1 of 4

৩৬. ব্রাহ্মণসেবা প্রভাব—শত্রু-শম্বরসংবাদ

ব্রাহ্মণসেবা প্রভাব—শত্রু-শম্বরসংবাদ

ভীষ্ম কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! অতঃপর শত্রু-শম্বরসংবাদ নামে এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা দেবরাজ ইন্দ্র জটাধারী ও ভস্মাচ্ছাদিকলেবর হইয়া ছদ্মবেশে বিরূপ রথারোহণে শম্বুরাসুরের নিকট আগমনপূৰ্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘দৈত্যরাজ! তুমি কিরূপ ব্যবহারদ্বারা স্বজাতীয়দিগকে অতিক্রম করিয়াছ এবং কোন্ ব্যবহারবলেই বা তাহারা তোমাকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া গণনা করে, তাহা যথার্থরূপে কীৰ্ত্তন কর।

“শম্বর কহিলেন, ‘মহাত্মন! আমি কখন ব্রাহ্মণের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করি না; ব্রাহ্মণগণ যে উপদেশ প্রদান করেন, আমি তাহা গ্রহণ করিয়া থাকি; তাঁহারা শাস্ত্রব্যাখ্যা করিতে আরম্ভ করিলে আমি অনন্যমনে তাহা শ্রবণ করি; কদাচ তাহাতে অবজ্ঞা প্রকাশ করি না। আমি সর্ব্বদা ব্রাহ্মণগণকে সাদরসম্ভাষণ ও তাঁহাদিগের চরণ বন্দনা করিয়া থাকি; তাঁহারাও বিশ্বস্তচিত্তে আমাকে কুশল জিজ্ঞাসা ও আমার বাক্যের প্রত্যুত্তর প্রদান করিয়া থাকেন। আমি কখন তাঁহাদের [তাঁহাদের নিকট] কোন অপরাধ করি না। তাঁহারা অসাবধানে থাকিলেও আমি সাবধান এবং তাঁহারা নিদ্রিত হইলেও আমি জাগরিত থাকি।

‘আমি একান্ত ব্রাহ্মণানুগত বলিয়া শাস্ত্ৰাৰ্থ জিজ্ঞাসা করিলে মধুমক্ষিকা যেমন ক্ষৌদ্রপটলকে [মৌচাককে] মধুধারায় অভিষিক্ত করে, তদ্রূপ তাঁহারা আমাকে অমৃততুল্য বিদ্যারসে আর্দ্র করিয়া থাকেন। তাঁহারা সন্তুষ্টচিত্তে আমাকে যে উপদেশ প্রদান করেন, আমি স্বীয় মেধাবলে তৎসমুদয় গ্রহণ এবং একাগ্রচিত্তে তাঁহাদিগের শ্রেষ্ঠতার বিষয় অনুধ্যান করি। আমি সেই ব্রাহ্মণদিগের নিকট যুক্তিরূপ সুধাপান করিয়া থাকি বলিয়া তারাগণমধ্যস্থিত চন্দ্রমার ন্যায় স্বজাতীয়দিগের মধ্যে শ্রেষ্ঠভাবে অবস্থান করিতেছি। আমার পিতা ইহা বিলক্ষণ অবগত হইয়াছিলেন যে, যাহারা ব্রাহ্মণের মুখবিনির্গত অমৃতময় জ্ঞানস্বরূপ শাস্ত্র শ্রবণ করিয়া যুদ্ধাদি কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হয়, তাহারা অনায়াসে জয়লাভ করিতে পারে। তিনি দেবাসুরযুদ্ধসময়ে ব্রাহ্মণের মহিমা দর্শন করিয়া অতিশয় হৃষ্ট ও বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া নিশাকরকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভগবন্! ব্রাহ্মণগণ কি প্রকারে সিদ্ধিলাভ করিলেন?”

‘তখন চন্দ্র কহিলেন, “দৈত্যরাজ! ব্রাহ্মণেরা তপোবলে সিদ্ধিলাভ করিয়া থাকেন। ক্ষত্রিয়ের ভুজবলের ন্যায় ব্রাহ্মণের বাক্যবল নিতান্ত দুঃসহ। ব্রাহ্মণ নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী হইয়া গুরুগৃহে অবস্থানপূৰ্ব্বক অল্পমাত্ৰ বেদাধ্যয়ন করিয়া ক্রোধবিহীন হইলেই নিৰ্ব্বাণপদ লাভ করেন। আর তিনি স্বীয় গৃহে অবস্থানপূর্ব্বক পিতার নিকট সমুদয় বেদ অধ্যয়ন করিলেও লোকে তাঁহাকে গ্রাম্য বলিয়া সম্ভাষণ করিয়া থাকে। সর্প যেমন মূষিকাদিকে গ্রাস করে, তদ্রূপ বসুমতী রণপরাঙ্মুখ রাজা ও অপ্রবাসী ব্রাহ্মণকে গ্রাস করিয়া থাকেন। লক্ষ্মী অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন অভিমানশালী ব্যক্তির অধিকৃত, ব্রাহ্মণ অপ্রবাসী ও কন্যকা [অবিবাহিত কন্যা] গর্ভবতী হইলেই জনসমাজে দূষিত হইয়া থাকে।” হে মহাত্মন! আমার পিতা ভগবান্ চন্দ্রমার নিকট এই কথা শ্রবণ করিয়া ব্রাহ্মণগণকে পূজা করিতে আরম্ভ করিলেন; আমিও এক্ষণে পিতার ন্যায় ব্রাহ্মণগণকে পূজা করিয়া থাকি।’

“হে ধৰ্ম্মরাজ! পুরন্দর এইরূপে প্রচ্ছন্নভাবে শম্বরের নিকট ব্রাহ্মণের মাহাত্ম্য শ্রবণপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণগণের প্রতি ভক্তিপরায়ণ ও তাঁহাদের পূজায় যত্নবান হইয়া অচিরাৎ দেবরাজত্ব লাভ করিলেন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *