1 of 4

১৬. উপমন্যু-আশ্রমে কৃষ্ণের শিবস্তোত্ৰশ্রবণ

১৬শ অধ্যায়

উপমন্যু-আশ্রমে কৃষ্ণের শিবস্তোত্ৰশ্রবণ

কৃষ্ণ কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! অনন্তর সেই দ্বিজবর উপমন্যু পুনরায় মহাদেবের মাহাত্ম্যকীৰ্ত্তন উপলক্ষ্যে আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “মাধব! পূৰ্ব্বে সত্যযুগে তণ্ডিনামে এক বিখ্যাত মহর্ষি ছিলেন। তিনি দশসহস্র বৎসর সমাধি অবলম্বনপূৰ্ব্বক পিনাকপাণির আরাধনা করিয়া যে ফললাভ করিয়াছিলেন, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। মহাত্মা তুণ্ডি সমাধিদ্বারা দশসহস্র বৎসর পরমাত্মাস্বরূপ অব্যয় মহাদেবের আরাধনা করিয়া পরিশেষে তাঁহাকে চিন্তা করিতে করিতে কহিতে লাগিলেন যে, সাঙ্খ্যমতাবলম্বীরা যে প্রধান পুরুষ লোকপ্রতিষ্ঠাতা মহাদেবের স্তবপাঠ ও যোগিগণ যাঁহাকে মনোমধ্যে চিন্তা করিয়া থাকেন, যিনি সৃষ্টি ও সংহারের অদ্বিতীয় কারণ, দেবতা, অসুর ও মুনিগণের মধ্যে যাহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই, আমি সেই অনাদিনিধান, পরমসুখী দেবাদিদেব মহাদেবের শরণাপন্ন হইলাম। মহাত্মা তণ্ডি এই কথা বলিবামাত্র ভগবান্ ভূতনাথ তাঁহার নেত্রপথে নিপতিত হইলেন। তিনি অক্ষয়, অচিন্ত্য, নিত্য, পূর্ণব্রহ্ম, নির্গুণ অথচ গুণবিষয়ীভূত এবং যোগিগণের পরমানন্দ ও মোক্ষস্বরূপ। তিনি ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু, ব্রহ্মা ও বিশ্বের একমাত্র গতি এবং অচল, শুদ্ধ, বুদ্ধিশক্তিগ্রাহ্য, মনঃস্বরূপ, দুর্জ্ঞেয় ও অপরিমেয়। দুরাত্মারা কখনই তাহাকে লাভ করিতে সমর্থ হয় না। তিনি বিশ্বসংসারের উৎপত্তিস্থান ও তমোগুণাতীত।

‘মহাত্মা তুণ্ডি বহুবর্ষ কঠোর তপানুষ্ঠানপুৰ্ব্বক সেই ভূতভাবন ভগবান মহাদেবের সাক্ষাৎকার লাভ করিয়া তাঁহার স্তব করিতে করিতে কহিলেন, ‘হে পরমাত্মন্। তুমি পবিত্রদিগের মধ্যে পবিত্র, গতিমানদিগের পরমগতি, তেজস্বীদিগের উৎকৃষ্ট তেজ ও তপস্বীদিগের পরম তপস্যাস্বরূপ। ইন্দ্র তোমাকে নমস্কার করিয়া থাকেন, তুমি বিশ্বাবসু, হিরণ্যাক্ষ, সহস্রাংশু, মোক্ষপদ, সর্ব্বসুখের আধার ও পরম সত্যস্বরূপ। তুমি জন্মমরণভীরু সন্ন্যাসীদিগকে মুক্তি প্রদান করিয়া থাক। যখন ব্রহ্ম, ইন্দ্র, বিষ্ণু, বিশ্বদেব ও মহর্ষিগণও তোমায় বিশেষরূপে পরিজ্ঞাত হইতে পারেন না, তখন আমি কিরূপে তোমাকে পরিজ্ঞাত হইব? বিশ্ব-সংসার তোমা হইতেই সমুদ্ভূত হইয়াছে ও তোমাতেই প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। তুমি কালপুরুষ ও ব্রহ্মস্বরূপ। পুরাণজ্ঞ দেবর্ষিগণ তোমাকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্ররূপী বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। তুমি জীব, দেহ, ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা, স্বর্ণাদি লোক, অনুভবাত্মক জ্ঞান এবং যজ্ঞের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাস্বরূপ। তুমি দেবগণেরও দুর্জ্ঞেয় ও সর্ব্বান্তৰ্য্যামী। তত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিতেরা তোমাকে পরিজ্ঞাত হইতে পারিলেই বিমুক্ত হইয়া অনায়াসে অনাময়ী পরমভাব লাভ করিতে পারেন। যাহারা তোমাকে পরিজ্ঞাত হইতে বাসনা না করে, তাহাদিগকেই ইহলোকে বারংবার জন্মগ্রহণ করিতে হয়। তুমি মোক্ষ ও স্বর্গের দ্বারস্বরূপ। তোমার কৃপাবলেই লোকে স্বর্গ ও মোক্ষ লাভ করে, আর তোমার কৃপা না থাকিলেই উহার লাভে বঞ্চিত হয়। তুমি স্বর্গ, মোক্ষ, কাম, ক্রোধ, সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, অধঃ ও ঊর্দ্ধস্বরূপ। তুমি ব্রহ্ম, ভব, বিষ্ণু, কার্ত্তিকেয়, ইন্দ্র, সবিতা, যম, বরুণ, চন্দ্র, মনু, ধাতা, বিধাতা, কুবের, পৃথিবী, বায়ু, সলিল, অগ্নি, আকাশ, বাক্য, বুদ্ধি, স্থিতি, মতি, কৰ্ম্ম, সত্য, মিথ্যা, সত্তা, অসত্তা, ইন্দ্রিয়, রূপরসাদি, বিষয়, প্রকৃতির অতীত, কার্য্যকারণভিন্ন এবং চিত্য ও অচিন্তস্বরূপা তুমি পরব্রহ্মা, পরমপদ ও সাঙ্খ্যমতাবলম্বী যোগীদিগের পরমগতি। ইহলোকে নির্ম্মলবুদ্ধিসম্পন্ন তত্ত্বজ্ঞ মহাত্মারা যে গতি প্রার্থনা করিয়া থাকেন, আজ আমি তোমার দর্শনে সেই গতি লাভ করিয়া চরিতার্থ হইলাম। হায়! তত্ত্ববিদ পণ্ডিতেরা যাঁহাকে সনাতন পরমপুরুষ বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন, আমি এত কাল তাঁহাকে পরিজ্ঞাত না হইয়া মূঢ়ভাবে অবস্থান করিয়াছি। যাঁহাকে পরিজ্ঞাত হইলে মোক্ষলাভে সমর্থ হওয়া যায়, আজ আমি বহুজন্মের পর সেই ভক্তবৎসল ভগবান্ ভূতনাথের সাক্ষাৎকার লাভ করিলাম।

‘এই দেবাদিদেব ভগবান্ মহেশ্বরই দেব, অসুর ও মুনিগণের হৃদয়াকাশনিহিত সনাতন পরব্রহ্মস্বরূপ। ইনি সমুদয় পদার্থের সৃষ্টিকর্ত্তা, সৰ্ব্বভূতের আত্মা, সৰ্ব্বদর্শী ও সৰ্ব্বত্র গমনশীল। ইঁহার মুখ সৰ্ব্বস্থানেই বিদ্যমান রহিয়াছে। ইহলোকে ইঁহার কিছুমাত্র অবিদিত নাই। ইনি দেহকর্ত্তা, দেহপোষক দেহী, দেহের সংহারকর্ত্তা, দেহিগণের গতি, প্রাণের সৃষ্টি ও পোষণকৰ্ত্তা, প্রাণী, প্রাণদাতা এবং অধ্যাত্মগতিনিষ্ঠ, আত্মতত্ত্বজ্ঞ জীবন্মূক্ত যোগিগণের গতিস্বরূপ। ইনি কৰ্ম্মানুসারে প্রাণীগণকে শুভাশুভ গতি প্রদান করিয়া থাকেন। ইনি জীবগণের জন্মমৃত্যুবিধান ও মহর্ষিগণকে সিদ্ধি প্রদান করেন। ইনি পৃথিব্যাদি ভুবনসমুদয় উৎপাদন করিয়া অষ্টবিধ মূৰ্ত্তি দ্বারা এই বিশ্বসংসার ধারণ ও ইহার প্রতিপালন করিতেছেন। সমুদয় পদার্থ ইহা হইতে সম্ভূত, ইঁহাতেই অবস্থিত ও ইঁহাতেই লীন হইয়া থাকে। ইনি অদ্বিতীয় সনাতন পুরুষ। ইনি সত্যকামীদিগের সত্যলোক, যোগীদিগের মোক্ষ ও অধ্যাত্মবেত্তাদিগের কৈবল্যস্বরূপ। ইনি দেবতা, অসুর ও মনুষ্যলোকমধ্যে অপ্রকাশিত থাকিবেন বলিয়া ব্রহ্মাদি সিদ্ধগণ ইঁহাকে শাস্ত্রমধ্যে গুপ্তভাবে রাখিয়াছেন। তন্নিবন্ধন দেবতা, অসুর ও মনুষ্যগণ অজ্ঞানান্ধকারে মুগ্ধ হইয়া ইঁহার যথার্থ তত্ত্ব অবগত হইতে সমর্থ হয়েন না।

‘যাহারা একান্ত ভক্তিভাবে ইহার শরণাপন্ন হয়, এই অন্তর্য্যামী ভগবান স্বয়ং তাহাদিগকে আত্মপ্রদর্শন করিয়া থাকেন। ইঁহাকে অবগত হইতে পারিলে, জন্মমৃত্যুজনিত ভয় ও জ্ঞাতব্য বিষয় আর কিছুই থাকে না। পণ্ডিতগণ ইঁহাকে লাভ করিতে পারিলে আর কোন বস্তুই অলব্ধ বলিয়া গণ্য করেন না। সাশাস্ত্রবিশারদ পণ্ডিতগণ এই সূক্ষ্মস্বরূপ পরমেশ্বরকে অবগত হইয়া সমুদয় বন্ধন হইতে মুক্ত হয়েন। বেবেত্তা পণ্ডিতগণ প্রাণায়াম করিয়া ওঙ্কাররূপ রথে আরোহণপূর্ব্বক এই বেদপ্রতিষ্ঠিত মহেশ্বরে প্রবেশ করেন। ইনি দেব্যানের আদিত্যরূপ দ্বার ও পিতৃযানের চন্দ্ররূপ দ্বার বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। ইনি কাষ্ঠা, দিক, সংবৎসর, যুগাদি, ইন্দ্রপদ, সার্ব্বভৌমপদ, দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণস্বরূপ। পূর্ব্বে প্রজাপতি প্রজাসৃষ্টির নিমিত্ত এই নীললোহিতকে নানাবিধ স্তব করিয়া ইঁহার নিকট বর যাচ্ঞা করিয়াছিলেন। ঋগবেদবেত্তারা ঋগবেদদ্বারা ইঁহার মহিমা কীৰ্ত্তন, ঋত্বিকগণ এই যজুৰ্ব্বেদময় মহেশ্বরের উদ্দেশে আহুতি প্রদান, বিশুদ্ধবুদ্ধি সামবেদবেত্তারা ইঁহার উদ্দেশে সামবেদগান এবং অথৰ্ব্ববিদ ব্রাহ্মণগণ অথৰ্ব্ববেদদ্বারা এই সত্যস্বরূপ পরম ব্রহ্মকে স্তব করিয়া থাকেন। ইনি যজ্ঞের আদিকারণ ও ঈশ্বর।

‘দিবা ও রাত্রি ইঁহার চক্ষু ও কর্ণস্বরূপ। পক্ষ ও মাস ইঁহার মস্তক ও বাহুস্বরূপ; ঋতু ইঁহার বীৰ্য্যস্বরূপ; তপস্যা ইঁহার গুহ্য, উরু ও পাদস্বরূপ। ইনি মৃত্যু, যম, অগ্নি, কাল, সংহারকর্ত্তা, কালের উৎপত্তিস্থান, চন্দ্র, আদিত্য, গ্রহ, নক্ষত্র, বায়ু, ধ্রুব, সপ্তর্ষি, সপ্তভুবন, প্রকৃতি, মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার ও পৃথিবীস্বরূপ। ব্রহ্মাদি তৃণপৰ্য্যন্ত সমুদয় ইহাতে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। ভূমি প্রভৃতি অষ্ট প্রকৃতি ও প্রকৃতি হইতে শ্রেষ্ঠ জীব এই ভগবান, মহাদেবের অংশ। ইনি শাশ্বত পরমানন্দস্বরূপ। ইনি বীতস্পৃহ. সাধু ব্যক্তিদিগের একমাত্র গতি ও উৎকৃষ্ট ভাব। ইনি উদ্বেগশূন্য সনাতন ব্রহ্ম এবং বেদবেত্তাদিগের উৎকৃষ্ট ধ্যেয়। ইনি পরাকাষ্ঠা, শ্রেষ্ঠকলা, পরমা সিদ্ধি, পরমগতি, শান্তি, সুখ, সন্তোষ, বেদ ও স্মৃতিস্বরূপ। যোগিগণ ইঁহাকে লাভ করিলে আর তাঁহাদিগকে জন্মপরিগ্রহ করিতে হয় না। আজ আমি ইঁহার দর্শনলাভে কৃতার্থ, হইলাম।

‘হে দেবাদিদেব মহাদেব! যজ্ঞশীল ব্যক্তিরা ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া যে স্বর্গাদিলোক লাভ করেন, তুমি সেই স্বর্গাদিলোক; শান্তি, যোগ, জপ ও কঠোর নিয়মানুষ্ঠাননিরত তাপসগণ যে নক্ষত্রলোক লাভ করিয়া থাকেন, তুমি সেই নক্ষত্রলোক; কৰ্ম্মত্যাগী সন্ন্যাসিগণ যে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হয়েন, তুমি সেই ব্ৰহ্মলোক; বীতস্পৃহ মুমুক্ষু ব্যক্তিরা যে নিৰ্ব্বাণমুক্তি লাভ করিয়া থাকেন, তুমি সেই নির্ব্বাণ। বেদ ও পুরাণশাস্ত্রে এই পাঁচ প্রকার গতি নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে। তুমি প্রসন্ন হইলে ঐ পাঁচ প্রকার গতিলাভ হয়, অন্যথা ঐ সমুদয় লাভের সম্ভাবনা নাই। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, বিশ্বদেব এবং মহর্ষিগণ তোমার মাহাত্ম্য অবগত হইতে পারেন নাই।

শিববরে তণ্ডিমহর্ষির পুত্রবরলাভ

“মহর্ষি তণ্ডি এইরূপে দেবাদিদেব মহাদেবের স্তব করিয়া বেদ পাঠ করিলে, দেবী পাৰ্ব্বতী ও ভগবান্ ভূতনাথ তাহার প্রতি পরম পরিতুষ্ট হইলেন। অনন্তর ভগবান ভবানীপতি তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! আমি তোমার প্রতি পরম প্রীত হইয়াছি। তুমি আমার প্রসাদবলে এক পুত্রলাভ করিবে। ঐ পুত্র যশস্বী, তেজস্বী, বিদ্যাজ্ঞানসমন্বিত, অজর ও বেদের সূতকৰ্ত্তা হইবে। এক্ষণে এতদ্ভিন্ন তোমার অন্য যাহা অভিলাষ থাকে ব্যক্ত কর, আমি তাহা পূর্ণ করিব। তখন তণ্ডি কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, ‘ভগব। আপনার প্রতি যেন আমার অচলা ভক্তি থাকে। মহাত্মা তণ্ডি এইরূপ কহিলে ভগবান ভূতনাথ ‘তথাস্তু’ বলিয়া অনুচরগণের সহিত তথা হইতে অন্তর্হিত হইলেন।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহাত্মা উপমন্যু এইরূপে তণ্ডিকৃত শিবারাধনা ও তাঁহার বরপ্রাপ্তির বিষয় কীৰ্ত্তন করিয়া পুনরায় আমাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘কেশব! ভগবান্ ভূতনাথ এইরূপে তণ্ডিকে বরপ্রদানপূর্ব্বক দেবতা ও মহর্ষিগণকর্ত্তৃক সংস্তুত হইয়া অন্তর্হিত হইলে মহর্ষি তণ্ডি আমার আশ্রমে আগমনপূৰ্ব্বক আমার নিকট ঐ সমুদয় বৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করিয়া, পূৰ্ব্বে লোকপিতামহ ব্রহ্মা দেবগণের নিকট মহাদেবের যে দশসহস্র নাম কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন এবং শাস্ত্রে উহার যে একসহস্র নাম কীৰ্ত্তিত আছে, তৎসমুদয় কীৰ্ত্তন করিলেন। এক্ষণে আমি তোমার নিকট সেই তণ্ডিকীর্ত্তিত নামসমুদয়ের মধ্যে কতকগুলি নাম কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।’ ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *