ব্রাহ্মণের তৃপ্তিতে মঙ্গল—অতৃপ্তিতে অমঙ্গল
ভীষ্ম কহিলেন, “ব্রাহ্মণগণকে সতত পূজা করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। ব্রাহ্মণগণ সকলকেই সুখদঃখ প্রদান করিতে পারেন। ব্রাহ্মণগণকে প্রার্থনারূপ বিবিধ ভোগ্য বস্তু ও অলঙ্কার প্রদান, নমস্কার এবং পিতার ন্যায় তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করা রাজার অবশ্য কর্ত্তব্য। ইন্দ্র হইতে যেমন জীবগণের মঙ্গললাভ হয়, তদ্রূপ ব্রাহ্মণ হইতে রাজ্যের মঙ্গললাভ হইয়া থাকে। রাজ্যমধ্যে তেজঃপুঞ্জকলেবর শুদ্ধাচারসম্পন্ন ব্রাহ্মণ ও শত্রুদমনসমর্থ মহারথ ক্ষত্রিয়কে সংস্থাপিত করিতে চেষ্টা করা নরপতির অবশ্য কৰ্ত্তব্য। স্বীয় ভবনে সৎকুলোদ্ভব ধৰ্ম্মজ্ঞানসম্পন্ন ব্রতপরায়ণ ব্রাহ্মণকে বাস প্রদান করা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কার্য্য আর কিছুই নাই। ব্রাহ্মণগণকে হবনীয় দ্রব্য প্রদান করিলে দেবগণ তাহা গ্রহণ করেন। অতএব ব্রাহ্মণই সর্ব্বপ্রধান; তাহা হইতে শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই। চন্দ্র, সূর্য্য, জল, বায়ু, ভূমি, আকাশ ও দিক্সমুদয় ব্রাহ্মণশরীরে প্রবিষ্ট হইয়া অন্ন গ্রহণ করিয়া থাকেন। যে পাপাত্মার গৃহে ব্রাহ্মণগণ ভোজন না করেন, দেবতা ও পিতৃগণ কখনই তাহার গৃহে অনুগ্রহণ করেন না। ব্রাহ্মণগণ পরিতৃপ্ত হইলে দেবতা ও পিতৃগণ পরম পরিতুষ্ট হয়েন, সন্দেহ নাই।
ব্রাহ্মণপ্রশংসাপ্রসঙ্গে পৃথিবী-বাসুদেবসংবাদ
“যাহারা যজ্ঞীয় দ্রব্য ব্রাহ্মণসাৎ করে, তাহারা পরমপরিতৃপ্ত ও চরমে পরমগতি প্রাপ্ত হয়। ব্রাহ্মণোদ্দেশে যে যে দ্রব্য প্রদত্ত হয়, দেবতা ও পিতৃগণ সেই সেই দ্রব্যদ্বারাই পরম পরিতুষ্ট হইয়া থাকেন। যে যজ্ঞ হইতে প্রজাগণ সমুৎপন্ন হইয়া থাকে, ব্রাহ্মণই সেই যজ্ঞের মূলকারণ। এই জগৎ যাহা হইতে সমুৎপন্ন হইয়াছে এবং যাহাতে লীন হইবে, ব্রাহ্মণগণের তাহা অবিদিত নাই; একমাত্র ব্রাহ্মণপ্রভাবে স্বর্গ ও নরক উভয়ই লাভ হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণগণ স্বধর্ম্ম ও ভূত, ভবিষ্যৎ বিষয়ে সমুদয়ই অবগত আছেন। যাহারা ব্রাহ্মণের আজ্ঞানুবর্ত্তী হয়, তাহাদিগের কুত্রাপি পরাভব নাই। তাহারা চরমে পরমপদ প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণগণের তেজঃপ্রভাবে ক্ষত্রিয়দিগের তেজঃ ও বলের উপশম হইয়া থাকে। দেখ, ভৃগুবংশীয়েরা তালজঙ্ঘদিগকে, অঙ্গিরার বংশসমুৎপন্ন মহাত্মারা নীপগণকে এবং মহর্ষি ভরদ্বাজ বৈতহব্য ও ঐলদিগকে পরাস্ত করিয়াছেন। কাষ্ঠমধ্যে অগ্নি যেমন গৃঢ়ভাবে অবস্থান করে, তদ্রূপ ইহলোকে যাহা পাঠ, যাহা শ্রবণ ও যে বিষয়ক কথোপকথন করা যায়, তৎসমুদয়ই গৃঢ়ভাবে ব্রাহ্মণে অন্তর্নিবিষ্ট রহিয়াছে।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই উপলক্ষ্যে আমি পৃথিবী-বাসুদেবসংবাদ নামে এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা বাসুদেব সৰ্ব্বভূতজননী ভগবতী বসুমতীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বসুন্ধরে! গৃহস্থ ব্যক্তিরা কি কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করিলে পাপ হইতে মুক্ত হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।’
“তখন পৃথিবী বাসুদেবকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘কেশব! আমি নারদের মুখে শুনিয়াছি, ইহলোকে ব্রাহ্মণের সেবা করাই পরম পবিত্র ও উৎকৃষ্ট ধর্ম্ম। ব্রাহ্মণের সেবা করিলে পাপের লেশমাত্রও থাকে না। ব্রাহ্মণ হইতে ক্ষত্রিয়ের মহারথিত্ব, কীর্ত্তি, বুদ্ধি ও সম্পত্তিলাভ হইয়া থাকে। অতুল ঐশ্বর্য্যের নিমিত্ত সঙ্কুলসম্ভূত ধৰ্ম্মজ্ঞানসম্পন্ন পরমপবিত্র ব্রাহ্মণের সেবা করাই কৰ্ত্তব্য। ব্রাহ্মণ সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ব্রাহ্মণগণ যাহাকে প্রশংসা করেন, সেই অভ্যুদয়শালী হয়। যে ব্যক্তি মোহবশতঃ ব্রাহ্মণগণকে তিরস্কার করে, তাহাকে মহার্ণবনিক্ষিপ্ত মৃৎপিণ্ডের ন্যায় অচিরাৎ বিনষ্ট হইতে হয়। ব্রাহ্মণের অনিষ্টাচরণ পরাভবের হেতু। দেখ, ব্রাহ্মণশাপে ভগবান্ চন্দ্রমা কলঙ্কযুক্ত ও সমুদ্র লবণোদকে পরিপূর্ণ হইয়াছেন এবং দেবরাজ ইন্দ্র ব্রাহ্মণগণ প্রভাবে প্রথমে সহস্রভগচিহ্নে পরিব্যাপ্ত হইয়া পরিশেষে আবার ব্রাহ্মণের প্রসাদে সহস্রনয়ন হইয়াছেন। অতএব জিতেন্দ্রিয় ও পবিত্র হইয়া ব্রাহ্মণের আজ্ঞানুবর্ত্তী হওয়া মনুষ্যমাত্রেরই বিধেয়।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! বসুন্ধরা দেবী এইরূপ কহিলেন, মহাত্মা মধুসূদন তাঁহার বাক্যশ্রবণে আহ্লাদিত হইয়া তাঁহাকে অসংখ্য সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। অতএব তুমি এই দৃষ্টান্তানুসারে ব্রাহ্মণগণকে পূজা কর, তাহা হইলেই শ্ৰেয়োলাভে সমর্থ হইবে।”
