৯৪তম অধ্যায়
পুরাকল্পীয় মৃণালাপহরণ বৃত্তান্ত
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বকালে কতকগুলি মহর্ষি ও রাজর্ষি তীর্থযাত্ৰা করিয়া এইরূপ মৃণালের নিমিত্ত শপথ করিয়াছিলেন। আমি এই উপলক্ষ্যে সেই পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে মহর্ষি শুক্র, অঙ্গিরা, কবি, অগস্ত্য, নারদ, পৰ্ব্বত, ভৃগু, বশিষ্ঠ, কশ্যপ, গৌতম, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, গালব, অষ্টাবক্র, ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠপত্নী অরুন্ধতী, বালখিল্যগণ এবং রাজর্ষি শিবি, দিলীপ, নহুষ, অম্বরীষ, যাতি, ধুন্ধুমার ও পুরু প্রভৃতি মহাত্মারা মহানুভব ভগবান শতক্ৰতুর সহিত প্রভাসতীর্থে সমুপস্থিত হইয়া পরস্পর মন্ত্রণা করিয়া পৃথিবীর বহুবিধ তীর্থে গমন করিয়াছিলেন। তাঁহারা অসংখ্য তীর্থপর্য্যটনপূৰ্ব্বক নিষ্পাপ হইয়া মাঘীপূর্ণিমাতে অতিপবিত্র কৌশিকীতীর্থে উপস্থিত হয়েন। ঐ তীর্থে ব্ৰহ্মসরঃনামে পদ্মকুমুদপরিপূর্ণ একটি পবিত্র সরোবর আছে। মহাত্মা মহর্ষি ও রাজর্ষিগণ ঐ সরোবরের পবিত্রজলে অবগাহনপুৰ্ব্বক পদ্মমৃণাল ও কুমুদমৃণালসমুদয় উৎপাটনপূর্ব্বক ভক্ষণ ও সঞ্চয় করিতে লাগিলেন।
“ঐ সময় মহর্ষি অগস্ত্য যেসমুদয় মৃণাল উত্তোলনপূর্ব্বক তীরভূমিতে সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহা অকস্মাৎ অপহৃত হইল। কিন্তু কে অপহরণ করিল, তাহার কিছুই নিশ্চয় হইল না। তখন ভগবান্ অগস্ত্য মহর্ষি ও রাজর্ষিগণকে কহিলেন, আমার বোধ হইতেছে, আপনাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি মৃণাল অপহরণ করিয়াছেন। অতএব যিনি উহা লইয়াছেন, তিনি শীঘ্র আমাকে উহা প্রদান করুন। আমার বস্তু অপহরণ করা আপনাদিগের কখনই কর্ত্তব্য নহে। আমি শুনিয়াছি, কালক্রমে ধর্ম্মের বলক্ষয় হইবে। আমার বোধ হয় এক্ষণে সেই ধর্ম্মদ্রোহী কালের আবির্ভাব হইয়াছে। অতএব যাবৎ লোকে অধর্ম্মে প্রবৃত্ত না হয়, যাবৎ ব্রাহ্মণগণ গ্রামমধ্যে শূদ্রদিগকে বেদ শ্রবণ না করান, যাবৎ ভূপতিগণ অধর্ম্মনিরত হইয়া প্রজার প্রতি অত্যাচার না করেন, যাবৎ উত্তম, মধ্যম ও নীচ লোকেরা পরস্পর অবজ্ঞাত না হয় এবং যাবৎ পরাক্রান্ত প্রাণীগণ দুৰ্ব্বল প্রাণীদিগের প্রতি অত্যাচার না করে, আমি সেই সময়ের মধ্যেই সুরলোকে প্রস্থান করিব, সন্দেহ নাই।’
“ভগবান্ অগস্ত্য এইরূপ আক্ষেপ করিলে মহর্ষি ও রাজর্ষিগণ তাঁহার বাক্যশ্রবণে নিতান্ত দুঃখিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘তপোধন! আপনি আমাদিগের প্রতি বৃথা দোষারোপ করিবেন না। আমরা কঠিন শপথ করিয়া কহিতেছি, আপনার মৃণাল অপহরণ করি নাই।’ এই বলিয়া তাহারা ক্রমে ক্রমে প্রত্যেকে শপথ করিতে আরম্ভ করিলেন।
মৃণালবিষয়ে ভৃগুপ্রভৃতির শপথ
“ভৃগু কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে তিরস্কৃত হইয়া তিরস্কার, তাড়িত হইয়া তাড়ন ও পৃষ্ঠমাংস ভক্ষণ করুক।’
“বশিষ্ঠ কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল হরণ করিয়াছে, সে অধ্যায়নিরত ও কুক্কুরের সহিত ক্রীড়াপরায়ণ হউক এবং সন্ন্যাসী হইয়া রাজধানীতে অবস্থান করুক [সন্ন্যাসীর সহরবাসে বিলাসাদির আকর্ষণে স্খলিত হওয়ার সম্ভাবনা]।’
“কশ্যপ কহিলেন, ‘ভগবন্ যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে সৰ্ব্বস্থানে সমুদয় বস্তু ক্রয়-বিক্রয়, ন্যস্ত ধন অপহরণ ও মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করুক।
“গৌতম কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে অহঙ্কৃত, কামক্রোধপরতন্ত্র ও মাৎসর্য্যপরায়ণ হইয়া জীবিত থাকুক।
“অঙ্গিরা কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে অশুচি, নিন্দিত, কুক্কুরের সহিত ক্রীড়াপরায়ণ, ব্রহ্মহত্যাকারী ও প্রায়শ্চিত্ত পরাঙ্মুখ হউক।’
“ধুন্ধুমার কহিলেন, ‘ভগবন! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে মিত্রের নিকট অকৃতজ্ঞতাচরণ, শূদ্রার গর্ভে পুত্রোৎপাদন ও একাকী উপাদেয় বস্তু ভোজন করুক।’
“পুরু কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে চিকিৎসাব্যবসায় অবলম্বন, স্বভার্য্যার উপার্জ্জিত ধনে জীবিকানির্ব্বাহ এবং নিয়ত শ্বশুরের অন্ন ভক্ষণ করিয়া প্রাণ ধারণ করুক।’
“দিলীপ কহিলেন, ‘ব্রাহ্মণ একটিমাত্র কূপসম্পন্ন স্থানে অবস্থানপূর্ব্বক শূদ্রসংসর্গ করিলে তাহার যে লোভ হয়, আপনার মৃণালহর্ত্তাকে যেন সেই লোক লাভ করিতে হয়।’
“শুক্র কহিলেন, ‘যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে বৃথামাংস ভোজন, দিবসে স্ত্রীসংসর্গ ও নরপতির দৌত্যকার্য্য স্বীকার করুক।’
“জমদগ্নি কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে অনধ্যায়ে অধ্যয়ন, শূদ্রের শ্রাদ্ধে ভোজন এবং স্বয়ং শ্রাদ্ধ করিয়া মিত্রকে ভোজন প্রদান করুক।’
“শিবি কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে অনাহিতাগ্নি হইয়া প্রাণত্যাগ, যজ্ঞের বিঘ্ন উৎপাদন ও তপস্বীদিগের সহিত বিরোধ করুক।’
“যযাতি কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল হরুণ করিয়াছে, সে জটাধারী ও ব্ৰতপরায়ণ হইয়া ঋতুকাল ব্যতীত ভাৰ্য্যাতে পুত্রোৎপাদন এবং বেদসমুদয়ের অনাদর করুক।’
“নহুষ কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল হরণ করিয়াছে, সে সন্ন্যাসী হইয়া গৃহে বাস, দীক্ষিত হইয়া যথেচ্ছাচার ও বেতন গ্রহণ করিয়া বিদ্যাদান করুক।’
“অম্বরীষ কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে ধৰ্ম্মপরিত্যাগ, ব্রহ্মহত্যা এবং জ্ঞাতি, স্ত্রী ও গোসমূহের প্রতি নৃশংস ব্যবহার করুক।’
“নারদ কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে দেহাত্মবাদী হউক এবং নিন্দিত গুরুর নিকট শাস্ত্রাধ্যয়ন, অযথাস্বরে বেদপাঠ ও গুরুজনদিগকে অবজ্ঞা করুক।’
“নাভাগ কহিলেন, ‘ভগবন্ যে আপনার মৃণাল হরণ করিয়াছে, সে গোশরীরে পদাঘাত, সূৰ্য্যাভিমুখে মূত্রপরিত্যাগ ও শরণাগত ব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান করুক।’
“বিশ্বামিত্র কহিলেন, ভগবন্! যে আপনার মৃণাল হরণ করিয়াছে, সে ভৃত্য হইয়া প্রভুর নিকট কপটতা প্রকাশ এবং রাজা ও অজ্য ব্যক্তিদিগের পৌরোহিত্য করুক।’
“পর্ব্বত কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে গ্রামের অধ্যক্ষতা, গর্দ্দভযানে আরোহণ ও জীবিকানির্ব্বাহের নিমিত্ত কুক্কুরের পরিচর্য্যা করুক।
“ভরদ্বাজ কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে ক্রূর ও মিথ্যাবাদী ব্যক্তির ন্যায় অশেষ পাপে লিপ্ত হউক।’
“অষ্টক কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে অকৃতজ্ঞ, যথেচ্ছাচারী, পাপপরায়ণ ভূপতি হইয়া অধৰ্ম্মানুসারে পৃথিবী শাসন করুক।’
“গালব কহিলেন, ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে পাপিষ্ঠ ব্যক্তি অপেক্ষা নিন্দনীয় হউক এবং সতত জ্ঞাতিদ্রোহ ও দান করিয়া তাহা কীর্ত্তন করুক।’
“অরুন্ধতী কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে শ্বশুরের অপবাদ, ভর্ত্তার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ ও একাকী সুস্বাদু বস্তু ভক্ষণ করুক।’
“বালখিল্যগণ কহিলেন, ‘ভগবন্! যাহারা আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, তাহারা জীবিকানির্ব্বাহের নিমিত্ত গ্রামদ্বারে একপদে অবস্থান ও ধৰ্ম্মজ্ঞ হইয়া ধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করুক।’
“শুনঃসখ কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে অগ্নিহোত্রে অনাদর করিয়া নিদ্রাসুখ অনুভব ও সন্ন্যাসী হইয়া যথেচ্ছাচার করুক।’
“সুরভী কহিলেন, ‘ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, লোকে কেশনির্ম্মিতরজ্জুদ্বারা তাহার পাদবন্ধন করিয়া পরবৎসের সাহায্য গ্রহণপূৰ্ব্বক কাংস্যময় দোহনপাত্রে তাহার দুগ্ধ দোহন করুক।’
“এইরূপে তত্ৰত্য সমুদয় ব্যক্তি নানাপ্রকার শপথ করিলে দেবরাজ ইন্দ্র সেই জাতক্রোধ মহর্ষি অগস্ত্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভগবন্! যে আপনার মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে চরিতব্রহ্মচর্য্য যজুৰ্ব্বেদী বা সামবেদী ব্রাহ্মণকে কন্যাদান, অথৰ্ব্ববেদ অধ্যয়ন করিয়া স্নান, সমুদয় বেদ অধ্যয়ন, পুণ্যসঞ্চয়, ধৰ্ম্মানুষ্ঠান ও ব্ৰহ্মলোক লাভ করুক।’
“তখন অগস্ত্য কহিলেন, ‘দেবরাজ! যখন তুমি শপথ করিবার ছলে আপনার মঙ্গল প্রার্থনা করিলে, তখন তুমিই আমার মৃণাল অপহরণ করিয়াছ; অতএব অচিরাৎ উহা আমাকে প্রদান করিয়া ধর্ম্ম প্রতিপালন কর।’
“ইন্দ্র কহিলেন, ‘ভগবন্! আমি লোভবশতঃ আপনার মৃণাল অপহরণ করি নাই; কেবল ধর্ম্ম শ্রবণ করিবার নিমিত্তই এই কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। এক্ষণে আমি মহর্ষিদিগের মুখে বিবিধ সনাতনধর্ম্ম শ্রবণ করিলাম। অতএব আপনি ক্রোধ পরিত্যাগপূর্ব্বক আপনার মৃণাল গ্রহণ করিয়া আমার অপরাধ মার্জ্জনা করুন।’
“সুররাজ পুরন্দর এইরূপ অনুনয় করিলে ভগবান্ অগস্ত্য প্রীতমনে স্বীয় মৃণাল গ্রহণপূর্ব্বক মহর্ষি ও রাজর্ষিদিগের সহিত পুনৰ্ব্বার বিবিধ পবিত্ৰতীর্থে গমন ও অবগাহন করিতে লাগিলেন। যে ব্যক্তি যথানিয়মে প্রতিপৰ্ব্বে এই পবিত্র উপাখ্যান পাঠ করেন, তাঁহাকে কখনই মূর্খ পুত্রের পিতা, বিদ্যাবিহীন, বিপদগ্রস্ত, রোগী ও জরাতুর হইতে হয় না। তিনি রজোগুণবিহীন ও মঙ্গলযুক্ত হইয়া অনায়াসে পরলোকে স্বর্গলাভ করিতে পারেন। আর যে ব্যক্তি ঐ মহর্ষিদিগের প্রণীত শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন, তিনি সনাতন ব্রহ্মালোক লাভ করিতে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই।”
