2 of 4

৮৪. সুবর্ণমাহাত্ম্য–উৎপত্তি-বিবরণ

৮৪তম অধ্যায়

সুবর্ণমাহাত্ম্য–উৎপত্তি-বিবরণ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! সমুদয় লোকের, বিশেষতঃ ধর্ম্মদর্শী নরপতির পক্ষে যে গোদান সমুদয় দান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, অব্যবস্থিতচিত্ত নরপতিগণ বিধিপূৰ্ব্বক রাজ্যপালনে অক্ষম হওয়াতে অধোগতিলাভের উপযুক্ত হইয়াও যে ভূমিদানপ্রভাবে পাপ হইতে মুক্ত হইতে পারেন; পূৰ্ব্বে মহারাজ নৃগ ও মহর্ষি নাচিকেত গোদানপ্রভাবে যে উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিয়াছেন এবং সকল কর্ম্মেই যে ভূমি, গো ও সুবর্ণ উৎকৃষ্ট দক্ষিণা বলিয়া পরিগণিত হয়, তাহা আপনি কীৰ্ত্তন করিয়াছেন, আমি আপনার মুখে ভূমি ও গোসমুদয়ের বিষয় বিশেষরূপে শ্রবণ করিয়াছি; কিন্তু সুবর্ণের বিষয় আপনি সবিশেষ কীৰ্ত্তন করেন নাই। অতএব সুবৰ্ণ কি, কি নিমিত্ত কোন্ স্থান হইতে উহার উৎপত্তি হইয়াছে, উহার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা কে, উহা দান করিলে কি ফললাভ হয়, কি নিমিত্ত উহাদিগকে উৎকৃষ্ট বলিয়া নির্দ্দেশ করে, কি কারণে উহা শ্রুতিতে যজ্ঞাদি কার্য্যের প্রশস্ত দক্ষিণা বলিয়া পরিগণিত হইয়াছে এবং কি নিমিত্তই বা উহা গাভী ও ভূমি অপেক্ষা পবিত্রতাসম্পাদক উৎকৃষ্ট দক্ষিণা বলিয়া অভিহিত হয়, তৎসমুদয় শ্রবণ করিতে আমার একান্ত অভিলাষ হইয়াছে; অতএব আপনি উহার যথার্থ তত্ত্ব কীৰ্ত্তন করুন।”

স্বর্ণদান-উপদেশ—ভীষ্ম-পিতৃগণসংবাদ

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি সুবর্ণের উৎপত্তির বিষয় যেরূপ অবগত আছি, তাহা বিস্তারিতরূপে কীৰ্ত্তন করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে আমার পিতা মহাতেজস্বী শান্তনুর লোকান্তরপ্রাপ্তি হইলে আমি গঙ্গাতীরে গমন করিয়া তাঁহার শ্রাদ্ধ করিয়াছিলাম। তৎকালে আমার জননী জাহ্নবী বিস্তর সাহায্য করিয়াছিলেন। শ্রাদ্ধকালে তপঃসিদ্ধ বহুসংখ্যক ঋষি আমার, সমীপে উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় আমি সমাহিতচিত্তে ক্রমে ক্রমে তোয়দানাদি পূৰ্ব্বকৃত্যসমুদয় সমাপন করিয়া পিণ্ডদানে প্রবৃত্ত হইলে, অকস্মাৎ এক মনোহর কেয়ূরসম্পন্ন দিব্যাভরণভূষিত বাহু বিস্তৃত কুশসমুদয় ভেদ করিয়া সমুদগত হইল। তদ্দর্শনে আমার পিতা স্বয়ং সাক্ষাৎকারে পিণ্ড প্রতিগ্ৰহ করিতেছেন বিবেচনা করিয়া আমার আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। কিন্তু তাহার পরক্ষণেই শাস্ত্রচিন্তা করাতে আমার স্মরণ হইল যে, বেদে হস্তোপরি পিণ্ডদান করিবার বিধি বিহিত হয় নাই; পিতৃগণও কখন সাক্ষাৎসম্বন্ধে পিণ্ড প্রতিগ্রহ করেন না। বেদে কুশোপরি পিণ্ডদানের ব্যবস্থাই বিহিত হইয়াছে। অতএব পিতার হস্তে পিণ্ডদান করা কর্ত্তব্য নহে।

“আমি এইরূপে শাস্ত্রোক্ত প্রমাণ অনুধ্যানপূৰ্ব্বক পিতার হস্তে পিণ্ডদান না করিয়া দর্ভোপরি পিণ্ডদান করিলাম। আমি পিণ্ডদান করিবামাত্র আমার পিতার সেই হস্ত অন্তর্হিত হইল। অনন্তর রজনীকালে আমি নিদ্রিত হইলে পিতৃগণ স্বপ্নযোগে আমাকে দর্শনদান করিয়া কহিলেন, ‘বৎস! তুমি যে ধৰ্ম্ম হইতে পরিভ্রষ্ট হও নাই, ইহাতে আমরা পরম প্রীত হইয়াছি। তুমি শাস্ত্র সপ্রমাণ করিয়া আত্মা, ধৰ্ম্ম, শাস্ত্র, বেদ, পিতৃগণ, গুরু ও লোকপিতামহ ব্রহ্মা সকলেরই সম্মান রক্ষা এবং যুক্তিযুক্ত কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছ। এক্ষণে তুমি গোদানের পরিবর্তে কিঞ্চিৎ সুবর্ণ দান কর। তাহা হইলে আমরা পূর্ব্বপুরুষগণের সহিত পবিত্র হইব। সুবর্ণ সৰ্ব্বাপেক্ষা পবিত্রতাসম্পাদক পদার্থ। যে ব্যক্তি সুবর্ণ দান করে, তাহার ঊর্দ্ধতন দশ ও অধস্তন দশ পুরুষ পবিত্র হয়। পিতৃগণ এই কথা কহিয়া অন্তর্হিত হইলে আমি জাগরিত হইয়া নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্ট ও সুবর্ণদানে কৃতসঙ্কল্প হইলাম।

স্বর্ণপ্রশংসা—পরশুরামের অশ্বমেধযজ্ঞ

“অতঃপর এই সুবর্ণমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন-উপলক্ষ্যে জমদগ্নিপুত্র দীর্ঘজীবী মহাত্মা পরশুরামের পুরাতন ইতিহাস কহিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে পরশুরাম রোষাবিষ্টচিত্তে একবিংশতিবার পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করিয়া সমুদয় পৃথিবী অধিকারপূর্ব্বক পরিশেষে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়গণপূজিত সৰ্ব্বকামসম্পন্ন, জীবগণের তেজোবর্দ্ধন, পরমপাবন অশ্বমেধযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। ঐ যজ্ঞফলে সকলেই নিষ্পাপ হইয়া থাকে কিন্তু তিনি সেই ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াও নিষ্পাপ হইতে পারেন নাই। তখন তিনি আপনাকে হেয় জ্ঞান করিয়া শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন মহর্ষি ও দেবগণের নিকট গমনপূৰ্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে পণ্ডিতগণ! নিষ্ঠুরকার্য্যনিরত মানবগণের পবিত্র হইবার উপায় কি, তাহা আপনারা কীৰ্ত্তন করুন।’ তখন মহর্ষিগণ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে ভার্গব! তুমি বেদবিধানানুসারে ব্রাহ্মণগণকে পূজা করিয়া তাঁহাদিগের নিকট পবিত্র হইবার উপায় জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহাদের আদেশানুসারে কার্য্য কর।’ মহর্ষিগণ এই কথা কহিলে পরশুরাম মহাত্মা বশিষ্ঠ, অগস্ত্য, কশ্যপ এবং দেবর্ষি নারদের নিকট গমন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে ব্রাহ্মণগণ! আমার পবিত্র হইবার একান্ত অভিলাষ হইয়াছে; অতএব যদি আপনারা আমার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করেন, তাহা হইলে কোন্ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান ও কি বস্তু দান করিলে আমি পবিত্র হইতে পারিব, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।’

“পরশুরাম এইরূপে স্বীয় পবিত্রতা-সম্পাদনবিষয় জিজ্ঞাসা করিলে, তপোধনগণ তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘হে ভার্গব! আমরা শ্রবণ করিয়াছি যে, মনুষ্য একান্ত পাপসংযুক্ত হইলেও গো, ভূমি ও ধন দান করিয়া অনায়াসে পবিত্রতা লাভ করিতে পারে। এক্ষণে অত্যদ্ভূত পবিত্রতম আর একটি দানের বিষয় উল্লেখ করিতেছি, শ্রবণ করুন। এই দানের নাম সুবর্ণদান। সুবৰ্ণ অগ্নির অপত্য। পূৰ্ব্বে উহা লোকসকলকে দগ্ধ করিয়া অগ্নির বীর্য্য হইতে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিল। উহা দান করিলে লোকে অনায়াসে সিদ্ধিলাভ করিতে সমর্থ হয়।’

রুদ্রের তেজোবীৰ্য্যে স্বর্ণের উৎপত্তিসূচনা

“অনন্তর মহর্ষি বশিষ্ঠ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘রাম! যাহা দান করিলে উৎকৃষ্ট ফললাভ হয়, সেই অগ্নিবর্ণ সুবর্ণ যেরূপে উদ্ভূত হইয়াছে, উহা যে পদার্থ এবং যে প্রকারে উহা উৎকর্ষতা লাভ করিয়াছে, আমি তাহা আদ্যোপান্ত কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। সুবর্ণ অগ্নিসোমাত্মক। অজ দান করিলে অগ্নিলোক, মেষ দান করিলে বরুণলোক, অশ্ব দান করিলে সূর্য্যলোক, কুঞ্জর দান করিলে নাগলোক, মহিষ দান করিলে অসুরলোক, কুক্কুট ও বরাহ দান করিলে রাক্ষসতুল্য লোক এবং ভূমি দান করিলে যজ্ঞফল, গোলোক, বরুণলোক ও চন্দ্রলোক লাভ হয়। কিন্তু ঐ অজমেষাদি সমুদয় পদার্থই সুবর্ণ অপেক্ষা নিকৃষ্ট। পূৰ্ব্বে সমুদয় জগৎ মন্থন করিয়া একটি তেজ সমুত্থিত হইয়াছিল, সেই তেজই সুবর্ণ। সুবর্ণ সমুদয় রত্ন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এই নিমিত্তই গন্ধৰ্ব্ব, উরগ, রাক্ষস, মনুষ্য ও পিশাচগণ যত্নপূৰ্ব্বক উহা ধারণ করিয়া থাকে। কেহ কেহ সুবর্ণদ্বারা মুকুট, কেহ কেহ অঙ্গদ ও কেহ কেহ বা অন্যরূপ অলঙ্কার প্রস্তুত করিয়া ধারণ করে। অতএব সুবর্ণ ভূমি, গো ও অন্যান্য রত্ন অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং ভূমিদান ও গোদান অপেক্ষা সুবর্ণদান শ্রেয়স্কর। সুবর্ণ অক্ষয় ও পরমপবিত্র। অতএব তুমি ব্রাহ্মণগণকে সুবর্ণ দান কর। দক্ষিণাদানকালে সুবর্ণই প্রশস্ত বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। যাহারা সুবর্ণ দান করে তাহাদিগের সমুদয় পদার্থ প্রদান করা হয়। অগ্নি সমস্ত দেবতাস্বরূপ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়েন। সুবর্ণ সেই অগ্নি হইতে উদ্ভূত হইয়াছে, সুতরাং যিনি সুবর্ণ দান করেন, তাঁহার সমুদয় দেবতা প্রদান করা হয়। ফলতঃ সুবর্ণ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই।

‘হে রাম! আমি পূৰ্ব্বে পুরাণগ্রন্থে প্রজাপতির বাক্য পাঠ করিয়া অবগত হইয়াছি, পাৰ্ব্বতীর সহিত ভগবান্ শূলপাণির পরিণয়ের পর তাঁহারা গিরিবর হিমাচলে অপত্যোৎপাদনের নিমিত্ত পরস্পর সমাগত হইলেন। তখন দেবগণ নিতান্ত উদ্বিগ্ন হইয়া রুদ্রের নিকট গমন এবং তাঁহার ও দেবী পাৰ্ব্বতীর পদবন্দনপূৰ্ব্বক দেবদেবকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি তপস্বী এবং দেবী পার্ব্বতীও তপস্বিনী। সুতরাং আপনাদের উভয়ের মিলন উভয়েরই প্রীতিকর হইয়াছে, সন্দেহ নাই। কিন্তু আপনাদের উভয়ের তেজ অমোঘ। আপনাদিগের যে পুত্র উৎপন্ন হইবেন, তিনি নিশ্চয়ই মহাবলপরাক্রান্ত হইবেন এবং স্বীয় বলবীর্য্যপ্রভাবে ত্রিলোকের কিছুই অবশিষ্ট রাখিবেন না।। অতএব আমরা আপনার নিকট প্রণত হইয়া এই বর প্রার্থনা করিতেছি যে, আপনি প্রজাগণের হিতসাধন করিবার নিমিত্ত তেজোহ্রাস করুন। আপনারা ত্রৈলোকের সার; সুতরাং আপনাদের উভয়ের সমাগম সকলের সন্তাপের কারণ হইয়াছে, সন্দেহ নাই। আর আপনাদিগের তেজ হইতে যে পুত্র উৎপন্ন হইবেন, তিনি নিশ্চয়ই দেবগণকে পরাভব করিবেন। বিশেষতঃ আপনার তেজ পৃথিবী, আকাশ বা স্বর্গ কেহই ধারণ করিতে সমর্থ হইবে না; উহার প্রভাবে নিশ্চয়ই সমুদয় জগৎ দগ্ধ হইয়া যাইবে। অতএব আপনি আমাদিগের প্রতি প্রসন্ন হইয়া যাহাতে আপনার ঔরসে দেবীর গর্ভে পুত্র উৎপন্ন না হয়, তাহার উপায়বিধানে মনোযোগী হউন, ধৈৰ্য্যাবলম্বনপূৰ্ব্বক আপনার প্রজ্বলিত তেজ সঙ্কুচিত করুন।”

রুদ্রাণী-অভিশাপে সুরগণের নিঃসন্তানতা

‘দেবগণ এইরূপ প্রার্থনা করিলে বৃষভবাহন রুদ্র ‘তথাস্তু’ বলিয়া তাঁহাদিগের বাক্যে স্বীকারপূৰ্ব্বক আপনার তেজ ঊর্দ্ধে উত্তোলিত করিলেন। তদবধি তাঁহার নাম ঊর্দ্ধরেতা বলিয়া প্রখ্যাত হইয়াছে। মহাদেব এইরূপে ঊদ্ধরেতা হইলে দেবী পাৰ্ব্বতী দেবগণের প্রযত্নে আপনার পুত্রোৎপত্তির বিলক্ষণ ব্যাঘাত জন্মিল দেখিয়া ক্রোধভরে তাঁহাদিগকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘হে সুরগণ! তোমরা আমার ভর্ত্তার সন্তানোৎপত্তি রোধ করিয়া দিলে; অতএব আমি অভিশাপ প্রদান করিতেছি, তোমাদিগের কখনই সন্তান উৎপন্ন হইবে না।’ হে ভার্গব! দেবগণ যখন মহাদেবের নিকট এইরূপ প্রার্থনা করেন, তৎকালে অগ্নি তথায় সমুপস্থিত ছিলেন না, সুতরাং পার্ব্বতীপ্রদত্ত অভিশাপ তাঁহাতে সংক্রামিত হইল না। কিন্তু অন্যান্য দেবতারা পাৰ্ব্বতীর শাপে সন্তানলাভে এককালে বঞ্চিত হইয়া রহিলেন।

‘যখন ভগবান ব্যোমকেশ তেজ উর্দ্ধে উত্তোলিত করেন, তৎকালে তাহা হইতে কিয়দ্দংশ স্খলিত ও ভূতলাভিমুখী হইয়া অগ্নিতে নিপতিত হইয়াছিল। সেই রুদ্রতেজ অগ্নিতে নিপতিত হইবামাত্র যারপরনাই পরিবর্দ্ধিত হইয়া উঠিল। এই ঘটনার অল্পদিন পরেই ইন্দ্রাদি দেবতা ও সাধ্যগণ তারকাসুরের বলবীর্য্যে সাতিশয় সন্তপ্ত হইলেন। তাঁহাদিগের আবাস, বিমান ও নগরসমুদয় এবং মহর্ষিগণের আশ্রমসকল অসুরগণকর্ত্তৃক অপহৃত হইল।’ ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *