৪৭তম অধ্যায়
ব্রাহ্মণের চাতুর্ব্বর্ণবিবাহ—উত্তরাধিকারিনির্ণয়
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি সমুদয় শাস্ত্রনির্ণয়ই অবগত আছেন। ধৰ্ম্মসংশয় উপস্থিত হইলে আপনিই তাহার সিদ্ধান্ত করিয়া দেন। আমার কোন বিষয় জ্ঞাত হইতে ইচ্ছা হইলে আমি আর কাহাকেও জিজ্ঞাসা করি না। এক্ষণে আপনার নিকট প্রশ্ন করিতেছি, আপনি তাহার উত্তর প্রদান করুন। ব্রাহ্মণের চারিটি ভাৰ্য্যা বিহিত আছে—ব্রাহ্মণী, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রা। ঐ সমস্ত স্ত্রীর গর্ভে ব্রাহ্মণের যেসকল পুত্ৰ উৎপন্ন হয়, তাহাদিগের মধ্যে কে কি পরিমাণে পৈতৃক ধন অধিকার করিবে, আপনি তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণে বিবাহ করাই ব্রাহ্মণের প্রশস্ত। তিনি চিত্তবিভ্রম, লোভ বা সম্ভোগবাসনায় শূদ্রার পাণিগ্রহণ করিতে পারেন কিন্তু উহা শাস্ত্রের অনুমোদিত নহে। শাস্ত্রে নির্দ্দিষ্ট আছে যে, ব্রাহ্মণ শূদ্রা সম্ভোগ করিলে অধোগতি প্রাপ্ত হয়েন; অতএব ঐরূপ স্থলে বিধানানুসারে পাপশান্তির নিমিত্ত প্রায়শ্চিত্ত করা তাঁহার অবশ্য কর্ত্তব্য। যদি শূদ্রার গর্ভে ব্রাহ্মণের পুত্র উৎপন্ন হয়, তাহা হইলে তাহাকে শূদ্রাসম্ভোগবিহিত প্রায়শ্চিত্ত অপেক্ষা দ্বিগুণ প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে। এক্ষণে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যা ও শূদ্রার গর্ভসদ্ভূত পুত্রগণের মধ্যে ব্রাহ্মণের ধন হইতে যে যেরূপ অংশ গ্রহণ করিবে, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি শ্রবণ কর।
“ব্রাহ্মণীর গর্ভসম্ভূত পুত্ৰ অগ্রে পিতৃধন হইতে সুলক্ষণ বৃষ ও যান প্রভৃতি উৎকৃষ্ট বস্তুসকল শ্রেষ্ঠাংশস্বরূপ অধিকার করিবে; তৎপরে যে ধন অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা দশ অংশ করিতে হইবে। সেই দশ অংশ হইতেই ব্রাহ্মণীগর্ভসমুৎপন্ন পুত্র চারি অংশ গ্রহণ করিবে; ক্ষত্রিয়ার গর্ভসম্ভূত পুত্র ব্রাহ্মণ হইয়াও অসবর্ণার গর্ভে উৎপন্ন হইয়াছে বলিয়া তিন অংশ গ্রহণ করিবে; বৈশ্যাগৰ্ভসম্ভূত পুত্র দুই অংশ অধিকার করিবে এবং শূদ্রার গর্ভে যাহার জন্ম হইয়াছে, সে একাংশ মাত্র গ্রহণ করিবে। যদিও শূদ্রার গর্ভে ব্রাহ্মণের ঔরসে সমুৎপন্ন পুত্র পৈতৃক ধনগ্রহণের একান্ত অনুপযুক্ত, তথাপি তাহাকে দয়া করিয়া অল্পমাত্র ধন প্রদান করা কর্ত্তব্য। হে ধৰ্ম্মরাজ! ব্রাহ্মণের ধন দশ অংশ করিয়া সবর্ণা ও অসবর্ণার গর্ভজাত পুত্রেরা একরূপে অধিকার করিবে। যেস্থলে সকল পুত্রই সমানবর্ণা হইতে উৎপন্ন হইবে, সেই স্থলে পিতৃধনের সমান অংশ কল্পনা করাই বিধেয়। শূদ্ৰাতনয় সম, দম প্রভৃতি সদগুণ বিরহিত বলিয়া ব্রাহ্মণত্বলাভে বঞ্চিত হইয়া থাকে। আর তিন বর্ণ হইতে ব্রাহ্মণের ঔরসে যাহারা জন্মগ্রহণ করে, তাহারা ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিগণিত হয়। শাস্ত্রে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি বর্ণই নির্দ্দিষ্ট আছে। পঞ্চম বর্ণ নাই। এই চারি বর্ণের মধ্যে শূদ্র নিকৃষ্ট বর্ণ। এই নিমিত্ত শূদ্রাপুত্র ব্রাহ্মণের ধন হইতে দশ-অংশের একাংশমাত্র গ্রহণ করিবে। তাহাও আবার পিতা যদি স্বেচ্ছানুসারে প্রদান করেন, তাহা হইলে গ্রহণ করিতে পারিবে; নতুবা সে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া কদাচ তাহাতে হস্ত প্রসারণ করিতে সমর্থ হইবে না। তথাচ শূদ্রাপুত্রকে নিতান্ত বঞ্চিত না করিয়া পৈতৃক ধন হইতে যৎকিঞ্চিৎ প্রদান করা পিতার সব্বতোভাবে শ্রেয়স্কর। দয়া পরমধর্ম্ম, দয়া যে স্থানে প্রদর্শিত হউক না কেন, বহুগুণ উৎপাদন করিয়া থাকে। দয়ার পাত্রপাত্র বিচার নাই। সুতরাং শূদ্র নিকৃষ্ট জাতি হইলেও করুণাপরতন্ত্র হইয়া তাহাকে পৈতৃক ধনলাভের আশা হইতে এককালে নিরাশ করা কর্ত্তব্য নহে। ব্রাহ্মণের ঔরসে অন্য বর্ণ হইতে পুত্র উৎপন্ন হউক বা না হউক, শূদ্ৰাগৰ্ভজাত পুত্রকে দশমাংশের অধিক প্রদান করা কদাপি কর্ত্তব্য নহে।
“যদি ব্রাহ্মণের তিন বৎসরের আহার সাধনোপযোগী ধন হইতে কিছু অতিরিক্ত থাকে, তাহা হইলে তিনি তদ্বারা যজ্ঞানুষ্ঠান করিবেন। বৃথা ব্যয় করা তাহার কর্ত্তব্য নহে। সহধর্ম্মিণীকে তিনসহস্র মুদ্রার অধিক প্রদান করা ভর্ত্তার অবিধেয়। সহধর্ম্মিণী সেই ভক্তৃদত্ত ধন যথেচ্ছ ব্যয় করিতে পারিবে। পতির লোকান্তর প্রাপ্তি হইলে স্ত্রী পতিধনের উত্তরাধিকারিণী; উহা কেবল উপভোগ করিবে, উহার বিক্রয়াদি করিবার অধিকার তাহার কিছুমাত্র নাই। ভর্ত্তৃধন অপহরণ করা স্ত্রীর কর্ত্তব্য নহে। তাহার যাহা কিছু পিতৃদত্ত ধন থাকিবে, তাহার লোকান্তর প্রাপ্তি হইলে তাহার কন্যা তৎসমুদয় অধিকার করিবে।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট ধনবিভাগধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করিলাম, এই ধৰ্ম্ম সবিশেষ অবগত হইয়া ধন বৃথা ব্যয় করা কৰ্ত্তব্য নহে।”
ব্রাহ্মণজাতীয় পত্নীর শ্রেষ্ঠত্ব
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যখন ব্রাহ্মণের ঔরসে শূদ্রার গর্ভে সম্ভূত পুত্রের পৈতৃক ধনে অধিকার নাই, তখন তাহাকে দশমাংশ প্রদান করিবার প্রয়োজন কি এবং ব্রাহ্মণ হইতে ব্রাহ্মণী, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যার গর্ভে যে সমুদয় পুত্র জন্মগ্রহণ করে, তাহারা সকলেই ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিগণিত হয়, তখন কি নিমিত্ত তাহাদিগের পৈতৃক ধনে সমান অধিকার নাই, আপনি তাহা আমার নিকট বিশেষরূপে কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যদিও সমুদয় ভাৰ্য্যাই আদরের পাত্র বলিয়া দারা নামে অভিহিত হয়, তথাপি ব্রাহ্মণীকেই সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলিতে হইবে। ব্রাহ্মণ অগ্রে ক্ষত্রিয়াদি তিন বর্ণে বিবাহ করিয়া পশ্চাৎ ব্রাহ্মণীকে বিবাহ করিলেও ব্রাহ্মণী সৰ্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠা ও মান্যা হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণী বিদ্যমান থাকিতে অন্য ভাৰ্য্যা স্বীয় গৃহে কখনই ভর্ত্তার স্নানীয়দ্রব্য, কেশসংস্কারদ্রব্য, দন্তধাবন, অঞ্জন ও হব্যকব্য প্রভৃতি বস্তু রক্ষা করিতে পারে না। ব্রাহ্মণীই ভর্ত্তাকে বস্ত্র, আভরণ, মাল্য, অন্ন ও পানীয় প্রদান করিবেন। মহাত্মা মনুর প্রণীত শাস্ত্রে এই সনাতন ধর্ম্ম দৃষ্ট হইয়াছে। যদি কোন ব্রাহ্মণ কামপরতন্ত্র হইয়া ইহার অন্যথাচরণে প্রবৃত্ত হয়েন, তাহা হইলে তাহাকে মতঙ্গের ন্যায় চণ্ডালরূপ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে। যদিও ক্ষত্রিয়ার গর্ভসম্ভূত পুত্রের ব্রাহ্মণীগৰ্ভসম্ভূত তুল্য বলিয়া নির্দ্দেশ করা গিয়াছে, তথাপি ব্রাহ্মণী শ্রেষ্ঠবর্ণসম্ভূতা বলিয়া তাহার গর্ভসম্ভূত পুত্রকে অবশ্যই শ্রেষ্ঠ বলিয়া নির্দ্দেশ করিতে হইবে। ব্রাহ্মণীর গর্ভসম্ভূত পুত্ৰই সৰ্ব্বপ্রধান। এই নিমিত্ত সে পিতৃধন হইতে উৎকৃষ্ট বস্তুসমুদয় ও অবশিষ্ট ধন দশ ভাগ করিয়া তাহার চারি ভাগ গ্রহণ করিতে পারে। ক্ষত্রিয়া যেমন ব্রাহ্মণীর তুল্য নহে, তদ্রূপ বৈশ্যা কখনই ক্ষত্রিয়ার তুল্য, সম্মানাস্পদ হইতে পারে না। রাজ্য, কোষ ও সসাগরা পৃথিবীতে ক্ষত্রিয়ের অধিকার থাকে। ক্ষত্রিয় রাজপদে অধিরূঢ় হইয়া স্বধৰ্ম্মানুসারে প্রভূত ঐশ্বর্য্য লাভ করিতে পারে। ক্ষত্রিয় ভিন্ন কেহই প্রজাগণকে রক্ষা করিতে সমর্থ হয় না। ক্ষত্রিয় ঋষিপ্রণীত সনাতনধৰ্ম্ম পরিজ্ঞাত হইয়া দেবতাদিগের মান্য ব্রাহ্মণগণের যথাবিধি পূজা করিয়া থাকেন। ক্ষত্রিয়ই সমুদয় বর্ণের রক্ষাকর্ত্তা। লোকের ধন ও স্ত্রীপুত্রাদি দস্যুগণকর্ত্তৃক সমাক্রান্ত হইলে ক্ষত্রিয়ই তৎসমুদয় রক্ষা করিয়া থাকে। অতএব বৈশ্যার গর্ভজাত পুত্র অপেক্ষা যে ক্ষত্রিয়ার গর্ভজাত পুত্র শ্রেষ্ঠ, তাহার আর সন্দেহ কি? অতএব ক্ষত্রিয়ার গর্ভজাত পুত্র, বৈশ্যাগৰ্ভসম্ভূত পুত্র অপেক্ষা অধিক পরিমাণে পৈতৃক ধন গ্রহণ করিতে পারে।”
ক্ষত্রিয়াদি ত্রিবর্ণের পুত্রকলত্র-পারিপাট্য
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি ব্রাহ্মণের নিয়মসমুদয় বিধিপূৰ্ব্বক কীৰ্ত্তন করিলেন, এক্ষণে ক্ষত্রিয়াদি তিন বর্ণের নিয়মও শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইয়াছে, অতএব তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ক্ষত্রিয়গণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই দুই বর্ণেই বিধিপূর্ব্বক বিবাহ করিবে। উহারা কামপরতন্ত্র হইয়া, শূদ্ৰাদিগকেও পত্নীত্বে প্রতিগ্ৰহ করিতে পারে; কিন্তু উহা শাস্ত্রসম্মত নহে। যে ক্ষত্রিয় সবর্ণা, বৈশ্যা ও শূদ্রা এই ত্রিবিধ পত্নীর গর্ভে পুত্রোৎপাদন করিবেন, তাঁহার ধন আট ভাগে বিভক্ত হইবে। ঐ আট ভাগের মধ্যে ক্ষত্রিয়াগৰ্ভসম্ভূত পুত্র চারি ভাগ, বৈশ্যাগৰ্ভসম্ভূত পুত্র এক ভাগমাত্র গ্রহণ করিবে। কিন্তু পিতা প্রদান না করিলে শূদ্ৰাগৰ্ভজাত পুত্র ঐ ধনের কিছুমাত্র গ্রহণ করিতে পারিবে না। ক্ষত্রিয়ের জয়লব্ধ ধনে ক্ষত্রিয়াগৰ্ভসম্ভূত পুত্রের সম্পূর্ণ অধিকার।
“বৈশ্যজাতি বৈশ্য ও শূদ্র এই দুই বর্ণে বিবাহ করিতে পারে; কিন্তু শূদ্রাকে বিবাহ করা তাহার পক্ষে শাস্ত্রসম্মত নহে। যে বৈশ্য বৈশ্যা ও শূদ্রা এই উভয়বিধ পত্নীর গর্ভে পুত্রোৎপাদন করিবে, তাহার ধন পাঁচভাগে বিভক্ত হইবে; তন্মধ্যে বৈশ্যাগৰ্ভজাত পুত্র চারিভাগ ও শূদ্ৰাগৰ্ভসম্ভূত পুত্র একভাগ গ্রহণ করিবে। কিন্তু পিতার অনুমতি ব্যতীত শূদ্রাপুত্র কখনই ঐ ধনের একভাগ গ্রহণ করিতে পারিবে না। যাহা হউক, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণ শূদ্রার গর্ভে যেসমুদয় পুত্র উৎপাদন করিবেন, তাহাদিগকে পৈতৃকধনের অল্পমাত্র অংশ প্রদান করা তাঁহাদের অবশ্য কর্ত্তব্য। শূদ্ৰজাতি কেবল সবর্ণাকে বিবাহ করিতে পারে। শূদ্রের একশত পুত্ৰ উৎপন্ন হইলেও তাহারা পৈতৃক ধন সমান অংশে বিভক্ত করিয়া লইবে। ফলতঃ সমুদয় বর্ণেরই সবর্ণাগৰ্ভসম্ভূত পুত্রগণের পৈতৃক ধনে সমান অধিকার। তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠপুত্র জ্যেষ্ঠাংশস্বরূপ এক ভাগ অধিক গ্রহণ করিতে পারে।
“সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা এইরূপ দায়ভাগবিধি নির্ণয় করিয়াছেন। মরীচিপুত্র মহাত্মা কশ্যপ কহিয়াছেন, যদি ব্রাহ্মণাদি বর্ণচতুষ্টয় ক্রমে ক্রমে অনেক সবর্ণার পাণিগ্রহণ করেন, তাহা হইলে অগ্রে প্রথমার গর্ভসম্ভূত পুত্র জ্যেষ্ঠাংশ, মধ্যমার গর্ভসম্ভূত পুত্র মধ্যমাংশ ও কনিষ্ঠার গর্ভসম্ভূত পুত্র কনিষ্ঠাংশ গ্রহণপূৰ্ব্বক শেষে অবশিষ্ট ধন সমান ভাগে বিভক্ত করিয়া লইবে। ফলতঃ সবর্ণাগৰ্ভসম্ভূত পুত্রই সমুদয় পুত্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।”
