1 of 4

৩৩. ব্রাহ্মণমাহাত্ম্য—ব্রাহ্মণসম্বন্ধে নৃপতিকৰ্ত্তব্য

ব্রাহ্মণমাহাত্ম্য—ব্রাহ্মণসম্বন্ধে নৃপতিকৰ্ত্তব্য

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! মহীপালগণের কোন্ কার্য্য সৰ্ব্বোৎকৃষ্ট এবং তাঁহারা কোন্ কার্য্য অনুষ্ঠান করিলে ইহলোকে ও পরলোকে মঙ্গললাভ করিতে সমর্থ হয়েন?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মহীপাল সুখলাভার্থী হইয়া ব্রাহ্মণগণের আরাধনা করিবেন। ব্রাহ্মণগণের আরাধনাই রাজাদিগের সর্ব্বোকৃষ্ট কার্য্য। বৃদ্ধ শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণদিগকে প্রতিনিয়ত পূজা করা রাজার অবশ্য কর্ত্তব্য। যেসকল ব্রাহ্মণ রাজার নগর বা জনপদবাসী হইবেন, রাজা তাঁহাদিগকে বহুবিধ ভোগ্যবস্তুপ্রদান, তাঁহাদের প্রতি শান্তবাক্য প্রয়োগ ও তাঁহাদিগকে প্রতিনিয়ত নমস্কার করিবেন। এই কার্য্যকেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট কার্য্য বলিয়া অবধারণ করা ভূপতিদিগের শ্রেয়স্কর। আপনার দেহ ও পুত্রের ন্যায় ব্রাহ্মণগণকে প্রতিপালন করা রাজার পরমধর্ম্ম। যাঁহারা ব্রাহ্মণগণের মধ্যে পূজনীয়, রাজা তাঁহাদিগকে সমধিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শন করিবেন। ব্রাহ্মণেরা শান্তভাবে অবস্থান করিলে, রাজ্য নির্ব্বিঘ্নে রক্ষিত থাকে। আর তাঁহারা ক্রোধাবিষ্ট হইলে, মারণোচ্চটনাদি বিবিধ উপায় ও তপোবললব্ধ তেজদ্বারা সমগ্র দগ্ধ করিতে সমর্থ হয়েন। অতএব তাঁহাদিগকে পিতার ন্যায় পূজা ও সম্মান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। জলধর যেমন জলধারা বর্ষণ করিয়া শস্যোৎপাদনপূৰ্ব্বক লোকের জীবন রক্ষা করিতেছে, সেইরূপ তাঁহাদিগের প্রসাদেও লোকযাত্ৰা নির্ব্বাহ হইতেছে। অভিচারাদি ক্রিয়াদ্বারা ইঁহাদিগের বিনাশসাধন করা সাধ্যায়ত্ত নহে। ইঁহাদিগের গতি কুত্রাপি প্রতিহত হয় না। অরণ্যমধ্যে অগ্নিশিখা যেমন সমস্ত বন দগ্ধ করিয়া থাকে, সেইরূপ তাঁহারা ক্রোধাবিষ্ট হইলে সমুদয় ভস্মসাৎ করিতে সমর্থ হয়েন। অতি সাহসিক ব্যক্তিরাও উঁহাদিগকে দেখিয়া ভীত হইয়া থাকে। উঁহাদিগের গুণের ইয়ত্তা নাই। উঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ তৃণাচ্ছাদিত কূপের ন্যায় প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করেন এবং কেহ কেহ বা মেঘনির্ম্মুক্ত নভোমণ্ডলের ন্যায় ব্যক্তভাব ধারণ করিয়া থাকেন। কোন ব্রাহ্মণ নিতান্ত ক্ষিপ্রকারী ও কেহ কেহ বা কার্পাসের ন্যায় একান্ত মৃদু এবং কতকগুলি অতিশয় শঠ ও কতগুলি যারপরনাই অকপট। উহাদের মধ্যে কেহ কেহ কৃষিকার্য্যের অনুষ্ঠান ও গোরক্ষণ, কেহ কেহ ভিক্ষাচরণ, কেহ কেহ চৌর্য্যবৃত্তি অবলম্বন ও কেহ কেহ নট-নর্ত্তকের কার্য্যসাধন, কেহ কেহ নিরন্তর কলহপ্রবৃত্তির চরিতার্থতা সম্পাদন এবং কেহ কেহ বা লৌকিক ও অলৌকিক উভয়বিধ কার্য্য সাধন করিয়া থাকেন।

“ব্রাহ্মণমধ্যে এইরূপ বহুবিধ স্বভাবসম্পন্ন ব্যক্তিগণ নিরীক্ষিত হয়েন। সেই নানা কৰ্ম্মনিরত বিবিধ কাৰ্য্যোপজীবী ব্রাহ্মণগণের ধৰ্ম্মজ্ঞান সতত কীৰ্ত্তন করিবে। ব্রাহ্মণেরা পিতৃগণ, দেবতা, মনুষ্য, ও উরগগণের পূজ্য; দেবতা, পিতৃলোক, গন্ধৰ্ব্ব, রাক্ষস, অসুর ও পিশাচগণমধ্যে কেহই উঁহাদিগকে পরাজয় করিতে সমর্থ হয় না। 

উঁহারা দেবতাকে অদেবতা ও অদেবতাকে দেবতা করিয়া থাকেন। যাঁহারা উঁহাদিগের প্রিয়, তাঁহারা রাজা হয়েন; আর যাহারা অপ্রিয়, তাহারা পরাভূত হইয়া থাকে। যে মূর্খেরা ব্রাহ্মণের অযশ ঘোষণা করে, তাহারা নিশ্চয়ই বিনষ্ট হয়। পরের নিন্দা ও প্রশংসানিরত কীৰ্ত্তি-অকীৰ্ত্তির কারণ ব্রাহ্মণগণ নিরন্তর বিদ্বেষীদিগের প্রতি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া থাকেন। ব্রাহ্মণেরা যে পুরুষের প্রশংসা করেন, তিনি অভ্যুদয়শালী হয়েন; আর তাঁহারা যাহার নিন্দা করেন, সে অবিলম্বে পরাভূত হয়, সন্দেহ নাই। শক, যবন, কাম্বোজ, দ্রাবিড়, কলিঙ্গ, পুলিন্দ, উশীনর, কোলিসৰ্প ও মাহিষক প্রভৃতি কতকগুলি ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণগণের অনুগ্রহদৃষ্টি ব্যতিরেকে শূদ্রত্ব লাভ করিয়াছে। ব্রাহ্মণগণের নিকট প্ররাভূত হওয়াই শ্রেয়ঃ, তাঁহাদিগকে পরাজয় করা কদাপি বিধেয় নহে। সর্ব্বজন্তুবিনাশের পাপ অপেক্ষা ব্ৰহ্মহত্যার পাপ গুরুতর। মহর্ষিগণ ব্ৰহ্মাহত্যাকে মহাপাতক বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। ব্রাহ্মণগণের অপবাদ শ্রবণ করা কদাপি কর্ত্তব্য নহে। যে স্থলে উহাদিগের অপবাদ কীৰ্ত্তিত হয়, তথায় অধোমুখে অবস্থান বা তথা হইতে প্রস্থান করাই কৰ্ত্তব্য। ব্রাহ্মণগণের সহিত বিরোধ উৎপাদনপূৰ্ব্বক পরমসুখে জীবিত থাকিতে পারে, এরূপ লোক জীবলোকে অদ্যাপি জন্মে নাই এবং জন্মিবার সম্ভাবনাও নাই। মুষ্টিদ্বারা বায়ু গ্রহণ এবং হস্তদ্বারা চন্দ্র স্পর্শ ও পৃথিবী ধারণ করা যেরূপ দুষ্কর, ব্রাহ্মণকে পরাজয় করাও তদ্রূপ সুকঠিন, সন্দেহ নাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *