1 of 4

১৮. ব্যাসাদি মহর্ষিগণকর্ত্তৃক শিবমাহাত্ম্য বর্ণন

১৮শ অধ্যায়

ব্যাসাদি মহর্ষিগণকর্ত্তৃক শিবমাহাত্ম্য বর্ণন

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে জনমেজয়! ভগবান্ বাসুদেব এইরূপে উপমন্যুকীৰ্ত্তিত মহাদেবের সহস্র নাম কীৰ্ত্তন করিলে পর ভীষ্মের সমীপস্থিত অন্যান্য মহাত্মারা যুধিষ্ঠিরের নিকট মহাদেবের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! তুমি এই সহস্র নাম পাঠ কর, তাহা হইলেই তোমার মঙ্গললাভ হইবে। আমি পূর্ব্বে পুত্রলাভার্থ সুমেরুপৰ্ব্বতে ঘোরতর তপানুষ্ঠানপূর্ব্বক এই স্তব পাঠ করিয়াছিলাম। ইহার প্রভাবে আমার অভীষ্ট ফল লাভ হইয়াছে। অতএব এই স্তব পাঠ করিলে তুমিও অভীষ্ট ফল লাভে সমর্থ হইবে।” দেবপূজিত সাঙ্খ্যতত্ত্বজ্ঞ মহাত্মা কপিল কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি ভক্তিসহকারে জন্ম জন্ম মহাদেবকে আরাধনা করাতে তিনি আমার প্রতি পরম পতিতুষ্ট হইয়া আমাকে সংসারবন্ধননাশক জ্ঞান প্রদান করিয়াছেন।”

ইন্দ্রের প্রিয়সখা আলম্বায়ননামে বিখ্যাত চারুশীর্ষ কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি গোকর্ণতীর্থে একশত বৎসর তপানুষ্ঠানপূর্ব্বক মহাদেবের প্রভাবে লক্ষবৎসরজীবী জরাবিহীন ধৰ্ম্মজ্ঞানযুক্ত দমগুণান্বিত অযোনিসম্ভূত একশত পুত্ৰ লাভ করিয়াছি।”

মহর্ষি বাল্মীকি কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বে সাগ্নিক মুনিগণের সহিত আমার বিবাদ উপস্থিত হওয়াতে তাঁহারা আমাকে ব্রহ্মঘ্ন বলিয়া নির্দ্দেশ করিলে, আমি সেই পাপমোচনার্থ ভগবান ভূতনাথের শরণাপন্ন হইয়াছিলাম। তিনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে সেই পাপ হইতে মুক্ত করিয়া ‘তোমার অসাধারণ যশোলাভ হইবে’ বলিয়া বর প্রদান করিয়াছেন।

প্রদীপ্ত প্রভাকরসদৃশ তেজঃপুঞ্জকলেবর মহর্ষি জামদগ্ন্য কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃগণকে বধ করিয়া নিতান্ত কাতরভাবে মহাদেবের শরণাপন্ন হইয়া সহস্রনাম উচ্চারণপূর্ব্বক তাঁহার স্তব করিয়াছিলাম। তিনি আমার স্তবে পরম পরিতুষ্ট হইয়া আমাকে পরশু ও নানাবিধ দিব্যাস্ত্র প্রদানপূৰ্ব্বক কহিয়াছেন, ‘বৎস! তোমার পাপের লেশমাত্র থাকিবে না। তুমি অজেয়, অজর ও অমর হইবে।’ আমি তাহারই প্রসাদবলে বিবিধ দিব্যাস্ত্র, অজেয়ত্ব, অজরত্ব ও অমরত্ব লাভ করিয়াছি।”

মহর্ষি বিশ্বামিত্র কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি পূৰ্ব্বে ক্ষত্রিয় ছিলাম, কেবল সেই ভগবান ভূতনাথের প্রসাদবলে আমার এই দুর্ল্লভ ব্রাহ্মণ্যলাভ হইয়াছে।”

অসিতদেবল কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বে দেবরাজ ইন্দ্রের শাপপ্রভাবে আমার ধর্ম্মসমুদয় নষ্ট হইয়াছিল। ভগবান ভূতপতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে সেই ধৰ্ম্ম, যশঃ ও দীর্ঘায়ু প্ৰদান করিয়াছেন।”

দেবরাজ ইন্দ্রের প্রিয়সখা বৃহস্পতিতুল্য মহর্ষি গৃহৎসমদ কহিলেন, “মহারাজ! পূৰ্ব্বে ইন্দ্রের সহস্রবর্ষব্যাপী যজ্ঞ আরম্ভ হইলে, আমি সেই যজ্ঞে সামবেদ পাঠ করিতেছিলাম। ঐ সময় চাক্ষুষমনুর পুত্র ভগবান্ বরিষ্ঠ আমাকে কহিলেন, “তোমার ও সামবেদপাঠ সম্যকরূপ হইতেছে না। এইরূপ অবজ্ঞাজনক পাঠ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক বিবেচনা করিয়া পাঠ করা তোমার অবশ্য কৰ্ত্তব্য। যজ্ঞ দূষিত করা কখনই উচিত নহে। এই কথা কহিয়া তিনি রোষাবিষ্টচিত্তে আমাকে শাপ প্রদানপূর্ব্বক পুনরায় কহিলেন, ‘রে মূঢ়! তুমি জলবায়ুবিহীন, মৃগাদিপশুবিবর্জ্জিত, সিংহ ও রুরু প্রভৃতি হিংস্ৰজন্তুসমাকীর্ণ, অযজ্ঞীয় পাদপাকুল কান্তার মধ্যে হিংস্র মৃগ হইয়া অতিকষ্টে একাদশসহস্র অষ্টশত বৎসর অবস্থান করিবে।’ ভগবান্ বরিষ্ঠ এই কথা কহিবামাত্র আমি মৃগরূপী হইলাম। অনন্তর আমি স্বীয় দুর্দ্দশা অপনোদনের নিমিত্ত ভগবান্ ভবানীপতির শরণাপন্ন হইলে, তিনি আমাকে কহিলেন, ‘বৎস! তুমি অজর, অমর ও পরমসুখী হইবে; ইন্দ্রের সহিত তোমার সখ্যভাব সমান থাকিবে, এবং তোমাদিগের উভয়ের যজ্ঞ পরিবর্দ্ধিত হইবে।’

“হে ধৰ্ম্মনন্দন! ভগবান্ ভূতভাবন এইরূপে সকলের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়া থাকেন; তিনি সুখদুঃখের বিধাতা, ধারণকৰ্ত্তা ও কায়মনোবাক্যের অগোচর, তাঁহার প্রসাদবলে আমার তুল্য পণ্ডিত আর. কেহই নাই।”

কৃষ্ণ ও ঋষিগণের শিবমাহাত্ম্য প্রকাশ

ঐ সময় মহামতি বাসুদেব পুনরায় যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি ঘোরতর তপানুষ্ঠান করিয়া মহাদেবকে পরিতুষ্ট করাতে তিনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া কহিয়াছিলেন, ‘বৎস! তুমি অর্থ অপেক্ষা লোকের প্রিয়, যুদ্ধে অপরাজিত ও অনলতুল্য তেজস্বী হইবে।’ আমি পূৰ্ব্বাবতারে মণিমন্ত্রপৰ্ব্বতে বহুসহস্র বৎসর ঐ দেবদেবের আরাধনা করিয়াছিলাম। পরিশেষে তিনি আমার ভক্তিভাবে পরম পরিতুষ্ট হইয়া একদা আমাকে আত্মপ্রদর্শনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! তুমি অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।’ তখন আমি কহিলাম, ‘ভগবন্! যদি আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তাহা হইলে আমাকে এই বর প্রদান করুন, যেন অনন্তকাল আপনার প্রতি অচলা ভক্তি থাকে।’ আমি এইরূপ বর প্রার্থনা করিলে তিনি ‘তথাস্তু’ বলিয়া সেই স্থানেই অন্তর্হিত হইলেন।”

জৈগীষব্য কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ভগবান ভূতপতি স্বয়ং বারাণসীতে পরমযত্নসহকারে আমাকে অনুসন্ধানপূৰ্ব্বক অণিমাদি অষ্ট ঐশ্বৰ্য্য প্রদান করিয়াছিলেন।”

গর্গ কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূর্ব্বে দেবাদিদেব মহাদেব স্রোতস্বতী সরস্বতীর তীরে আমার মনোযজ্ঞদ্বারা পরম পরিতুষ্ট হইয়া আমাকে অত্যাশ্চর্য্য চতুঃষষ্টি কলাজ্ঞান ও সহস্র ব্রহ্মজ্ঞ পুত্র প্রদান করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রসাদে আমার ও আমার পুত্রগণের দশ লক্ষ বৎসর পরমায়ু হইয়াছে।”

পরাশর কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূর্ব্বে আমি মহেশ্বরকে প্রসন্ন করিয়া এইরূপ চিন্তা করিয়াছিলাম যে, তাঁহার অনুগ্রহে আমার এক মহাতপা, মহাতেজা, মহাযোগী, মহাযশ, বেদের বিভাগকর্ত্তা, ব্রহ্মনিষ্ঠ, দয়ার্দ্র-স্বভাব পরম সুপণ্ডিত পুত্ৰ উৎপন্ন হউক। আমি ঐরূপ চিন্তা করিলে সেই ত্রিলোকীনাথ আমার অভিপ্রায় অবগত হইয়া আমার সমক্ষে আগমনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! তুমি আমার প্রসাদে অবশ্যই অভিলাযানুরূপ পুত্রলাভ করিবে। তোমার ঐ আত্মজ বেদবেত্তা, ইতিহাসরচয়িতা, জগতের হিতকর, কুরুবংশধর ও সাবর্ণিমন্বন্তরে সপ্তর্ষিমধ্যে পরিগণিত হইবে। তাহার সহিত সুররাজের যারপরনাই বন্ধুত্ব জন্মিবে এবং সে আমার প্রভাবে জরাবিহীন হইয়া চিরকাল জীবিত থাকিবে। ভগবান্ ভূতনাথ আমাকে এইরূপ কহিয়া তথা হইতে অন্তর্হিত হইলেন।”

মাণ্ডব্য কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি পূৰ্ব্বে বৃথা চৌর্য্যাপরাধে শূলে আরোপিত হইয়া ভক্তিভাবে ভগবান্ ভূতনাথের স্তব করিয়াছিলাম। তিনি আমার সেই স্তুতিবাদ-শ্রবণে পরম পরিতুষ্ট হইয়া আমাকে আত্মপ্রদর্শনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘তুমি আমার অনুকম্পায় অবিলম্বে শূল হইতে মুক্তিলাভ করিয়া অর্ব্বুদ বৎসর জীবিত থাকিবে। তোমার দেহ হইতে শুলজনিত বেদনা তিরোহিত হইয়া যাইবে। কি মানসিক, কি দৈহিক কোনরূপ পীড়াই তোমাকে। আক্রমণ করিতে সমর্থ হইবে না। তোমার এই দেহ সত্য হইতে উৎপন্ন হইয়াছে, এই নিমিত্ত এই জীবলোকে তোমার তুল্য শ্রেষ্ঠ আর কেহই বিদ্যমান থাকিবে না। তোমার জন্ম সার্থক হইবে। তুমি নিষ্কণ্টকে সমুদয় তীর্থ পর্য্যটন ও দেহান্তে স্বৰ্গভোগ করিবে। বৃষবাহন ভগবান্ মহেশ্বর আমাকে এই কথা কহিয়া প্রমথগণের সহিত সেই স্থানে অন্তর্হিত হইলেন।”

গালব কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বে আমি মহর্ষি বিশ্বামিত্রের নিকট অধ্যয়ন করিতে গিয়াছিলাম। পাঠ সমাপ্ত হইলে, আমি মহর্ষিকর্ত্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া পিতৃদর্শনার্থ আগমন করিলাম। ঐ সময় আমার পিতা পরলোকপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। জননী আমাকে দর্শন করিয়া পূৰ্ব্বাপেক্ষা সমধিক দুঃখিত হইয়া রোদন করিতে করিতে কহিলেন, ‘বৎস! তুমি নিতান্ত বালক, অদ্যাপি তোমার পাঠসমাপ্তি হয় নাই বলিয়া তোমার পিতা এক্ষণে তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন না। জননী এই কথা কহিলে আমি পিতৃদর্শনে নিতান্ত হতাশ হইয়া একান্তমনে মহাদেবের আরাধনা করিতে লাগিলাম। ভগবান্ ভূতনাথ আমার ভক্তিদর্শনে অচিরাৎ প্রসন্নচিত্তে আমার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, ‘বৎস! তুমি ও তোমার পিতা, মাতা তোমরা সকলেই অমর হইবে। তুমি গৃহে গমন করিলেই তোমার পিতার সহিত সাক্ষাৎকার হইবে।’ ভগবান্ ভূতভাবন আমাকে এই কথা কহিয়া গৃহে গমন করিতে অনুজ্ঞা করিলে, আমি স্বীয় ভবনে সমুপস্থিত হইয়া দেখিলাম, পিতা যজ্ঞান্তে আচমন করিয়া যজ্ঞকাষ্ঠ, কুশ ও ফল গ্রহণপূর্ব্বক গৃহ হইতে বহির্গত হইতেছেন। তাঁহাকে দেখিবামাত্র আমি তাঁহার চরণে নিপতিত হইলাম। তখন তিনি অবিলম্বে সেই যজ্ঞীয় সামগ্রী সমুদয় পরিত্যাগপূৰ্ব্বক আমার মস্তকাঘ্রাণ করিয়া বাষ্পাকুলোলচনে কহিলেন, ‘বৎস! আজ আমার পরমসৌভাগ্য যে, তোমাকে কৃতবিদ্য হইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিতে দেখিলাম।’ ”

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির মহর্ষিদিগের মুখে ভূতভাবন ভগবান্ মহাদেবের এইরূপ অদ্ভুত মাহাত্ম্য শ্রবণ করিয়া নিতান্ত বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তখন ভগবান্ বাসুদেব তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বে প্রচণ্ড সূৰ্য্যের ন্যায় তেজঃসম্পন্ন মহাত্মা উপনন্যু আমাকে কহিয়াছিলেন, ‘যাহারা নিরন্তর রজঃ ও তমোগুণসম্পন্ন হইয়া অশুভকাৰ্য্যদ্বারা আপনাদিগকে কলুষিত করে, তাহারা কখনই ভগবান্ দেবদেবকে লাভ করিতে সমর্থ হয় না। একান্ত ভক্তিপরায়ণ বিশুদ্ধাত্মা ব্রাহ্মণগণই তাহাকে লাভ করিয়া থাকে। যে ব্যক্তি নিরন্তর ভূতভাবন ভগবান্ ভবানীপতির প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ হইয়া কালহরণ করেন, তাঁহাকে যোগবলসম্পন্ন অরণ্যবাসী মুনি বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে। মহাত্মা মহেশ্বর প্রসন্ন হইলে অনায়াসেই ব্রহ্মত্ব, কেশবত্ব, ইন্দ্ৰত্ব ও ত্রৈলোকের আধিপত্য প্রদান করিতে পারেন। যাঁহারা ইহলোকে মনে মনেও ভগবান্ শূলপাণির শরণাপন্ন হয়েন, তাঁহারা সৰ্ব্বপাপবিমুক্ত হইয়া চরমে দেবগণের সহিত বাস করিয়া থাকেন। লোক গৃহতড়াগাদির উচ্ছেদ ও লোকসমুদয়ের প্রাণসংহার করিয়াও দেবদেব বিরূপাক্ষের অর্চ্চনা করিলে তাহাকে পাপে লিপ্ত হইতে হয় না। সুলক্ষণবিহীন পাপাত্মারাও ভগবান্ শঙ্করের উপাসনা করিলে সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হইতে পারে। কীট, পক্ষী, পতঙ্গ প্রভৃতি প্রাণীগণও ভূতভাবন ভবানীপতির শরাপন্ন হইলে অকুতোভয়ে সর্ব্বত্র বিচরণ করিতে সমর্থ হয়। যাহারা ইহলোকে ভগবান্ ভূতনাথের প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ হয়, তাহারা নিশ্চয়ই সংসার হইতে মুক্তিলাভ করে।’ ”

কৃষ্ণের পুনঃ পুনঃ শিবমাহাত্ম্যকীৰ্ত্তন

মহাত্মা বাসুদেব ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে এইরূপে উপমন্যুর বাক্য কীৰ্ত্তন করিয়া পুনৰ্ব্বার তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, “মহারাজ! আদিত্য, চন্দ্র, অনিল, অনল, আকার, ভূমি, সলিল, বসুগণ, বিশ্বদেবগণ, ধাতা, অর্য্যমা, শুক্র, বৃহস্পতি, রুদ্রগণ, সাধ্যগণ, বরুণ, ব্রহ্মা, ইন্দ্র, মরুদ্‌গণ, উপনিষদ, সত্য, বেদসমুদয়, দক্ষিণা, বেদপাঠক, সোমরস, যজ্ঞকর্ত্তা, হব্য, রক্ষা, দীক্ষা, নিয়মসমুদয়, স্বাহা, বৌষট্‌, ব্রাহ্মণ, সৌরভেয়ী, শ্রেষ্ঠধর্ম্ম, কালচক্র, বল, যশ, দম, বুদ্ধিমানদিগের স্থিতি, শুভাশুভ, সপ্তর্ষি, সূক্ষ্মবুদ্ধি, উৎকৃষ্ট স্পর্শ, কার্য্যসিদ্ধি, দেবগণ, উষ্মপগণ, লোকসমুদয়, সুষাম, তুষিত, ব্ৰহ্মকায়, আভাস্বর, গন্ধপ, ধূমপ ও দৃষ্টিপনামক দেবগণ, বাচংযমগণ, সংযতমন, মহর্যিসমুদয়, বিশুদ্ধকাৰ্য্য, নির্ম্মাণনিরত দেবগণ, স্পর্শাশন, দর্শপ, আজ্যপ, চিন্তাদ্যোত প্রভৃতি দেবগণ, সুপর্ণ, গন্ধৰ্ব্ব, পিশাচ, দানব, যক্ষ, চারণ ও পন্নগগণ, স্থূল, সূক্ষ্ম, অসূক্ষ্ম, মৃদু, সুখ, দুঃখ, সুখান্তে দুঃখ ও দুঃখান্তে সুখ, সাঙ্খ্যশাস্ত্র এবং অন্যান্য সর্ব্বোৎকৃষ্ট সমুদয় পদার্থই সেই ভূতভাবন সনাতন মহেশ্বর হইতে সম্ভূত হইয়াছে। যে সমুদয় দেবতা আকাশাদি পদার্থের সৃষ্টিকৰ্ত্তা, তাঁহারাও সেই ভগবান্ ভূতপতি হইতে সমুদ্ভূত হইয়া এই ধরিত্রীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতেছেন। তত্ত্বদর্শী মহাত্মারা নিরন্তর তাঁহার সূক্ষ্মতত্ত্ব পর্য্যালোচনা করিয়া থাকেন। আমি মোক্ষলাভের নিমিত্ত সনাতন পরমেশ্বরের সেই পবিত্র তত্ত্বকে নমস্কার করিতেছি। সেই ভগবান দেবাদিদেব আমার স্তবে তুষ্ট হইয়া আমাকে অভীষ্ট ফল প্রদান করুন। যে ব্যক্তি জিতেন্দ্রিয়, যোগশীল ও পবিত্র হইয়া এই পবিত্র স্তব এক মাস নিয়ত পাঠ করেন, তাঁহার নিশ্চয়ই অশ্বমেধের ফললাভ হয়। এই বিশুদ্ধ স্তব পাঠ করিলে ব্রাহ্মণের সমগ্র বেদার্থজ্ঞান, ক্ষত্রিয়ের পৃথিবীজয়, বৈশ্যের অর্থ ও নিপুণতা এবং শূদ্রের সুখ ও সদ্গতিলাভ হইয়া থাকে। যে মহাত্মা এই সৰ্ব্বদোষবিনাশন পবিত্র স্তব পাঠ করিয়া ভগবান্ দেবদেবের প্রতি একান্ত ভক্তিপরায়ণ হয়েন, তাঁহারা আপনাদিগের রোমকূপ পরিমিত বহুসংখ্যক বৎসর স্বর্গে বাস করিতে পারেন, সন্দেহ নাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *