1 of 4

৫. আশ্রয়স্থানের মমতা—ইন্দ্ৰশুক সংবাদ

৫ম অধ্যায়

আশ্রয়স্থানের মমতা—ইন্দ্ৰশুক সংবাদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! অনৃশংসতা ধর্ম্ম ও ভক্তিপরায়ণ ব্যক্তিদিগের গুণ শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে; অতএব আপনি উহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আমি এই উপলক্ষে দেবরাজ ইন্দ্র ও এক শুকপক্ষীর পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বকালে কাশীরাজের রাজ্যে এক ব্যাধ বিষলিপ্ত বাণ গ্রহণপূর্ব্বক গ্রাম হইতে বিনির্গত হইয়া মৃগয়া করিত। ঐ ব্যাধ একদা মৃগ অন্বেষণ করিতে করিতে নিবিড় অরণ্যে প্রবেশপূৰ্ব্বক অনতিদূরে একটি মৃগকে লক্ষ্য করিয়া স্বীয় বিষাক্ত বাণ পরিত্যাগ করিল; কিন্তু দৈবাৎ এই বাণ মৃগের উপরে নিপতিত না হইয়া এক প্রকাণ্ড বৃক্ষের উপরে পতিত হইল। তরুবর বিষ-মিশ্রিত সুতীক্ষ্ণশরে বিদ্ধ হওয়াতে ক্রমে তাহার ফল ও পত্ৰসমুদয় ভূতলে নিপতিত হইল এবং উহা ক্রমে ক্রমে শুষ্ক হইয়া গেল।

“ঐ বৃক্ষের কোটরে বহুকাল এক ধর্ম্মপরায়ণ কৃতজ্ঞ শুকপক্ষী বাস করিত। ঐ পক্ষী স্বীয় আশ্রয়দাতা বনস্পতিকে শুষ্ক হইতে দেখিয়া উহাকে পরিত্যাগ না করিয়া নিরাহারে তথায় অবস্থানপূর্ব্বক তাহার সহিত শুষ্ক হইতে লাগিল। ভগবান সুরপতি শুকপক্ষীর অলৌকিক কার্য্য অবলোকন করিয়া বিস্ময়োৎফুল্ললোচনে মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, ‘ঐ শুকপক্ষী আশ্রয়দাতা বৃক্ষের দুঃখে নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছে। কি আশ্চর্য্য! তিৰ্য্যগ্‌যোনিদিগের মধ্যেও কি এরূপ অনৃশংস ব্যবহার আছে অথবা মনুষ্য প্রভৃতি প্রাণীমাত্রেই সদগুণসমুদয় বিদ্যমান থাকিবার সম্ভাবনা?’ দেবরাজ মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিয়া পরিশেষে ব্রাহ্মণবেশে সেই শুকপক্ষীর নিকট আগমনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বিহগরাজ! তুমি শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করিয়া তোমার জননী দাক্ষেয়ীকে চরিতার্থ করিয়াছ। যাহা হউক, এক্ষণে তুমি কি নিমিত্ত এই শুষ্কবৃক্ষ পরিত্যাগ না করিয়া ইহাতে অবস্থান করিতেছ, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন কর।’

“ব্রাহ্মণরূপী সুররাজ এই কথা কহিলে ধর্ম্মপরায়ণ শুক তাঁহাকে অভিবাদনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘দেবরাজ! আমি জ্ঞানচক্ষুদ্বারা আপনাকে পরিজ্ঞাত হইয়াছি; আপনি সুখে আগমন করিয়াছেন ত?’ তখন ভগবান্ সহস্রাক্ষ সেই শুকপক্ষীর বাক্যশ্রবণে মনে মনে তাহাকে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান ও তাহার বিজ্ঞান বলের যথোচিত প্রশংসা করিয়া পুনরায় তাহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বিহগরাজ! এই অরণ্যে অসংখ্য বৃক্ষ বিদ্যমান আছে এবং উহাদিগের কোটরসমুদয় সতত পত্রদ্বারা সমাচ্ছন্ন রহিয়াছে; অতএব তুমি কি নিমিত্ত এই ফলপল্লববিহীন শুষ্কবৃক্ষে বাস করিতেছ? আমার মতে এই মৃতকল্প হতশ্রীকতা [নষ্টশ্রী] ক্ষীণসার জীর্ণবৃক্ষ পরিত্যাগ করাই তোমার কর্ত্তব্য।’

কর্ত্তব্যপরায়ণ শুকের ইন্দ্রলোকলাভ

“দেবরাজ এই কথা কহিলে ধর্ম্মপরায়ণ শুক দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগপূৰ্ব্বক কহিল, ‘সুররাজ! দেবতার আদেশ কেহই অতিক্রম করিতে পারে না। এক্ষণে আপনি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি এক্ষণে তাহার উত্তর প্রদান করিতেছি, শ্রবণ করুন। আমি এই বৃক্ষে জন্মগ্রহণপূৰ্ব্বক বিবিধ সদ্গুণসম্পন্ন হইয়া বহুকাল বাস করিতেছি। এই তরুবর আমাকে বালকের ন্যায় রক্ষা করিয়াছে। এই স্থানে শত্রুগণ কখন আমাকে আক্রমণ করিতে পারে নাই। এই নিমিত্ত আমি এই বৃক্ষের প্রতি ভক্তিপরায়ণ হইয়া অনৃশংসতা ধর্ম্ম প্রতিপালন করিতেছি। অতএব আপনি আমার প্রতি দয়া করিয়া কি নিমিত্ত আমার অধপ্রবৃত্তি উত্তেজিত করিতেছেন? দয়ার তুল্য সাধুদিগের পরমধৰ্ম্ম আর কিছুই নাই। দয়াই সৰ্ব্বদা সাধুদিগকে প্রীতি প্রদান করিয়া থাকে। ধর্ম্মবিষয়ক সংশয় উপস্থিত হইলে দেবগণ আপনাকেই উহা জিজ্ঞাসা করেন, এই নিমিত্ত আপনি দেবরাজ্যে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন, অতএব আমাকে এই বৃক্ষ পরিত্যাগ করিতে উপদেশ করা আপনার নিতান্ত অকৰ্ত্তব্য। আমি যাহাকে আশ্রয় করিয়া এতাবৎকাল জীবিত রহিয়াছি, আজ তাহার অসময় দেখিয়া কিরূপে তাহাকে পরিত্যাগ করিব?’

“মহানুভব শুকপক্ষী এই কথা কহিলে, দেবরাজ অনৃশংসতাধৰ্ম্ম শ্রবণে পরিতুষ্ট হইয়া তাহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘হে ধর্ম্মাত্মন্! আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি। এক্ষণে বর প্রার্থনা কর।’ তখন শুক কহিল, ‘দেবরাজ! যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তাহা হইলে আমাকে এই বর প্রদান করুন, যেন এই বৃক্ষ অচিরাৎ পূৰ্ব্ববৎ ফুলপুষ্পে সুশোভিত হয়।’

“ধৰ্ম্মাত্মা শুক এইরূপ বর প্রার্থনা করিলে ভগবান্ পাকশাসন তাহার প্রতি সমধিক প্রীত হইয়া সেই বৃক্ষে অমৃতসেচন করিলেন; বৃক্ষও পূৰ্ব্বের ন্যায় মনোহর শাখাপল্লব ও ফলে সমাকীর্ণ হইয়া রমণীয় শোভা ধারণ করিল। মহাত্মা শুক পরমসুখে সেই তরুকোটরে কিয়ৎকাল অতিক্রম করিয়া পরিশেষে দেহত্যাগপূৰ্ব্বক স্বীয় অনৃশংসতাধৰ্ম্মবলে ইন্দ্রলোক প্রাপ্ত হইল।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! যেমন মহাত্মা শুকপক্ষীর আশ্রয়বলে বৃক্ষের হিতসাধন হইয়াছে, তদ্রূপ লোকে ভক্তিপরায়ণ সাধুব্যক্তিকে আশ্রয় করিলে অনায়াসে সমুদয় কাৰ্য্যে সিদ্ধিলাভ করিতে পারে।”