2 of 4

৭৭. গোদানফল বর্ণন

৭৭তম অধ্যায়

গোদানফল বর্ণন

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন রাজা যুধিষ্ঠির পুনরায় শান্তনুনন্দন ভীষ্মকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “পিতামহ! আপনার অমৃততুল্য বাক্যশ্রবণে আমার শ্রবণেচ্ছা ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইতেছে; অতএব আপনি পুনরায় আমার নিকট গোদানের ফল বিস্তারিতরূপে কীৰ্ত্তন করুন।”

ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পুনরায় গোদানের ফল জিজ্ঞাসা করিলে কুরুকুলতিলক মহাত্মা ভীষ্ম তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘বৎস! ব্রাহ্মণকে গুণসম্পন্ন বস্ত্রাবৃত তরুণী গাভী প্রদান করিলে পাপের লেশমাত্রও থাকে না। গোদাতাকে কখনই অন্ধকারময় নরকে নিপতিত হইতে হয় না। কিন্তু যে ব্যক্তি জলশুন্য তড়াগের ন্যায় দুগ্ধবিহীন বিকলেন্দ্রিয় জরারোগসম্পন্ন [বৃদ্ধ ও রোগগ্রস্ত।] গাভী প্রদান করিয়া ব্রাহ্মণকে নিরর্থক তাহার লালনপালনে ক্লেশভোগ করায়, তাহাকে নিশ্চয়ই ঘোরতর নরকে নিপতিত হইতে হয়। যে গাভী নিতান্ত দুর্দ্দান্ত, পীড়িত বা দুর্ব্বল, অথবা যে গাভী ক্রয় করিয়া তাহার মূল্য প্রদান করা হয় নাই, তাদৃশ গাভী দান করিলে দাতার অন্যান্য সৎকর্ম্মসমুপার্জ্জিত স্বর্গাদি লোকসমুদয় নিষ্ফল হইয়া যায়। অতএব বলসম্পন্ন, তরুণবয়স্ক, নিরীহ, সুগন্ধসম্পন্ন গাভীসমুদয় দান করাই প্রশংসনীয়। যেমন সমুদয় নদী হইতে গঙ্গা শ্রেষ্ঠ, তদ্রূপ সমুদয় গাভী হইতে কপিলাই শ্রেষ্ঠ।”

কপিলাদানমাহাত্ম্য—কপিলালক্ষণ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! সাধু ব্যক্তিরা কি নিমিত্ত কপিলাদানের সমধিক প্রশংসা করেন, আপনি তাহা বিশেষরূপে কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি বৃদ্ধদিগের নিকট কপিলার উৎপত্তিবিষয় যেরূপ শ্রবণ করিয়াছি, তাহা কহিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বকালে ভগবান্ স্বয়ম্ভু দক্ষকে প্রজাসৃষ্টি করিতে আদেশ করিলে, দক্ষ প্রজাপতি প্রজাদিগের হিতসাধনার্থ সৰ্ব্বপ্রথমে তাহাদিগের জীবনোপায় নির্দ্ধারিত করিয়াছিলেন। দেবগণ যেমন অমৃত অবলম্বন করিয়া জীবন ধারণ করেন, তদ্রূপ প্রজাগণ দক্ষনির্দ্দিষ্ট জীবিকা অবলম্বন করিয়া প্রাণধারণ করিতেছে। স্থাবর ও জঙ্গমপদার্থমধ্যে জঙ্গম এবং জঙ্গমের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। ব্রাহ্মণদ্বারাই যজ্ঞ নির্ব্বাহ হয়। যজ্ঞদ্বারা অমৃত উৎপন্ন হইয়া থাকে। ঐ অমৃত গাভীতে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। দেবগণ উহা পান করিয়া পরম পরিতুষ্ট হয়েন। প্রজাগণ সর্ব্বাগ্রে উৎপন্ন হইবামাত্র ক্ষুধার্ত্ত বালক যেমন পিতার নিকট গমন করে, তদ্রূপ জীবলাভের নিমিত্ত জীবিকাদাতা দক্ষের শরণাপন্ন হইয়াছিল। তখন প্রজাপতি দক্ষ প্রজাগণকে জীবিকার নিমিত্ত শরণাপন্ন দেখিয়া স্বয়ং অমৃতপান করিলেন। ঐ অমৃতপাননিবন্ধন প্রজাপতির পরম পরিতৃপ্তি হওয়াতে তাঁহার মুখ হইতে সুগন্ধ উদ্‌গার উদ্‌গীর্ণ এবং সেই উদ্‌গরপ্রভাবে সুরভি সমুৎপন্ন হইল।

“অনন্তর সেই সুরভি প্রজাদিগের মাতৃতুল্য কপিলাগণের সৃষ্টি করিলেন। উহাদের বর্ণ সুবর্ণের ন্যায়, উহারা প্রজাদিগের জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন। যেমন স্রোতস্বতীর তরঙ্গ বেগপ্রভাবে ফেন উৎপন্ন হয়, সেইরূপ সেই অমৃতবর্ণ কপিলাগণের অনবরত ক্ষরিত দুগ্ধ হইতে ফেন উত্থিত হইতে লাগিল। একদা সুরভিদিগের দুগ্ধফেন তাহাদের মুখ হইতে পরিভ্রষ্ট হইয়া মহাদেবের মস্তকে নিপতিত হওয়াতে তিনি সাতিশয় ক্রূদ্ধ হইয়া ললাটনেত্ৰদ্বারা কপিলাদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। তাঁহার দৃষ্টিপাতে বোধ হইল যেন কপিলাগণ দগ্ধ হইতেছে। পরিশেষে সূর্য্যকিরণে মেঘমণ্ডলে যেমন বিবিধবর্ণ সমুৎপন্ন হয়, তদ্রূপ মহাদেবের সেই ক্রোধদৃষ্টিপ্রভাবে কপিলাগণের বর্ণ নানাপ্রকার হইল। তন্মধ্যে যাহারা তাহার ক্রোধদৃষ্টি অতিক্রম করিয়া ভগবান্ চন্দ্রদেবের শরণাপন্ন হইয়াছিল, তাহারাই কেবল পূৰ্ব্বের ন্যায় আকারসম্পন্ন রহিল।

“অনন্তর প্রজাপতি দক্ষ ভগবান্ ভূতনাথকে ক্রূদ্ধ দেখিয়া সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘দেবদেব! তোমার মস্তকে বৎসদিগের মুখপরিভ্রষ্ট দুগ্ধ নিপতিত হওয়াতে তুমি অমৃতরসে অভিষিক্ত হইয়াছ। গোসমুদয়ের মুখপরিভ্রষ্ট দ্রব্য কখনই উচ্ছিষ্ট বলিয়া পরিগণিত হয় না। শশধর যেমন অমৃত সংগ্রহ করিয়া পুনরায় ক্ষরণ করেন, তদ্রূপ কপিলাগণ অমৃতসদ্ভূত দুগ্ধ ক্ষরণ করিয়া থাকে। বায়ু, অগ্নি, সুবর্ণ ও সমুদ্র যেমন কখনও দূষিত হইবার নহে, তদ্রূপ অমৃত দেবগণকর্ত্তৃক পীত হইলেও এবং গাভীর বৎসকর্ত্তৃক দুগ্ধ পীত হইলেও কদাপি দূষিত বলিয়া পরিগণিত হয় না। কপিলাগণ ঘৃত ও দুগ্ধদ্বারা এই বিশ্বসংসারের পুষ্টিসাধন করিবে। সকলেই ইহাদিগের অমৃতময় ঐশ্বর্য্য অভিলাষ করে।’

“প্ৰজাপতি দক্ষ মহাদেবকে এই কথা কহিয়া তাঁহাকে কতকগুলি গাভীর সহিত এক বৃষভ প্রদান করিলেন। তখন ভগবান্ ভূতনাথ পরম পরিতুষ্ট হইয়া সেই বৃষভকে বাহন ও ধ্বজরূপে নির্দ্ধারিত করিলেন। এই নিমিত্তই মহাদেবের নাম বৃষভধ্বজ বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছে। আর ঐ সময় দেবগণ একত্র হইয়া তাঁহাকে পশুদিগের অধিপতিরূপে পরিকল্পিত করিয়াছিলেন, সেই নিমিত্তই তিনি গোসমুদয়ের অধিপতি বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই নিমিত্তই সমুদয় গোদান অপেক্ষা কপিলাদানই উৎকৃষ্ট বলিয়া পরিগণিত হইয়াছে। গাভীসমুদয় জগতের শ্রেষ্ঠ পদার্থ ও জীবনস্বরূপ। উহারা অমৃতময়, অমৃতসম্ভূত, পরমপবিত্র, কামপ্রদ ও রুদ্ৰাধিষ্ঠিত। অতএব গাভীদান করিলে সমুদয় অভিলষিত দ্রব্য দান করা হয়। মানবগণ মঙ্গলকামনা করিয়া শুদ্ধাচারে এই গোসম্ভববৃত্তান্ত পাঠ করিলে তাহাদের সমুদয় পাপ বিনাশ এবং অনায়াসে পশু, পুত্র, ধন ও ঐশ্বর্য্যলাভ হয়। শান্তিকৰ্ম্ম, তর্পণ, বৃদ্ধ ও বালকের তুষ্টিসাধন এবং হব্য, কব্য, বিবিধ যান ও বস্ত্র দান করিলে যে ফললাভ হয়, গেদাতা একমাত্র গোদান করিয়া সেই ফললাভ করিতে পারে, সন্দেহ নাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *