১৯তম অধ্যায়
বিবাহরহস্য—দিগধিষ্ঠাত্রী—অষ্টাবক্রসংবাদ
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাত্মা মধুসূদন এইরূপে মহাদেবের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিয়া তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলে, ধৰ্ম্মনন্দন যুধিষ্ঠির শান্তনুতনয়কে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘পিতামহ! পাণিগ্রহণকালে বেদবাক্যানুসারে বর ও কন্যাকে ‘তোমরা পরস্পর সমবেত হইয়া একধৰ্ম্ম আচরণ কর’ বলিয়া অনুজ্ঞা প্রদান করা হয়। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য, বর ও কন্যাকে যে ধৰ্ম্ম আচরণ করিতে অনুজ্ঞা করা যায়, উহা কি যাগযজ্ঞাদির অনুষ্ঠান বা সন্তানোৎপাদন অথবা ইন্দ্রিয়সুখসাধন? যখন প্রাণীমাত্রেই স্ব স্ব কৰ্ম্মানুসারে ভিন্ন ভিন্ন গতি লাভ করে এবং স্ত্রীপুরুষের মধ্যে কেহ অগ্রে ও কেহ পশ্চাৎ কালগ্রাসে নিপতিত হয়, তখন ঐ ধর্ম্ম যে যাগ্যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান, তাহা কখনই সম্ভবপর নহে। আর যখন কামিনীগণ পরপুরুষে অনুরক্ত হইয়া তদ্দ্বারা পুত্রোৎপাদন ও ইন্দ্রিয়সুখসাধন করিতেছে, তখন ঐ পূৰ্ব্বোক্ত ধর্ম্ম যে পুত্রোৎপাদন ও ইন্দ্রিয়সুখসাধন, তাহাই বা কিরূপে সম্ভবপর হইতে পারে? অতএব আমার বোধ হয়, ঐ ধৰ্ম্ম সত্যধৰ্ম্ম নহে। যাহা হউক, ঐ ধৰ্ম্ম নিতান্ত দুৰ্ব্বোধ্য হওয়াতে উহাতে আমার মহা সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে; অতএব আপনি সম্ভবরূপে ইহার যথার্থ তত্ত্ব কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! আমি এই উপলক্ষ্যে দিগধিষ্ঠাত্রী দেবতার সহিত মহর্ষি অষ্টাবক্রের কথোপকথন কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।”
অষ্টাবক্রের বদান্যমহর্ষিকন্যার পাণিপ্রার্থনা
“পূৰ্ব্বে মহাতপাঃ অষ্টাবক্র মহর্ষি বদান্যের সুপ্রভানাম্নী কন্যার রূপলাবণ্যদর্শনে বিমুগ্ধ হইয়া উহাকে বিবাহ করিবার নিমিত্ত উহার পিতার নিকট গমনপূর্ব্বক স্বীয় অভিলাষ ব্যক্ত করিয়াছিলেন। মহর্ষি বদান্য অষ্টাবক্রের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, ‘বৎস! তুমি একবার উত্তরদিকে গমনপূর্ব্বক একজনের সহিত সাক্ষাৎকার করিয়া আইস, তাহা হইলেই আমি তোমাকে কন্যাদান করিব।’
“মহর্ষি অষ্টাবক্র কহিলেন, ‘মহাত্মন্! আমাকে উত্তরদিকে কাহার সহিত সাক্ষাৎকার করিতে হইবে, তাহা আপনি কীৰ্ত্তন করুন। আপনি এক্ষণে আমাকে যাহা করিতে অনুমতি করিবেন, আমি তাহাই করিব।’
“মহর্ষি বদান্য কহিলেন, বৎস! তুমি অলকাপুরী ও হিমালয় পৰ্ব্বত অতিক্রমপূৰ্ব্বক কৈলাসপৰ্ব্বতে ভগবান্ ভূতভাবনের বাসস্থান অবলোকন করিবে। তথায় সিদ্ধ, চারণ, বিবিধমুখ প্রমথ ও দিব্যাঙ্গরাগসংযুক্ত পিশাচগণ মহাদেবের চতুর্দ্দিক পরিবেষ্টনপূৰ্ব্বক মহাহ্লাদে তানপ্রদানপুরঃসর [সুর ভাঁজিতে ভাঁজিতে] নৃত্যগীত করিয়া তাঁহার পরিচর্য্যা করিতেছেন। কৈলাসপৰ্ব্বতের ঐ স্থান অতিরমণীয়। ভগবান ভূতনাথ স্বীয় অনুচরগণের সহিত নিয়তকাল তথায় অবস্থান করিয়া থাকেন। দেবী পার্ব্বতী মহাদেবকে লাভ করিবার নিমিত্ত ঐ স্থানে অতি কঠোর তপানুষ্ঠান করিয়াছিলেন বলিয়া ঐ স্থান উহাদের উভয়েরই অতি সন্তোষকর হইয়াছে। উহার পূৰ্ব্বে ও উত্তরদিকে ছয় ঋতু, কাল, রাত্রি এবং দেবতা ও মনুষ্য প্রভৃতি সকলেই দেবদেবের উপাসনার নিমিত্ত নিয়ত বিদ্যমান রহিয়াছে। তুমি ঐ স্থান অতিক্রম করিয়া গমন করিতে করিতে দেবসন্নিভ অতিরমণীয় এক নীলবন অবলোকন করিবে। ঐ স্থানে এক বৃদ্ধা তপস্বিনীর সহিত তোমার সাক্ষাৎ হইবে। তুমি তাঁহাকে দর্শনপূৰ্ব্বক পরমযত্নসহকারে তাঁহার সৎকার করিয়া এই স্থানে প্রত্যাগমন করিবে। তুমি তথায় সেই বর্ষীয়সীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া প্রত্যাগমন করিলেই আমি তোমাকে কন্যা দান করিব। এক্ষণে যদি এই নিয়ম প্রতিপালন করা তোমার অভিমত হয়, তাহা হইলে অচিরাৎ তথায় গমন কর।
“তখন অষ্টাবক্র কহিলেন, “ভগবন্! আপনি আমাকে যে বিষয়ে অনুমতি প্রদান করিলেন, নিশ্চয়ই তাহা সম্পাদন করিব।
বদান্যের নির্দ্দেশে অষ্টাবক্রের হিমালয়গমন
“ভগবান্ অষ্টাবক্র বদান্যকে এই কথা কহিয়া অচিরাৎ উত্তরাভিমুখে যাত্রা করিয়া, ক্রমে ক্রমে সিদ্ধচারণসেবিত হিমালয়পৰ্ব্বতে সমুপস্থিত হইয়া ধর্ষদায়িনী বাহুদানদীর পবিত্রজলে স্নান ও দেবগণের তৰ্পণ করিয়া ঐ শোকবিহীন বিমল তীর্থে কুশশয্যায় শয়নপূৰ্ব্বক পরমসুখে রজনী অতিবাহিত করিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে ঐ মহাত্মা গাত্রোত্থানপূর্ব্বক স্নানক্রিয়া সমাপনানন্তর অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া যথাবিধি আহুতি প্রদান করিলেন। ঐ স্থানে এক হ্রদ ও হ্রদের অনতিদূরে হরপাৰ্ব্বতীর প্রতিমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ভগবান্ অষ্টাবক্র ঐ হ্রদের তীরে কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিয়া হরপার্ব্বতীর প্রতিমা দর্শনপূর্ব্বক কৈলাসপর্ব্বতে সমুপস্থিত হইয়া মহাত্মা ধনপতির কাঞ্চনময় পুরদ্বার, মন্দাকিনীনদী ও নলিনীদলসমাচ্ছন্ন সরোবরের শোভা দর্শন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ঐ সরোবরের তত্ত্বাবধায়ক নিশাচরগণ মণিভদ্রতনয়ের সহিত তাঁহার সম্মুখে সমুপস্থিত হইল। ভগবান্ অষ্টাবক্র সেই ভীমবিক্রম, রাক্ষসগণকে অবলোকনপূর্ব্বক তাঁহাদের যথোচিত সৎকার করিয়া কহিলেন, ‘নিশাচরগণ! তোমরা অবিলম্বে ধনপতির নিকট আমার আগমন সংবাদ প্রদান কর।’ তখন নিশাচরগণ তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, ‘“ভগবন! আপনার আগমনবৃত্তান্ত যক্ষরাজের অবিদিত নাই। ঐ দেখুন, তেজঃপুঞ্জকলেবর ভগবান্ কুবের স্বয়ং আপনার নিকট আগমন করিতেছেন।’
‘রাক্ষসগণ এই কথা কহিতে কহিতেই ধনাধিপতি কুবের মহাত্মা অষ্টাবক্রের নিকট আগমনপূৰ্ব্বক তাঁহাকে কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, ‘ব্ৰহ্মর্ষে! আপনি আমাকে যাহা আজ্ঞা করিবেন, আমি তাহাই করিতে সম্মত আছি। এক্ষণে আপনি আমার গৃহে আগমন করুন। তথায় সৎকৃত ও বিশ্রান্ত হইয়া নির্ব্বিঘ্নে গমন করিবেন। মহাত্মা কুবের এই বলিয়া মহর্ষি অষ্টাবক্রকে স্বীয় গৃহে আনয়নপূর্ব্বক আসন ও পাদ্য অর্ঘ্যপ্রদানপুরঃসর উপবেশন করাইয়া স্বয়ং উপবিষ্ট হইলেন। ঐ সময় মণিভদ্রপ্রমুখ যক্ষ, গন্ধৰ্ব্ব ও কিন্নরগণও তথায় সমুপস্থিত হইয়া উপবেশন করিলেন। তখন মহাত্মা কুবের মহর্ষি অষ্টাবক্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! অপ্সরাগণ নৃত্য করিবার মানসে সমুপস্থিত হইয়া আপনার অনুমতি প্রার্থনা করিতেছে। কুবের এই কথা কহিলে অষ্টাবক্র মধুরবাক্যে তাঁহাকে কহিলেন, ‘যক্ষরাজ! অতিথিসৎকার করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য। অতএব, এক্ষণে অপ্সরাগণ নৃত্য করিতে আরম্ভ করুক।’
অষ্টাবক্রের কুবের আতিথ্যগ্রহণ—পুনঃপর্য্যটন
“ভগবান্ অষ্টাবক্র এইরূপে অনুমতি প্রদান করিলে নানাবেশধারিণী উৰ্ব্বরা, মিশ্রকেশী, রম্ভা, উৰ্ব্বশী, অলম্বুষা, ঘৃতাচী, চিত্রা, চিত্রাঙ্গদা, রুচি, মনোহরা, সুকেশী, সুমুখী, হাসিনী, প্রভা, বিদ্যুতা, প্রশমী, দান্তা, বিদ্যোতা ও রতি প্রভৃতি অপ্সরোগণ নৃত্য এবং গন্ধৰ্ব্বগণ বিবিধ বাদিত্ৰনিস্বন [বাদ্যধ্বনি] করিতে লাগিল। এইরূপে নৃত্য আরম্ভ হইলে মহাতপাঃ ভগবান্ অষ্টাবক্র সেই কুবেরের আবাসে দেবমানের এক বৎসর পরমসুখে অতিবাহিত করিলেন। অনন্তর একদা মহাত্মা যক্ষরাজ মহর্ষি অষ্টাবক্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! নৃত্যগীতাদি অতি মনোহর বিষয়। আপনি এই উপলক্ষ্যে এক বৎসর আমার আলয়ে অতিবাহিত করিলেন। এক্ষণে যদি আপনার মত হয়, তাহা হইলে আরও কিছু দিন এই স্থানে অবস্থান করুন। আপনি অতিথি ও আমাদিগের পূজনীয়। আমরা আপনার আজ্ঞাবহ ভৃত্য এবং আমাদের গৃহ আপনার গৃহস্বরূপ সন্দেহ নাই।
“যক্ষরাজ এই কথা কহিলে ভগবান্ অষ্টাবক্র তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘যক্ষরাজ! আমি তোমার যথোচিত সৎকারদ্বারা যারপরনাই পরিতুষ্ট হইয়াছি। তোমার তুল্য শিষ্টাচারপরায়ণ ব্যক্তি অতি বিরল। এক্ষণে আমাকে মহর্ষির নিয়োগক্রমে নির্দ্দিষ্ট স্থানে গমন করিতে হইবে। তোমার বুদ্ধির ও সম্পত্তির বৃদ্ধি হউক। আমি চলিলাম।’ ভগবান্ অষ্টাবক্র এই বলিয়া তথা হইতে বিনির্গত হইয়া কৈলাস, মন্দর ও সুমেরু প্রভৃতি বিবিধ পর্ব্বত অতিক্রম করিলেন এবং পরিশেষে কিরাতরূপী মহাদেবের স্থান প্রদক্ষিণ ও তাঁহাকে প্রণাম করিয়া পবিত্র হইয়া ধরণীতলে অবতরণপূৰ্ব্বক ক্রমশঃ উত্তরাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন।
“কিয়ৎক্ষণ গমন করিতে করিতে এক মৃগপক্ষিসমাকীর্ণ, সকল প্রকার পুষ্পফলে পরিপূর্ণ, রমণীয় কানন তাঁহার নয়নগোচর হইল। ঐ অরণ্যমধ্যে এক দিব্য-আশ্রম ছিল। ঐ আশ্রমে বিবিধ রত্নবিভূষিত নানাপ্রকার পৰ্ব্বত, মণিভূমিনিখাত [মণিদ্বারা তট ও তলযুক্ত] মনোহর সরোবর ও অন্যান্য বহুবিধ অদ্ভুত পদার্থসমুদয় যারপরনাই উৎকৃষ্ট শোভা ধারণ করিয়াছিল। মহর্ষি অষ্টাবক্র সেই সমুদয় পদার্থের অলৌকিক শোভা দর্শনে চমৎকৃত হইয়া চতুর্দ্দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিতে করিতে সেই আশ্ৰমমধ্যে কুবেরপুরী অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এক সৰ্ব্বরত্নময় অত্যাশ্চর্য্য অনির্ব্বচনীয় পুরী তাঁহার নয়নপথে নিপতিত হইল। ঐ পুরীর পার্শ্বদেশে নানাপ্রকার মণিকাঞ্চনময় পর্ব্বত ও সুবৰ্ণবিমানসমুদয় বিরাজিত ছিল; মন্দারকুসুম সমলঙ্কৃত মন্দাকিনী কলকল শব্দে প্রবাহিত হইতেছিল এবং হীরক ও মণিসমুদয় চতুর্দ্দিকে প্রভাজাল বিস্তার করিতেছিল। ঐ পুরীমধ্যে বিচিত্র মণিহোরণসমলঙ্কৃত মুক্তাজালখচিত হৃদয়াকর্ষক বিবিধ গৃহসমুদয় বিদ্যমান ছিল। ভগবান্ অষ্টাবক্র সেই সমস্ত দর্শন করিয়া চিন্তা করিলেন, ‘এক্ষণে আমি কোন্ স্থানে অবস্থান করিব?’ পরিশেষে তিনি সেই পুরের দ্বারদেশে সমুপস্থিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, ‘আমি অতিথি; এক্ষণে তোমরা এই পুরমধ্যে যে কেহ বিদ্যমান থাক, আমাকে আসিয়া সমুচিত সৎকার কর।’
আতিথ্যলিপ্সু অষ্টাবক্রের প্রতি নারী-অনুরাগ
“মহাত্মা অষ্টাবক্র এই কথা কহিবামাত্র ঐ পুরমধ্যস্থ সৰ্ব্বাঙ্গ সুন্দরী সাতটি কন্যা অতিথিকে অভ্যর্থনা করিবার নিমিত্ত বহির্গত হইল। ঐ সময় মহর্ষি অষ্টাবক্র ঐ সাতটি কন্যার মধ্যে যাহাকে নিরীক্ষণ করিলেন, সেই তাঁহার মনোহরণ করিল।
“তিনি তাহাদের রূপলাবণ্যদর্শনে কিয়ৎক্ষণ নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া পরিশেষে কথঞ্চিৎ ধৈৰ্য্যাবলম্বনপূৰ্ব্বক চিত্তবিকার পরিহার করিলেন। অনন্তর সেই কন্যাগণ তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, ‘ভগবন্! আপনি এই আবাসমধ্যে প্রবেশ করুন।’ কন্যাগণ এই কথা কহিলে, অষ্টাবক্র উহাদের রূপমাধুরী ও গৃহসৌন্দৰ্য্য নিরীক্ষণে নিতান্ত অভিলাষী হইয়া তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন এবং তথায় এক শুক্লাম্বরধারিণী, পর্য্যাঙ্কে নিষণ্ন [খাটে উপবিষ্টা], সর্ব্বাভরণবিভূষিতা বৃদ্ধাকে নিরীক্ষণ করিয়া, ‘মঙ্গল হউক’ বলিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন। মহর্ষি গৃহে প্রবিষ্ট হইবামাত্র সেই স্থবিরা গাত্রোত্থানপূর্ব্বক তাঁহার প্রত্যুদ্গমন করিয়া উপবেশন করিতে অনুরোধ করিল। তখন মহর্ষি অষ্টাবক্র তথায় উপবেশন ও বিশ্রামসুখ লাভ করিয়া সেই সমস্ত নারীদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে অঙ্গনাগণ! তোমাদিগের মধ্যে যিনি অত্যন্ত জ্ঞানবতী ও ধৈর্য্যশালিনী, সেই রমণী এই স্থানে অবস্থান করুন। আর সকলেই স্ব স্ব আলয়ে স্বেচ্ছানুসারে গমন করুন।’
“মহর্ষি এই কথা কহিবামাত্র কামিনীগণ তাঁহাকে প্রদক্ষিণ করিয়া গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল। কেবল সেই বর্ষীয়সী সেই গৃহমধ্যে অবস্থান করিতে লাগিল। অনন্তর দিবস অতীত ও রজনী সমুপস্থিত হইল। তখন মহর্ষি এক দুগ্ধফেনধবল শয্যায় শয়ন করিয়া সেই বৃদ্ধাকে কহিলেন, ‘রজনী ক্রমশঃ বর্দ্ধিত হইতেছে; অতএব তুমিও এক্ষণে শয়ন কর।’ বৃদ্ধা তপোধনের বাক্য শ্রবণ করিয়া অন্য এক শয্যায় শয়ন করিল। অনন্তর কিয়ৎক্ষণ অতীত হইলে ঐ বর্ষীয়সী দুরন্ত শীতব্যপদেশে [শীতকাতরতাচ্ছলে] কলেবর কম্পিত করিয়া মহর্ষির শয্যায় আগমন করিল। মহর্ষি তাহাকে আপনার শয্যায় আগত দেখিয়া স্বাগতপ্রশ্নপূৰ্ব্বক তাহার সংবর্দ্ধনা করিলেন। তখন বৃদ্ধা অষ্টাবক্রের শয্যায় শয়ন করিয়া প্রীতিপূৰ্ব্বক তাঁহাকে আলিঙ্গন করিল। কিন্তু মহর্ষি কাষ্ঠের ন্যায় নির্ব্বিকার হইয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। বৃদ্ধা তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া দুঃখিতচিত্তে কহিল, ‘ভগবন্! পুরুষস্পর্শে স্ত্রীলোকের স্বভাবতই ধৈৰ্য্যলোপ হইয়া থাকে। আমি আপনাকে স্পর্শ করিয়া অনঙ্গশরে নিতান্ত জর্জ্জরীভূত হইয়াছি; এক্ষণে আপনাকে নিরীক্ষণ করিয়া অবধি ভগবান্ কুসুমায়ুধের [কামের] বশবর্ত্তিনী হইয়াছি। আপনি প্রফুল্লমনে আলিঙ্গন করিয়া আমাকে চরিতার্থ করুন। আমি আপনার নিকট আগ্রহাতিশয়সহকারে প্রার্থনা করিতেছি, আপনাকে আমার ইচ্ছা সফল করিতে হইবে। আপনি যে এতকাল কঠোর তপানুষ্ঠান করিয়াছেন, আমার মনোরথ পূর্ণ করাই ইহার অভীষ্ট ফল। এক্ষণে আমার এই যে সমস্ত ধনরত্ন ও অন্যান্য যাহা কিছু নিরীক্ষণ করিতেছেন, আপনি তৎসমুদয়ের ও আমার অধীশ্বর হউন। আপনি আমার আশা সফল করিলে আমিও আপনার সমুদয় ইচ্ছা পূর্ণ করিব। এই রমণীয় কাননমধ্যে আপনার একান্ত বশবর্ত্তিনী হইয়া পরমসুখে বিহার করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইয়াছে। আমরা এই স্থানে পরস্পর মিলিত হইলে লৌকিক-অলৌকিক নানাপ্রকার সুখভোগ করিতে সমর্থ হইব, সন্দেহ নাই। পুরুষসংসর্গ অপেক্ষা স্ত্রীলোকের উৎকৃষ্ট সুখ আর কিছুই নাই। স্ত্রীলোকেরা অনঙ্গশর নিপীড়িত হইলে নিতান্ত স্বেচ্ছাচারী হইয়া থাকে। তৎকালে প্রচণ্ড সূৰ্য্যকিরণসন্তপ্ত বালুকার উপর দিয়া গমন করিলেও তাহাদের পদতল ব্যথিত হয় না।
“বৃদ্ধা এইরূপ অসঙ্গত প্রার্থনা করিলে, অষ্টাবক্র তাহাকে কহিলেন, ‘ভদ্রে! আমি কদাচ নারী স্পর্শ করি নাই। ধৰ্ম্মশাস্ত্রকারেরা এই কাৰ্য্যকে নিতান্ত দূষিত বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। আমি বিষয়ভোগে নিতান্ত অনভিজ্ঞ। এক্ষণে ধৰ্ম্মানুসারে পাণিগ্রহণপূৰ্ব্বক পুত্রোৎপাদন করাই আমার উদ্দেশ্য। আমি ধৰ্ম্মতঃ পুত্রলাভ করিলে আমার নিশ্চয়ই শুভলোকসমুদয় লাভ হইবে। এক্ষণে তুমি ধৰ্ম্মের মর্ম্ম অবগত হইয়া এই ব্যাপার হইতে বিরত হও।’
“তখন বৃদ্ধা কহিল, ‘ভগবন্! স্ত্রীলোকেরা স্বভাবতই রতিপ্রিয়। পুরুষসংসর্গ উহাদের যেমন প্রীতিকর, অগ্নি, বরুণ প্রভৃতি দেবতারাও উহাদের তাদৃশ প্রীতিকর নহেন। দেখুন, সহস্র স্ত্রীলোকমধ্যে কথঞ্চিৎ একটি পতিব্রতা দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে। যখন উহাদিগের কামপ্রবৃত্তি প্রবৃদ্ধ হয়, তৎকালে উহারা পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভর্ত্তা, পুত্র ও দেবরের কিছুমাত্র অপেক্ষা করে না; আপনার অভিলাষ পূর্ণ করিতেই ব্যতিব্যস্ত হইয়া থাকে। হে তপোধন! প্রজাপতি স্ত্রীজাতিসংক্রান্ত যে সমস্ত দোষের কথা উল্লেখ করিয়াছেন, এই আমি আপনার নিকট তৎসমুদয় অবিকল কীৰ্ত্তন করিলাম।’
অষ্টাবরে নারী-প্রত্যাখ্যান—বৃদ্ধার কৌশল
“বর্ষীয়সী এই কথা কহিলে মহর্ষি অষ্টাবক্র তাহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভদ্রে! লোকে কার্য্যের আস্বাদজ্ঞ [আস্বাদে অভিজ্ঞ—রসবোধসমর্থ] হইলেই তদ্বিষয়ে তাহার প্রবৃত্তি জন্মে। আমি বিষয়সম্ভোগ কিছুমাত্র অবগত নহি; এই নিমিত্তই তোমার এই প্রার্থনায় সম্মত হইতেছি না। এক্ষণে এই কাৰ্য্য ভিন্ন তোমার অন্য কোন্ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিব, তাহা ব্যক্ত কর।’ তখন স্থবিরা কহিল, ‘ভগবন্! আপনি এ স্থানে কিছুদিন অবস্থান করুন। কালক্রমে সম্ভোগসুখের আস্বাদগ্রহে [আস্বাদগ্রহণে] সমর্থ হইবেন।’
“বৃদ্ধা এইরূপ অনুরোধ করিলে, ‘মহর্ষি অষ্টাবক্র তাহার বাক্যে সম্মত হইয়া কহিলেন, ‘ভদ্রে! তোমার যতদিন ইচ্ছা হইবে, আমি ততদিনই এই স্থানে বাস করিব, সন্দেহ নাই।’ তিনি বৃদ্ধাকে এই কথা কহিয়া উহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি তৎকালে উহার যে যে অঙ্গ নিরীক্ষণ করিলেন, তাহা কিছুতেই তাহার চিত্ত আকর্ষণে সমর্থ হইল না। তখন মহর্ষি ঐ নারীকে একান্ত জরাজীর্ণ বিবেচনা করিয়া দুঃখিত মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, এই নারী কি এই গৃহদেবতা? এ কি শাপপ্রভাবে এইরূপ বিকৃতরূপ হইয়াছে? যাহাই হউক, ইহাকে ইহার বিরূপতার কারণ জিজ্ঞাসা করা কোনমতেই কর্ত্তব্য হইতেছে না।’ মহর্যি এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে একদিন অতিক্রান্ত হইল। দিবা অবসান হইলে বৃদ্ধা মহর্ষিকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, ‘ভগবন! ঐ দেখুন, দিবাকর অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইয়াছেন; এক্ষণে আমি আপনার কোন্ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিব, আজ্ঞা করুন।’ তখন অষ্টাবক্র কহিলেন, ‘ভদ্রে! তুমি এক্ষণে আমার স্নানাৰ্থ সলিল আহরণ কর। আমি কৃতজ্ঞান হইয়া সন্ধ্যোপাসনা করিব।’ ”
