2 of 4

৫১. চ্যবনের মূল্যদানে নহুষের ধীবররক্ষা কথা

৫১তম অধ্যায়

চ্যবনের মূল্যদানে নহুষের ধীবররক্ষা কথা

ভীষ্ম কহিলেন, “মহারাজ! তখন নরপতি নহুষ মৎস্যজীবিগণের মুখে স্বীয় পুরোহিত মহর্ষি চ্যবনের বৃত্তান্ত শ্রবণ করিবামাত্র সত্বর অমাত্য ও পুরোহিতগণসমভিব্যাহারে সংযত হইয়া তাঁহার সমীপে গমনপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে আত্মপরিচয় প্রদান করিলেন। মহাত্মা চ্যবনও সেই দেবতুল্য সত্যব্রতপরায়ণ নরপতিকে অভ্যর্থনা করিলেন।

“তখন নরপতি নহুষ তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দ্বিজবর! এক্ষণে আমাকে আপনার কি প্রিয়কার্য্যসাধন করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন। আপনি আমাকে যে বিষয়ে অনুমতি করিবেন, অতি দুষ্কর হইলেও আমি তাহা সংসাধন করিব।’

“চ্যবন কহিলেন, ‘মহারাজ! মৎস্যজীবী ধীবরগণ অতিশয় শ্রান্ত হইয়াছে; অতএব তুমি উহাদিগকে মৎস্যগণের মূল্যের সহিত আমার মূল্য প্রদান কর।’

“নহুষ কহিলেন, ‘মহাত্মন্! যদি আপনার অভিমত হয় তাহা হইলে আপনার বিনিময়ে ধীবরদিগকে সহস্র মুদ্রা প্রদান করা যাউক।’

‘চ্যবন কহিলেন, ‘মহারাজ! সহস্র মুদ্রা আমার উপযুক্ত মূল্য নহে; অতএব তুমি বিশেষ বিবেচনা করিয়া যাহা আমার যথার্থ মূল্য হয়, উহাদিগকে তাহা প্রদান কর।’

“নহুষ কহিলেন, ‘ভগবন্! যদি আপনার অভিমত হয়, তাহা হইলে আপনার মূল্যস্বরূপ ইহাদিগকে একলক্ষ মুদ্রা প্রদান করা যায়।’

‘চ্যবন কহিলেন, রাজ! একলক্ষ মুদ্রা আমার উপযুক্ত মূল্য নহে। অতএব তুমি অমাত্যগণের সহিত পরামর্শ করিয়া যাহা আমার উপযুক্ত মূল্য হয়, উহাদিগকে প্রদান কর।’

“নহুর্ষ কহিলেন, ‘ভগবন্! তবে উহাদিগকে কোটি মুদ্রা প্রদান করা যাউক। আর যদি উহাও আপনার উপযুক্ত মূল্য না হয়, তাহা হইলে বলুন, উহাদিগকে উহা অপেক্ষা অধিক প্রদান করি।’

“চ্যবন কহিলেন, ‘রাজ! এক কোটি বা তদপেক্ষা অধিক মুদ্রা আমার উপযুক্ত মূল্য নহে। অতএব ব্রাহ্মণগণের সহিত পরামর্শ করিয়া যাহা আমার যথার্থ মূল্য হয়, তাহা প্রদান কর।’

“নহুষ কহিলেন, ‘ভগবন্! তবে ধীবরদিগকে আপনার মূল্যস্বরূপ অর্দ্ধরাজ্য বা সমুদয় রাজ্য প্রদান করি। আমার বোধ হয়, ইহাই আপনার উপযুক্ত মূল্য। এক্ষণে আপনার অভিপ্রায় কি তাহা ব্যক্ত করুন।’

‘চ্যবন কহিলেন, ‘মহারাজ! তোমার অৰ্দ্ধরাজ্য বা সমুদয় রাজ্য আমার উপযুক্ত মূল্য নহে। অতএব তুমি ঋষিদিগের সহিত পরামর্শ করিয়া যাহা আমার উপযুক্ত মূল্য, তাহাই প্রদান কর।’

চ্যনের জীবনমূল্যনিরূপণ—গোধনপ্রশংসা

“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষি চ্যবন এই কথা কহিলে নরপতি নহুষ তাঁহার যথার্থ মূল্যনিরূপণে অসমর্থ এবং অমাত্য ও পুরোহিতগণের সহিত নিতান্ত দুঃখিত ও চিন্তাসাগরে নিমগ্ন হইয়া মৎস্যজীবিগণকে কি প্রদান করিলে মহর্ষির যথার্থ মূল্য দান করা হইবে, ইহা চিন্তা করিতেছেন, এমন সময়ে এক গোগর্ভম্ভূত ফলমূলাহারী তপস্বী সহসা তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! আপনাকে উৎকণ্ঠিত দেখিতেছি কেন? আপনি অবিলম্বে আপনার উৎকণ্ঠার কারণ প্রকাশ করুন, আমি অবশ্যই আপনার উকণ্ঠা নিবারণ ও সন্তোষসাধন করিব। আমি পরিহাসাদিলেও-কখন মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করি না। অতএব আপনার নিকট যাহা কহিতেছি, নিশ্চয়ই তাহা সম্পাদন করিব।

“তখন মহাত্মা নহুষ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি এই মহর্ষি চ্যবনের মূল্য কি, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করিয়া আমাকে সবংশে পরিত্রাণ করুন। আমি কেবল বাহুবলশালী, আমার কিছুমাত্র তপোবল নাই। সুতরাং মহর্ষি রোষাবিষ্ট হইলে আমার কথা দূরে থাকুক, সমুদয় বিশ্বসংসার বিনাশ করিতে পারেন। আমি আজ মহর্ষি চ্যবনের মূল্য স্থির করিতে না পারিয়া অমাত্য ও পুরোহিতবর্গের সহিত একেবারে অগাধ চিন্তাসাগরে নিমগ্ন হইয়াছি; অতএব আপনি এই মহর্ষির মূল্য নিশ্চয় করিয়া আমাকে উদ্ধার করুন।’

নরপতি নহুষ এই কথা কহিলে সেই গোজাত মহর্ষি অমাত্যগণের সহিত তাঁহার হর্ষোৎপাদনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! ব্রাহ্মণগণ সমুদয় বর্ণ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। একমাত্র গোধনই উহাদিগের প্রকৃত মূল্য হইতে পারে। অতএব আপনি উহাই মহর্ষির মূল্যরূপে কল্পনা করুন।’ তখন নরপতি নহুষ অমাত্য ও পুরোহিতগণসমভিব্যাহারে মহা-আহ্লাদিত হইয়া ভৃগুনন্দন চ্যবনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহর্ষে! আপনি গাত্রোত্থান করুন। আমার বোধ হয়, গোধনই আপনার প্রকৃত মূল্য; অতএব এক্ষণে আমি গোধনদ্বারা আপনাকে ক্রয় করিলাম।’

“মহাত্মা নহুষ এই কথা কহিবামাত্র মহর্ষি চ্যবন তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘রাজন্‌! এই আমি গাত্রোত্থান করিলাম, তুমি আমাকে যথার্থমূল্যে ক্রয় করিয়াছ। ইহলোকে গোধনতুল্য ধন আর কিছুই নাই। গোমাহাত্ম্যকীৰ্ত্তন, গোমাহাত্ম্যশ্রবণ, গোদান ও গোদর্শনদ্বারা সমুদয় পাপনাশ ও মঙ্গললাভ হইয়া থাকে। গাভী পরমপবিত্র পদার্থ। শ্ৰী, অন্ন, দেবগণের হবনীয় দ্রব্য, স্বাহাকার, বষট্‌কার ও যজ্ঞসমুদয়ই গাভীগণ হইতে সমুৎপন্ন হয়। গাভীগণ দিব্যদুগ্ধ ধারণ ও ক্ষরণ করিয়া থাকে। উহারা সমুদয় লোকের নমস্য ও অমৃতের আধারস্বরূপ। উহাদিগের শরীরকান্তি ও তেজস্বিতা হুতাশনসদৃশ। গাভী হইতে জীবগণের যারপরনাই সুখোদয় হইয়া থাকে। গোকুল যে স্থানে অবস্থান করিয়া নির্ভয়ে নিশ্বাস পরিত্যাগ করে, সে স্থান পরম পরিত্র ও শোভাযুক্ত হয়। গাভী স্বর্গের সোপানস্বরূপ। স্বর্গে দেবগণও উহাদিগকে পূজা করিয়া থাকেন। গাভীর নিকট যে যাহা প্রার্থনা করে, সে তৎক্ষণাৎ তাহাই লাভ করিতে পারে। গাভী অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পদার্থ আর কিছুই নাই। হে ধৰ্ম্মরাজ! সম্পূর্ণরূপে গোকুলের মহিমা কীর্ত্তন করা আমার সাধ্য নহে। আমি এক্ষণে যাহা কহিলাম, ইহা তাহাদিগের গুণের একাংশ মাত্র।’

‘মহর্ষি চ্যবন এই কহিয়া নিরস্ত হইলে মহারাজ নহুষ ধীবরগণকে মহর্ষির মূল্যস্বরূপ একটি গাভী প্রদান করিলেন। তখন ধীবরগণ চ্যবনকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ‘মহর্ষে! যতক্ষণে সপ্তপদ ভূমি গমন করিতে পারা যায়, ততক্ষণ মাত্র সাধুদিগের সহিত একত্র বাস করিলেই তাঁহাদের সহিত মিত্ৰতালাভ হইয়া থাকে। আপনার সহিত বহুকাল আমাদিগের সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হইয়াছে; অতএব আপনি আমাদিগের প্রতি প্রসন্ন হউন। আপনি পরমপবিত্র ও তেজস্বী; এক্ষণে আমরা প্রণতভাবে আপনার নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি যে, আপনি অনুগ্রহ প্রকাশপূৰ্ব্বক আমাদের নিকট গাভী গ্রহণ করুন।”

‘চ্যবন কহিলেন, ‘হে ধীবরগণ! অগ্নিদাহে তৃণাদি যেমন ভস্মীভূত হয়, তদ্রূপ আশীবিষতুল্য মুনি ও দরিদ্রের ক্রোধ দৃষ্টিপাতে মনুষ্য সমূলে নির্ম্মূল হইয়া থাকে। তোমরা দরিদ্র, সুতরাং আমি কদাচ তোমাদের প্রার্থনা ভঙ্গ করিব না। এক্ষণে আমি তোমাদের গাভী গ্রহণ করিলাম। তোমরা পাপ হইতে মুক্ত হইলে, অতঃপর তোমরা এই মৎস্যগণের সহিত স্বর্গে গমন কর।

“মহর্ষি চ্যবন এই কথা কহিয়া ধীবরদিগের নিকট সেই গাভী গ্রহণ করিলে, তাহারা মৎস্যসমুদয়ের সহিত স্বর্গে গমন করিল। নরপতি নহুষ তাহাদিগকে স্বর্গারোহণ করিতে অবলোকন করিয়া নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। ঐ সময় সেই গোগর্ভজাত মহর্ষি ও ভৃগুনন্দন চ্যবন উভয়ে নরপতিকে অনুরূপ বর প্রার্থনা করিতে কহিলেন, তখন নরপতি মহা-আহ্লাদিত হইয়া তাঁহাদিগের বাক্যে স্বীকার করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! যেন, আমার ধৰ্ম্মে অচলা ভক্তি থাকে।’ নহুষ এইরূপ যুক্তিসঙ্গত বর প্রার্থনা করিলে ঋষিদ্বয় ‘তথাস্তু’ বলিয়া তাঁহার আনন্দবর্দ্ধনপূৰ্ব্বক তৎকর্ত্তৃক পূজিত হইয়া স্ব স্ব আশ্রমে গমন করিলেন। নরপতি নহুষও বরলাভে পরম পরিতুষ্ট হইয়া স্বীয় ভবনে প্রবিষ্ট হইলেন।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট পরপীড়াদর্শনের ক্লেশ, অন্যসহবাসজনিত স্নেহ ও গোমাহাত্ম্যের বিষয় কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে যদি তোমার অন্য কোন বক্তব্য থাকে, প্রকাশ কর।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *