৭৫তম অধ্যায়
ব্রতনিয়মাদির পালনফল
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ ! আপনার ধর্ম্মসংকীৰ্ত্তনে আমি অত্যন্ত আহ্লাদিত হইয়াছি, এক্ষণে আমার আরও কয়েকটি বিষয়ে সন্দেহ আছে, আপনি অনুগ্রহ করিয়া তাহা ভঞ্জন করুন। ব্রত, নিয়ম, জিতেন্দ্রিয়তা, অধ্যয়ন, অধ্যাপন, বেদাধ্যয়ন, বেদাধ্যাপন, প্রতিগ্রহে অস্বীকার, স্বকৰ্ম্মানুষ্ঠান, শৌর্য্য, শৌচ, ব্রহ্মচর্য্য, দয়া এবং পিতা, মাতা, আচার্য্য ও গুরুজনের শুশ্রূষা এই সমুদয়ের ফল কি, আপনি তাহা বিশেষরূপে কীৰ্ত্তন করুন। উহা শ্রবণ করিতে আমার অতিশয় কৌতুহল উপস্থিত হইয়াছে।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যে ব্যক্তি শাস্ত্রানুসারে ব্রত আরম্ভ করিয়া যথানিয়মে তাহা সমাপন করেন, তাঁহার অক্ষয় লোকলাভ হইয়া থাকে। নিয়ম প্রতিপালন ও যজ্ঞানুষ্ঠানের ফল তুমি স্বয়ং সম্ভোগ করিতেছ; সুতরাং উহার ফল প্রত্যক্ষই হইতেছে। উত্তমরূপে অধ্যয়ন করিল ইহলোকে, পরলোকে ও ব্রহ্মলোকে পরম আনন্দ অনুভব করা যায়। অতঃপর জিতেন্দ্রিয়তার ফল বিশেষরূপে কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিমাত্রেই সৰ্ব্বত্র পরমসুখে কালযাপন করেন। তাঁহাদিগের ক্লেশের লেশমাত্রও থাকে না, তাঁহারা স্বেচ্ছানুসারে সৰ্ব্বত্রই গমনাগমন করিতে পারেন। কেহই তাঁহাদিগের শত্রুতা করে না। তাঁহারা যাহা প্রার্থনা করেন, তাঁহাই প্রাপ্ত হয়েন। তাঁহাদিগের কোন কামনাই অসিদ্ধ হয় না। তপস্যা, পরাক্রমপ্রকাশ, দান ও বিবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া লোকের যেরূপ স্বর্গসুখসম্ভোগ হয় একমাত্র জিতেন্দ্রিয়প্রভাবে সেইরূপই সুখলাভ হইয়া থাকে। দান অপেক্ষা জিতেন্দ্রিয়তা সমধিক প্রশংসনীয়। সময়ে সময়ে দাতা ক্রোধ প্রকাশ করিয়া থাকেন, কিন্তু জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি কখনই ক্রূদ্ধ হয়েন না। যে দাতা ক্রোধ-প্রকাশ না করিয়া দান করেন, তাঁহারই শাশ্বত লোকলাভ হইয়া থাকে, কিন্তু যিনি ক্ৰোধ করিয়া দান করেন, তাঁহার সেই দান বিফল হয়; অতএব দান অপেক্ষা যে জিতেন্দ্রিয়তা শ্রেষ্ঠ, তাহার আর সন্দেহ নাই। মহর্ষিগণ ইহলোক হইতে প্রস্থান করিয়া স্বর্গে যেসকল অদৃশ্য স্থানে গমন করিয়া থাকেন, জিতেন্দ্রিয়তাই তাঁহাদের তৎসমুদয় লাভের মূল কারণ।
“যে ব্যক্তি যথানিয়মে হোমাদিকার্য্যের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক শিষ্যগণকে উপদেশ প্রদান করেন, তিনি ব্রহ্মলোকে অক্ষয় সুখভোগ করিতে পারেন। যিনি উপাধ্যায়ের নিকট বেদাধ্যয়ন করিয়া স্বয়ং শিষ্যগণকে অধ্যয়ন করান এবং গুরুর কার্য্যের প্রশংসা করেন, তিনি নিশ্চয়ই স্বর্গলোকে সমাদৃত হয়েন। যে ক্ষত্রিয় যজ্ঞ, দান ও অধ্যয়নকার্য্যে নিরত হয়েন এবং সমরাঙ্গনে অন্যের পরিত্রাণ করেন, তাঁহারও স্বর্গলাভ হইয়া থাকে। বৈশ্য স্বীয় কার্য্যানুষ্ঠান-তৎপর হইয়া দান এবং শূদ্র স্বকৰ্ম্মনিরত হইয়া উৎকৃষ্ট বর্ণের শুশ্রূষা করিলে, নিশ্চয়ই স্বর্গলাভের অধিকারী হয়।
‘শূর [শূর শব্দ শ্রেষ্ঠার্থবাচক] বিবিধ প্রকার। যিনি যে বিষয়ে কিছুতেই পরাঙ্মুখ হয়েন না, তিনি সেই বিষয়ে শূর বলিয়া অভিহিত হয়েন। যিনি কদাচই যজ্ঞানুষ্ঠানে পরাঙ্মুখ হয়েন না, তিনি যজ্ঞশূর, যিনি কিছুতেই সত্য হইতে বিচলিত না হয়েন, তিনি সত্যশূর এবং যিনি প্রাণান্তেও যুদ্ধ পরিত্যাগ না করেন, তিনি যুদ্ধশূর নামে বিখ্যাত হয়েন। এইরূপ দানশূর, সাঙ্খ্যশূর, যোগশূর, অরণ্যবাসশূর, গৃহবাসশূর, ত্যাগশূর, আত্মোন্নতিবিধানশূর, ক্ষমাশূর, আর্জ্জবসূর, নিয়মশূর, বেদাধ্যয়নশূর, গুরুশুশ্রূষাশূর, পিতৃশুশ্রূষাশূর, মাতৃশুশ্রূষাশূর, ভৈক্ষ্যশূর ও অতিথিসৎকারশূর প্রভৃতি বিবিধ সকার্য্যশূর ইহলোকে বিদ্যমান আছেন। তাঁহারা সকলেই স্ব স্ব কৰ্ম্মফলনিবন্ধন উৎকৃষ্ট লোকে গমন করিবেন।
সত্যনিষ্ঠাদির প্রশংসা
“সমুদয় তীর্থে অবগাহন করিলেও সত্যবাদীর সদৃশ ফললাভ হয় কি না সন্দেহ। তুলাদণ্ডের এক দিকে সহস্র অশ্বমেধ ও অপর দিকে সত্য আরোপিত করিলে সহস্র অশ্বমেধযজ্ঞ অপেক্ষা সত্য গুরুতর হইয়া উঠে। একমাত্র সত্যপ্রভাবেই সূর্য্য উত্তাপ প্রদান করিতেছেন এবং সত্যপ্রভাবেই অগ্নি প্রজ্বলিত ও বায়ু প্রবাহিত হইতেছেন। ফলতঃ সমুদয় জগৎই সত্যে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। দেব, ব্রাহ্মণ ও পিতৃগণ সত্যপ্রভাবেই প্রীত হইয়া থাকেন। সত্য পরমধর্ম্ম, সত্যবাদী ব্যক্তিরা অনায়াসে স্বর্গসুখ লাভ করেন; অতএব সত্য উল্লঙ্ঘন করা কদাপি বিধেয় নহে। মহাত্মা মুনিগণ সকলেই সত্যনিরত, সত্যপরাক্রম ও সত্যশপথ হইয়া থাকেন, এই নিমিত্তই সত্য সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছে। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট দমগুণ ও সত্যের ফল বিশেষরূপে কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে ব্রহ্মচর্য্যের ফল কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যিনি জন্মাবধি ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করেন, তাঁহার কিছুই দুর্ল্লভ হয় না। সত্যনিরত দমগুণসম্পন্ন কোটি কোটি উৰ্দ্ধরেতা মহর্ষি ব্রহ্মচর্য্যপ্রভাবে ব্রহ্মলোকে বাস করিতেছেন। ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচর্য্য অনুষ্ঠান করিলে তাঁহার পাপের লেশমাত্রও থাকে না। ব্রাহ্মণ অগ্নিস্বরূপ তপানুষ্ঠাননিরত ব্রাহ্মণগণে অগ্নি প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে। ব্রহ্মচারী কুপিত হইলে দেবরাজ ইন্দ্রও যে ভীত হইয়া থাকেন, ইহাই মহর্ষিদিগের ব্রহ্মচর্য্যানুষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ। এক্ষণে পিতা, মাতা ও গুরুজনের শুশ্রূষার ফল কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যে ব্যক্তি পিতা, মাতা, গুরু ও আচার্য্যের শুশ্রূষায় একান্ত অনুরক্ত হয় এবং কদাপি তাঁহাদিগের দ্বেষ না করে, তাহারা স্বর্গলোকলাভ হয়, গুরুশুশ্রূষানিবন্ধন তাহাকে কদাপি নরক দর্শন করিতে হয় না।”
