1 of 4

৪০. স্ত্রীজাতির চরিত্রনাশের স্বাভাবিক কারণ

স্ত্রীজাতির চরিত্রনাশের স্বাভাবিক কারণ

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! তুমি স্ত্রীজাতির বিষয়ে যে যে কথা কহিলে, তৎসমুদয়ই সত্য। এক্ষণে পূৰ্ব্বে মহাত্মা বিপুল যেরূপে গুরুপত্নীকে পরপুরুষসংসর্গে নিবৃত্ত করিয়াছিলেন ও সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা যে নিমিত্ত সৰ্ব্বজনমোহিনী স্ত্রীজাতির সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহা আমি তোমার নিকট কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। ইহলোকে স্ত্রীলোক অপেক্ষা পাপশীল পদার্থ আর কিছুই নাই। প্রজ্বলিত অগ্নি, ময়দানবের মায়া, ক্ষুরধার বিষ, সর্প ও মৃত্যু, এই সমুদয়ের সহিত উহাদিগের তুলনা করা যায়। শুনিয়াছি, পূৰ্ব্বকালে প্রজাগণ অতিশয় ধার্ম্মিক ছিল। তাহারা স্বীয় পুণ্যবলে আপনারাই দেবত্ব লাভ করিত। দেবগণ তাহাদিগকে আপনা হইতে স্বর্গলাভ করিতে দেখিয়া, শঙ্কিতমনে সৰ্ব্বলোক পিতামহ ব্রহ্মার শরণাপন্ন হইয়া তাহার নিকট মৌনাবলম্বনপূর্ব্বক অধধামুখে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন ভগবান্ কমলযোনি তাঁহাদিগের অন্তর্গত ভাব পরিজ্ঞাত হইয়া মানবগণের মোহ উৎপাদনের নিমিত্ত সৰ্ব্বজনমোহিনী স্ত্রীজাতির সৃষ্টি করিলেন। অতি পূৰ্ব্বকালে স্ত্রীগণ পতিব্রতা ছিল, ভগবান্ প্রজাপতি কর্ত্তৃক ঐরূপ স্ত্রীজাতির সৃষ্টি হওয়া অবধি স্ত্রীলোক ব্যভিচার দোষে লিপ্ত হইয়াছে।

“সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা এই প্রবাহে ঐরূপ মহিলাগণের সৃষ্টি করিয়া উহাদিগকে বিষয়ভোগেচ্ছা প্রদান করিলেন। উহারাও কামলুব্ধ হইয়া সৰ্ব্বদা মানবগণকে আক্রমণ করিতে লাগিল। অনন্তর ভগবান্ ব্রহ্মা কামের সহায়স্বরূপ ক্রোধের সৃষ্টি করিলেন। তখন মানবগণ কামক্রোধের বশবর্ত্তী হইয়া, ঐ সমুদয় স্ত্রীতে আসক্ত হইল। স্ত্রীগণের প্রতি কোন কার্য্য বা ধর্ম্ম নির্দ্দিষ্ট নাই। উহারা বীর্য্যবিহীন, শাস্ত্রজ্ঞানশূন্য মিথ্যাবাদিনী। প্রজাপতি উহাদিগকে শয্যা, আসন, অলঙ্কার, অন্ন, পান, অনার্য্যতা, কটুবাক্যপ্রয়োগ, প্রচার, বন্ধন অথবা বিবিধ প্রকার ক্লেশ প্রদান করিলেও উহাদিগকে পরপুরুষসংসর্গে নিবৃত্ত করা যায় না। মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক, ব্রহ্মাও উহাদিগকে স্বধৰ্ম্মে রক্ষা করিতে সমর্থ হয়েন না। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট স্ত্রীজাতির সৃষ্টিবিষয় কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে মহাত্মা বিপুল যেভাবে গুরুপত্নীকে পরপুরুষসংসর্গে নিবৃত্ত করিয়াছিলেন, তাহা বিশেষরূপে কহিতেছি, শ্রবণ কর।

নারীপ্রবৃত্তি প্রতিরোধে ঋষিশিষ্য বিপুলের যত্ন

“পূৰ্ব্বকালে দেবশর্ম্মা নামে এক মহাত্মা ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁহার রুচিনামে এক পরমরূপবতী ভাৰ্য্যা ছিলেন। দেব, দানব ও গন্ধৰ্ব্বগণ তাঁহার অলৌকিক রূপলাবণ্যদর্শনে বিমোহিত হইয়াছিলেন। সুররাজ পুরন্দর সেই কামিনীর অলোকসামান্য রূপে মোহিত হইয়া তাহার সহিত সংসর্গ করিতে সতত যত্নবান ছিলেন। মহর্ষি দেবশৰ্ম্মা স্ত্রীজাতির চরিত্র ও পুরন্দরের পারদারিকতা সবিশেষ পরিজ্ঞাত হইয়া যথোচিত যত্নসহকারে স্বীয় পত্নীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতেন।

“একদা ঐ মহর্ষি যজ্ঞ করিবার নিমিত্ত স্থানান্তরে গমন করিতে ইচ্ছা করিয়া, কিরূপে ভাৰ্য্যাকে রক্ষা করিবেন, মনে মনে তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন এবং পরিশেষে প্রিয়শিষ্য বিপুলকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘বৎস! আমি যজ্ঞানুষ্ঠানের নিমিত্ত স্থানান্তরে গমন করিব। ইন্দ্র সতত আমার ভার্য্যার সতীত্ব ভঙ্গ করিবার চেষ্টা করে। সেই পাপাত্মা মায়াবলে বিবিধ রূপ ধারণ করিতে পারে। অতএব তুমি সাবধান হইয়া নিরন্তর ইহার রক্ষণাবেক্ষণ করিবে।’

“মহাত্মা দেবশর্ম্মা এইরূপ আজ্ঞা করিলে, অনল ও সূর্য্যের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন জিতেন্দ্রিয় মহাতপাঃ বিপুল তাঁহার আজ্ঞা গ্রহণপূৰ্ব্বক তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! ইন্দ্র। কোন্ কোন্ রূপ ধারণ করিতে পারে এবং তাহার শরীর ও তেজই বা কিরূপ, আপনি তৎসমুদয় কীর্ত্তন করুন।

ইন্দ্রের স্বভাবপ্রদর্শনে ঋষির সাবধানতা

“তখন ভগবান্ দেবশর্ম্মা মহাত্মা বিপুলকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বৎস! আমি তোমার নিকট ইন্দ্রের মায়া সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। ঐ দুরাত্মা ক্ষণে ক্ষণে বিবিধ বেশ পরিবর্ত্তন করিয়া থাকে। সে কখন কিরীট, কখন বজ্র, কখন মুকুট ও কখন কুণ্ডল ধারণ করে; আবার মুহূৰ্ত্তমধ্যে চণ্ডালসদৃশ হয়। ঐ পাপাত্মা কখন শিখা, কখন জটা, কখন কৌপীন এবং কখন বৃহৎ, কখন স্থূল ও কখন বা সূক্ষ্ম শরীর ধারণ করে, কখন গৌরাঙ্গ, কখন শ্যামাঙ্গ, কখন রূপবান্, কখন কুৎসিত, কখন বায়ুরূপী, কখন যুবা, কখন বৃদ্ধ, কখন ব্রাহ্মণ, কখন ক্ষত্রিয়, কখন বৈশ্য, কখন শূদ্র, কখন প্রতিলোমজাতি, কখন অনুলোমজাতি হয় এবং কখন শুক, কখন বায়স, কখন হংস, কখন কোকিল, কখন ব্যাঘ্র, কখন সিংহ, কখন হস্তী, কখন দেবতা, কখন দৈত্য, কখন নরপতি, কখন পক্ষী, কখন চতুষ্পদ, কখন মক্ষিকা ও কখন বা মশকাদির বেশ ধারণ করিয়া থাকে। অন্যের কথা দূরে থাকুক, যিনি এই বিশ্বসংসারের সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনিও ঐ পাপাত্মার রূপ নিশ্চয় করিতে সমর্থ হয়েন না। ঐ দুরাত্মা রূপান্তর পরিগ্রহ করিলে কেবল জ্ঞানচক্ষুদ্বারা উহাকে অবলোকন করা যায়। অতএব তুমি পরম যত্নসহকারে আমার সহধর্ম্মিণী রুচিকে রক্ষা করিবে। কুক্কুর যেমন যজ্ঞীয় দ্রব্য উচ্ছিষ্ট করে, তদ্রূপ ইন্দ্র যেন উহাকে দূষিত করিতে না পারে।

যোগবলে বিপুলের গুরুপত্নীদেহে প্রবেশ

মুনিবর দেবশর্ম্মা বিপুলকে এই কথা কহিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। তখন মহাত্মা বিপুল গুরুবাক্য শ্রবণে মনে মনে, চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, এক্ষণে কিরূপে আমি ইন্দ্র হইতে গুরুপত্নীকে রক্ষা করি? দেবরাজ পরম মায়াবী ও মহাবলপরাক্রান্ত। আমি আশ্রম বা উটজদ্বার [তৃণকুটীরের দরজা] রোধ ও পৌরুষপ্ৰকাশ করিয়া কোনরূপেই তাহার আগমন নিবারণ করিতে পারিব না। সে অনায়াসে বায়ুরূপ ধারণ করিয়াও গুরুপত্নীকে আক্রমণ করিতে পারে। অতএব যোগবলে গুরুপত্নীর শরীরমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া, উঁহাকে রক্ষা করাই আমার কর্ত্তব্য। যদি গুরু আজ উঁহাকে ইন্দ্রোপভুক্ত বলিয়া অবগত হয়েন, তাহা হইলে রোষবশতঃ নিশ্চয়ই আমাকে শাপ প্রদান করিবেন। অতএব ইঁহাকে ইন্দ্র হইতে অবশ্যই রক্ষা করা উচিত। গুরুর আজ্ঞা প্রতিপালন করা আমার অবশ্য কর্ত্তব্য। যদি আজ আমি যোগবলে গুরুপত্নীর শরীরমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া উঁহাকে রক্ষা করিতে পারি, তাহা হইলে আমার একটি অদ্ভুত কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করা হইবে। পদ্মপস্থিত সলিলবিন্দু যেরূপ পত্রের. সহিত নির্লিপ্তভাবে অবস্থান করে, তদ্রূপ আমি নির্লিপ্তভাবে গুরুপত্নীর শরীরে মহা অবস্থান করিলে, আমাকে কখনই দোষী হইতে হইবে না। অতএব আজ আমি এইরূপে উহার শরীরমধ্যে অবস্থান করিব।

“হে ধৰ্ম্মরাজ। মহাত্মা বিপুল গুরুপত্নীর রক্ষাবিষয়ে এইরূপ নিশ্চয় করিয়া ধৰ্ম্ম, বেদশাস্ত্র এবং আপনার ও গুরুর তপোবল অবধারণপূৰ্ব্বক গুরুপত্নীর রক্ষার নিমিত্ত যত্নবান হইয়া তাঁহার নিকট উপবেশন ও বিবিধ কথাপ্রসঙ্গে তাঁহার মোহ উৎপাদন করিলেন। পরে যোগবলে তাঁহার নয়নযুগল আচ্ছন্ন করিয়া, বায়ু যেমন আকাশমধ্যে প্রবিষ্ট হয়, তদ্রূপ তাঁহার শরীরমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন এবং স্বীয় অবয়বদ্বারা তাঁহার সমুদয় শরীর স্তব্ধ করিয়া ছায়ার ন্যায় উহার মধ্যে অবস্থান করিতে লাগিলেন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *