2 of 4

৭৩. ইন্দ্রের গোলকপ্রশ্নে ব্রহ্মার উত্তর

৭৩তম অধ্যায়

ইন্দ্রের গোলকপ্রশ্নে ব্রহ্মার উত্তর

ভীষ্ম কহিলেন, “সুররাজ এইরূপ প্রশ্ন করিলে সর্ব্বলোক পিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘দেবরাজ! তুমি গোদানাদি বিষয়ে যে যে প্রশ্ন করিলে, কেহই ঐ সমুদয় প্রশ্ন করিতে সমর্থ হয় না। এক্ষণে আমি ঐ সমুদয়ের উত্তর কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

‘গোলোক নানাপ্রকার; ঐ লোসমুদয় আমার ও পতিব্রতা রমণীগণের দৃষ্টিগোচর হয়। তুমি কদাপি ঐ সমুদয় লোক অবলোকন করিতে সমর্থ হও না। ব্রতপরায়ণ মহর্ষি ও বিশুদ্ধবুদ্ধি ব্রাহ্মণগণ স্ব স্ব পুণ্যবলে সশরীরে ঐ সমুদয় লোকে গমন করিয়া থাকেন। যেসমুদয় ব্রাহ্মণ ব্রতপরায়ণ হইয়া সমাধিদ্বারা চিত্তকে নিৰ্ম্মল করিতে পারেন, তাঁহারা ইহলোকে থাকিয়াই স্বপ্নের ন্যায় ঐ সমুদয় লোক দর্শন করিতে সমর্থ হয়েন। কাল, জরা, পাপ, ব্যাধি ও ক্লম কদাপি ঐ সমুদয় লোক আক্রমণ করিতে সমর্থ হয় না। আমি প্রত্যক্ষ করিয়াছি, ঐ সমুদয় লোকে যে সমস্ত কামচারিণী ধেনু আছে, তাহারা স্ব স্ব অভিযানুসারে বিবিধ ভোগ্যবস্তু প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ঐ লোকসমুদয়ে বিবিধ মনোহর বাপী, সরোবর, নদী, বন, পর্ব্বত ও গৃহসকল বিদ্যমান আছে। ফলতঃ সুবিস্তীর্ণ গোলোসমুদয় অপেক্ষা আর কোন লোকই উৎকৃষ্ট নহে। সহিষ্ণু, ক্ষমাশীল, স্নেহবান্‌, গুরুভক্ত, অহঙ্কারবিরহিত, মাংসভক্ষণপরাঙ্মুখ, যোগযুক্ত, ধার্ম্মিক, জনকজননীর শুশ্রূষানিরত, সত্যবাদী, ব্রাহ্মণসেবাতৎপর, অনিন্দনীয়, ক্রোধবিহীন, গোব্রাহ্মণে ভক্তিমান, গুরু পরায়ণ, যাবজ্জীবন সত্যনিষ্ঠ, বদান্য, অপরাধীর প্রতি ক্ষমাবান, মৃদুস্বভাব, জিতেন্দ্রিয়, দেবভক্ত, অতিথিপ্রিয় ও দয়াবান মহাত্মারাই ঐ সমুদয় সনাতনলোক লাভ করিয়া থাকেন। পরদারনিরত, গুরু, শঠ, ক্রূর, ধৰ্ম্মদ্বেষ্টা ও ব্রহ্মহত্যাকারী দুরাত্মারা মনে মনেও সেই পবিত্রজনসেবিত লোকসমুদয় দর্শন করিতে পারে না।

‘এই আমি তোমার নিকট গোলোকসমুদয়ের বিষয় বিশেষরূপে কীৰ্ত্তন করিলাম, এক্ষণে গোদাননিরত মহাত্মাদিগের ফললাভের বিষয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যে ব্যক্তি ধর্মোপার্জ্জিত বা পৈতৃক ধনদ্বারা গোধন ক্রয় করিয়া ব্রাহ্মণকে প্রদান করেন, তাঁহার অক্ষয়লোক লাভ হয়। যে ব্যক্তি দতলব্ধ ধনদ্বারা গোধন জয় করিয়া ব্রাহ্মণকে প্রদান করেন, তিনি দেবমানের অযুত বৎসর স্বর্গসুখ অনুভব করিতে পারেন। যে ব্যক্তি ন্যায়ানুসারে পৈতৃক গোধন অধিকার করিয়া ব্রাহ্মণকে প্রদান করেন, তাঁহার সনাতন অক্ষয়লোক লাভ হয়। যে ব্যক্তি গোদান গ্রহণ করিয়া বিশুদ্ধ মনে সেই ধেনু ব্রাহ্মণকে প্রদান করেন, তাঁহারও অক্ষয়লোক লাভ হইতে পারে। যে ব্যক্তি জন্মাবধি জিতেন্দ্রিয় ও ক্ষমাশীল হইয়া সত্যবাক্য প্রয়োগ এবং ব্রাহ্মণ ও গুরুর অপরাধ ক্ষমা করেন, তিনি পবিত্র গোলক লাভ করিতে সমর্থ হয়েন।

‘ব্রাহ্মণের প্রতি কটুবাক্যপ্রয়োগ ও গোধনের হিংসা করা কাহারও কৰ্ত্তব্য নহে। সতত গোসেবানিরত হইয়া যত্নপূৰ্ব্বক গোধন রক্ষা করা অবশ্য কর্ত্তব্য। মহাত্মা ব্রাহ্মণ সত্যধর্ম্মনিরত হইয়া একটিমাত্র গোদান করিলে সহস্র গোদানের ফল, ক্ষত্রিয় ঐরূপ গুণসম্পন্ন হইয়া একটি গোদান করিলে পূর্ব্বোক্ত গোপ্রদাতা ব্রাহ্মণের তুল্যফল, বৈশ্য ঐরূপ গুণযুক্ত হইয়া একটি গোদান করিলে পঞ্চশত গোদানের ফল এবং শূদ্র বিনীত হইয়া একটি গোদান করিলে একশত পঞ্চবিংশতি গোদানের ফললাভ করিতে পারেন। যাঁহারা সত্যপরায়ণ, গুরুশুশ্রূষানিরত, দক্ষ, ক্ষমাশীল, দেবারাধনতৎপর, শান্তস্বভাব, অহঙ্কারবিহীন ও ধৰ্ম্মশীল হইয়া বিবিধপূর্ব্বক ব্রাহ্মণকে দুগ্ধবতী ধেনু প্রদান করেন, তাঁহাদিগের মহাফললাভ হয়। অতএব গোদান করা গুরুশুশ্রূষানিরত, সত্যধর্ম্মাবলম্বী, পরমভক্ত মহাত্মাদিগের অবশ্য কৰ্ত্তব্য। মহর্ষি ও সিদ্ধগণ কহিয়া থাকেন, যাঁহারা বেদাধ্যয়ননিরত ও গোভক্তিপরায়ণ হইয়া নিয়ত গোদর্শনে, প্রীতি প্রকাশ এবং যাবজ্জীবন গোসমুদয়কে নমস্কার করেন, তাঁহারা রাজসূয়যজ্ঞ ও বিবিধ সুবর্ণদানের তুল্য ফললাভ করিতে সমর্থ হয়েন।

‘পুণ্যশীল মহাত্মারা গোব্ৰতপরায়ণ, সত্যবাদী, শান্তস্বভাব ও অলুব্ধ হইয়া সংবৎসর আহারের পূর্ব্বে গোদিগকে ভোজ্যবস্তু প্রদান করিলে সহস্র গোদানের ফললাভ করিতে পারেন। যে ব্যক্তি গোব্ৰতশীল ও গোসমূহের প্রতি কৃপাপরায়ণ হইতে দশ বৎসর প্রতিদিন একবারমাত্র ভোজন করিয়া একবারের আহারীয় দ্রব্য গোসমুদয়কে প্রদান করেন, তাঁহার অনন্ত স্বর্গসুখলাভ হয়। ব্রাহ্মণগণ দিবসের মধ্যে একবারমাত্র আহার করিয়া একবারের ভোজ্যদ্রব্য সংগ্রহপুরঃসর তদ্দ্বারা গোধনক্রয়পূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণকে প্রদান করিলে সেই ধেনুর রোমপরিমিত বৎসর, ক্ষত্রিয়গণ ঐরূপ সঞ্চিত অর্থদ্বারা ধেনু ক্রয় করিয়া ব্রাহ্মণকে দান করিলে পাঁচ বৎসর, বৈশ্য ঐরূপে গোদান করিলে দুই বৎসর ছয় মাস এবং শূদ্র ঐরূপ নিয়মে গোদান করিলে এক বৎসর তিন মাস স্বর্গসুখ অনুভব করে। যে ব্যক্তি আত্মবিক্রয়দ্বারা গোধন ক্রয় করিয়া ব্রাহ্মণকে প্রদান করেন, তিনি যত কাল গোজাতি পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকে, তত কাল স্বর্গভোগ করিতে সমর্থ হয়েন। শাস্ত্রে নির্দ্দিষ্ট আছে যে, আত্মবিক্রয়দ্বারা ক্রীত গোধনের প্রতিলোমে অক্ষয় স্বর্গ সন্নিবিষ্ট থাকে। যে ব্যক্তি সংগ্রামে জয়লাভপূর্ব্বক ধেনুসমুদয় প্রাপ্ত হইয়া ব্রাহ্মণকে দান করেন, তাঁহার আত্মবিক্রয়ী গোদাতার তুল্য ফললাভ হয় এবং যে ব্যক্তি ধেনুর অভাবে যতব্রত হইয়া ব্রাহ্মণকে তিলনিৰ্ম্মিত ধেনু প্রদান করেন, তিনি সমুদয় দুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া পরলোকে পরমসুখে ক্ষীরসমুদ্র উপভোগ করিতে পারেন।

মনুষ্য সামান্যতঃ গোদান করিলেই উৎকৃষ্ট ফললাভ করিতে সমর্থ হয় না; অতএব পাত্র, কাল, গোবিশেষ ও গোদানের বিধি পরিজ্ঞাত হওয়া গোদানশীল মহাত্মাদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। যাঁহার আবাসে থাকিলে গোসমূহকে সূর্য্য ও অনলের উত্তাপজনিত ক্লেশ ভোগ করিতে হয় না এবং যিনি স্বাধ্যায়নিরত, বিশুদ্ধকুলসম্ভূত, প্রশান্ত, যজ্ঞানুষ্ঠানপরায়ণ, পাপভীরু, বহুজ্ঞ, শরণাগতপ্রতিপালক ও বৃত্তিহীন, তিনিই গোদানের উপযুক্ত পাত্র। অতএব উৎকৃষ্ট দেশে ও উৎকৃষ্ট সময়ে ঐরূপ ব্রাহ্মণকেই গোদান করা কর্ত্তব্য। ব্রাহ্মণের যজ্ঞ, কৃষ্যাদি কার্য্য, হোম, গুরুসেবা ও বালকপোষণার্থ গোদান করিবে। দুগ্ধবতী, বিদ্যালব্ধ বা যুদ্ধলব্ধ, মেষাদি প্রাণীর বিনিময়ে ক্রীত, যৌতুকপ্রাপ্ত, অক্লিষ্ট ও হৃষ্টপুষ্ট গোসমুদয়ই দান বিষয়ে প্রশস্ত বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। বলান্বিত [বলবান], শীলসম্পন্ন [শান্ত-ঠাণ্ডা] ও সুগন্ধবতী ধেনুসমুদয় প্রশংসনীয়। ভাগীরথী যেমন সমুদয় নদীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তদ্রূপ কপিলা গোসমুদয়ের মধ্যে প্রধান। ত্রিরাত্রি ভূমিশয্যায় শয়ন ও সলিলমাত্র পান করিয়া ব্রাহ্মণগণের। তৃপ্তিসাধনপূৰ্ব্বক তাঁহাদিগকে সবৎসা ধেনু প্রদান করিবে এবং গোদানের পর ত্রিরাত্র কেবল দুগ্ধপান করিয়া থাকিবে। এইরূপ বিধি অনুসারে সবৎসা ধেনু দান করিলে ঐ ধেনুর গাত্রে যতগুলি রোম থাকে, তত বৎসর স্বর্গভোগ হয়। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে বলবান, বিনীত, লাঙ্গলবহনে নিপুণ বৃষ দান করেন, তিনি দশ ধেনুপ্রদাতার তুল্য লোক লাভ করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি দুর্গম পথে ব্রাহ্মণ ও গোসমুদয়কে রক্ষা করেন, তিনি অশ্বমেধযজ্ঞের তুল্য ফল লাভ করিয়া মৃত্যুকালে যেরূপ ঐশ্বর্য্য ও যেরূপ লোকলাভ করিতে বাসনা করেন, তাহাই লাভ করিতে পারেন। আর যে ব্যক্তি নিস্পৃহ, সংযত, শুচি ও কামনাবিহীন হইয়া তৃণ; গোময় ও পত্র ভোজন করিয়া পরমানন্দে বনে বনে গোসমূহের অনুগমন করেন, তিনি দেবগণের সহিত অমরলোক অথবা স্বীয় অভিলষিত অন্য কোন উৎকৃষ্ট লোকে বাস করিতে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *