুমি সৰ্ব্বভূতের হৃদয়স্থ জীবাত্মা। মহর্ষিগণ প্রতিনিয়ত তোমাকে স্তব করিয়া থাকেন। তোমার হস্ত, পদ, মুখ, চক্ষু, কর্ণ ও মস্তক সৰ্ব্বত্র বিদ্যমান রহিয়াছে এবং তুমি সমুদয় লোক পরিব্যাপ্ত করিয়া অবস্থান করিতেছ। তুমি স্বর্গসুখ, সূর্য্যের প্রভা ও কিরণ, সৰ্ব্বভূতের অন্তর্গত পরমাত্মা, অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি, ঈশান, জ্যোতি ও অব্যয়স্বরূপ। তোমাতে বুদ্ধি, মতি ও লোকসমুদয় প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। সত্যসঙ্কল্প, জিতেন্দ্রিয় যোগানুষ্ঠাননিরত মহাত্মারা নিরন্তর তোমারই শরণাপন্ন হইয়া থাকেন। যাঁহারা তোমাকে হৃদয়াকাশশায়ী পরম পুরুষ, বিশ্বব্যাপী জ্যোতির্ম্ময় ও বুদ্ধিমানদিগের পরমগতি বলিয়া পরিজ্ঞাত হইতে পারেন, তাঁহারাই যথার্থ বুদ্ধিমান। মনুষ্য মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার ও পঞ্চতন্মাত্র এই সাত সূক্ষ্মগুণ ও তোমার সৰ্ব্বজ্ঞতা প্রভৃতি ছয় গুণ এবং যোগবিধি বিশেষরূপে পরিজ্ঞাত হইতে পারিলেই তোমাতে লীন হইতে পারে।’
“আমি এইরূপে ভূতভাবন ভগবান্ মহাদেবের স্তব করিলে জগতের সমুদয় লোক সিংহনাদ করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণ, দেব, অসুর, নাগ, পিশাচ, পক্ষী, রাক্ষস, ভূত, মহর্ষি ও পিতৃগণ তাঁহাকে নমস্কার করিতে লাগিলেন। মন্দ মন্দ সমীরণ প্রবাহিত ও আমার মস্তকে সুগন্ধি পুষ্পবৃষ্টি নিপতিত হইতে লাগিল। তখন ভূতভাবন ভগবান্ ভবানীনাথ পার্ব্বতী ও ইন্দ্রকে অভিনন্দনপূৰ্ব্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বাসুদেব! তুমি যে আমার পরমভক্ত, তাহা আমি সবিশেষ অবগত আছি। এক্ষণে আমি তোমার প্রতি যারপরনাই প্রীত হইয়া তোমাকে আটটি বর গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিতেছি, অতএব তুমি আমার নিকট স্বীয় অভিলাষানুরূপ আটটি বর প্রার্থনা কর।’ ”
